
দীর্ঘ পথের শেষে অবশেষে আমরা এসে দাঁড়ালাম থাঙ্কুয়াইন ঝর্ণার সামনে। যে জলরেখাটিকে কিছুক্ষণ আগে দূর থেকে সাদা আলোর ফিতার মতো মনে হচ্ছিল, কাছে এসে সেটিই যেন রূপ নিল এক অনন্ত জলধ্বনির। প্রায় পঞ্চাশ ফুট উঁচু পাথুরে প্রাচীর বেয়ে অবিরাম নেমে আসছে স্বচ্ছ জল। বর্ষার শেষভাগের উচ্ছ্বসিত প্রবাহে ঝর্ণাটি তখন পূর্ণ যৌবনে। পাহাড়ের বুক থেকে নিরবচ্ছিন্ন পতনের সেই শব্দ চারপাশের সমস্ত নৈঃশব্দ্যকে ভেঙে আবার নৈঃশব্দ্যের মধ্যেই মিশিয়ে দিচ্ছিল।
অনেক ঝর্ণা দেখেছি। কিন্তু প্রতিটি ঝর্ণার নিজস্ব একটি ব্যক্তিত্ব থাকে। থাঙ্কুয়াইনের সৌন্দর্য তার উচ্চতায় নয়, তার স্বাভাবিকতায়। এখানে মানুষের হাতের কোনো স্পর্শ নেই। কংক্রিটের সিঁড়ি নেই, কৃত্রিম রেলিং নেই, পর্যটকের কোলাহলও নেই। আছে কেবল পাহাড়, পাথর, জল আর অরণ্যের নিবিড় ছায়া।
মুহূর্তের জন্য আমরা সবাই নিশ্চুপ হয়ে গেলাম। যেন প্রত্যেকে নিজের ভেতরে ফিরে গেছি। ঝর্ণার সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের অহংকার বড় ক্ষুদ্র হয়ে যায়। তখন মনে হয়, প্রকৃতি হাজার বছর ধরে তার নিজের ভাষায় যে প্রার্থনা উচ্চারণ করে চলেছে, মানুষ কেবল তার ক্ষুদ্র এক শ্রোতা।
আমাদের দলের কয়েকজন প্রথমেই ঝর্ণার নিচে গিয়ে দাঁড়ালেন। কেউ দু’হাত মেলে জলের আঘাত গ্রহণ করছেন, কেউ চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছেন, কেউ আবার শিশুর মতো আনন্দে জল ছিটিয়ে দিচ্ছেন অন্যের গায়ে। পাহাড়ি ঝর্ণার পানির শীতলতা যেন শরীরের পাশাপাশি মনকেও ধুয়ে দেয়।
আমিও নেমে গেলাম পানিতে। স্বচ্ছ জলের তলায় নুড়িপাথরগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কোথাও সবুজ শ্যাওলার আস্তরণ, কোথাও ধবধবে সাদা পাথর। ঝর্ণার পতনের নিচে দাঁড়াতেই মনে হলো, অজস্র ক্ষুদ্র জলবিন্দু একসঙ্গে এসে শরীরকে আঘাত করছে। সেই আঘাত ব্যথা দেয় না; বরং দীর্ঘ পথচলার সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে নিয়ে যায়।
একসময় পুরো দলই আনন্দে মেতে উঠল। ছবি তোলা, ভিডিও ধারণ, হাসি, জলকেলি সব মিলিয়ে পাহাড়ের নিস্তব্ধতায় যেন এক নির্মল উৎসবের জন্ম হলো। আমার মনে অনায়াসেই ভেসে উঠল সত্যজিৎ রায়ের ‘হীরক রাজার দেশে’ চলচ্চিত্রের সেই চিরসবুজ গান
“আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে…” গানটি যেন সেদিন পাহাড়ের বাতাসেই ভেসে বেড়াচ্ছিল।
আমাদের দলে প্রবীণ সাংবাদিক ফরিদুল আলম দেওয়ান এবং ইকবাল বাহার চৌধুরীকেও তখন সমান উচ্ছ্বসিত দেখাচ্ছিল। বয়সের হিসাব যেন পাহাড় মুছে দিয়েছে। প্রকৃতির কাছে মানুষ শেষ পর্যন্ত কেবল একজন পথিক এখানে বয়সের নয়, বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতারই মূল্য সবচেয়ে বেশি।
ঝর্ণার সৌন্দর্য উপভোগ করে কিছুটা সময় কাটানোর পর আমরা পাশের পাহাড়ি পথ ধরে এগিয়ে গেলাম ‘রাইতু বিডি কটেজ’-এর দিকে।
থাঙ্কুয়াইন ঝর্ণা থেকে খুব বেশি দূরে নয়, তৈনখালের তীরঘেঁষে গড়ে উঠেছে এই ছোট্ট পাহাড়ি কটেজ। চারদিকে বাঁশঝাড়, ফলজ গাছ আর পাহাড়ি সবুজে ঘেরা শান্ত পরিবেশ। অরণ্যের গভীরে এমন একটি পরিচ্ছন্ন বিশ্রামস্থল সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। দীর্ঘ পথ হাঁটার পর তখন আমাদের সবারই প্রবল ক্ষুধা লেগেছে।
কটেজের দায়িত্বে থাকা কাজল তঞ্চঙ্গ্যা আন্তরিক হাসিমুখে আমাদের স্বাগত জানালেন। পাহাড়ি মানুষের আতিথেয়তায় যে আন্তরিকতার ছাপ থাকে, তা তাঁর আচরণে স্পষ্ট ফুটে উঠছিল।
