যা চলে যায়, তাকে যেতে দাও


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : অগাস্ট ২৫, ২০২৬, ৮:৫৩ অপরাহ্ন /
যা চলে যায়, তাকে যেতে দাও

মমতাজ উদ্দিন আহমদ


মানুষের জীবনে কিছু ঘটনা আসে ঝড়ের মতো। কেউ অপমান করে, কেউ কষ্ট দিয়ে চলে যায়। কেউ বা আবার আমাদের সম্পর্কে এমন কথা বলে যা হৃদয়ের গভীরে কাঁটার মতো বিঁধে থাকে। সময় ও স্রোত যেমন থেমে থাকে না। তেমনি ঘটনাবলীও সময়ের স্রোত ধরে শেষ হয়ে যায়। একসময়ের প্রিয় মানুষটি দূরে সরে যায়। কথাগুলো বাতাসে মিলিয়ে যায়। অথচ তাদের প্রতিধ্বনি আমাদের মনের ভিতর দীর্ঘকাল ঘুরে বেড়ায়। আমরা শুয়ে শুয়ে ভাবি, বসে বসে ভাবি, একা থাকলে ভাবি, ভিড়ের মধ্যেও ভাবি। কে কী বলল, কেন বলল, তার জবাব কী হওয়া উচিত ছিল। এই অন্তহীন প্রতিক্রিয়ার নামই যেন আমাদের ব্যক্তিগত মানসিক নাট্যমঞ্চ।

কিন্তু জীবনের গভীরতম সত্য কখনো কখনো অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত একটি বাক্যে এসে ধরা দেয়। তা হচ্ছে: ‘যা চলে গেছে, তাকে যেতে দাও’। এই কথাটি লাওজু বা লাও-ৎসের। তিনি ছিলেন প্রাচীন চীনের এক প্রভাবশালী দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক চিন্তাবিদ। তাওবাদ-এর প্রধান প্রবর্তক তিনি। তিনি খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে চীনে বসবাস করতেন। লাওজুর গ্রন্থ ‘দাও দে জিং’ এর মূল শিক্ষা হলো: জগতের স্বাভাবিক নিয়ম বা ‘দাও’-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জীবনযাপন করা। মানুষ যখন অহংকার, আকাঙ্ক্ষা, জবরদস্তি ও অপ্রয়োজনীয় সংঘাত থেকে মুক্ত হয়, তখন সে প্রকৃত শান্তি ও প্রজ্ঞার সন্ধান পেতে পারে। নদী যেমন নিজের গতিতে সাগরের দিকে যায়, বৃক্ষ যেমন নীরবে শিকড় বিস্তার করে ও আলো গ্রহণ করে, তেমনি মানুষকেও অযথা কোলাহল, প্রতিযোগিতা ও প্রতিশোধে শক্তি নষ্ট না করে স্বাভাবিক কর্তব্যে মনোনিবেশ করতে বলা হয়েছে।

‘যা চলে গেছে, তাকে যেতে দাও’ এই আহ্বান আমার কাছে মনে হয় পরাজয়ের কথা নয়। এটি একই সাথে আত্মমুক্তির কথা। এর অর্থ অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া নয়। অপমানকে সত্য বলে মেনে নেওয়াও নয়। কিংবা নিজের অধিকার বিসর্জন দেওয়াও নয়। এর অর্থ হলো: অন্যের আচরণকে নিজের অন্তরের স্থায়ী অধিবাসী হতে না দেওয়া।

পার্বত্য জনপদ আলীকদমে আমার এই ক্ষণিকের জীবনে অনেকই কিছুই করেছি। সেটা বোধ হয় অন্ধ সমালোচকরাও স্বীকার করে নিবেন। প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়তে সম্মুখ সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছি। এসব প্রতিষ্ঠান গড়েছি বিনিময়ের প্রত্যাশা ছাড়াই। কিন্তু একসময় এসে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তা ছেড়ে দিয়েছি। আমার কাছে আজ মনে হয় এই ছেড়ে দেওয়া মানে নিজেকে উদ্ধার করেছি। যদিও তাতে দুর্জন-দুর্মুখরা পরিতৃপ্ত হয়েছেন।

