মেনলে, ক্রামা ধর্ম ও রিয়েন বর্ণমালা: ম্রো সমাজে এক ধর্মীয় জাগরণের ইতিহাস


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : নভেম্বর ৮, ২০২৬, ১০:৩২ পূর্বাহ্ন / ০
মেনলে, ক্রামা ধর্ম ও রিয়েন বর্ণমালা: ম্রো সমাজে এক ধর্মীয় জাগরণের ইতিহাস

।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ ।।


পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রতিটি জনগোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব জীবনবোধ, বিশ্বাস, ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের দীর্ঘ উত্তরাধিকার। পাহাড়ের বিচিত্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে ম্রোদের অবস্থানও স্বতন্ত্র। তাঁদের জীবনযাপন, সামাজিক প্রথা, লোকবিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা পার্বত্য চট্টগ্রামের সামগ্রিক ইতিহাসকে দিয়েছে এক বিশেষ মাত্রা। এই সমাজের ইতিহাসে বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে আবির্ভূত হন মেনলে নামের এক ব্যক্তি। তাঁর উদ্যোগে গড়ে ওঠে ক্রামা ধর্মীয় আন্দোলন। একই সঙ্গে তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় ম্রো ভাষার জন্য একটি নতুন বর্ণমালা ‘রিয়েন’।

মেনলের আবির্ভাব ম্রো সমাজে নতুন ধর্মমত ক্রামার সূচনা, শিক্ষা, নৈতিকতা, সামাজিক শৃঙ্খলা ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য নিয়েও নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। তাঁর জীবন, ধর্মীয় মতবাদ এবং বর্ণমালা উদ্ভাবনের ঘটনাকে ঘিরে রয়েছে নানা বর্ণনা ও মতভেদ। কোনো কোনো বিবরণ অনুসারীদের ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে এসেছে, কোনোটি গবেষকের মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান থেকে সংগৃহীত। ফলে মেনলেকে বুঝতে হলে বিশ্বাস, লোকস্মৃতি ও নৃতাত্ত্বিক তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রেখেই ইতিহাসের কাছে যেতে হয়।

সুইস নৃতাত্ত্বিক Lorenz G. Löffler-এর গবেষণাগ্রন্থ Ethnographic Notes on the Mru and Khumi of the Chittagong and Arakan Hill Tracts এর মধ্যে ম্রো ও খুমি জনগোষ্ঠীর জীবন, সমাজ, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বিশ্বাসের বিস্তৃত বিবরণের পাশাপাশি মেনলে, ক্রামা ধর্ম এবং রিয়েন বর্ণমালা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংকলিত হয়েছে।

১. মেনলের আবির্ভাব ও ঐতিহাসিক পটভূমি

মেনলের জন্ম বান্দরবান সদর উপজেলার ৩১৫ নং রেনিক্ষ্যং মৌজার মালাউ-ও নামের একটি ছোট ম্রো পাড়ায়। স্থানীয়ভাবে জায়গাটি পুরাপাড়া নামেও পরিচিত। কথিত আছে, বহু আগে পাড়াটি আগুনে পুড়ে যাওয়ার কারণে এ নামের প্রচলন ঘটে। সময়ের সঙ্গে পাড়ার অবস্থান কিছুটা পরিবর্তিত হলেও জনপদটির অস্তিত্ব টিকে আছে।

মেনলের জন্মসাল নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। ম্রো সমাজে অতীতে মানুষের বয়স নির্ধারণের জন্য লিখিত জন্মনিবন্ধনের প্রচলন ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে জুমচাষের মৌসুম বা ফসলের চক্র ধরে বয়সের হিসাব করা হতো। ফলে কোনো ব্যক্তির সঠিক জন্মসাল নির্ণয় করা কঠিন। মেনলের ক্ষেত্রেও গবেষকেরা বিভিন্ন সাক্ষ্য ও তাঁর নিজের লেখার সূত্র ধরে জন্মকাল অনুমান করেছেন। সেসব তথ্যের ভিত্তিতে ১৯৬২ থেকে ১৯৬৫ সালের মধ্যবর্তী সময়কে সম্ভাব্য জন্মকাল হিসেবে বিবেচনা করা যায়। তবে ১৯৬৪ বা ১৯৬৫ সালের দিকে জন্মের পক্ষে কিছু সাক্ষ্য তুলনামূলকভাবে বেশি গ্রহণযোগ্য বলে গবেষক নৃবিজ্ঞানী সেলিন মুশে মনে করেছেন।

