আজানের সুরে জাগে অন্তর


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : অক্টোবর ১৭, ২০২৬, ৯:০৮ অপরাহ্ন / ০
আজানের সুরে জাগে অন্তর

।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ ।।


কাজী নজরুল ইসলামের ইসলামী সংগীতে আজান শুধু মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসা সুর নয়। তা মানুষের অন্তরের দরজায় কড়া নাড়া এক অনন্ত আহ্বান। দিনের কাজ, সংসারের ব্যস্ততা আর দুনিয়ার মোহের মাঝখানে সেই ধ্বনি স্মরণ করিয়ে দেয় মানুষের জীবনে এমন এক সত্য আছে, যা ক্ষণিকের লাভ-ক্ষতির চেয়ে বড়। নজরুলের গানে আজান তাই একই সঙ্গে সুর, স্মৃতি, জাগরণ ও আত্মসমর্পণের ভাষা।

তেমনই একটি অসাধারণ ইসলামী সংগীত ‘দূর আজানের মধুর ধ্বনি বাজে বাজে মসজিদেরই মিনারে। / এ কী খুশির অধীর তরঙ্গ উঠ্‌লো জেগে’ প্রাণের কিনারে।’ এ গানের শুরুতেই দূরের মিনার থেকে ভেসে আসে আজানের মধুর ধ্বনি। দূরত্ব এখানে শুধু স্থানিক নয়। তা যেন ব্যস্ত জীবনের কোলাহল পেরিয়ে অন্তরের কাছে পৌঁছানোর পথ। সুরটি কানে লাগে, কিন্তু থেমে থাকে না শ্রবণে। তা প্রাণে ঢেউ তোলে। কবির ভাষায়, “এ কী খুশির অধীর তরঙ্গ” জেগে ওঠে অন্তরের কিনারে। আনন্দটি সাধারণ উল্লাস নয়; তা ঈমানের আনন্দ, স্মরণের আনন্দ। এক মুহূর্তে মানুষ উপলব্ধি করে, সে একা নয়। তার জীবনের ওপরে আছে এক মহান আশ্রয়, যার দিকে ফিরে যাওয়াই তার প্রকৃত শান্তি।

নজরুল আজানের ধ্বনিকে জুড়ে দিয়েছেন ইসলামের সূচনালগ্নের স্মৃতির সঙ্গে। তাঁর মনে জাগে হজরত বিলাল (রা.)-এর কথা। যেন বহু শতাব্দীর ব্যবধান মুছে গিয়ে সেই কণ্ঠ আবার মদিনার আকাশে ধ্বনিত হচ্ছে। বিলাল (রা.) ইসলামী ইতিহাসে ঈমান, ধৈর্য ও আত্মনিবেদনের উজ্জ্বল প্রতীক। কবির কল্পনায় তাঁর আজান এমন সুর, যা পাষাণ হৃদয়ও গলিয়ে দেয়। মদিনা ভেসে যায় প্রেমে। এই চিত্রকল্পে অতীত নিছক স্মৃতিচারণ নয়; তা বর্তমানের জন্য জীবন্ত শিক্ষা। আজও আজানের ডাক সেই নিষ্ঠা ও ভালোবাসার উত্তরাধিকার বহন করে।

এইখানেই নজরুলের কাব্যদৃষ্টি গভীর। তিনি ধর্মীয় ইতিহাসকে দূরের, জড় কোনো বিষয় করে রাখেন না। অতীতের মহিমাকে টেনে আনেন বর্তমান মানুষের হৃদয়ে। বিলালের কণ্ঠ যেন প্রতিটি যুগের মুসলমানকে প্রশ্ন করে তোমার অন্তর কি সেই ডাক শুনছে? তুমি কি বিশ্বাসকে শুধু পরিচয়ে রেখেছ, নাকি জীবনের পথেও তার আলো জ্বালিয়েছ? এ প্রশ্নে আছে অনুরাগ, আবার আত্মসমীক্ষার তাগিদও।

গানের পরের অংশে সুরের আবেদন স্পষ্ট আহ্বানে রূপ নেয়। সংসারের কাজ থামিয়ে আল্লাহর পথে চলার কথা বলা হয়। এই আহ্বানকে দুনিয়াবিমুখতার সরল নির্দেশ বলে বুঝলে গানের মর্ম সংকুচিত হয়। সংসার মানুষের দায়িত্বের ক্ষেত্র। কাজ, পরিবার ও জীবিকা তার জীবনের বাস্তবতা। কিন্তু ব্যস্ততা যেন মানুষকে তার স্রষ্টার স্মৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন না করে গানের তাগিদ মূলত এইখানে। আজান বলে, প্রয়োজনের ভিড়েও থামার সময় আছে। নিজের অন্তরকে শোনার সময় আছে; স্রষ্টার সামনে বিনত হওয়ার সময় আছে।

মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে উচ্চারিত ডাক তাই কেবল নির্দিষ্ট সময়ে নামাজের সংবাদ দেয় না। তা আত্মাকে জিজ্ঞেস করে, জীবনের দিশা কোথায়? মানুষ কি শুধু আহার, উপার্জন, আকাঙ্ক্ষা আর প্রতিযোগিতার পেছনে ছুটবে? নাকি সে নিজের আচরণকে শুদ্ধ করবে, অন্যের প্রতি ন্যায়বান হবে এবং স্রষ্টার স্মরণে বিনয়ী থাকবে? নজরুলের “খোদার রাহ” এই বিস্তৃত অর্থেই তাৎপর্যপূর্ণ। সে পথ ইবাদতের, আনুগত্যের, নৈতিকতার এবং আত্মশুদ্ধির। মসজিদমুখী হওয়ার ডাক তাই অন্তরকে কলুষ থেকে ফিরিয়ে আনারও ডাক।

এ গানের ভাষায় “না-পাক” শব্দটি বাহ্যিক অপবিত্রতার সীমা ছাড়িয়ে অন্তরের গাফিলতি ও ঈমানের শৈথিল্যের ইঙ্গিত দেয়। মানুষ দুনিয়ার ধুলোয় হাঁটবে, দায়িত্ব পালন করবে তবু তার আত্মা যেন কলুষে ঢেকে না যায়। নামাজ সেই আত্মাকে বারবার ধুয়ে নেওয়ার এক সুযোগ। দিনের নির্ধারিত বিরতিগুলোতে মানুষ নিজের অহংকার, লোভ ও ভুলের মুখোমুখি দাঁড়ায়। কিবলামুখী হয়ে সে স্বীকার করে, তার চেয়ে বড় শক্তি আছে; তার চেয়ে বড় বিচার আছে। এই স্বীকৃতি মানুষকে ছোট করে না। বরং তাকে সত্য, সংযম ও দয়ার পথে বড় করে।

এ গানের শেষ দু’টি পঙক্তি ‘চল্ মসজিদে তুই, শোন্ মোয়াজ্জিনের ডাক, / তোর জনম যাবে বিফলে যে ভাই এই ইবাদতে বিনা রে॥’ পুরো সংগীতে নজরুলের আহ্বানে আছে দৃঢ়তা, কিন্তু তা শুষ্ক উপদেশের দৃঢ়তা নয়। আজানের মধুরতা, বিলালের স্মৃতি এবং মদিনার প্রেমময় আবহ তার বাণীকে হৃদয়গ্রাহী করে তোলে। তিনি পাঠক বা শ্রোতাকে ভীত করে নয়, জাগিয়ে তুলতে চান। যেন বলেন দরজা খোলা আছে, ফিরে এসো। যে ডাক আকাশ থেকে ভেসে আসে, তার উত্তর মানুষের অন্তরেই প্রস্তুত হতে পারে।

গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয় ১৯৩৭ সালের সেপ্টেম্বরে, কাশেম মল্লিকের কণ্ঠে। রচনার নির্দিষ্ট সময় জানা না গেলেও, তার আবেদন সময়ের সীমানা মানে না। মিনার থেকে আজান আজও ভেসে আসে। তার সুরে ইতিহাসের স্মৃতি আছে, বর্তমানের দায়িত্ব আছে, আর ভবিষ্যতের আশাও আছে।

নজরুলের এই ইসলামী সংগীত শেষ পর্যন্ত এক অন্তরযাত্রার কথা বলে। আজানের ধ্বনি বাইরে থেকে শুরু হয়, কিন্তু তার গন্তব্য মানুষের ভেতর। যে হৃদয় সেই ডাকে সাড়া দেয়, সে কেবল মসজিদে যায় না; সে সত্যের দিকে, শুদ্ধতার দিকে, আল্লাহর স্মরণে প্রশান্ত জীবনের দিকে এগোয়। তাই আজান এখানে প্রার্থনার আহ্বান, আবার জীবনেরও আহ্বান গাফিলতি থেকে জাগরণে, বিচ্ছিন্নতা থেকে আশ্রয়ে, আর অস্থিরতা থেকে আত্মিক শান্তিতে ফেরার আহ্বান।

আজানের আরেকটি তাৎপর্য তার সমবেত আহ্বানে। সে একা কাউকে নয়, গোটা জনপদকে ডাকে। ধনী-দরিদ্র, কর্মব্যস্ত-অবসর, পরিচিত-অপরিচিত সবাই একই কাতারে দাঁড়ানোর সুযোগ পায়। এই দৃশ্য মানুষের সমতার কথা মনে করায়। দৈনন্দিন জীবনে যে দূরত্ব ও বিভাজন তৈরি হয়, প্রার্থনার মুহূর্তে তা অতিক্রম করার শিক্ষা মেলে। নজরুলের আহ্বান তাই ব্যক্তিগত ভক্তির গণ্ডি পেরিয়ে সমাজের দিকেও প্রসারিত। আল্লাহর পথে চলা মানে মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া, অহংকার কমানো এবং ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় করা। আজানের সুরে এই সম্মিলিত চেতনারও অনুরণন শোনা যায়।


লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।