
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ২০২৬ সালের ২৬ আগস্ট সংঘটিত আকস্মিক বন্যা প্রচলিত বর্ষণনির্ভর বন্যার সরল উদাহরণ নয়। বর্ষণ ছাড়া বন্যা দেখলো বিশ্ববাসী। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, হিমবাহের অংশ ভেঙে বরফ, পাথর ও পলির ধস নেমে এই বন্যা হয়। সেই ধ্বংসাবশেষ লেন্দে খোলা নদীর গতিপথ আটকে একটি অস্থায়ী প্রাকৃতিক বাঁধ বা জলাধার তৈরি করে। পরে বাঁধ ভেঙে বিপুল পানি ও ধ্বংসাবশেষ ভুটেকোশি–ত্রিশুলি নদী ব্যবস্থায় নেমে আসে। নেচার ও বিবিসি-এর প্রতিবেদনে এই ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভের মূল্যায়নেও এ তথ্য জানা যায়।
এই ঘটনার নির্দিষ্ট দায় জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর কতটা বর্তায়, তা এখনো বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিষয়। তবে উষ্ণায়নের ফলে হিমবাহ ক্ষয়, পেরমাফ্রস্ট গলন, পাহাড়ি ঢালের দুর্বলতা এবং হিমবাহজাত হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে। ফলে নেপালের সাম্প্রতিক বন্যা সমগ্র হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের জলবায়ু-ঝুঁকির এক শক্তিশালী সতর্কসংকেত।
নেপালের এই দুর্যোগটির উৎস কি ভূমিকম্প, নাকি প্রকৃতির অন্য কোনো আকস্মিক রূপান্তর? প্রাথমিক পর্যায়ে সীমান্ত এলাকায় একটি ভূকম্পন নথিভুক্ত হওয়ায় অনেকে ধারণা করেছিলেন। ভূমিকম্পই হয়তো ভূমিধস ও বন্যার মূল কারণ। কিন্তু পরবর্তী বিশ্লেষণে ঘটনাক্রমটি উল্টো হওয়ার সম্ভাবনা জোরালো হয়। প্রথমে হিমবাহ-উৎপন্ন বরফ ও পাথরের ধস, তারপর সেই ধসের অভিঘাতে ভূকম্পন।
নেচার-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বরফ-পাথরের ধস এত শক্তিশালী ছিল যে তা ৫.২ মাত্রার মতো একটি ভূকম্পনজনিত ঘটনা সৃষ্টি করে। বিবিসি-ও ইউএসজিএস -এর মূল্যায়ন উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, হিমবাহ ভেঙে উপত্যকার তলায় আঘাত করার অভিঘাতেই ভূকম্পন নথিভুক্ত হয়েছিল। ভূমিকম্পটি ধসের কারণ না-ও হতে পারে। স্থানীয় প্রতিবেদনে অবশ্য ঘটনাটির প্রাথমিক পর্যায়ে ৪.৪ মাত্রার ভূমিকম্পের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
নেপালের এই প্রাকৃতিক দুর্যোগকে ‘বন্যা’ না বলে কয়েকটি ধারাবাহিক ধাপের সমষ্টি হিসেবে দেখা দরকার। প্রথম ধাপে উচ্চভূমিতে হিমবাহের একটি অংশ ভেঙে পড়ে। সেই সঙ্গে নেমে আসে বরফ, পাথর, মাটি ও পলিমাটি। দ্বিতীয় ধাপে এই বিপুল ধ্বংসাবশেষ লেন্দে খোলা নদীর একটি অংশ আটকে দেয়। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ থেমে গিয়ে তৈরি হয় অস্থায়ী জলাধার। তৃতীয় ধাপে সঞ্চিত পানির চাপ ওই প্রাকৃতিক বাঁধকে ভেঙে দেয়। তখন স্বচ্ছ পানির বদলে পানি, বরফ, শিলা ও পলির এক ঘন মিশ্রণ তীব্র গতিতে নিম্ন উপত্যকার দিকে ধাবিত হয়।
দ্যা কাঠমণ্ডু পোস্ট-এর প্রতিবেদনে নেপালের জলবিজ্ঞান ও আবহাওয়া অধিদপ্তর-এর প্রাথমিক মূল্যায়ন উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, চীনা কর্তৃপক্ষের পাঠানো ‘পূর্বাপর উপগ্রহ চিত্র বা আগে ও পরের স্যাটেলাইট চিত্র’-তে মিতেরি সেতুর প্রায় ২০ কিলোমিটার উজানে ধ্বংসাবশেষ নদী আটকে অস্থায়ী হ্রদ তৈরির চিত্র দেখা যায়। পানি ও ধ্বংসাবশেষের মিশ্রণই ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়েছে। নেচার-এর প্রতিবেদনে একই ধারাবাহিকতার কথা বলা হয়েছে: লেন্দে খোলা আটকে সাময়িক জলাধার তৈরি হয়, পরে তা ভেঙে ভুটেকোশি নদী ব্যবস্থায় বিপুল ঢল নামে।