মেনলে ছিলেন ম্রো জনগোষ্ঠীর উত্তরাঞ্চলীয় আনোক গোষ্ঠীর মানুষ। তাঁর গোত্রের নাম ছিল ঙ্রুনাউ। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। তাঁর বাবা মেনসিং এবং মা তুমতে। দুই ভাই কির ওন ও মেন্যা এবং দুই বোন ওয়ানলং ও তনরুং। পরিবারটি ছিল দরিদ্র। চাষযোগ্য জমি ছিল সামান্য। তাঁর বাবা জুমচাষের পাশাপাশি বাঁশের ঝুড়ি তৈরি করে বিক্রি করতেন।

মেনলের শৈশবের এই পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ বুঝতে পারা জরুরি। কারণ তাঁর পরবর্তী জীবনের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য ছিল শিক্ষার প্রতি প্রবল আকর্ষণ, প্রচলিত জীবনধারার বাইরে যাওয়ার চেষ্টা এবং নিজস্ব ধর্মীয় পরিচয় নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা।

২. দারিদ্র্য, শিক্ষার আকাঙ্ক্ষা ও মেনলের শৈশব

মেনলের শৈশবের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল শিক্ষার প্রতি গভীর আগ্রহ। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। পাহাড়ি দুর্গম জনপদে তখন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগও ছিল সীমিত। বিশেষ করে ম্রো শিশুদের জন্য বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথ ছিল দীর্ঘ ও কঠিন। পাহাড়ের অনেক জনপদে বিদ্যালয় ছিল না। কোথাও থাকলেও যাতায়াত, ভাষা ও আর্থিক সংকট শিক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াত।

মেনলে গ্রামের কাছাকাছি বিদ্যালয়ে পড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিদ্যালয়টি ছিল প্রায় দুই ঘণ্টার হাঁটার পথ। তাঁর বাবা মনে করতেন, বয়সের তুলনায় মেনলে পড়াশোনা শুরু করতে দেরি করে ফেলেছে। তাই প্রথমে তিনি ছেলেকে বিদ্যালয়ে পাঠাতে রাজি হননি। মেনলে এ সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি। কথিত আছে, তিনি দুই-তিন দিন উপবাস করে নিজের ইচ্ছার কথা জানান। তাঁর এই অনড় অবস্থানের পর পরিবারে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবনা শুরু হয়।

এ সময় গ্রামের কাটাং নামের এক ব্যক্তি তাঁর প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন। কাটাং বার্মিজ ভাষা ও লিপি জানতেন। তিনি মেনলেকে সেই ভাষা শেখাতে শুরু করেন। কাটাংয়ের দাবি অনুযায়ী, মেনলে মাত্র তিন মাসে বার্মিজ ভাষা শিখে ফেলেছিলেন। যদিও এই সময়সীমা প্রত্যক্ষভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবু ঘটনাটি মেনলের শেখার আগ্রহ ও দ্রুত অনুধাবনক্ষমতার পরিচয় বহন করে।

পরবর্তী সময়ে মেনলে বান্দরবান সদর উপজেলার সুয়ালক ম্রো আবাসিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তখন তাঁর বয়স আনুমানিক পনেরো বছর। বিদ্যালয়ে তাঁর মেধার পরিচয় পেয়ে শিক্ষক তাঁকে প্রথম শ্রেণি থেকে সরাসরি তৃতীয় শ্রেণিতে উন্নীত করেন। তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন মারমা শিক্ষক টি এন মং এবং দুজন বাঙালি শিক্ষক।