আমরা প্রায়ই মনে করি, প্রতিশোধ না নিলে আমরা দুর্বল। তর্কে না জিতলে আমরা পরাজিত। অপমানের উত্তর সঙ্গে সঙ্গে না দিলে আমাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়। অথচ প্রতিটি আঘাতের উত্তর দিতে গিয়ে আমরা ধীরে ধীরে নিজের জীবন থেকে শক্তি ধার করে অন্যের হাতে তুলে দিই। যে মানুষটি এক মুহূর্তের জন্য আমাদের কষ্ট দিয়েছিল, তাকে আমরা নিজের চিন্তার ঘরে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস বসিয়ে রাখি। সে তখন আর বাইরের মানুষ থাকে না। সে আমাদের স্নায়ু, ঘুম, মনোযোগ ও শান্তির ওপর অধিকার বিস্তার করে। অথচ সে আবর্জনাই ছিলো।

“ছেড়ে দাও” তাই বিস্মৃতির আদেশ নয়। এটি অধিকার পুনরুদ্ধারের মন্ত্রও বটে। যে অপমান আমাকে ভেঙে দিতে চেয়েছিল, তার অর্থ নির্ধারণের ক্ষমতা আমি আর অপমানকারীর হাতে রাখব না। যে দুঃখ আমাকে থামাতে চেয়েছিল, তাকে আমি আমার যাত্রার শেষ কথা হতে দেব না। আমি তার উপস্থিতি স্বীকার করব। তার শিক্ষা গ্রহণ করব। কিন্তু তাকে আমার ভবিষ্যতের কর্তা করব না।

আমার কাছে তাই লাওজুর চিন্তার সাথে মিল রেখেই মনে হয় মানুষের কর্মই চিন্তার কোলাহলের বিপরীতে এক নীরব সত্য। তাই নিন্দুকের পেছনে সময় ব্যয় না করে নিজ কর্মই করে যাওয়া শ্রেয় থেকে শ্রেয়তর। মানুষের জীবনে চিন্তা অপরিহার্য। কিন্তু অতিচিন্তা প্রায়ই বাস্তবতার বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়। আমরা সম্ভাব্য বিপদের শংকা আর কাল্পনিক অপমানে জর্জরিত হই। অনাগত ব্যর্থতা ও অতীতের ক্ষত নিয়ে এমন এক জগৎ নির্মাণ করি, যার সঙ্গে বাস্তব জীবনের সম্পর্ক অতি সামান্য। মনের পর্দায় দৃশ্য বদলাতে থাকে। কখনো আমরা হাসি, কখনো কাঁদি, কখনো ক্রুদ্ধ হই। কখনো বা নিজের কাছেই নিজের বিচারসভা বসাই। অথচ বাইরে জীবন তার নিজস্ব নিয়মে এগিয়ে চলে।

দিনশেষে বাস্তবতা জানতে চায় তুমি কী করছ? তুমি কি তোমার শ্রমে ফিরে গেছ? তুমি কি নিজের দায়িত্ব পালন করছ? তুমি কি ক্ষতকে সৃষ্টিশীল শক্তিতে রূপান্তরিত করছ? তুমি কি আজকের দিনটিকে গতকালের অপমানের কাছে বন্ধক রেখেছ, নাকি নিজের হাতে আগামী দিনের বীজ বুনছ?

লাওজুর দর্শন আমাকে শিখিয়েছে প্রকৃতির স্বাভাবিক সত্যকে বুঝতে। তার কাছে শিখেছি অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ছেড়ে দিতে। লাওজু আমাকে অহংকারের কোলাহল পেরিয়ে শান্ত ও সচেতন কর্মের পথে ফিরে যেতে শিখিয়েছে। তাই আমি এখন পূর্ণতার প্রান্তে এক তৃপ্তময় কোলাহালে মেতে আছি। আমার দীর্ঘদিনের সঞ্চিত লেখাগুলোকে গ্রন্থে রূপ দিতে গিয়ে আস্তে আস্তে আমার পাণ্ডুলিপির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সতোরোতে। লাওজুর দর্শন আমার উচিলা হলেও মূল কৃতজ্ঞতা আমার আল্লাহর কাছেই। তার রহমতের চাদর আমাকে ছায়া দিয়েছে।

