
।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ ।।
মহাগ্রন্থ আল কুরআনের তাফসির ইসলামী জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ শাখা। যুগে যুগে মুসলিম আলেমগণ কুরআনের ভাষা, হাদিস, সাহাবি ও তাবেঈনের ব্যাখ্যা, ফিকহ, আকিদা, দর্শন এবং সমাজ-বাস্তবতার আলোকে কুরআনের মর্ম অনুধাবনের চেষ্টা করেছেন। ফলে তাফসিরের ইতিহাসে যেমন ইবনে জারির তাবারি, ইবনে কাসির, জালালাইন ও ফখরুদ্দিন রাজির মতো শাস্ত্রীয় গ্রন্থ রয়েছে, তেমনি আধুনিক যুগে উদ্ভূত হয়েছে নতুন ধরনের ব্যাখ্যাগ্রন্থ। আল্লামা আবুল আ’লা মওদূদীর তাফহীমুল কুরআন সেই আধুনিক ধারার অন্যতম প্রভাবশালী সৃষ্টি।
আবুল আ’লা মওদূদী (১৯০৩–১৯৭৯) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী ইসলামী চিন্তাবিদ। তাঁর চিন্তার পরিসর শুধু তাফসিরে সীমাবদ্ধ ছিল না। ইসলামি রাষ্ট্র, শরিয়াহ, অর্থনীতি, নৈতিকতা, শিক্ষা, ইতিহাস ও আধুনিক মুসলিম সমাজ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি লিখেছেন।
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস ২০২৬ সালে মুস্তানসির মির-এর ‘মওদুদী: মেকারস অব ইসলামিক সিবিলাইজেশন’ গ্রন্থ প্রকাশ করেছে। গ্রন্থটির দ্বিতীয় অধ্যায়ে মওদূদীর বহু-খণ্ডের কুরআন-তাফসির ‘তাফহিমুল কুরআন’-এর বৈশিষ্ট্য, গবেষণামূলক উপাদান এবং তাঁর সামগ্রিক চিন্তার সঙ্গে এর সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
তাফহীমুল কুরআন মূলত উর্দু ভাষায় রচিত একটি বহু-খণ্ডের কুরআন-ব্যাখ্যা। মওদূদীর উদ্দেশ্য ছিল এমন শিক্ষিত সাধারণ পাঠকের কাছে কুরআনের বক্তব্যকে সহজভাবে পৌঁছে দেওয়া, যাঁরা আরবি তাফসিরের বিপুল ঐতিহ্যের সঙ্গে সরাসরি পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান না। অনেক গবেষক তাফহীমুল কুরআনকে মওদূদীর প্রধান কীর্তি হিসেবে অভিহিত করেছেন। এ তাফসির গ্রন্থটির ভাষা, বিন্যাস, বিষয়সূচি, ক্রস-রেফারেন্স, মানচিত্র এবং সাধারণ শিক্ষিত পাঠকের উপযোগী উপস্থাপনার বিশেষত্বও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
তাফহীমুল কুরআনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এটি শুধু শব্দার্থের অনুবাদ নয়। আয়াতের পেছনের ঐতিহাসিক পরিস্থিতি, সংশ্লিষ্ট আয়াতসমূহের পারস্পরিক সম্পর্ক, হাদিস-সুন্নাহ এবং সমকালীন মানবজীবনের প্রশ্নকে একত্রে বিবেচনা করার চেষ্টা এতে দেখা যায়।
মওদূদীর ব্যাখ্যায় কুরআনের একটি আয়াতকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার পরিবর্তে তার সামগ্রিক বক্তব্য বোঝার প্রবণতা রয়েছে। তাঁর আলোচনায় ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি নৈতিকতা, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি, আইন ও সভ্যতার প্রশ্নও প্রবলভাবে উপস্থিত। ২০২৩ সালে নূর মোহাম্মদ উসমানি, মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান ও মো. ইউসুফ আলীর যৌথ গবেষণায় মওদূদীর ‘তাফহীমুল কুরআন’-এর ব্যাখ্যাপদ্ধতি বিশদভাবে পর্যালোচনা করা হয়। গবেষকদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, মওদূদী কুরআনের ব্যাখ্যায় কুরআনের আয়াত ও মহানবী (সা.)-এর হাদিসকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি আরবি ভাষা, শরিয়াহর নীতি এবং শরিয়াহর উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ যুক্তিবিচার প্রয়োগ করেছেন। গবেষণাটি তাঁর এই পদ্ধতিকে ঐতিহ্য ও যুক্তির মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্রয়াস হিসেবে মূল্যায়ন করেছে এবং একে আদর্শ কুরআন-ব্যাখ্যার পদ্ধতিগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