নৃবিজ্ঞানী সেলিন মুশে ১৯৯৮ সালের দিকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক টি এন মংয়ের সাক্ষাৎকার নেন। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও শিক্ষক টি এন মং তাঁর ছাত্র মেনলেকে স্মরণ করেছিলেন একজন শান্ত, সংযত, বুদ্ধিমান ও অনুসন্ধিৎসু ছাত্র হিসেবে। সাক্ষাৎকারে ওই শিক্ষক বলেছিলেন, মেনলে দ্রুত শিখতেন। প্রচলিত পাঠ্যবইয়ের বাইরেও নানা বিষয়ে প্রশ্ন করতেন। বিশেষ করে ম্রোদের নিজস্ব বিশ্বাস, আচার ও অতীত সম্পর্কে তাঁর কৌতূহল ছিল প্রবল। শিক্ষক তাঁকে এমন একজন ছাত্র হিসেবে স্মরণ করেছেন, যিনি জগতের সত্য জানতে চাইতেন।

ম্রোদের একটি প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে একটি লোককথা হচ্ছে: থুরাই দেবতার পাঠানো ধর্মীয় বিধিবিধান লেখা সম্বলিত বিধি-নিষেধ ও বর্ণমালা গরু খেয়ে ফেলেছিল। মেনলে শিক্ষককে প্রশ্ন করেছিলেন, এ কথা সত্য কি না। শিক্ষক তাঁকে বুঝিয়েছিলেন, বর্ণমালা মানুষের সৃষ্টি। গরু তা খেয়ে ফেলেছে এমন বিশ্বাসের কোনো যুক্তি নেই। এ ধরনের প্রশ্ন থেকে বোঝা যায়, মেনলে শৈশবেই প্রচলিত বিশ্বাসকে যুক্তির আলোয় যাচাই করতে চাইতেন।

শিক্ষকের স্মৃতিচারণে মেনলের পরবর্তী জীবনের কিছু অস্বাভাবিক দাবির কথাও এসেছে। তিনি নাকি একসময় নিজের অলৌকিক ক্ষমতার কথা বলতেন। মুঠোভর্তি মাটি ছুড়ে দিলে বিস্ফোরণ ঘটাতে বা মানুষকে মেরে ফেলতে পারবেন এমন দাবিও করেছিলেন বলে শিক্ষক জানিয়েছেন। আবার একদিন সাদা পোশাক, সাদা পাগড়ি, হাতে তরবারি এবং ঘোড়ায় চড়ে ফিরে আসার কথাও বলেছিলেন। এই সাক্ষাৎকারটি মেনলের ব্যক্তিত্ব ও তাঁর সম্পর্কে পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠা ধর্মীয় ধারণা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

৩. মসিহ হিসেবে আত্মপ্রকাশ ও দৈব-প্রকাশের বর্ণনা

মেনলের ধর্মীয় আত্মপ্রকাশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দৈব নির্দেশনা ও নতুন বর্ণমালা লাভের কাহিনি। ক্রামা ধর্মের অনুসারীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, মেনলে থুরাই নামের এক সর্বোচ্চ সত্তার কাছ থেকে ধর্মীয় বাণী ও নতুন লিপি লাভ করেছিলেন। তবে কীভাবে তিনি এই নির্দেশনা পেয়েছিলেন, সে বিষয়ে বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে।

মেনলের বাবা এক সাক্ষ্যে বলেছেন, একসময় মেনলে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। প্রায় অচেতন অবস্থায় তিনি নতুন বর্ণমালা দেখতে পান। সুস্থ হওয়ার পর সেই বর্ণমালা নিয়ে কাজ শুরু করেন। অন্য এক ম্রো তথ্যদাতার বর্ণনায়, মেনলে স্বপ্নে থুরাইকে দেখেছিলেন। থুরাই তাঁকে রোমান, আরবি ও তৃতীয় একটি লিপি দেখান। মেনলে প্রথম দুটি গ্রহণ না করে তৃতীয়টি বেছে নেন। এই বর্ণনায় নতুন লিপি গ্রহণের মধ্য দিয়ে ম্রোদের নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। এসব বর্ণনা ম্রোদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুসারীদের স্মৃতির অংশ। এগুলোকে দৈব ঘটনার প্রমাণক নয়। ক্রামা ধর্মের আবির্ভাবকে অনুসারীরা কীভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, তার সাক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা অধিক যুক্তিসংগত।

