মহান আল্লাহর দয়া ও ক্ষমার অনন্ত আহ্বান


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : অক্টোবর ৭, ২০২৬, ৪:৫১ পূর্বাহ্ন / ০
মহান আল্লাহর দয়া ও ক্ষমার অনন্ত আহ্বান
মানুষের দরজা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বন্ধুরা দূরে সরে যেতে পারে, পরিবার ভুল বুঝতে পারে, সমাজ পুরোনো ভুলের বিচার করতে পারে, নিজের বিবেকও কখনো নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে পারে। কিন্তু আল্লাহর রহমতের দরজা মানুষের রায়ের ওপর নির্ভর করে না। যে মানুষ নিজের অপরাধে ভেঙে পড়েছে, তার জন্য আল্লাহর রহমত আশ্রয়।

মমতাজ উদ্দিন আহমদ


মানুষ ভুল করতে পারে, কিন্তু আল্লাহর রহমতের দরজা তার জন্য বন্ধ হয়ে যায় না। মানুষের জীবন কখনো সরল নদীর মতো বয়ে যায় না। কোথাও তা পাথরে আঘাত পায়, কোথাও কাদায় আটকে যায়। কোথাও নিজেরই অন্ধকারে পথ হারায়। আমরা ভুল করি, কখনো জেনে, কখনো না জেনে। কখনো প্রবৃত্তির টানে, কখনো দুর্বলতার চাপে। তারপর একসময় নিজের হৃদয়ের কাছে দাঁড়িয়ে মনে হয় আমি কি আর ফিরে যেতে পারব? ইসলামের উত্তর অত্যন্ত কোমল, অথচ গভীরভাবে শক্তিশালী: হ্যাঁ, ফিরে যাওয়ার পথ এখনো আছে।

মহান আল্লাহর দুটি বহুল উচ্চারিত নাম আর-রহমান ও আর-রহিম। কুরআনের সূচনাতেই অর্থাৎ সুরা ফাতেহায় এই দুই নাম উচ্চারিত হয়েছে। যেন মানুষকে প্রথমেই জানিয়ে দেওয়া হয় আল্লাহর সঙ্গে তার সম্পর্কের দরজা ভয় দিয়ে নয়, রহমত দিয়ে খোলে।

আল্লাহর দয়া কোনো দূরের বিমূর্ত ধারণা নয়। মানুষ জন্মের আগেই তার জন্য রিজিকের ব্যবস্থা হয়। সে দুর্বল অবস্থায় পৃথিবীতে আসে। অথচ তার চারপাশে মা-বাবার মমতা, বাতাস, পানি, আলো ও জীবনের অসংখ্য উপকরণ সাজানো থাকে। সে ভুল করে, তবু তার শ্বাস থেমে যায় না। সে অবাধ্য হয়, তবু তওবার সম্ভাবনা নিঃশেষ হয়ে যায় না। এই দয়া মানুষকে পাপের অনুমতি দেয় না। বরং পাপের পরও ফিরে আসার সুযোগ দেয়। আল্লাহর রহমত হলো এমন এক আশ্রয়, যেখানে আহত আত্মা নিজের ক্ষত লুকাতে হয় না। সেখানে মানুষ সাজানো মুখ নিয়ে নয়, ভাঙা হৃদয় নিয়েও উপস্থিত হতে পারে।

মানুষের উদ্দেশ্যে কুরআনের সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক আহ্বানগুলোর মধ্যে সূরা আয-যুমার-এর ৫৩ নম্বর আয়াত উল্লেখযোগ্য। এ আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন: “হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর সীমালঙ্ঘন করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব পাপ ক্ষমা করে দেন; নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”

এই আয়াতের সৌন্দর্য শুধু ‘ক্ষমা’ শব্দে নয়। তার আগে ব্যবহৃত সম্বোধনে—“হে আমার বান্দারা”। যারা সীমালঙ্ঘন করেছে, তাদেরও আল্লাহ নিজের বান্দা বলে ডাকছেন। মানুষ পাপ করেছে, কিন্তু তার পরিচয়কে শুধু পাপ দিয়ে শেষ করে দেওয়া হয়নি। মানুষ ভুল করেছে এটি সত্য। কিন্তু সে তওবা করতে পারে এটিও সত্য। সে পড়ে গেছে এটি যেমন বাস্তব। তেমনি উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতাও তার মধ্যে আল্লাহ রেখেছেন।