তবে তাফহীমের বিশেষত্বের সঙ্গে কিছু বিতর্কও রয়েছে। তাফসিরে যুক্তি, আধুনিকতা, রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে ব্যাখ্যার মধ্যে আনার ফলে আল্লামা মওদূদীর কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে দেওবন্ধপন্থী কতিপয় আলেম ও গবেষকদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হয়েছে।
ইবনে কাসিরের মতো তাফসিরের প্রধান শক্তি হলো হাদিস, সাহাবি ও তাবেঈনের বর্ণনাকে কেন্দ্র করে আয়াতের ব্যাখ্যা করা। তাফসিরে জালালাইনের শক্তি ভাষাগত সংক্ষিপ্ততা ও ব্যাখ্যার ঘনত্ব। অন্যদিকে তাফহীমের বিশেষত্ব হলো কুরআনের বক্তব্যকে আধুনিক সমাজ ও সভ্যতার প্রশ্নের সঙ্গে সংযুক্ত করা। অর্থাৎ তিনটির লক্ষ্য এক নয়।
আধুনিকতার সঙ্গে তাফহীমের সংলাপ: তাফহীমুল কুরআনের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো এর আধুনিক জীবনবোধ। মওদূদী এমন এক সময়ে লিখছিলেন, যখন মুসলিম সমাজ ঔপনিবেশিকতা, জাতীয়তাবাদ, আধুনিক রাষ্ট্র, পাশ্চাত্য রাজনৈতিক চিন্তা, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল সামাজিক বাস্তবতার মুখোমুখি। ফলে তাঁর তাফসিরে কুরআনের সঙ্গে এসব প্রশ্নের সংলাপ তৈরি হয়েছে। শরিয়াহ, ইসলামি রাষ্ট্র, ইজতিহাদ, নৈতিকতা, শিক্ষা ও রাজনৈতিক চিন্তাও আলোচিত হয়েছে। তাফহীম কুরআনের নির্দেশনাকে সমকালীন মানুষের নৈতিক ও সামাজিক সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করতে চেয়েছে। এ কারণেই আধুনিক শিক্ষিত মুসলিম পাঠকের কাছে গ্রন্থটি বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করেছে। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসে প্রকাশিত সাম্প্রতিক গবেষণাও দেখায় যে মওদূদী ও তাঁর তাফসির আন্তর্জাতিক ইসলামি-একাডেমিক গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আলেমদের গ্রহণযোগ্যতা : আলেমদের গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নটি আরও সূক্ষ্ম। তাফহীমুল কুরআন ব্যাপকভাবে পঠিত ও গবেষণাযোগ্য এ বিষয়ে যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু এর প্রতিটি ব্যাখ্যা বা মওদূদীর সব রাজনৈতিক-ধর্মতাত্ত্বিক অবস্থান আলেমসমাজে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত এমন দাবি করা যায় না। বিশেষত তাঁর রাজনৈতিক দর্শন, রাষ্ট্রচিন্তা এবং কিছু ব্যাখ্যাগত অবস্থান নিয়ে মুসলিম আলেম ও গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তাই তাফহীমের মূল্যায়নে জনপ্রিয়তা ও একাডেমিক গুরুত্বকে আলেমসমাজের সর্বসম্মত গ্রহণযোগ্যতার সমার্থক হিসেবে দেখা উচিত নয়।
দক্ষিণ এশীয় ইসলাম ও রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্বের গবেষক শেরআলী তারিন অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের ‘অক্সফোর্ড বিবলিওগ্রাফিজ ইন ইসলামিক স্টাডিজ’-এমওদূদীকে নিয়ে একটি স্বতন্ত্র একাডেমিক রেফারেন্স নিবন্ধ লিখেছেন। সেখানে তাফহিমুল কুরআন-কে মওদূদীর অন্যতম সুপরিচিত রচনা হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, গ্রন্থটি দক্ষিণ এশিয়ার পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার বাইরেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
তবে তাফহীমুল কুরআন আলেমসমাজে সর্বসম্মত তাফসির না হলেও এটি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ আধুনিক তাফসির, যাকে উপেক্ষা করে বিংশ শতাব্দীর কুরআন-ব্যাখ্যার ইতিহাস সম্পূর্ণ করা কঠিন। তাহলে তাফহীমের সীমাবদ্ধতা কোথায়? একটি প্রামাণ্য আলোচনায় শুধু গুণের কথা বললে তা গবেষণা হয় না। সীমাবদ্ধতাও বলতে হয়।
