মধ্যপ্রাচ্যে মহাপ্রলয়: মার্কিন আধিপত্যের সূর্যাস্ত ও এক রক্তাক্ত নতুন বিশ্বব্যবস্থা


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : মার্চ ২, ২০২৬, ৮:২৩ অপরাহ্ন /
মধ্যপ্রাচ্যে মহাপ্রলয়: মার্কিন আধিপত্যের সূর্যাস্ত ও এক রক্তাক্ত নতুন বিশ্বব্যবস্থা

।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ ।।


বিশ্ব রাজনীতি আজ এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে মানচিত্রের রেখাগুলো বারুদের ধোঁয়ায় ঝাপসা হয়ে গেছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনীর শাহাদাতের মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মাথায় মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যে পাল্টা আঘাত শুরু হয়েছে, তা শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ রণকৌশল হিসেবে ইতিহাসে খোদাই হয়ে থাকবে। খামেনীর মৃত্যুতে যারা ইরানকে নেতৃত্বশূন্য ভেবেছিল, তাদের দম্ভ ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে তেহরানের ‘খাইবার শেকান’ মিসাইল। তেল আবিবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ধ্বংস হওয়া থেকে শুরু করে কুয়েতে তিনটি এফ-১৬ মার্কিন যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়া―সবই জানান দিচ্ছে যে, এই যুদ্ধ কেবল শুরু।

১. নেতানিয়াহুর পরিণতি: অনিশ্চয়তার মেঘে তেল আবিব

২রা মার্চ ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড করপস (IRGC) সরাসরি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় ও বিমান বাহিনীর সদর দপ্তর লক্ষ্য করে নজিরবিহীন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। টাইমস অফ ইসরায়েল ও তাসনিম নিউজের দাবি অনুযায়ী, ‘খাইবার শেকান’ মিসাইলের আঘাতে পুরো ভবনটি গুঁড়িয়ে গেছে। বর্তমানে নেতানিয়াহুর অবস্থা নিয়ে চরম রহস্য দানা বেঁধেছে―তিনি জীবিত না মৃত, তা নিয়ে বিশ্ব গণমাধ্যম এখন দ্বিধাবিভক্ত। এই সফল ‘সারপ্রাইজ অ্যাটাক’ ইসরায়েলের তথাকথিত ‘অভেদ্য’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছে।

২. রণক্ষেত্রে মার্কিন সেনাদের রক্তক্ষরণ:

ইরানি মিসাইল ও শাহেদ ড্রোন কেবল ইসরায়েলেই নয়, বরং সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতেও প্রলয় ঘটিয়েছে। রেডিও তেহরানের তথ্যমতে, এই পাল্টা হামলায় অন্তত ২০০-র বেশি মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। কুয়েতের আকাশে মার্কিন এফ-১৬ (F-16) যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার দৃশ্যটি মার্কিন সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের এক নগ্ন পরাজয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর স্বপ্ন দেখছেন, তখন তার সৈন্যরা মধ্যপ্রাচ্যের বিলাসবহুল হোটেলগুলোতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে।

৩. জ্বালানি সংকট ও বিশ্ব অর্থনীতির পতন:

এই যুদ্ধের আঘাত সরাসরি এসে লেগেছে বিশ্ব অর্থনীতির হৃৎপিণ্ডে। কাতারের ‘রাস লাফান’ শিল্পনগরীতে হামলার পর কাতার এনার্জি তাদের এলএনজি (LNG) উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালী ও বাব আল-মানদেব কার্যত অবরুদ্ধ হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম হুহু করে বাড়ছে। পিনাকী ভট্টাচার্যের বিশ্লেষণে যা স্পষ্ট―ইরান যদি তার কৌশলগত সম্পদ ব্যবহার করে এই নৌপথগুলো পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়, তবে চীন ও ইউরোপের অর্থনীতি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।

৪. নেপথ্যের রাজনীতি ও পশ্চিমের দ্বিচারিতা:

ওয়াশিংটন পোস্টের তথ্যে বেরিয়ে এসেছে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের দ্বিমুখী ভূমিকা। গোপনে ট্রাম্পকে হামলায় প্ররোচিত করলেও এখন ইরানি ড্রোনের মুখে রিয়াদ চরম অসহায়ত্ব প্রকাশ করছে। অন্যদিকে, খামেনীর শাহাদাতের সময় যারা নীরব ছিল, সেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন ইরানের পাল্টা আঘাতে তটস্থ হয়ে তড়িঘড়ি ‘যুদ্ধ থামানোর’ আরজি জানাচ্ছে। কিন্তু ইরানের নতুন নেতা আলী লারিজানি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন―আমেরিকা এই অঞ্চল থেকে পুরোপুরি বিতাড়িত না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে।

৫. ভূ-প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ও দীর্ঘ যুদ্ধের প্রস্তুতি:

ইরান কেবল ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদে শক্তিশালী নয়, তার ভূগোলও এক বিশাল সেনাবাহিনী। জাগ্রোস পর্বতমালা আর পাহাড়ি ভূখণ্ড পেরিয়ে ইরানে স্থল অভিযান (Ground Invasion) চালানো প্রায় অসম্ভব। ইরান তার ‘অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার’ কৌশলে শত্রু পক্ষকে ক্লান্ত ও নিঃস্ব করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। আইআরজিসি কমান্ডারদের মতে, তারা এখনও তাদের মূল অস্ত্র ফাত্তাহ-১ বা ফাত্তাহ-২ ব্যবহারই করেনি। অর্থাৎ, ইরান একটি দীর্ঘস্থায়ী ও ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।

উপসংহার:

২০২৬ সালের এই যুদ্ধ প্রমাণ করেছে যে, ‘জীবিত খামেনীর চেয়ে মৃত খামেনী অনেক বেশি শক্তিশালী’। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু এক আগ্নেয়গিরিকে জাগিয়ে তুলেছেন, যার লাভা এখন পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে গ্রাস করছে। একদিকে নেতানিয়াহুর অনিশ্চিত পরিণতি, অন্যদিকে জ্বালানি সংকটে টালমাটাল বিশ্ব―সব মিলিয়ে এটি আর কেবল আঞ্চলিক সংঘাত নয়, বরং এক নতুন বিশ্বব্যবস্থা তৈরির রক্তক্ষয়ী মহড়া। বিশ্ববাসী এখন রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে আছে―এই মহাপ্রলয় কি শান্তির কোনো নতুন সূর্যোদয় ঘটাবে, নাকি পৃথিবীকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে পরিণত করবে?

লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

তারিখ: 03.03.2026