এ ধরনের দুর্যোগকে বৈজ্ঞানিক ভাষায় ‘ক্যাসকেডিং ডিজেস্টার’ বলা যায়। একটি ঘটনা পরের ঘটনাকে জন্ম দেয়। হিমবাহ ভাঙন থেকে ভূমিধস, ভূমিধস থেকে নদী অবরোধ, অবরোধ থেকে অস্থায়ী জলাধার, জলাধার ভাঙন থেকে কাদা-পাথরের ধস এবং কাদা-পাথরের ধস থেকে আকস্মিক বন্যা। ফলে প্রচলিত বৃষ্টিমাপক যন্ত্র বা সাধারণ নদী-সতর্কতা ব্যবস্থা সবসময় বিপদের পূর্ণ চিত্র ধরতে পারে না।
এই বন্যার ধ্বংসক্ষমতা শুধু পানির পরিমাণে নির্ধারিত হয়নি। পানির সঙ্গে মিশে থাকা ধ্বংসাবশেষই তাকে অধিক প্রাণঘাতী করেছে। কাদা, পাথর, বরফ ও মাটির মিশ্রণ একটি চলমান ভারী দেয়ালের মতো আচরণ করতে পারে। তা ঘরবাড়ি, সেতু, রাস্তা, যানবাহন ও নদীতীরবর্তী অবকাঠামোকে পানির মতো ভাসিয়ে নেয় না; অনেক সময় সরাসরি আঘাত করে গুঁড়িয়ে দেয়।
নেচার জানিয়েছে, ভুটেকোশি নদী ব্যবস্থার পাশে বহু মানুষ বাস করে এবং দুর্যোগের প্রবাহ প্রায় ১০০ কিলোমিটার ডাউনস্ট্রীম পর্যন্ত প্রভাব ফেলেছে। বিবিসি-এর তথ্য অনুযায়ী, ত্রিশুলি ও ভুটেকোশি নদীর আশপাশের জনবসতি, তীর্থপথ ও পর্বতারোহণ-নির্ভর পর্যটন এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদীর সংকীর্ণ উপত্যকা, সেতু ও বাণিজ্যপথ মানুষের পালানোর সুযোগও কমিয়ে দিয়েছে। নেচার-এর বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, বন্যাপ্রবণ সমতল ও নদীতীরের ওপর নির্মাণ এবং অঞ্চলে পর্যটন-বাণিজ্যের বিস্তার মানুষের ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
কোনো দুর্যোগ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ‘ঘটেছে’ এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে দুর্যোগের পেছনে জলবায়ুর প্রভাব বিশ্লেষণ প্রয়োজন। নেচার ও বিবিসি উভয়েই জানিয়েছে, এই ঘটনার ক্ষেত্রে উষ্ণায়নের নির্দিষ্ট ভূমিকা নির্ধারণে আরও গবেষণা দরকার।
তবে জলবায়ু পরিবর্তন উচ্চ হিমালয়ের ভৌত পরিবেশ বদলে দিচ্ছে এটি বৃহত্তর পরিসরে সুপ্রতিষ্ঠিত প্রবণতা। জাতিসংঘের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপাল মাত্র তিন দশকের কিছু বেশি সময়ে তার বরফের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হারিয়েছে এবং আগের দশকের তুলনায় গত দশকে হিমবাহ গলার হার ৬৫ শতাংশ বেড়েছে। এই তথ্য কোনো একক বন্যার সরাসরি কারণ প্রমাণ না দিলেও বুঝা যাচ্ছে পাহাড়ি পরিবেশ আগে তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল, তা এখন দ্রুত পরিবর্তনশীল।
উষ্ণতা বাড়লে কয়েকটি ঝুঁকি একসঙ্গে তৈরি হয়। হিমবাহ পাতলা হয়ে যায়, বরফের ভেতরের সংযোগ দুর্বল হয়। এছাড়াও বরফের নিচে ও পাহাড়ের ঢালে জমাট মাটি-পাথর গলতে শুরু করে। পেরমাফ্রস্টকে পাহাড়ি ঢালের এক ধরনের প্রাকৃতিক বন্ধন হিসেবে ভাবা যায়; তা দুর্বল হলে শিলা ও বরফের বৃহৎ অংশ ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা বাড়ে। এর পাশাপাশি নতুন বা বড় হয়ে ওঠা হিমবাহ-হ্রদ প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে জিএলওপি বা হিমবাহজাত হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা তৈরি করতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন হিমালয়ের বরফ, পেরমাফ্রস্ট ও ঢালকে অস্থিতিশীল করে এ ধরনের বিপর্যয়ের সম্ভাব্যতা ও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বাড়াতে পারে।