লাওজুর দর্শনে কর্ম শুধু জীবিকা অর্জনের উপায় নয়। কর্ম হলো অস্তিত্বের প্রত্যক্ষ স্বাক্ষর। মানুষ কী ভাবল, কে কী বলল, সমাজ তাকে কী নামে ডাকল এসবের চেয়ে অধিক সত্য তার প্রতিদিনের কাজ। কথার জগৎ অসংখ্য সম্ভাবনা তৈরি করে। কিন্তু কর্মই জীবনের মাটিতে তার বাস্তব রূপ নির্মাণ করে।

লাওজুর দর্শনে সরলতা, নম্রতা, সংযম, অহিংসা, প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং অন্তরের নীরবতা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি মনে করতেন, জ্ঞানী ব্যক্তি সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করতে চান না। বরং বাস্তবতাকে বুঝে তার সঙ্গে সামঞ্জস্য স্থাপন করেন। অন্যের অপমান বা আচরণে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে নিজের সত্য ও কর্মপথে ফিরে আসাও এই দর্শনেরই একটি প্রয়োগ। বাড়ির উঠুনে থাকা বৃক্ষটি জানে না কে তার পাশে বসে কী বলছে। সে কারও প্রশংসায় পাতা মেলায় না। কারও নিন্দায় শিকড় গুটিয়ে নেয় না। সন্ধ্যা হলে সে মাটির গভীর থেকে জল টেনে নেয়। প্রভাতে সূর্যের আলো গ্রহণ করে। নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য নিঃশব্দে খাদ্য প্রস্তুত করে। তার জীবন কোনো ঘোষণায় নয়, ধারাবাহিক কর্মেই প্রতিষ্ঠিত।

বৃক্ষ আমাদের শেখায়, অস্তিত্বের সবচেয়ে গভীর কাজগুলো প্রায়ই নিঃশব্দে সম্পন্ন হয়। শিকড়ের বিস্তার দৃশ্যমান নয়। তবু তার ওপরই বৃক্ষের সমগ্র উচ্চতা নির্ভর করে। তেমনি মানুষের চরিত্র, জ্ঞান, দক্ষতা ও সাফল্যের ভিতরকার নির্মাণও বহুদিন অদৃশ্য থাকে। মানুষ তখনও কথা বলে। সমালোচনা করে, সন্দেহ করে। আর সাধক তার কাজ করে যায়। একদিন তার ফল, ছায়া ও উচ্চতা নিজেই তার হয়ে কথা বলে। আমার জন্মস্থানে আমার হাতের ছোঁয়া লাগা অনেক প্রতিষ্ঠান আছে। সেখানে আমি নাই। অথচ নীরবে প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের কল্যাণে কাজ করছে। এটাই ছোট্ট এই জীবনের অন্যতম প্রাপ্যতা।

ভাগ্যকে আমরা প্রায়ই একটি অদৃশ্য, অপরিবর্তনীয় শক্তি বলে মনে করি। কিন্তু মানুষের কর্ম ভাগ্যের সঙ্গে তার সম্পর্ককে বদলে দিতে পারে। কর্ম কখনো রাতারাতি অলৌকিক পরিবর্তন ঘটায় না। বরং ছোট ছোট সিদ্ধান্ত, নিয়মিত শ্রম, সংযম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। যে ব্যক্তি নিজের শক্তিকে পরনিন্দা, ক্রোধ ও প্রতিশোধে অপচয় না করে শিক্ষায়, সৃষ্টিতে ও কর্তব্যে নিয়োজিত করে, তার ভবিষ্যৎ স্বাভাবিকভাবেই অন্য রূপ নিতে শুরু করে।

এখানে কর্মের শক্তি কোনো অন্ধ নিশ্চয়তা নয়। কর্ম করলেই সব ইচ্ছা পূর্ণ হবে এমন প্রতিশ্রুতি জীবন দেয় না। কিন্তু কর্ম মানুষকে অন্তত নিজের জীবনের সক্রিয় অংশীদার করে তোলে। নিষ্ক্রিয় অভিযোগ মানুষকে ভাগ্যের দাসে পরিণত করে। সচেতন কর্ম তাকে ভাগ্য নির্মাণের সহযাত্রী করে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় কর্মমুখর মানুষকে নিষ্ক্রিয় মানুষগুলোই বেশী কষ্ট দিয়ে থাকে। যাদের জীবনে কোনো অর্জন নেই তারা অন্যের অর্জনকে খাটো করে থাকে।

