
রাতের আকাশে মেঘমুক্ত পরিবেশে কখনো কখনো অসংখ্য নক্ষত্রের মাঝখান দিয়ে বিস্তৃত আবছা আলোর একটি পথ দেখা যায়। প্রাচীন মানুষ সেই আলোকপথকে ঘিরে নানা কল্পকাহিনি ও পৌরাণিক আখ্যান নির্মাণ করেছে। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান জানায়, ওই আলোকপথের সঙ্গে আমাদের নিজস্ব ছায়াপথের সম্পর্ক রয়েছে। এর নাম মিল্কিওয়ে। অসংখ্য নক্ষত্র, গ্যাস, ধূলিকণা, অদৃশ্য ভরের প্রভাব এবং নানা মহাজাগতিক কাঠামো নিয়ে গঠিত এই ছায়াপথেই পৃথিবীসহ আমাদের সৌরজগতের অবস্থান।
মিল্কিওয়েকে বুঝতে হলে প্রথমেই একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। আমরা এর বাইরে দাঁড়িয়ে ছায়াপথটিকে দেখি না। বরং এরই ভেতরে বসবাস করে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করি। ফলে মহাকাশ থেকে তোলা কোনো ছবিতে পুরো মিল্কিওয়েকে একসঙ্গে দেখার সুযোগ আমাদের নেই। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন দিক থেকে পাওয়া তথ্য, নক্ষত্রের অবস্থান ও গতি, গ্যাসের বিস্তার, রেডিও তরঙ্গ এবং অন্যান্য বিকিরণ বিশ্লেষণ করে ছায়াপথটির গঠন সম্পর্কে ধারণা তৈরি করেছেন। নতুন পর্যবেক্ষণ ও উন্নত প্রযুক্তির সঙ্গে সঙ্গে সেই ধারণা আরও নির্ভুল হচ্ছে।
মিল্কিওয়ে একটি দণ্ডাকার সর্পিল ছায়াপথ। এর কেন্দ্রে রয়েছে নক্ষত্রের ঘন সমাবেশ এবং একটি দণ্ডসদৃশ কাঠামো। কেন্দ্রের চারপাশে বিস্তৃত সর্পিল বাহুগুলোতে রয়েছে নক্ষত্র, গ্যাস ও ধূলিকণা। ছায়াপথটির দৃশ্যমান চাকতির ব্যাস এক লাখ আলোকবর্ষেরও বেশি। তবে এর সীমানা নির্ধারণের পদ্ধতি অনুসারে মাপের তারতম্য হতে পারে। দৃশ্যমান নক্ষত্রের বাইরেও ছায়াপথের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিপুল বিস্তৃত একটি অদৃশ্য ভরবিন্যাস, যা মহাকর্ষীয় প্রভাবের মাধ্যমে শনাক্ত করা যায়।
এখানে ‘আলোকবর্ষ’ কথাটির অর্থ বোঝা জরুরি। এটি সময়ের একক নয়; দূরত্বের একক। আলো এক বছরে যে দূরত্ব অতিক্রম করে, তাকে এক আলোকবর্ষ বলা হয়। আলো প্রতি সেকেন্ডে প্রায় তিন লাখ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়। ফলে এক আলোকবর্ষ প্রায় ৯.৪৬ ট্রিলিয়ন কিলোমিটারের সমান। মহাবিশ্বের বিপুল দূরত্ব প্রকাশ করতে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এই একক ব্যবহার করেন।
আমাদের সূর্য মিল্কিওয়ের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত নয়। এটি ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে প্রায় ২৬ হাজার আলোকবর্ষ দূরে, একটি সর্পিল বাহুর স্থানীয় অংশে রয়েছে। পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘোরে, আর সূর্য তার গ্রহ-উপগ্রহসহ মিল্কিওয়ের কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করছে। এই একবার প্রদক্ষিণ সম্পন্ন করতে প্রায় ২২ থেকে ২৫ কোটি বছর লাগে। একে কখনো কখনো মহাজাগতিক বছর বলা হয়। পৃথিবীতে যখন ডাইনোসরদের আবির্ভাব ঘটেছিল, তখন আমাদের সৌরজগতের অবস্থান আজকের অবস্থানের তুলনায় ভিন্ন ছিল।
