
মমতাজ উদ্দিন আহমদ, আলীকদম (বান্দরবান)
পার্বত্য চট্টগ্রামের ম্রো জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় বাঁশ ও বেতের তৈরি নানা ধরনের সামগ্রী গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি এসব সামগ্রীর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তাদের সামাজিক প্রথা, পারিবারিক ঐতিহ্য ও ধর্মীয় বিশ্বাস। এমনই একটি বিশেষ কারুশিল্পের নিদর্শন হলো ‘খং-তোম’। এটি বড় আকারের একটি ঢাকনাযুক্ত ঝুড়ি। নারীদের পোশাক সংরক্ষণে ব্যবহৃত হলেও এর গুরুত্ব কেবল গৃহস্থালি ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
ম্রোদের বাড়িতে খং-তোম রাখা হয় ‘কিম্মা’ নামের ব্যক্তিগত কক্ষে। আক্ষরিক অর্থে কিম্মা বলতে ‘প্রধান ঘর’ বোঝালেও এটি বাড়ির অপেক্ষাকৃত ছোট একটি কক্ষ। বিবাহিত দম্পতি ও তাদের ছোট সন্তানদের শয়নকক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হয় ঘরটি। পাশাপাশি পরিবারের ব্যক্তিগত সম্পদ ও খাদ্যসামগ্রী সংরক্ষণের স্থান হিসেবেও এর ব্যবহার রয়েছে। এই কক্ষে অপরিচিত বা বহিরাগতদের প্রবেশের অনুমতি নেই।
খং-তোম মূলত নারীদের পোশাক রাখার কাজে ব্যবহৃত হয়। ম্রো সমাজের একটি প্রচলিত বিবাহপ্রথার সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। কোনো মেয়ে বিয়ে করলে সে তার সঙ্গে একটি খং-তোম স্বামীর বাড়িতে নিয়ে যায়। জানা যায়, এর বিনিময়ে মেয়ের বাবাকে প্রচলিত নিয়মে ১০ রুপি পরিশোধ করতে হতো। অর্থাৎ, খং-তোম গৃহস্থালির একটি সামগ্রী হলেও বিবাহের সঙ্গে যুক্ত একটি মূল্যবান পারিবারিক সম্পদও।
খং-তোমের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর দ্বিস্তরবিশিষ্ট কাঠামো। একটি বাইরের ঝুড়ির ভেতরে আরেকটি ঝুড়ি বসিয়ে এটি তৈরি করা হয়। ফলে এর দেয়াল ও তলা উভয়ই দ্বিস্তরবিশিষ্ট। ম্রোদের অন্যান্য ঝুড়ির তুলনায় এর বিশেষত্ব হলো, এটি একটি আলাদা ঢাকনাসহ তৈরি করা হয়।
সাধারণত, ঝুড়িটির ভেতরের তলার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ২৫ সেন্টিমিটার হয়। পা-সহ বাইরের তলার মাপ ৩০ × ৩০ সেন্টিমিটার। ঢাকনা ছাড়া এর উচ্চতা ৭১ সেন্টিমিটার। এর মধ্যে পায়ের উচ্চতা ৪ সেন্টিমিটার। ঢাকনাসহ মোট উচ্চতা দাঁড়ায় ৯৩ সেন্টিমিটার।
ঝুড়িটির ওপরের মুখ প্রথমে ৬৩ সেন্টিমিটার ব্যাস পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এরপর ক্রমশ সরু হয়ে ওপরের কিনারায় এর ব্যাস দাঁড়ায় ৫৮ সেন্টিমিটার। এই সরু অংশের ওপর ঢাকনাটি বসানো হয়।
ঝুড়ির বুননে বাঁশের সরু ফালি ব্যবহার করা হয়। এর দেয়ালের বুননপদ্ধতি ‘নুম-লক হাউ-লক’ অর্থাৎ, একটি ফালি নিচ দিয়ে এবং পরেরটি ওপর দিয়ে চালিয়ে বোনা হয়। ভেতরের ঝুড়ির তলার বুনন ম্রোদের ‘ক্লাইপুক’ নামের অন্য একটি ঝুড়ির তলার মতো।