নেচার-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনাটির আগে বড় কোনো হ্রদ বা অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের সুস্পষ্ট প্রমাণ ছিল না। সেই কারণে প্রচলিত পূর্বাভাস কাঠামো সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। স্থানীয় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩০ মিনিটে ত্রিশুলি নদীর জলস্তর প্রায় ৯ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যায়। এত দ্রুত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সতর্কবার্তা জারি, মানুষের কাছে পৌঁছানো এবং নিরাপদ উচ্চভূমিতে সরিয়ে নেওয়া তিনটি কাজ নেপাল সরকারের কাছে অত্যন্ত কঠিন ছিল।
নেপালের পাহাড়গুলো আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো কৃষি, জীবিকা ও সংস্কৃতির উৎস। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, হিমালয়ের হিমবাহ-নির্ভর নদীগুলো গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও সিন্ধু অববাহিকার কোটি কোটি মানুষের পানি ও খাদ্য-নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। ফলে উচ্চ হিমালয়ে একটি বরফধসের অভিঘাত স্থানীয় গ্রাম ছাড়িয়ে বহু দূরের জনজীবনেও প্রতিফলিত হতে পারে।
পাহাড়ি উন্নয়নকে নদীর গতিপথ, ঢালের স্থিতি, হিমবাহের পরিবর্তন ও জলবায়ু-প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের নদীগুলো সুস্থতা রক্ষায় কোনো সরকারই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। উপরন্তু নদীর উজানের পাহাড়গুলো স্কেভেটর দিয়ে রাস্তা নির্মাণের নামে ‘উন্নয়ন’ এর কাজ চলমান আছে। স্থানীয় মানুষের ঐতিহ্যগত জ্ঞানকে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য কোনো সরকারি পদক্ষেপ নেই।
নেপালের সাম্প্রতিক বন্যা আমাদের সামনে প্রকৃতির কোনো রহস্যময় ‘ক্রোধ’ নয়। বরং পরিবর্তিত পাহাড়ি ব্যবস্থার একটি বৈজ্ঞানিক সতর্কবার্তা বলা যায়। হিমালয় স্থির নয়। তার বরফ সরে যাচ্ছে, ঢাল নরম হচ্ছে, নদীর আচরণ বদলাচ্ছে, আর মানুষের বসতি ও অবকাঠামো ক্রমশ ঝুঁকিপূর্ণ উপত্যকার গভীরে প্রবেশ করছে।
নেপালে বন্যা ছিল হিমবাহ-ধস, নদী অবরোধ, অস্থায়ী জলাধার ভাঙন এবং বিপুল কাদা-পাথরের ধস-এর সম্মিলিত ফল। ভূকম্পন সেই ঘটনাক্রমের একটি ফল বা সহগামী সংকেত হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন এই নির্দিষ্ট বিপর্যয়ের প্রত্যক্ষ কারণ কতটা, তা হয়তো আগামীতে গবেষণার মাধ্যমে জানা যাবে। কিন্তু উষ্ণায়ন যে হিমালয়ের ঝুঁকির পরিধি বাড়িয়ে দিচ্ছে, তার প্রমাণ ক্রমশ স্পষ্ট।
নদী, জনপদ, কৃষি, পর্যটন, সীমান্ত-নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবন রক্ষা করতে হলে হিমালয়কে রক্ষা করার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। নেপালের এই বন্যা পৃথিবীর ছাদ থেকে নেমে আসা এক সতর্ক সংকেত। পর্বত গরম হলে তার অভিঘাত পাহাড়ে থেমে থাকে না। তা নদীর সঙ্গে সঙ্গে সমতল, নগর ও মানুষের ভবিষ্যতের দিকে নেমে আসে।
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
মোবাইল: 01556-560126 / 01645-950296
তারিখ: 29/08/202 খিষ্টাব্দ।
আপনার মতামত লিখুন :