মিল্কিওয়ের কেন্দ্রে রয়েছে Sagittarius A* নামে পরিচিত একটি অতিভারী কৃষ্ণগহ্বর। এর ভর সূর্যের ভরের প্রায় ৪০ লাখ গুণ। কৃষ্ণগহ্বরের মহাকর্ষ এত প্রবল যে নির্দিষ্ট সীমার ভেতর থেকে আলোও বেরিয়ে আসতে পারে না। সেই সীমাকে বলা হয় ঘটনা দিগন্ত। ২০২২ সালে ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপ সহযোগিতা এই কৃষ্ণগহ্বরের প্রথম চিত্র প্রকাশ করে। ছবিতে কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশের উত্তপ্ত পদার্থ থেকে আসা বিকিরণ এবং মাঝখানের অন্ধকার ছায়া দেখা যায়। কৃষ্ণগহ্বরের অভ্যন্তর সরাসরি ছবিতে ধরা পড়েনি।
কৃষ্ণগহ্বরের উপস্থিতি জানার জন্য বিজ্ঞানীরা শুধু ছবি তোলার ওপর নির্ভর করেন না। এর আশপাশের নক্ষত্র কীভাবে চলাচল করে, গ্যাস কীভাবে আচরণ করে এবং বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যে কী ধরনের বিকিরণ পাওয়া যায় এসব তথ্যও বিশ্লেষণ করা হয়। বিশেষ করে কেন্দ্রের কাছাকাছি কিছু নক্ষত্রের কক্ষপথ পর্যবেক্ষণ করে সেখানে বিপুল ভর অতি ক্ষুদ্র অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত থাকার শক্ত প্রমাণ পাওয়া গেছে।
মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণের একটি বিস্ময়কর দিক হলো, দূরের দিকে তাকানো মানে অতীতের দিকে তাকানো। কোনো নক্ষত্র থেকে আলো আমাদের কাছে পৌঁছাতে যদি এক হাজার বছর লাগে, তবে আমরা আজ সেই নক্ষত্রকে যেমন দেখছি, তা এক হাজার বছর আগের অবস্থা। আরও দূরের গ্যালাক্সির আলো আমাদের কাছে পৌঁছাতে কোটি কোটি বছর লাগতে পারে। তাই দূরবীক্ষণ যন্ত্র শুধু মহাকাশের বস্তু দেখায় না; মহাবিশ্বের অতীত সম্পর্কেও তথ্য দেয়।
এই জ্ঞান আমাদের নিজের অবস্থান সম্পর্কে নতুন উপলব্ধি তৈরি করে। পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়; সূর্যও নয়। আমাদের সৌরজগৎ বিশাল মিল্কিওয়ের একটি সাধারণ অঞ্চলে অবস্থিত। আবার মিল্কিওয়েও মহাবিশ্বের একমাত্র ছায়াপথ নয়। পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বে অসংখ্য গ্যালাক্সি রয়েছে। প্রতিটির নিজস্ব গঠন, ইতিহাস ও বিবর্তন আছে।
মানুষের অবস্থান মহাজাগতিক মাপে ক্ষুদ্র এ কথা সত্য। কিন্তু সেই ক্ষুদ্র পৃথিবীতে দাঁড়িয়েই মানুষ দূরবর্তী নক্ষত্রের আলো বিশ্লেষণ করেছে, কৃষ্ণগহ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ সংগ্রহ করেছে এবং নিজের ছায়াপথের গঠন সম্পর্কে ধারণা তৈরি করেছে। এই অর্জন মানুষের শারীরিক আকারের নয়, অনুসন্ধিৎসু বুদ্ধি ও জ্ঞানচর্চার শক্তির পরিচয়।
মিল্কিওয়ে তাই আমাদের কাছে শুধু নক্ষত্রের সমাবেশ নয়। এটি আমাদের মহাজাগতিক ঠিকানা। এই ঠিকানা সম্পর্কে যত জানি, ততই স্পষ্ট হয় আমরা বিশাল এক মহাবিশ্বের ক্ষুদ্র অংশ, অথচ সেই মহাবিশ্বকে বোঝার ক্ষমতা আমাদের চিন্তার এক অসাধারণ অর্জন।
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
মোবাইল: 01556-560126 / 01645-950296
তারিখ: 18/10/2026 খিষ্টাব্দ।
আপনার মতামত লিখুন :