
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কেবল বাংলা সাহিত্যের কবি হিসেবে দেখলে তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি ক্ষুদ্র অংশই দেখা হয়। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, শিক্ষাচিন্তক, জমিদার, সমাজপর্যবেক্ষক এবং মানবসভ্যতার অন্তর্গত ঐক্যের সন্ধানী। অমিতাভ চৌধুরীর ‘ইসলাম ও রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের ইসলাম, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এবং বাংলার মুসলমান সমাজ সম্পর্কে মনোভাবের নানা দৃষ্টান্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। লেখক তাঁর বক্তব্য নির্মাণ করেছেন রবীন্দ্রনাথের বাণী, চিঠি, স্মৃতিকথা, সাহিত্যিক উদ্ধৃতি এবং জমিদারি জীবনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। এই প্রবন্ধে সেই উৎসের আলোকে রবীন্দ্রনাথের মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্বিন্যস্ত করা হলো।
মহানবী (সা.)-এর প্রতি রবীন্দ্রনাথের শ্রদ্ধা:
রবীন্দ্রনাথ হজরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে কোনো দীর্ঘ জীবনীমূলক গ্রন্থ রচনা করেননি। কিন্তু তাঁর কাছ থেকে পাওয়া তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শুভেচ্ছাবার্তা প্রমাণ করে যে ইসলাম ও মহানবী (সা.) সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল শ্রদ্ধাপূর্ণ, সংযত এবং আন্তরিক। লেখক অমিতাভ চৌধুরীর রচিত ‘ইসলাম ও রবীন্দ্রনাথ অন্যান্য প্রসঙ্গ’ গ্রন্থের প্রথম প্রবন্ধটি হচ্ছে ‘ইসলাম ও রবীন্দ্রনাথ’। এ প্রবন্ধ অনুযায়ী, ১৯৩৩ সালের ২৬ নভেম্বর বোম্বাইয়ে আয়োজিত একটি পয়গম্বর দিবসের সভায় রবীন্দ্রনাথের বাণী পাঠ করেন কংগ্রেস নেত্রী সরোজিনী নাইডু। সেখানে কবি বলেন:
“জগতে যে সামান্য কয়েকটি মহান ধর্ম আছে, ইসলাম ধর্ম তাদেরই অন্যতম।” মহান এই ধর্মমতের অনুগামীদের দায়িত্বও তাই বিপুল। ইসলামপন্থীদের মনে রাখা দরকার, ধর্মবিশ্বাসের মহত্ব ও গভীরতা যেন তাঁদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রার ওপর ছাপ রেখে যায়। আসলে এই দুর্ভাগা দেশের অধিবাসী দু’টি সম্প্রদায়ের বুঝাপড়া শুধু তো জাতীয় স্বার্থের সপ্রতিভ উপলব্ধির ওপর নির্ভর করে না; সত্যদ্রষ্টাদের বাণী নিঃসৃত শ্বাশত প্রেরণা ওপরও তার নির্ভরতা। সত্য ও শ্বাশতকে যাঁরা জেনেছেন ও জানিয়েছেন, তাঁরা ঈশ্বরের ভালোবাসার পাত্র। এবং মানুষকেও তাঁরা চিরকাল ভালোবেসে এসছেন।”
এই বক্তব্যে তিনি ইসলামের অনুসারীদের দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দেন। অর্থাৎ কোনো মহান ধর্মের পরিচয় শুধু তার ঐতিহ্যে নয়; তার অনুসারীদের জীবনাচরণেও সেই মহত্ত্বের সাক্ষ্য থাকা প্রয়োজন।
এ বাণীটির তাৎপর্য এখানেই যে, রবীন্দ্রনাথ ইসলামকে কেবল একটি সম্প্রদায়ের ধর্ম হিসেবে দেখেননি। তিনি তাকে মানবসভ্যতার বৃহৎ ধর্মীয় ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকার করেছেন। সত্য ও শাশ্বতকে যাঁরা উপলব্ধি করেছেন এবং মানুষকে ভালোবেসেছেন, তাঁরা ঈশ্বরের প্রিয়। এই সার্বজনীন নৈতিক সূত্রকে তিনি ইসলামি ঐতিহ্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বলে দেখেছেন।
ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহমের বাণী:
১৯৩৪ সালে স্যার আবদুল্লাহ সুহরাওয়ার্দির অনুরোধে রবীন্দ্রনাথের আরেকটি বাণী কলকাতা বেতারে প্রচারিত হয়। সেখানে তিনি বলেন:
“ইসলাম পৃথিবীর মহত্তম ধর্মের মধ্যে একটি। এই কারণে তাঁর অনুবর্তীগণের দায়িত্ব অসীম, যেহেতু আপন জীবনে এই ধর্মের মহত্ব সম্পর্কে তাঁদের সাক্ষ্য দিতে হবে। ভারতে যে সকল ধর্মসমাজ আছে, তাদের পরস্পরের প্রতি সভ্যজাতিযোগ্য মনোভাব যদি উদ্ভাবিত করতে হয়, তাহলে কেবলমাত্র রাষ্ট্রিক স্বার্থবুদ্ধি দ্বারা তা সম্ভব হবে না, আমাদের নির্ভর করতে হবে সেই অনুপ্রেরণার প্রতি, যা ঈশ্বরের প্রিয়পাত্র ও মানবের বন্ধু সত্যদূতদের অমর জীবন থেকে চির-উৎসারিত। আজকের এই পূণ্য অনুষ্ঠান উপলক্ষে মুসলিম ভাইদের সঙ্গে একযোগে ইসলামের মহাঋষির উদ্দেশ্যে আমার ভক্তি উপহার অর্পন করে উৎপীড়িত ভারতবর্ষের জন্য তাঁর আশির্বাদ ও শান্তনা কামনা করি।”
রবীন্দ্রনাথ এই বাণীতে মুসলমানদের নৈতিক দায়িত্ব যুক্ত করেছেন। তাঁর বক্তব্যের সারকথা ‘একটি মহান ধর্মের অনুসারীদের জীবনে সেই ধর্মের মহত্ত্বের সাক্ষ্য থাকতে হবে।’ এই বক্তব্য রবীন্দ্রনাথের ধর্মভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে। তিনি ইসলাম ধর্মকে শুধু বাহ্যিক আচার বা সম্প্রদায়গত পরিচয়ে বিচার করেননি। বরং তার নৈতিক শক্তি, মানবপ্রেম ও সত্যের আহ্বানকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
দিল্লির জামে মসজিদ প্রকাশিত পয়গম্বর সংখ্যায় শুভেচ্ছা:
১৯৩৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি শান্তিনিকেতন থেকে পাঠানো এক বার্তায় রবীন্দ্রনাথ মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল অংশে তিনি বলেন:
“যিনি বিশ্বের মহত্ত্বমদের অন্যতম, সেই পবিত্র পয়গম্বর হজরত মুহাম্মদের উদ্দেশ্যে আমি আমার অন্তরের গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করি। মানুষের ইতিহাসে এক নতুন, সম্ভবনাময় জীবনীশক্তির সঞ্চয় করেছিলেন পয়গম্বর হজরত, এনেছিলেন নিখাদ, শুদ্ধ ধর্মাচরণের আদর্শ। সর্বান্তকরণে প্রার্থনা করি, পবিত্র পয়গম্বরের প্রদর্শিত পথ যাঁরা অনুসরণ করেছেন, আধুনিক ভারতবর্ষের সুসভ্য ইতিহাস রচনা করে তাঁরা যেন জীবন সম্পর্কে তাঁদের গভীর আস্থা এবং পয়গম্বরের প্রদত্ত শিক্ষাকে যথাযথ মর্যাদা দেন। তাঁরা যেন এমনভাবে ইতিহাসকে গড়ে তোলেন যাতে আমাদের জাতীয় জীবনে শান্তি ও পারস্পরিক শুভেচ্ছার বাতাবরণটি অটুট থেকে যায়।”
রবীন্দ্রনাথ তাঁর লেখা প্রার্থনা করেন, যাঁরা পয়গম্বরের প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করেন, তাঁরা যেন আধুনিক সুসভ্য ইতিহাস নির্মাণ করেন এবং জাতীয় জীবনে শান্তি ও পারস্পরিক শুভেচ্ছার পরিবেশ অটুট রাখেন।
এখানে শ্রদ্ধা ও দায়িত্ব দুইটি বিষয় পাশাপাশি আছে। রবীন্দ্রনাথ মহানবী (সা.)-এর নৈতিক উত্তরাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তাঁর অনুসারীদের কাছে সেই উত্তরাধিকারকে সামাজিক শান্তি ও সভ্যতার নির্মাণে রূপ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
