
মধ্যপ্রাচ্যে ফিলিস্তিনের গাজা মুসলিম বিশ্বে এক রক্তাক্ত প্রতীক। ইসরাইলী বর্বরতায় গাজায় প্রতিদিন সূর্য ওঠে আগুন আর ধোঁয়ার আলোছায়ায়। যেখানে বোমার শব্দের চেয়েও শিশুর কান্না বেশি তীব্র।
পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই জনপদটি দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর নির্মম বর্বরতার শিকার। যুদ্ধ পরবর্তী গাজায় হানা দিয়েছে ক্ষুধা। ইসরাইলী ক্ষেপণাস্ত্র, বোমা ও ট্যাংকের গর্জনের পাশাপাশি ক্ষুধা সবচেয়ে ভয়াবহ অস্ত্র। বর্বর নেতানিয়াহু বোমা ফেলেই ক্ষান্ত হয়নি। সে গাজাবাসীর রুটি-রুজির পথও বন্ধ করে দিয়েছে।
যুদ্ধ-বিগ্রহে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কঠোর নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। শান্তির পক্ষে ইসলামের আহ্বান সুস্পষ্ট। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,
“তোমরা আল্লাহর পথে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো, যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, কিন্তু তোমরা সীমালঙ্ঘন করো না।” (সূরা বাকারা: ১৯০)।
এই আয়াতটি স্পষ্ট করে যে, যুদ্ধ শুধু প্রতিরক্ষার জন্য, প্রতিশোধের জন্য নয়। মহানবী (সা.) যুদ্ধক্ষেত্রেও কিছু কঠোর নিয়ম মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,
“কোনো নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং উপাসনালয়ে অবস্থানকারীকে হত্যা করা যাবে না।”
কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রগুলো প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে এমন যুদ্ধ পরিচালনা করছে। যা পশুবৃত্তিকেও হার মানায়। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন থাকা সত্ত্বেও হাসপাতাল, স্কুল এবং শরণার্থী শিবিরে হামলা করেছে মানবতার শত্রু ইসরাইলী সেনাবাহিনী-আইডিএফ। গাজার মতো চলমান সংঘাতগুলোতে এর নির্মম চিত্র দেখা যায়। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো প্রায়শই ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর কাছে দুর্বল। নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতা আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করে।
গাজা যুদ্ধের ফলে জনজীবন পুরোপুরি বিপর্যস্ত। বছরের পর বছর ধরে সেখানকার মানবতা শান্তির অন্বেষায় ছুটছে। যুদ্ধবাজ ইহুদীরা বোমা হামলার পাশাপাশি খাদ্য, পানি, বিদ্যুৎ ও ওষুধের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে থাকে। অপুষ্টি ও পানিশূন্যতায় হাজার হাজার শিশু মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়। মায়েরা ক্ষুধার্ত সন্তানকে কোলে নিয়ে চুমু দিয়ে সান্ত্বনা দেন। কারণ তাদের বুক থেকে দুধ শুকিয়ে গেছে।
জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ওআইসি–সবাই গাজার পরিস্থিতি জানে। কিন্তু তাদের প্রতিবাদ কেবল বিবৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এই নীরবতা মানবতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
মার্কিন মদদে বর্বর ইহুদীরা প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে এমন যুদ্ধ পরিচালনা করছে, যা যেকোনো পশুবৃত্তিকে হার মানায়। আন্তর্জাতিক মানবিক আইনসমূহে এখন কাগুজে। আজকের বিশ্বে যুদ্ধ মানেই নির্বিচারে রক্তপাত, বেসামরিক মানুষ হত্যা এবং মানবিক স্থাপনা ধ্বংস করা।
জাতিসংঘ, জেনেভা কনভেনশন–সবকিছু থাকা সত্ত্বেও হাসপাতাল, স্কুল এবং শরণার্থী শিবিরে হামলা করেছে বর্বর আইডিএফ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজার মতো চলমান সংঘাতগুলোতে এর নির্মম চিত্র দেখা গেছে।
নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতা আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করে। ফলস্বরূপ, ‘জোর যার মুল্লুক তার’ এই প্রবাদটিই যেন প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।
এই নির্মমতার পরিণতি খুবই ভয়াবহ হতে পারে। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতি এই অবজ্ঞা বিশ্বকে এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ঠেলে দিচ্ছে। এই ধরনের সংঘাত থেকে পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়ছে, যা মানব সভ্যতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
যখন মানবিকতা ও ন্যায়বিচারের অভাব দেখা যায়, তখন বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তাই ন্যায়, মানবিকতা এবং জবাবদিহিতার প্রতি শ্রদ্ধা ফিরিয়ে আনা জরুরি।
গাজাবাসীর দুঃখে মুসলিম বিশ্বের করণীয় নিয়ে একমাত্র ইরান ছাড়া মুসলিম দেশগুলো নিশ্চুপ। অথচ আল্লাহ তাআলা বলেন,
“তোমরা একে অপরকে সাহায্য করো ন্যায়পরায়ণতা ও আল্লাহভীতির কাজে।” (সূরা মায়িদা: ২)।
গাজার মজলুম মুসলমানদের জন্য মুসলিম উম্মাহর কিছু গুরুত্বপূর্ণ করণীয় হলো:
১. ঐক্য ও কূটনৈতিক চাপ: মুসলিম বিশ্বের নেতাদের উচিত অবিলম্বে একজোট হয়ে ইসরায়েলের ওপর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা। এই ঐক্য ছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব নয়।
২. আর্থিক সাহায্য: যাদের সামর্থ্য আছে, তারা বিশ্বস্ত সংস্থা ও চ্যানেলের মাধ্যমে গাজার মানুষদের জন্য অর্থ, খাদ্য, ওষুধ বা অন্যান্য সামগ্রী পাঠাতে পারেন। এটি কেবল দান নয়, এটি মজলুমের প্রতি সাহায্য এবং একটি ইবাদত।
৩. সচেতনতা বৃদ্ধি: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বক্তৃতা, খুতবা, সংবাদ ও লেখালেখির মাধ্যমে গাজা বিষয়ে তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া এবং অন্যদের গাজার পক্ষে সজাগ করা জরুরি। মিডিয়া ও সামাজিক মাধ্যমে ইসরায়েলের বর্বরতা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে হবে।
৪. দোয়া ও আধ্যাত্মিক সমর্থন: আন্তরিকভাবে অশ্রুসিক্ত হয়ে দোয়া করা আমাদের প্রথম দায়িত্ব। রাসূল (সা.) বলেছেন, “দোয়াই ইবাদতের মূল।” (তিরমিযি)। তাদের জন্য নফল রোজা রাখা, কুরআন খতম করা এবং এর সওয়াব তাদের জন্য পৌঁছে দেওয়া আমাদের আধ্যাত্মিক দায়িত্ব।
গাজা আজ এক যন্ত্রণার নাম, এক রক্তাক্ত ইতিহাস। গাজার প্রতিটি গলিতে আর্তনাদের প্রতিধ্বনি, প্রতিটি ঘরে ক্ষুধার চিৎকার। এই কঠিন বাস্তবতায় আমরা কি শুধু চুপ করে থাকতে পারি? এই প্রশ্ন আমাদের মানবিক ও ঈমানি বিবেকের কাছে রেখে গেলাম।
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
মোবাইল: 01556-560126 / 01645-950296
তারিখ: ৩১/০৮/202৬ খিষ্টাব্দ।
আপনার মতামত লিখুন :