পাহাড়ের নীরব আতিথ্যে এক দুপুর


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : অগাস্ট ১৪, ২০২৬, ৪:৪৫ অপরাহ্ন /
পাহাড়ের নীরব আতিথ্যে এক দুপুর

তৈনখালের উজানে থাঙ্কুয়াইনের খোঁজে ষষ্ঠ পর্ব


মমতাজ উদ্দিন আহমদ


থাঙ্কুয়াইন ঝর্ণার স্বচ্ছ জলে দীর্ঘক্ষণ ভিজে থাকার পর শরীরের ক্লান্তি যেন কোথায় মিলিয়ে গিয়েছিল। ঝর্ণার জল কেবল শরীরকে শীতল করেনি, মনকেও এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে দিয়েছিল। তবু পাহাড়ি পথের দীর্ঘ হাঁটা, স্রোতের সঙ্গে লড়াই আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা অভিযানের পর ক্ষুধা তখন জানান দিচ্ছিল নিজের অস্তিত্ব।

ঝর্ণা থেকে অল্প হাঁটার পথ। তৈনখালের ডান তীর ঘেঁষে সবুজে ঢাকা একটি ছোট্ট টিলার ওপর চোখে পড়ল কাঠ ও বাঁশের তৈরি একটি পরিচ্ছন্ন কটেজ। নাম রাইতু বিডি কটেজ। চারপাশে বুনো ফুল, কলাগাছ, বাঁশঝাড় আর পাহাড়ি বৃক্ষের নীরব সমারোহ। দূরে অবিরাম শোনা যাচ্ছে থাঙ্কুয়াইন ঝর্ণার জলধ্বনি। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি যেন এখানেই কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার জন্য আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে।

কটেজের দায়িত্বে ছিলেন কাজল তঞ্চঙ্গ্যা। আন্তরিক হাসিমুখে তিনি আমাদের স্বাগত জানালেন। পাহাড়ি মানুষের আতিথেয়তার যে সহজ সৌন্দর্য, তার কোনো কৃত্রিমতা নেই। তাদের অভ্যর্থনায় আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে আন্তরিকতাই বেশি। প্রথম দেখাতেই কাজল তঞ্চঙ্গ্যার ব্যবহারে সেই আন্তরিকতার পরিচয় পেলাম।

আগের পর্বগুলি পড়তে ক্লিক করুন:

আমরা ভেজা কাপড় রোদে মেলে দিয়ে কটেজের বারান্দায় বসে পড়লাম। পাহাড়ি বাতাস ধীরে ধীরে শরীর শুকিয়ে দিচ্ছিল। দূরে তৈনখালের স্রোত, ওপরে নীল আকাশ, চারদিকে সবুজ অরণ্য। এমন দুপুরে শহরের কোনো বিলাসবহুল রেস্তোরাঁর কথা মনেও আসে না।

কিছুক্ষণ পর পরিবেশন করা হলো দুপুরের খাবার।

খাবারের আয়োজন ছিল অত্যন্ত সাধারণ, কিন্তু তার মধ্যেই ছিল এক অনন্য পরিতৃপ্তি। ধোঁয়া ওঠা সাদা ভাতের সঙ্গে দেশি মুরগির ঝোল, ঝাল মরিচ ভর্তা, ডাল এবং সিমের ভাজি। পাহাড়ি মসলার মৃদু সুবাসে রান্নাগুলোর স্বাদ ছিল ঘরোয়া অথচ স্মরণীয়। দীর্ঘ ভ্রমণের পর এমন খাবার যেন শুধু ক্ষুধাই মেটায় না, ক্লান্ত মনকেও তৃপ্ত করে।

সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, জনপ্রতি মাত্র ৩০০ টাকায় এই সুস্বাদু মধ্যাহ্নভোজের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পর্যটনকেন্দ্রগুলোর অতিরিক্ত মূল্য আর কৃত্রিম আয়োজনের সঙ্গে এর কোনো তুলনা চলে না। এখানে মূল্য নয়, আন্তরিকতাই ছিল আসল সম্পদ।

আমাদের দলের প্রত্যেকেই খাবারের প্রশংসা করলেন। বিশেষ করে দেশি মুরগির ঝোল আর মরিচ ভর্তার স্বাদ অনেকের মুখে মুখে ফিরছিল। পাহাড়ি রান্নার সহজ সরলতা যে কতটা হৃদয়গ্রাহী হতে পারে, সেদিন আবারও তা অনুভব করলাম।