ঝুড়িটির কাঠামো মজবুত করতে তলার চার কোণ থেকে ওপরের কিনারা পর্যন্ত বাঁশের শক্তিবর্ধক ফালি লাগানো হয়। এসব ফালি তৈরি করা হয় মোটা দেয়ালবিশিষ্ট বাঁশের গোড়ার অংশ থেকে। ফালির নিচের প্রান্ত সামান্য চৌকো করে কাটা হয়, যা ঝুড়ির পা হিসেবে কাজ করে। প্রতিটি শক্তিবর্ধক ফালিতে ৫ থেকে ৮ সেন্টিমিটার অন্তর ছিদ্র করা থাকে। এসব ছিদ্র দিয়ে সরু বেতের ফালি প্রবেশ করিয়ে ঝুড়ির দুই স্তরকে শক্তভাবে বেঁধে রাখা হয়। বেতের ফালির দুই প্রান্ত ঝুড়ির ভেতরের দিকে গিঁট দিয়ে আটকানো থাকে।
ঝুড়ির তলাও অতিরিক্ত বাঁশের ফালি দিয়ে শক্ত করা হয়। এ ছাড়া বহনের সুবিধার্থে এতে বেতের হাতল রয়েছে। ঢাকনা আটকে রাখার জন্য ঝুড়ি ও ঢাকনা উভয় অংশে ছোট ছোট হাতলও সংযুক্ত করা হয়। এসব হাতলের মধ্য দিয়ে সরু বেত, ফালি বা সুতা প্রবেশ করিয়ে ঢাকনাটি ঝুড়ির সঙ্গে বেঁধে রাখা যায়।
খং-তোমের ঢাকনাটিও দ্বিস্তরবিশিষ্ট। এর দুই স্তরের মাঝখানে ‘কু-রাম-লেভস’ নামের একটি বিশেষ উপাদানের স্তর রাখা হয়। এই উপাদান ঢাকনাটিকে বৃষ্টির পানি থেকে সুরক্ষা দেয়। ঢাকনার ওপরের অংশটি চূড়ার মতো উঁচু। মাঝখানে রয়েছে গুটির মতো একটি হাতল। ঢাকনা তৈরির সময় বাঁশের উল্লম্ব ফালিগুলো পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনা হয়। শেষ পর্যন্ত ফালিগুলো কেন্দ্রের দিকে পরস্পরের ওপর দিয়ে অতিক্রম করে গুটির আকৃতি তৈরি করে। ঢাকনার বাইরের অংশে সরু বেতের ফালি দিয়ে মাকড়সার জালের মতো একটি নকশাও তৈরি করা হয়। এই নকশার সঙ্গে যুক্ত হাতল ধরে ঢাকনাটি ওপরে তোলা যায়।
খং-তোমের ব্যবহারিক ও কারুশিল্পগত বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি এর একটি ধর্মীয় তাৎপর্যও রয়েছে। নারীদের পোশাক রাখার পাশাপাশি এতে ‘খং-রাউ’ নামের ছোট ছোট নুড়িপাথর সংরক্ষণ করা হয়। ম্রোদের কাছে এসব পাথর পবিত্র বলে বিবেচিত। পরিবারের রক্ষাকারী আত্মারা এসব পাথরের মধ্যে অবস্থান করেন বলে তাদের বিশ্বাস। এ কারণে পাথরগুলো বাইরের বা অপরিচিত মানুষের সামনে প্রদর্শন করা হয় না।
ম্রোদের ধর্মীয় আচারেও খং-তোমের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। বাড়িতে যখন ‘কোম-পট’ নিবেদন করা হয়, তখন তার একটি অংশ খং-তোমের ওপর অথবা ভেতরে রাখা হয়। কোম-পট হলো কলাপাতার ছোট টুকরায় মোড়ানো অল্প পরিমাণ খাদ্য, যা আত্মাদের উদ্দেশে নিবেদন করা হয়।
খং-তোমের নির্মাণকৌশল, ব্যবহার ও ধর্মীয় তাৎপর্য বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, ম্রোদের ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প তাদের দৈনন্দিন জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। একটি ঝুড়ির মধ্যেই সংরক্ষিত রয়েছে পারিবারিক সম্পদ, বিবাহপ্রথা, কারিগরি দক্ষতা ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের নানা অনুষঙ্গ। তাই খং-তোমকে শুধু একটি গৃহস্থালি সামগ্রী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি ম্রো জনগোষ্ঠীর বস্তুগত সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
আপনার মতামত লিখুন :