(প্রথম পর্ব : পাহাড়ের আহ্বান) “তৈনখাল ভ্রমণ ও থাঙ্কুয়াইন ঝর্ণা দর্শন”


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : অগাস্ট ২, ২০২৬, ৩:২৯ অপরাহ্ন /
(প্রথম পর্ব : পাহাড়ের আহ্বান) “তৈনখাল ভ্রমণ ও থাঙ্কুয়াইন ঝর্ণা দর্শন”

মমতাজ উদ্দিন আহমদ


শ্রাবণের দিন। অথচ আকাশে বর্ষার সেই চিরচেনা গাঢ় মেঘের আনাগোনা নেই। প্রকৃতি যেন নির্মল নীলের আবরণে নিজেকে মেলে দিয়েছে। বহুদিন ধরেই মন অস্থির হয়ে উঠছিল। কিছুদিন চাঁড়ালদের চণ্ডালীপনা উপভোগ করতে করতে মনটা বিষিয়ে উঠেছিল। তাই আমাকে পাহাড় ডাকছিল। অরণ্যের গোপন সঙ্গীত কানে বাজছিল। কোথাও যেন অবিরাম ঝরে পড়া কোনো অদেখা জলধ্বনি আমাকে আহ্বান জানাচ্ছিল। সেই আহ্বানের নাম- থাঙ্কুয়াইন ঝর্ণা

অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলাম। এবার যাওয়া হবে। পাহাড়ের অন্তরালে, তৈনখালের উজানে, অরণ্যের গভীর নিভৃতিতে প্রতিনিয়ত রোনাজারি করা সেই ঝর্ণার কাছে।

এই ভ্রমণে আমার সঙ্গী হলেন সাগরকন্যা মহেশখালীর একদল প্রাণপ্রিয় সাংবাদিক। জনপ্রিয় অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক সংবাদ প্ল্যাটফর্ম ‘বন্দর নিউজ’–এর সুপ্রিয় সম্পাদক হোবাইব মোঃ সজিব বেশ ক’দিন ধরে আমার সাথে যোগাযোগ করে আসছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্যে ছিলো তাঁর সম্পাদিত বন্দর নিউজের প্রতিনিধি সভাটি আলীকদমে করবেন। আমি সায় দিলাম। এ উপলক্ষে তাঁরা গত ১ আগস্ট এসেছিলেন আলীকদমে। কর্মসূচির আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতেই তাঁদের একটাই ইচ্ছা-পাহাড়কে কাছ থেকে দেখা। আলীকদম তাঁদের কাছে শুধু একটি উপজেলা নয়; পাহাড়, নদী, অরণ্য আর মেঘের মিলিত এক বিস্ময়ভূমি।

২ আগস্টের সকাল। আমরা রওনা হলাম তৈনখালের উজানের পথে।

আমাদের যাত্রার সূচনা আমতলী লংঘাট থেকে। বাহন একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা। আমার সঙ্গে মহেশখালীর বারোজন সাংবাদিক। নৌকার দড়ি খুলে দেওয়া মাত্রই মাতামুহুরীর সন্তান তৈনখাল আমাদের সামনে তার দীর্ঘ জলপথ খুলে দিল।

নৌকাটি ধীরে ধীরে স্রোতের বিপরীতে এগোতে লাগল। ইঞ্জিনের কর্কশ গর্জন চারপাশের সবুজ নৈঃশব্দ্যকে বারবার বিদীর্ণ করছিল। মনে হচ্ছিল, অরণ্যের গভীর ধ্যান ভেঙে দিয়ে আমরা যেন এক অনাহূত আগন্তুকের মতো প্রবেশ করছি তার অন্তঃপুরে। সেই শব্দের ভেতর হারিয়ে যাচ্ছিল পাহাড়ি পাখিদের সকালের কূজন। অথচ বোঝা যাচ্ছিল, গাছের অগণিত শাখা-প্রশাখার আড়ালে তাদের এক ব্যস্ত সংসার জেগে আছে।

যতই উজানের দিকে এগোচ্ছিলাম, ততই বদলে যাচ্ছিল তৈনখালের স্বরূপ। বর্ষার জল তখনও খালের শরীরে পূর্ণ যৌবনের আবেগ জাগিয়ে রেখেছে। কোথাও দশ-বারো ফুট গভীর জল, আবার কয়েক হাত দূরেই অতল গহ্বর। কোথাও স্রোত ঘূর্ণি তুলে নিজেকেই যেন চ্যালেঞ্জ করছে, কোথাও বা বিশাল পাথরে আছড়ে পড়ে ফেনার শুভ্র মুকুট পরে উন্মত্ত হয়ে উঠছে। পাহাড়ি জলধারার এই চঞ্চলতা কখনো ভয় জাগায়, আবার পরক্ষণেই বিস্ময়ে অভিভূত করে।

আমাদের নৌকার আপাত গন্তব্য রাইতুমনি পাড়ার কেয়াংঘাট। সাধারণ ভ্রমণকারীদের কাছে এখানেই পথের সমাপ্তি। কেউ আসেন কেয়াং দেখতে, কেউ দোছরী বাজার পর্যন্ত ঘুরে ফিরে যান। কিন্তু আমাদের যাত্রা অন্যরকম। আমাদের লক্ষ্য পাহাড়ের আরও গভীরে, যেখানে মানুষের পদচিহ্ন ক্রমশ বিরল হয়ে আসে, আর অরণ্যের ভাষাই হয়ে ওঠে একমাত্র ভাষা।

সেখানে, পাহাড়ের বুক চিরে, অগণিত বর্ষার জলরেখাকে আপন বুকে ধারণ করে অনন্তকাল ধরে ঝরে চলেছে থাঙ্কুয়াইন ঝর্ণা।

কিন্তু সেই ঝর্ণা পর্যন্ত নৌকা পৌঁছায় না। তৈনখালের উজানের প্রচণ্ড স্রোত, নিচে ছড়িয়ে থাকা বিশাল বোল্ডার আর খালের আকস্মিক গভীরতা নৌযাত্রাকে সেখানে অসম্ভব করে তোলে। কেয়াংঘাট পর্যন্তই জলপথের সীমা। তারপর শুরু হয় মানুষের নিজের শক্তি, সাহস আর অভিযাত্রিক মননের পরীক্ষা।

আমাদেরও সেই পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হতে হবে।

কিন্তু তার আগে পরিচয় হোক এই জলপথের সঙ্গে-যে জলপথ শুধু একটি পাহাড়ি খাল নয়, আলীকদমের ইতিহাস, তঞ্চঙ্গ্যা ও চাকমা জনগোষ্ঠীর স্মৃতি, ব্রিটিশ অভিযাত্রীর বিস্ময় এবং মাতামুহুরীর প্রাচীন ভূদৃশ্যের এক জীবন্ত দলিল।

পরবর্তী অংশে আমরা প্রবেশ করব তৈনখালের ইতিহাস, নামকরণ, ক্যাপ্টেন টি. এইচ. লেউইনের চোখে তৈনখাল এবং এই জলধারার নান্দনিক ভূগোলের জগতে-যেখানে ইতিহাস ও প্রকৃতি একে অপরের হাত ধরে এগিয়ে চলে।


লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

মোবাইল: 01556-560126 / 01645-950296

ইমেইল: momtaj.news@gmail.com

তারিখ: ০২/০৮/2026 খিষ্টাব্দ।