মেনলের বাবা দাবি করেছেন, ১৯৭৭ সালেই তিনি ম্রোদের জন্য নতুন লিপি তৈরির কাজ শুরু করেন। ১৯৮২ সালে গ্রামের মানুষের কাছে তা প্রকাশ করেন। অন্যদিকে শিক্ষক টি এন মংয়ের বক্তব্য থেকে জানা যায়, বিদ্যালয়ে পড়ার সময় মেনলে রোমান ও বাংলা লিপি শেখার প্রতি আগ্রহী হন। শিক্ষক তাঁকে ভাষা ও ব্যাকরণ শেখার উৎসাহ দিয়েছিলেন। পাঁচ-ছয় মাসের মধ্যে মেনলে নিজস্ব লিপি তৈরির চেষ্টা শুরু করেন এবং প্রায় দুই বছরের মধ্যে তা সম্পন্ন করেন বলে শিক্ষক স্মরণ করেছেন।

এই দুই বিবরণের মধ্যে সময় ও ঘটনার পার্থক্য রয়েছে। ফলে মেনলের লিপি উদ্ভাবনের নির্দিষ্ট সূচনাকাল নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তবে তাঁর বিদ্যালয়জীবনে ভাষা ও লিপি সম্পর্কে আগ্রহ জন্মেছিল শিক্ষকের সাক্ষ্য এ ধারণাকেই সমর্থন করে।

৪. ক্রামা ধর্মের উৎপত্তি ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা

মেনলের জীবনের সঙ্গে ক্রামা ধর্মের প্রতিষ্ঠা অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। ক্রামা ছিল ম্রো সমাজের জন্য একটি নতুন ধর্মীয় ও নৈতিক ব্যবস্থা। এর কেন্দ্রীয় বিশ্বাসে থুরাইয়ের প্রতি আনুগত্য, প্রার্থনা, আত্মশুদ্ধি এবং মানুষের প্রতি সদাচরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ক্রামা ধর্মের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার তারিখ নিয়ে মেনলের নিজের লেখায় একটি বিশেষ সংকেত পাওয়া যায়: ০৫-০৫-১৯। গবেষক সেলিন মুশে এই তারিখকে ৫ মে ১৯৮৪ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, শেষের ১৯ সংখ্যাটি মেনলের ঘোষণাকালীন বয়স নির্দেশ করে থাকতে পারে। এ হিসাব গ্রহণ করলে মেনলের জন্মকাল ১৯৬৪ বা ১৯৬৫ সালের কাছাকাছি দাঁড়ায়।

তবে এ তারিখের সঙ্গে অন্য কিছু সাক্ষ্যের অসংগতি রয়েছে। কোনো কোনো ম্রো তথ্যদাতা ২০০০ সালে বলেছিলেন, ক্রামা ধর্মের বয়স তখন প্রায় পঁচিশ বছর। সে হিসাবে ধর্মটির সূচনা ১৯৭৫ সালের দিকে হওয়ার কথা। আবার মেনলের ছোট ভাই মেন্যা তাঁর অন্তর্ধানের সময় ১৯৮৫ বা ১৯৮৬ সাল উল্লেখ করেছেন এবং তখন মেনলের বয়স উনিশ বছর ছিল বলে জানিয়েছেন। এসব তথ্যের মধ্যে পুরোপুরি মিল নেই।

তাই ৫ মে ১৯৮৪-কে ক্রামা ধর্মের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে উল্লেখ করা যায়। কিন্তু একে নিঃসংশয় ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত বলা যায় না। মেনলের নিজের লেখায় তারিখটির উপস্থিতি একে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

ক্রামা ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে মেনলে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করেছিলেন বলে বিবরণ পাওয়া যায়। মিয়ানমার ও ভারতের দিকেও তাঁর যাত্রার কথা উল্লেখ আছে। এসব সফরের বিস্তারিত বিবরণ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে আরও অনুসন্ধান প্রয়োজন। তবে তাঁর ধর্মীয় উদ্যোগ যে মালাউ-ও পাড়ার সীমা অতিক্রম করে বৃহত্তর ম্রো সমাজে পরিচিতি লাভ করেছিল, তা পরবর্তী অনুসারী ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্তিত্ব থেকে বোঝা যায়।