একজন সচেতন মানুষকে জীবনে ভেবে-চিন্তে পা ফেলতে হয়। ক্ষণিকের এই জীবনে ‘কী ছেড়ে দেব, আর কী ধরে রাখব’ তা নিয়ে চিন্তা করতে হয়।

ছেড়ে দিতে হবে অন্যের কণ্ঠে নিজের মূল্য নির্ধারণের অভ্যাস। অতীতের অপমানকে বর্তমানের পরিচয় বানানোর প্রবণতাও ছেড়ে দিতে হবে। প্রতিটি ঘটনার ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে নিজের শান্তি নষ্ট করা বোকামী। প্রতিশোধকে ন্যায়বোধের একমাত্র ভাষা মনে করাও ঠিক নয়। ছেড়ে দিতে হবে সেইসব প্রশ্ন, যাদের কোনো উত্তর আমাদের হাতে নেই কিন্তু যারা আমাদের সমস্ত শক্তি শুষে নেয়।

তবে ধরে রাখতে হবে বিবেক, আত্মমর্যাদা, ন্যায়বোধ, প্রয়োজনীয় সীমারেখা এবং সৎ কর্ম। তাই “লেট ইট গো” কখনোই অন্যায়ের সামনে আত্মসমর্পণ নয়। কোনো ক্ষতি যদি প্রতিরোধ করা দরকার হয়, তা প্রতিহত করতে হবে; কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা প্রয়োজন হলে, তা বলতে হবে। কিন্তু প্রতিরোধের পরেও অন্তরে বিষ জমিয়ে রাখা জরুরি নয়। কাজ শেষ হলে ক্রোধকে বিদায় দিতে হয়। নইলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানুষ নিজেই অন্যায়ের ছায়ায় বন্দি হয়ে যায়।

জীবন আমাদের সব প্রশ্নের উত্তর দেবে না। সবাই আমাদের বুঝবে না। সবাই ন্যায়পরায়ণ হবে না, সবাই আমাদের প্রাপ্য সম্মানও দেবে না। কিন্তু নিজের অন্তরের দরজা কার জন্য কতক্ষণ খোলা থাকবে, সে সিদ্ধান্ত আমাদের। অন্যের আচরণ আমাদের হাতে নেই। নিজের প্রতিক্রিয়া, নিজের শ্রম, নিজের নৈতিক অবস্থান এবং নিজের পথ এসব আমাদের হাতে।

তাই যখন পৃথিবীর কোলাহল অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখন বৃক্ষের দিকে তাকানো যেতে পারে। সে কোনো বিতর্কে জয়ী হতে চায় না। সে শুধু আলো গ্রহণ করে, জল টানে, শিকড় বিস্তার করে, ঋতুর সঙ্গে বদলে যায় এবং ধীরে ধীরে আকাশের দিকে উঠে যায়। মানুষেরও হয়তো সেই শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। সব শব্দের উত্তর শব্দে নয়, কিছু উত্তর দিতে হয় জীবনের পরিণতিতে।

শেষ পর্যন্ত আমাদের আশ্রয় অন্যের প্রশংসা নয়, নিজের কর্ম। অন্যের কণ্ঠ ক্ষণস্থায়ী; কর্মের ফল অধিক স্থায়ী। দুঃখ আসবে, অপমান আসবে, বিচ্ছেদ আসবে। তবু তাদের প্রত্যেককে হৃদয়ের সিংহাসনে বসিয়ে রাখা যাবে না। কিছু জিনিসকে প্রণাম করে বিদায় দিতে হয়। তারপর ফিরে আসতে হয় নিজের কাজে, নিজের সত্যে, নিজের নীরব নির্মাণে।

যা চলে গেছে, তাকে যেতে দাও। যে শক্তি অবশিষ্ট আছে, তাকে কর্মে নিবেদন করো। কারণ জীবন শেষ পর্যন্ত তোমার দুঃখের কাহিনি নয় তোমার প্রতিদিনের কর্মেরই দৃশ্যমান রূপ।


লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

মোবাইল: 01556-560126 / 01645-950296

তারিখ: 26/8/26/2026 খিষ্টাব্দ।