প্রথমত, তাফহীমের মধ্যে মওদূদীর নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামাজিক দর্শনের প্রভাব স্পষ্ট। ফলে কোনো কোনো আয়াতের ব্যাখ্যায় তাঁর সামগ্রিক ইসলামি রাষ্ট্র ও সমাজচিন্তার ছাপ পাওয়া যায়।
দ্বিতীয়ত, আধুনিক যুক্তিবোধ ও সমকালীন বাস্তবতার সঙ্গে কুরআনের সংলাপ তৈরির চেষ্টা যেমন এর শক্তি, তেমনি কোনো কোনো ক্ষেত্রে সমালোচনার কারণও হয়েছে।
তৃতীয়ত, তাফহীমকে প্রাচীন তাফসিরের জায়গায় বসিয়ে পড়লে তার প্রকৃতি বোঝা যাবে না। এটি মূলত আধুনিক মুসলিম পাঠকের উদ্দেশে নির্মিত কুরআনের একটি বিস্তৃত ব্যাখ্যাগ্রন্থ।
এই সীমাবদ্ধতাগুলো স্বীকার করলেই তাফহীমের মূল্য কমে না। বরং একটি গ্রন্থকে তার প্রকৃত অবস্থানে স্থাপন করা হয়।
তাহলে তাফহীমুল কুরআনের গ্রহণযোগ্যতা কতখানি? প্রমাণগুলো একত্র করলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ চিত্র পাওয়া যায়। জনপ্রিয়তার বিচারে নিঃসন্দেহে তাফহীমুল কুরআন অত্যন্ত প্রভাবশালী। যা দেশে দেশে আধুনিক ইসলামি চিন্তার বিচারে একটি গুরুত্বপূর্ণ তাফসির হিসেবে প্রতিভাত হচ্ছে। ইসলাম চিরআধুনিক ধর্ম। ইসলামের মূল শিক্ষার সঙ্গে পরিবর্তনশীল মানবজীবনের প্রশ্নের সম্পর্ক কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে—আধুনিক তাফসিরচর্চায় এই প্রশ্নটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাফহীমুল কুরআন সেই প্রশ্নের একটি স্বতন্ত্র উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছে। একাডেমিক গবেষণার বিচারে এটি সুপ্রতিষ্ঠিত গবেষণার বিষয়। দেওবন্দি ধারাসহ মুসলিম আলেমসমাজের বিভিন্ন অংশে তাফহীমুল কুরআনের কিছু ব্যাখ্যা ও মওদূদীর কিছু চিন্তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে লাখো আধুনিক শিক্ষিত মানুষের কাছে এ তাফসির গ্রন্থটি ইসলামের সুমহান আদর্শকে চিনতে ভূমিকা রেখে যাচ্ছে এতে কোনো সন্দেহ নেই।
তাফহীমুল কুরআন আধুনিক যুগের একটি প্রভাবশালী, বহুলপঠিত ও আন্তর্জাতিকভাবে গবেষিত কুরআন-ব্যাখ্যা। এর বিশেষত্ব হলো কুরআনের বাণীকে আধুনিক সমাজ, রাষ্ট্র, নৈতিকতা ও মানবজীবনের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়াস।
মওদূদীর রাজনৈতিক-ধর্মতাত্ত্বিক চিন্তা নিয়ে আলেম ও গবেষকদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও কুরআন, সহিহ হাদিস, আরবি ভাষা, শাস্ত্রীয় তাফসির এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য গবেষণার আলোকে সমালোচনামূলকভাবে পাঠ করাই অধিকতর জ্ঞানসংগত। এ ধরনের পাঠই একজন পাঠককে পবিত্র কুরআনের গভীরতা বুঝতে এবং প্রকৃত ইসলামী জ্ঞানচর্চার দিকে নিয়ে যাবে। তাফসিরের মর্যাদা লেখকের নাম দিয়ে নয়; তার দলিল, পদ্ধতি, ভাষা, ব্যাখ্যার সামঞ্জস্য এবং কুরআন-সুন্নাহর সঙ্গে তার সম্পর্ক দিয়ে বিচার করতে হয়।
তাফহীমুল কুরআনের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্ভবত এটি কুরআনকে আধুনিক শিক্ষিত মুসলিমের বুদ্ধিবৃত্তিক জিজ্ঞাসার সামনে নতুনভাবে হাজির করেছে।
সুতরাং তাফহীমুল কুরআনকে নিয়ে চূড়ান্ত রায় হতে পারে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আধুনিক তাফসির, যার যথার্থ মূল্যায়নের জন্য প্রশংসার পাশাপাশি সমালোচনামূলক পাঠও অপরিহার্য।
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
মোবাইল: 01556-560126 / 01645-950296
তারিখ: ০৯/১০/202৬ খিষ্টাব্দ।
আপনার মতামত লিখুন :