ক্রামা ধর্মে ব্যক্তিজীবন, পরিবার ও সামাজিক সম্পর্কের জন্য কিছু নৈতিক বিধান নির্ধারণ করা হয়েছিল। মদ্যপান, নেশাদ্রব্য গ্রহণ, চুরি, ডাকাতি ও বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক থেকে বিরত থাকা; দিনে তিনবার প্রার্থনা করা; বিনয়, সততা, পরিচ্ছন্নতা ও পারস্পরিক সদ্ভাব বজায় রাখা এসব ছিল তার উল্লেখযোগ্য নির্দেশনা। শিশুদের নামকরণ, দীক্ষা, বিবাহ ও মৃত্যুসংক্রান্ত আচারও এই ধর্মীয় ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হয়।

এসব বিধানের মধ্য দিয়ে মেনলে অনুসারীদের জন্য একটি নতুন নৈতিক ও সামাজিক জীবনপদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন বলে ধারণা করা যায়। এটি ছিল ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি সমাজকে শৃঙ্খলিত করারও একটি প্রয়াস।

৫. রিয়েন বর্ণমালার উদ্ভাবন ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব

মেনলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদানগুলোর একটি হলো ম্রো ভাষার জন্য রিয়েন (Riyen) বর্ণমালা প্রবর্তন। ক্রামা ধর্ম ও রিয়েন বর্ণমালা পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও দুটি বিষয় এক নয়। ক্রামা একটি ধর্মীয় ব্যবস্থা; রিয়েন হলো ম্রো ভাষা লেখার জন্য ব্যবহৃত বর্ণমালা।

মেনলের এই উদ্যোগের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বোঝার জন্য ম্রো সমাজের ভাষা ও শিক্ষার তৎকালীন পরিস্থিতি বিবেচনা করা প্রয়োজন। কোনো জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা থাকলেও সেই ভাষার লিখিত রূপ, পাঠ্যসামগ্রী ও শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে না উঠলে তার সাংস্কৃতিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। ম্রোদের ক্ষেত্রেও নিজস্ব ভাষায় লেখাপড়ার সুযোগ ছিল সীমিত। ফলে একটি স্বতন্ত্র বর্ণমালা তৈরির উদ্যোগ ভাষাগত পরিচয় প্রতিষ্ঠার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

১৯৯০ সালে বান্দরবান সফরের সময় নৃবিজ্ঞানীয় লরেঞ্জ জি. লেফলারের সঙ্গে মেনলে ও তাঁর ধর্মীয় আন্দোলন সম্পর্কে আলোচনা হয়। তিনি তখন এমন একটি নতুন লিপির কথা জানতে পারেন, যা ম্রোদের মধ্যে ব্যবহৃত হচ্ছিল। লফলার একজন ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে সেই লিপির নমুনা সংগ্রহ করেন। বিনিময়ে অর্থ দেওয়ার প্রস্তাবও করেছিলেন। পরে ওই ব্যক্তি নতুন লিপিতে লেখা বারো পৃষ্ঠার একটি দলিল এবং তার ইংরেজি অনুবাদ নিয়ে আসেন। লফলার অনুবাদটি যাচাই করার সুযোগ পান।

এই বারো পৃষ্ঠার দলিলটি রিয়েন বর্ণমালার ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এতে ক্রামা ধর্মের বিশ্বাস ও বক্তব্যের পরিচয় পাওয়া যায়। মেনলের অন্তর্ধানের পর নতুন ধর্মীয় নেতারাও এই লেখাগুলো ব্যবহার করে ধর্মীয় বিধি ও আচারের কাঠামো গড়ে তুলেছিলেন বলে লফলার তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেছেন।

লফলারের বিবরণে রিয়েন বর্ণমালার গঠন ও অক্ষরবিন্যাস নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। তিনি এর অক্ষরগুলোর ক্রম, ধ্বনিগত ব্যবহার এবং রোমান, বাংলা, মারমা ও অন্যান্য লিপির সঙ্গে সম্ভাব্য সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর মতে, মেনলে প্রচলিত লিপির কিছু অক্ষর ও বিন্যাস থেকে ধারণা গ্রহণ করলেও ম্রো ভাষার ধ্বনির প্রয়োজন অনুসারে নতুন ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করেছিলেন। ইংরেজি লিপিতে যেসব অক্ষর ম্রো ভাষার নির্দিষ্ট ধ্বনি প্রকাশে ব্যবহৃত হতো না, সেগুলোর কিছু স্থানান্তর বা নতুনভাবে ব্যবহারের সম্ভাবনাও তিনি দেখিয়েছেন।