খাবার শেষে কাজল তঞ্চঙ্গ্যার সঙ্গে গল্প জমে উঠল। জানতে পারলাম, মাত্র কয়েক মাস আগে এই কটেজটি পর্যটকদের জন্য চালু করা হয়েছে। থাঙ্কুয়াইন, ক্রাতং, লাদমেরাগ কিংবা পালংখিয়াং ঝর্ণা দেখতে আসা ভ্রমণকারীদের জন্য এটি ইতোমধ্যেই একটি নির্ভরযোগ্য আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে।

গল্পের মাঝখানেই তিনি আরেকটি বিস্ময়কর তথ্য জানালেন।

অরণ্যের এমন দুর্গম অঞ্চলেও তাঁরা স্টারলিঙ্ক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন।

প্রথমে বিশ্বাসই হচ্ছিল না। পাহাড়, অরণ্য আর ঝর্ণার এত গভীরে বসে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের সঙ্গে মুহূর্তেই সংযুক্ত হওয়া যায় এ যেন প্রযুক্তির এক নতুন অধ্যায়। আমাদের কয়েকজন সাংবাদিক বন্ধু সঙ্গে সঙ্গেই মোবাইল ফোন বের করে ফেসবুকে সরাসরি সম্প্রচার শুরু করলেন। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বললেন কেউ কেউ।

প্রকৃতি আর প্রযুক্তির এই সহাবস্থান আমাকে ভাবিয়ে তুলেছিল। একসময় এই অঞ্চলে পৌঁছাতেই দিনের পর দিন লেগে যেত। আর আজ সেই একই পাহাড়ে বসে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে যোগাযোগ করা সম্ভব। সময় সত্যিই বদলেছে।

কাজল তঞ্চঙ্গ্যা জানালেন, যারা আরও গভীর অভিযানে যেতে চান, তাঁদের জন্য এখানেই রাতযাপনের ব্যবস্থা রয়েছে। পরদিন খুব ভোরে স্থানীয় গাইড নিয়ে রওনা দিলে ক্রাতং, লাদমেরাগ, পালংখিয়াং, চাইম্প্রা কিংবা তামাংঝিরির মতো দুর্গম ঝর্ণাগুলো ঘুরে দেখা যায়। প্রতিটি ঝর্ণারই আলাদা সৌন্দর্য, আলাদা বৈশিষ্ট্য।

কথাগুলো শুনতে শুনতে আমার মনে পড়ল ২০১৯ সালে প্রকাশিত আমার ‘দামতুয়া : বান্দরবান ভ্রমণ গাইড’ গ্রন্থের কথা। সেই বইয়ে এই অঞ্চলের কয়েকটি ঝর্ণার সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরেছিলাম। কিন্তু বছরের পর বছর আলীকদমের পাহাড়ে ঘুরে আমার উপলব্ধি হয়েছে এই জনপদের প্রতিটি ঝর্ণা, প্রতিটি ঝিরি, প্রতিটি পাহাড় আলাদা একটি গ্রন্থের বিষয় হতে পারে।

হয়তো সেই কারণেই আবারও মনে হলো, আলীকদমকে নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ সাহিত্যিক ভ্রমণগ্রন্থ লেখা প্রয়োজন। এমন একটি গ্রন্থ, যেখানে শুধু পথনির্দেশ থাকবে না; থাকবে পাহাড়ের ইতিহাস, মানুষের জীবন, লোককথা, প্রকৃতির নন্দন আর ভ্রমণকারীর অন্তর্জগতেরও বিবরণ।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমে আসছিল। পাহাড়ের আলো ধীরে ধীরে কোমল হয়ে উঠছিল। কটেজের বারান্দা থেকে শেষবারের মতো চোখ মেলে তাকালাম চারপাশে। দূরে থাঙ্কুয়াইনের অবিরাম জলধ্বনি, সামনে তৈনখালের স্রোত, চারদিকে নীরব অরণ্য। মনে হলো, পাহাড়কে শুধু তার ঝর্ণা দিয়ে চেনা যায় না।

পাহাড়কে জানতে হলে তার মানুষের কাছে বসতে হয়। তাদের রান্না খেতে হয়। তাদের গল্প শুনতে হয়। তাদের হাসির ভেতর দিয়ে এই জনপদের আত্মাকে স্পর্শ করতে হয়। সেদিন রাইতু বিডি কটেজে কাটানো সেই নিরাভরণ দুপুর আমাকে নতুন করে শিখিয়েছিল ভ্রমণের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কোনো দর্শনীয় স্থান নয়; মানুষের আন্তরিকতা। ঝর্ণার সৌন্দর্য চোখে ধরা পড়ে, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা হৃদয়ে থেকে যায়।

বিকেলের আলো তখন ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আমরাও ধীরে ধীরে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলাম।

(সমাপনী পর্ব : ফেরার পথে তৈনখালের জলধ্বনি)


লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।