লেখক অমিতাভ তাঁর অনুসন্ধানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃক বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে উপরোক্ত তিনটি বাণীর উদ্বৃত করেছেন। লেখক বলেছেন, ‘আপাতত এই তিনটি মাত্র ক্ষুদ্র রচনাই আমাদের সম্বল। তাছাড়া রবীন্দ্রনাথ আর কোথাও হজরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে বলেছেন কিনা খুঁজে পাইনি। তবে মুসলমান সমাজ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের মনোভাব কী ছিল, তার বিবরণ নানা রচনায় নানাভাবে পাই।”
জমিদারি জীবনে মুসলমান প্রজাদের সঙ্গে সম্পর্ক:
রবীন্দ্রনাথের ইসলাম-ভাবনা শুধু সভা, বাণী বা সাহিত্যিক কল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। জমিদারি পরিচালনার সময় বাংলার গ্রামীণ সমাজ, বিশেষত দরিদ্র মুসলমান কৃষকদের সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ পরিচয় ঘটে। অমিতাভ চৌধুরীর প্রবন্ধে এই অভিজ্ঞতাকে রবীন্দ্রনাথের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে দেখানো হয়েছে।
প্রবন্ধকারের বর্ণনা অনুযায়ী, বাংলার বহু মুসলমান কৃষক হিন্দু জমিদার ও মহাজনের অর্থনৈতিক নিপীড়নের শিকার ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁদের শুধু ধর্মীয় পরিচয়ে দেখেননি। দেখেছেন দরিদ্র কৃষক, ঋণগ্রস্ত প্রজা এবং সামাজিকভাবে বঞ্চিত মানুষ হিসেবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার জায়গায় রাখে না। বরং অর্থনৈতিক ন্যায় ও প্রজাহিতৈষণার প্রশ্নেও যুক্ত করে।
শিলাইদহের পুণ্যাহ ও একাসনের ঘটনা:
অমিতাভ চৌধুরীর বর্ণনা অনুসারে, ১৮৯১ সালে শিলাইদহে জমিদারি তদারকির দায়িত্ব নেওয়ার পর রবীন্দ্রনাথ প্রথম পুণ্যাহ উৎসবে প্রচলিত আসনবৈষম্য দেখে আপত্তি জানান। সে সময় ব্রাহ্মণ, অন্যান্য হিন্দু ও মুসলমান প্রজাদের জন্য আলাদা আসনের ব্যবস্থা ছিল। জমিদারের জন্য ছিল পৃথক মর্যাদাপূর্ণ আসন।
রবীন্দ্রনাথ এই ব্যবস্থা মেনে নেননি। তাঁর বক্তব্য ছিল পুণ্যাহ মিলনের অনুষ্ঠান। সেখানে জাতি ও ধর্মের ভিত্তিতে আলাদা আসন বসানো যায় না। তিনি সব আসন সরিয়ে হিন্দু-মুসলমান, ব্রাহ্মণ-চণ্ডাল সবার জন্য একই ধরনের আসনের ব্যবস্থা করতে বলেন। প্রবন্ধকারের বিবরণ অনুযায়ী, নায়েব-গোমস্তারা প্রথা পরিবর্তনের প্রতিবাদ করেন এবং পদত্যাগের হুমকিও দেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তাঁর সিদ্ধান্তে অটল থাকেন।
তবে এই ঘটনার ঐতিহাসিক সত্যতা স্মৃতিকথা ও প্রবন্ধকারের বর্ণনার ওপর নির্ভরশীল। এ কথা মনে রাখা প্রয়োজন। তবু ঘটনার নৈতিক তাৎপর্য রবীন্দ্রনাথের অন্যান্য চিঠি, প্রবন্ধ ও সাহিত্যিক বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। তাঁর কাছে সামাজিক মিলন কোনো অলংকারিক কথা ছিল না; বসার জায়গা, খাওয়ার ব্যবস্থা ও দৈনন্দিন সম্পর্কের মধ্যেই তার পরীক্ষা হতো।
দ্বিতীয় পর্ব আগামীকাল: ইসলাম, মুসলিম সমাজ ও রবীন্দ্রনাথ: সাহিত্য, সমাজচিন্তা ও মানবতাবাদ।
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
মোবাইল: 01556-560126 / 01645-950296
তারিখ: 12/10/2026 খিষ্টাব্দ।
আপনার মতামত লিখুন :