রিয়েন বর্ণমালার কিছু বৈশিষ্ট্যকে লফলার বাংলা, মারমা ও বার্মিজ লিপির প্রভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত করেছেন। কোথাও কোথাও তিনি অক্ষরের নাম ও বিন্যাসের মধ্যে প্রতীকী তাৎপর্যও অনুসন্ধান করেছেন। রিয়েন বর্ণমালা নেয় লফলারের ভাষাতাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণটি গুরুত্বপূর্ণ।

রিয়েনের ব্যবহার যে ধর্মীয় লেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তারও কিছু প্রমাণ পাওয়া যায়। লফলার ম্রো ভাষার একটি প্রাথমিক পাঠ্যবইয়ের কথা উল্লেখ করেছেন, যা রিয়েন অক্ষরে লেখা হয়েছিল। বইটির প্রচ্ছদে রোমান হরফে লেখকের নাম ছিল Chawng Now Manyang Mro। পরে রিয়েন লিপির পাঠোদ্ধার করে তিনি নামটির আরেকটি রূপ শনাক্ত করেন। এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, লিপিটি শিক্ষা ও ভাষাচর্চার ক্ষেত্রেও ব্যবহারের চেষ্টা হয়েছিল। রিয়েন বর্ণমালা দিয়ে পরবর্তী সময়ে প্রাথমিক স্তরের বই লেখা হয়েছে।

৬. ম্রো সমাজে ক্রামা ধর্মের বিস্তার ও সামাজিক প্রভাব

ম্রো সমাজে ক্রামা ধর্মের আবির্ভাব এমন এক সময়ে ঘটে, যখন পাহাড়ি জনপদে প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি খ্রিষ্টধর্মের প্রভাবও বিস্তার লাভ করছিল। ম্রোদের ঐতিহ্যগত ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে নতুন ধর্মীয় পরিচয়ের সংযোগ ও বিরোধ দুই ধরনের অভিজ্ঞতাই তৈরি হয়।

লফলারের বিবরণ থেকে জানা যায়, সে সময় ম্রো সমাজে প্রধানত প্রচলিত ধর্মবিশ্বাস, খ্রিষ্টধর্ম এবং ক্রামা ধর্ম মিলে তিন ধরনের ধর্মীয় পরিচয় লক্ষ করা যেত। নতুন ধর্মীয় পরিচয় গ্রহণের ফলে সামাজিক সম্পর্কেও কিছু পরিবর্তন আসে। প্রথম দিকে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনে অনীহা ছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয় সামাজিক দূরত্বের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে সময়ের সঙ্গে এই বিভাজন দুর্বল হয়ে আসে।

ক্রামা ধর্মের অনুসারীরা নিজেদের স্বতন্ত্র ধর্মীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন। অন্যদিকে খ্রিষ্টান ম্রোদের একাংশ রিয়েন বর্ণমালাকে গ্রহণ করেননি। তাঁরা মিশনারি কার্যক্রমে ব্যবহৃত রোমানভিত্তিক লিপির প্রতি অনুগত ছিলেন। লফলার এমন কিছু খ্রিষ্টান ম্রোর কথা উল্লেখ করেছেন, যাঁরা রিয়েনকে অশুভ শক্তির সৃষ্টি বলে মনে করতেন। এ থেকে বোঝা যায়, বর্ণমালা নিয়ে মতভেদটি শুধু ভাষার প্রশ্ন ছিল না। এর সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয় ও সাংস্কৃতিক আনুগত্যও জড়িয়ে পড়েছিল।

তবে ক্রামা ধর্মের বিস্তারকে একমাত্র ধর্মীয় বিরোধের ইতিহাস হিসেবে দেখলে এর সামাজিক তাৎপর্য পুরোপুরি বোঝা যাবে না। এর মধ্যে ছিল নিজস্ব ধর্মীয় পরিচয় নির্মাণ, নৈতিক জীবনপদ্ধতি প্রতিষ্ঠা এবং মাতৃভাষাকে লিখিত রূপ দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা। বিশেষ করে রিয়েন বর্ণমালা প্রবর্তনের উদ্যোগ ম্রোদের ভাষা ও সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য নিয়ে নতুন ভাবনার সুযোগ তৈরি করেছিল।