এই আয়াত হতাশার অন্ধকারে একটি প্রদীপ। তবে এর অর্থ পাপকে হালকা করে দেখা নয়। আয়াতের পরবর্তী অংশে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার আহ্বান রয়েছে। অর্থাৎ রহমতের দরজা খোলা, কিন্তু সেই দরজার দিকে হাঁটতে হবে। ক্ষমার আশা থাকতে হবে, আর তওবার দায়িত্বও গ্রহণ করতে হবে।

ক্ষমা মানে ভুলকে বৈধ করা নয়: আল্লাহ ক্ষমাশীল। তাই বলে তিনি কখনোই অন্যায়কে তুচ্ছ করার শিক্ষা দেননি। ক্ষমা মানে অপরাধীর ফিরে আসার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। একজন মানুষ যদি অন্যের অধিকার নষ্ট করে, তবে শুধু মুখে ‘ক্ষমা চাই’ বললেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তওবার মধ্যে থাকে ভুলের জন্য আন্তরিক অনুশোচনা; পাপ বা অন্যায় কাজ ছেড়ে দেওয়া; পুনরায় সেই কাজে না ফেরার দৃঢ় সংকল্প; মানুষের অধিকার নষ্ট হলে তা ফিরিয়ে দেওয়া বা যথাসম্ভব সংশোধন করা; এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা। যে সত্যিকারের ক্ষমা চায়, সে নিজের আচরণ বদলানোর সাহসও অর্জন করে।

তওবা আরবি ‘তাওবা’ শব্দ থেকে এসেছে। এর অর্থ ফিরে আসা। মানুষ যখন ভুলের পথ থেকে সত্যের দিকে ফিরে আসে, তখনই তওবার সূচনা। তওবা শুধু ঠোঁটের উচ্চারণ নয়; এটি হৃদয়ের দিক পরিবর্তন। একজন মানুষ দীর্ঘদিন ভুল পথে চলতে পারে। তার হৃদয় ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে যেতে পারে। সে নিজের অপরাধকে যুক্তি দিয়ে ঢাকতে পারে। অন্যের ওপর দায় চাপাতে পারে। এমনকি ভুলকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে পারে। কিন্তু একদিন কোনো একটি মুহূর্তে তার অন্তরে প্রশ্ন জাগে আমি কি সত্যিই এ জীবনই চাই? এই প্রশ্নের ভেতরেই তওবার প্রথম আলো জ্বলে। যে মানুষ নিজের পতন থেকে শিক্ষা নেয়, সে আগের মানুষটি থাকে না। তার অশ্রু তাকে নম্র করে, অনুশোচনা তাকে সচেতন করে, আর আল্লাহর ওপর আশা তাকে নতুন পথে এগিয়ে দেয়।

সহিহ বুখারির একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে একজন মা তাঁর হারানো শিশুকে পেয়ে বুকে তুলে নেন ও দুধ পান করান। তখন নবী মুহাম্মদ (সা.) সাহাবিদের জিজ্ঞেস করেন, এই মা কি নিজের সন্তানকে আগুনে নিক্ষেপ করতে পারেন? তাঁরা বলেন, না। তখন তিনি বলেন “আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি এই মায়ের সন্তানের প্রতি মমতার চেয়েও বেশি দয়ালু।”

এই হাদিস আমাদের শুধু সান্ত্বনা দেয় না; আমাদেরও দয়ালু হতে শেখায়। যে ব্যক্তি আল্লাহর রহমত প্রত্যাশা করে, তাকে আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি নিষ্ঠুর হতে মানায় না। মানুষের ভুল দেখে তাকে চিরতরে বাতিল করে দেওয়া, অপমান করে তার তওবার পথ বন্ধ করা এগুলো রহমতের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