অল্প সময়ের মধ্যেই দুপুরের খাবার পরিবেশন করা হলো। খাবারের আয়োজন ছিল একেবারেই ঘরোয়া। ধোঁয়া ওঠা সাদা ভাত, দেশি মুরগির ঝোল, ঝাল মরিচ ভর্তা, ডাল এবং সিমের ভাজি।
জনপ্রতি মাত্র ৩০০ টাকায় এমন সুস্বাদু ও পরিপাটি খাবার পাব আমরা কেউই তা কল্পনা করিনি। দেশি মুরগির ঝোলে পাহাড়ি মসলার মৃদু সুবাস, মরিচ ভর্তার ঝাঁঝ, ডালের সরল স্বাদ আর সিম ভাজার মচমচে ঘ্রাণ সব মিলিয়ে খাবারটি ছিল অসাধারণ। বিলাসী আয়োজন নয়, আন্তরিক রান্নাই যে একজন ভ্রমণকারীর মনে দীর্ঘদিন জায়গা করে নেয়, সেদিন আবারও তার প্রমাণ পেলাম।
খাবারের পর কাজল তঞ্চঙ্গ্যার সঙ্গে গল্প করতে গিয়ে আরেকটি তথ্য জেনে বিস্মিত হলাম।
অরণ্যের এমন দুর্গম অঞ্চলেও তাঁরা স্টারলিঙ্ক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করছেন।
প্রকৃতির এত গভীরে দাঁড়িয়ে উচ্চগতির ইন্টারনেট ব্যবহার করার অভিজ্ঞতা সত্যিই অভিনব। আমাদের অনেকেই সেখান থেকেই পরিবার-পরিজনের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করলেন। প্রযুক্তি আর প্রকৃতি দুটি ভিন্ন জগত এখানে এসে যেন এক বিন্দুতে মিলিত হয়েছে।
কাজল তঞ্চঙ্গ্যা জানালেন, যারা থাঙ্কুয়াইন দেখে আশপাশের আরও দুর্গম ঝর্ণাগুলো ঘুরে দেখতে চান, তাঁদের জন্য রাত্রিযাপনের ব্যবস্থাও রয়েছে। এখান থেকেই অনেক পর্যটক পরদিন ক্রাতং, লাদমেরাগ, পালংখিয়াং, চাইম্প্রা কিংবা তামাংঝিরি ঝর্ণার উদ্দেশে যাত্রা করেন।
২০১৯ সালে প্রকাশিত আমার ‘দামতুয়া : বান্দরবান ভ্রমণ গাইড’ গ্রন্থে এই অঞ্চলের কয়েকটি ঝর্ণার সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরেছিলাম। কিন্তু প্রতিবার এই অঞ্চলে এলে নতুন করে উপলব্ধি করি আলীকদমের পাহাড়, ঝিরি আর ঝর্ণার গল্প কখনো একটি বইয়ে শেষ হওয়ার নয়। প্রতিটি জলধারার রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস, নিজস্ব ভূগোল, নিজস্ব নন্দন।
বিকেলের আলো ধীরে ধীরে কোমল হয়ে আসছিল। ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে নিতে আরেকবার তাকালাম থাঙ্কুয়াইন ঝর্ণার দিকে। জল তখনও ঝরে পড়ছে। একই ছন্দে। একই নিরবচ্ছিন্নতায়। হয়তো শত বছর আগেও এভাবেই ঝরছিল। শত বছর পরও ঝরবে। মানুষ আসবে, মানুষ চলে যাবে; কিন্তু পাহাড় তার প্রার্থনা থামাবে না।
ফেরার পথে মনে হচ্ছিল, একটি ভ্রমণের প্রকৃত সার্থকতা কেবল কোনো গন্তব্যে পৌঁছানো নয়। প্রকৃত ভ্রমণ তখনই সম্পূর্ণ হয়, যখন মানুষ ফিরে আসে কিছুটা বদলে গিয়ে। থাঙ্কুয়াইন আমাকে সেই পরিবর্তনের অনুভূতি দিয়েছে। শিখিয়েছে প্রকৃতিকে জয় করা যায় না; তাকে কেবল ভালোবাসা যায়, শ্রদ্ধা করা যায়।
তাই যারা এই পথে আসবেন, তাঁদের প্রতি একটি বিনীত অনুরোধ তৈনখাল, থাঙ্কুয়াইন কিংবা আলীকদমের কোনো পাহাড়কে শুধু দর্শনীয় স্থান হিসেবে দেখবেন না। এগুলো আমাদের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য। প্লাস্টিক, বোতল, চিপসের প্যাকেট কিংবা অন্য কোনো অপচনশীল বর্জ্য ফেলে এই সৌন্দর্যকে নষ্ট করবেন না।
আমরা অতিথি। পাহাড়ই এখানে চিরস্থায়ী বাসিন্দা। আর পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলা তৈনখালের জলধ্বনি আজও যেন কানে ভেসে আসে নীরবে, অবিরাম, অনন্তের দিকে।
(ষষ্ঠ পর্ব: পাহাড়ের নীরব আতিথ্যে এক দুপুর)
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
আপনার মতামত লিখুন :