৭. মেনলের অন্তর্ধান: ইতিহাসের অমীমাংসিত অধ্যায়

মেনলের জীবনের সবচেয়ে রহস্যময় অধ্যায় তাঁর অন্তর্ধান। তিনি ঠিক কবে, কোথায় এবং কী কারণে নিখোঁজ হন এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও অভিন্ন কোনো বিবরণ পাওয়া যায় না। তাঁর ছোট ভাই মেন্যা ১৯৮৫ বা ১৯৮৬ সালের কথা বলেছেন। অন্য কিছু তথ্যের সঙ্গে এ সময়ের হিসাব পুরোপুরি মেলে না। ফলে তাঁর অন্তর্ধানের নির্দিষ্ট সালও সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন হলেও উল্লেখযোগ্য গবেষণা হয়েছে বলে জানা যায়নি।

মেনলের অন্তর্ধানের পর ক্রামা ধর্মের অনুসারীরা তাঁর প্রচারিত বিশ্বাস ও লিখিত বাণীকে ধরে রাখার চেষ্টা করেন। নতুন ধর্মীয় নেতারা তাঁর রেখে যাওয়া লেখাগুলো থেকে বিধি ও আচার নির্ধারণ করেন। এভাবে একজন ব্যক্তির উদ্যোগে শুরু হওয়া ধর্মীয় আন্দোলন তাঁর অনুপস্থিতিতেও একটি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধরে রাখে।

মেনলের অন্তর্ধান নিয়ে অনুসারীদের মধ্যে নানা বিশ্বাস ও স্মৃতিচারণ প্রচলিত আছে। তাঁর জীবন ও অন্তর্ধান সম্পর্কে আরও প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য, পারিবারিক দলিল, অনুসারীদের লিখিত বিবরণ এবং সমসাময়িক নথি সংগ্রহ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে তাঁর ছোট ভাই, পরিবারের অন্য সদস্য, প্রাথমিক অনুসারী এবং রিয়েন লিপির ব্যবহারকারীদের সাক্ষাৎকার এ বিষয়ে নতুন তথ্য দিতে পারে।

মেনলের জীবনকে ঘিরে রহস্য যতই থাকুক, ম্রো সমাজের ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তিনি একটি নতুন ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রচারক ছিলেন। একই সঙ্গে নিজস্ব ভাষার জন্য বর্ণমালা নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁর এই দুই প্রচেষ্টা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের প্রশ্নকে একই সূত্রে যুক্ত করেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এখানকার প্রতিটি জনগোষ্ঠী নিজস্ব ভাষা, বিশ্বাস ও ঐতিহ্য নিয়ে বহুকাল ধরে টিকে আছে। কখনো সামাজিক পরিবর্তনের চাপে, কখনো নতুন ধর্মীয় প্রভাবের মুখে, আবার কখনো শিক্ষা ও আধুনিকতার সংস্পর্শে তাদের জীবনধারায় পরিবর্তন এসেছে। মেনলের আবির্ভাব সেই পরিবর্তনেরই একটি বিশেষ অধ্যায়।

তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাসের সত্যতা নিয়ে অনুসারী ও গবেষকের দৃষ্টিভঙ্গি এক নাও হতে পারে। রিয়েন বর্ণমালার গঠন ও ব্যবহার নিয়েও আরও গবেষণার অবকাশ রয়েছে। কিন্তু ম্রো সমাজের একজন মানুষ নিজের জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন ধর্মীয় পরিচয় ও লিখিত ভাষার ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। এই ঐতিহাসিক সত্যের গুরুত্ব আলাদা করে স্বীকার করতে হয়। মেনলের জীবন তাই শুধু একজন ধর্মপ্রবর্তকের জীবনী নয়। এটি পাহাড়ের একটি জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় অনুসন্ধান, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এবং ইতিহাসে নিজের অবস্থান নির্মাণের এক উল্লেখযোগ্য প্রয়াস।


লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

মোবাইল: 01556-560126 / 01645-950296

তারিখ: 08/11/2026 খিষ্টাব্দ।