মানুষের বিচার দ্রুত, আল্লাহর দরজা বিস্তৃত: মানুষ কাউকে তার একটি ভুল দিয়ে বিচার করে। কেউ একবার ব্যর্থ হলে তাকে ব্যর্থ মানুষ বলে, কেউ একবার পাপ করলে তাকে চিরদিনের পাপী বলে, কেউ অতীতে ভুল করলে তার ভবিষ্যতের সব দরজা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু আল্লাহ মানুষের অতীত জানেন, বর্তমান দেখেন এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও জানেন। মানুষ যেখানে শুধু পতন দেখে, আল্লাহ সেখানে ফিরে আসার সম্ভাবনাও দেখেন। এ কারণেই কোনো মানুষের তওবার পথকে উপহাস করা উচিত নয়। যে ব্যক্তি আজ ভুলের মধ্যে আছে, সে আগামীকাল আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের একজন হয়ে উঠতে পারে। আর যে ব্যক্তি আজ নিজেকে পবিত্র মনে করছে, সে নিজের অহংকারে পতিত হতে পারে। আত্মশুদ্ধির পথ মানুষকে বিনয়ী করে। কারণ সে জানে আমি নিজেও আল্লাহর রহমতের মুখাপেক্ষী।

আল্লাহর ক্ষমার ওপর আশা রাখা ঈমানের সৌন্দর্য। গুনাহে অবিচল থাকার অর্থ আত্মপ্রবঞ্চনা। কেউ যদি বলে, “আল্লাহ ক্ষমা করবেন” কিন্তু অন্যায় ছাড়ার কোনো ইচ্ছা না রাখে, তবে সে রহমতের অর্থকে ভুল বুঝছে। রহমত মানুষকে বলে ফিরে এসো। তওবা বলে পুরোনো পথ বদলাও। ক্ষমা বলে অতীতের ভারে চিরদিন পিষ্ট থেকো না। দায়িত্ব বলে যাকে কষ্ট দিয়েছ, তার হক আদায় করো। এই চারটি একসঙ্গে না থাকলে ধর্মীয় উপলব্ধি অসম্পূর্ণ হয়ে যায়। শুধু ভয় মানুষকে দীর্ঘদিন বদলাতে পারে না। শুধু আশা মানুষকে দায়িত্বশীলও করে না। ভয় ও আশার ভারসাম্য, অনুশোচনা ও কর্মপরিবর্তনের সমন্বয় এটাই তওবার পূর্ণতা।

মনে রাখা দরকার ‘আল্লাহ ক্ষমা করবেন’ এই বাক্যটি দুঃখী মানুষের জন্য আশ্রয়। কিন্তু অন্যায়কারীর জন্য লাইসেন্স নয়। এটি ভেঙে পড়া মানুষকে উঠতে সাহায্য করবে। কিন্তু অন্যের অধিকার লঙ্ঘনের পর দায় এড়ানোর পথ হবে না। সত্যিকারের ক্ষমাপ্রার্থনা মানুষের চরিত্রে পরিবর্তন আনে। যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে ফিরে আসে, তার আচরণে তা প্রকাশ পেতে থাকে। সে মিথ্যা ও অহংকার থেকে দূরে থাকে। অন্যের প্রতি কোমল আচরণ, অন্যায় উপার্জন ও জুলুম থেকে সে দূরে সরে যায়।

আল্লাহর দয়া নিয়ে কথা বললে মানুষের পারস্পরিক ক্ষমার প্রশ্নও সামনে আসে। যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, তাকে অন্যকে ক্ষমা করার সাধনাও করতে হয়। ক্ষমা মানে জুলুমকে সমর্থন করা নয়। ক্ষমা মানে নিজের হৃদয়কে প্রতিহিংসার কারাগার থেকে মুক্ত করা। প্রতিশোধের আগুনকে নিজের অন্তরে স্থায়ী বাসা বানিয়ে রাখা আত্মার জন্য ক্ষতিকর। যে হৃদয় আল্লাহর ক্ষমা চায়, সে ধীরে ধীরে বুঝতে শেখে মানুষ অসম্পূর্ণ। যেমন আমি আল্লাহর রহমতের প্রয়োজন অনুভব করি, অন্য মানুষও তেমনই তাঁর রহমতের মুখাপেক্ষী। এই উপলব্ধি হৃদয়ে কোমলতা আনে।

তওবার সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলো আসে একা ঘরে, রাতের নীরবতায়, সিজদার ভেতর, অথবা অশ্রুসিক্ত কোনো দোয়ায়। মানুষ তখন নিজের সাজানো পরিচয় সরিয়ে রেখে আল্লাহর সামনে দাঁড়ায়। সে বলে না আমি নির্দোষ। সে বলে আমি ভুল করেছি। সে বলে না আমার কোনো দোষ ছিল না। সে বলে আমাকে ফিরিয়ে নিন। সে আল্লাহর রহমতের দিকে তাকায়। চোখের পানি অহংকারকে নরম করে দোয়ার ভাষা হয়ে ওঠে।

কখনো মানুষ মনে করে, এত পাপের পর আল্লাহর সামনে কীভাবে দাঁড়াব? অথচ আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর সবচেয়ে বড় কারণই তো মানুষের পাপ ও দুর্বলতা। যে নিজেকে সম্পূর্ণ পবিত্র মনে করে, সে নিজের রোগ বুঝতে পারে না। আর যে নিজের ভাঙন স্বীকার করে, সে চিকিৎসার দরজায় পৌঁছাতে পারে।

জামি‘ আত-তিরমিজির একটি হাদিসে কুদসিতে এসেছে আল্লাহ বলেন, বান্দা তাঁকে ডাকতে থাকে এবং তাঁর ওপর আশা রাখে, তাহলে তার যত পাপই থাকুক, আল্লাহ ক্ষমা করেন। পাপ আকাশের মেঘ পর্যন্ত পৌঁছালেও ক্ষমা প্রার্থনা করলে তিনি ক্ষমা করেন। এমনকি পৃথিবীসম পাপ নিয়ে কেউ তাঁর কাছে আসে এবং তাঁর সঙ্গে শরিক না করে, আল্লাহ ততটাই ক্ষমা নিয়ে তার কাছে আসেন। হাদিসটির উদ্ধৃত সংস্করণটি হাসান হিসেবে উল্লেখিত।

এই হাদিসের ভাষা মানুষের কল্পনার সীমা প্রসারিত করে। আকাশের মেঘের মতো পাপ এটি পাপকে হালকা করার জন্য নয়। বরং আল্লাহর ক্ষমার ব্যাপ্তি বোঝানোর জন্য। মানুষের অপরাধ যত বড় মনে হোক, আল্লাহর রহমত তার চেয়েও বিস্তৃত। জীবন অনিশ্চিত; তাই তওবা কালকের জন্য রেখে দেওয়া আত্মপ্রবঞ্চনা। মানুষ জানে না তার পরের নিঃশ্বাসটি কখন আসবে। ফিরে আসার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো এখন।

মানুষের দরজা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বন্ধুরা দূরে সরে যেতে পারে, পরিবার ভুল বুঝতে পারে, সমাজ পুরোনো ভুলের বিচার করতে পারে, নিজের বিবেকও কখনো নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে পারে। কিন্তু আল্লাহর রহমতের দরজা মানুষের রায়ের ওপর নির্ভর করে না। যে মানুষ নিজের অপরাধে ভেঙে পড়েছে, তার জন্য আল্লাহর রহমত আশ্রয়। যে মানুষ অন্যায় করে কঠিন হয়ে গেছে, তার জন্য তওবা সতর্কবার্তা। যে মানুষ নিজেকে পবিত্র মনে করে অহংকারে ডুবে আছে, তার জন্য ক্ষমার প্রয়োজনের স্মরণ। আল্লাহর দয়া মানে এই নয় যে মানুষ অন্যায় করে নিশ্চিন্ত থাকবে। বরং এর অর্থ মানুষ অন্যায় থেকে ফিরে এসে নতুনভাবে বাঁচার সুযোগ পাবে। ক্ষমা মানে অতীতকে অস্বীকার করা নয়; বরং অতীতের শিকল ছিন্ন করে আলোর দিকে অগ্রসর হওয়া। তাই কোনো রাতকে শেষ রাত মনে করো না। কোনো পাপকে এত বড় মনে করো না যে আল্লাহর রহমত তার চেয়ে ছোট হয়ে যায়। কোনো ভুলকে এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পরিণত করো না, যা তোমার তওবার সম্ভাবনাকে হত্যা করে। আজ যদি হৃদয়ের ভেতর সামান্য অনুশোচনা জেগে থাকে, সেটিকে অবহেলা করো না। হয়তো সেটিই আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার জন্য ফিরে আসার ডাক।

আল্লাহ আমাদের অহংকার থেকে রক্ষা করুন, সত্যিকারের তওবার তাওফিক দিন, অন্যের প্রতি দয়ালু হওয়ার শক্তি দিন এবং তাঁর রহমত থেকে কখনো নিরাশ না হওয়ার ঈমান দান করুন। আমিন।


লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

মোবাইল: 01556-560126 / 01645-950296

তারিখ: 07/10/2026 খিষ্টাব্দ।