
ইতিহাসের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আমরা আবার ফিরে এলাম বর্তমানের জলযাত্রায়। তৈনখালের বুক চিরে আমাদের নৌকা তখনও স্রোতের বিপরীতে এগিয়ে চলছে। ইঞ্জিনের গম্ভীর শব্দ যেন পাহাড়ের নীরবতার সঙ্গে এক অদ্ভুত সংলাপ রচনা করছে। চারদিকে এত সবুজ, এত জল, এত আলো-ছায়ার মায়া মনে হচ্ছিল, আমরা যেন ধীরে ধীরে মানুষের পৃথিবী থেকে প্রকৃতির একান্ত গোপন অঙ্গনে প্রবেশ করছি।
নৌকার পেছনে ফেলে আসা প্রতিটি বাঁক যেন একটি করে নতুন দৃশ্যের জন্ম দিচ্ছিল। কোথাও খাল এত সরু যে দুই পাশের পাহাড় যেন একে অপরের দিকে ঝুঁকে এসেছে; কোথাও আবার একটু প্রশস্ত হয়ে জলের বুক খুলে দিয়েছে। দূর থেকে অনেক সময় মনে হচ্ছিল, সামনে পাহাড় এসে পথ আটকে দিয়েছে। কিন্তু কাছে যেতেই দেখা যাচ্ছে, পাহাড়ের গা ঘেঁষে খালটি নিঃশব্দে আরেকটি বাঁক নিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেছে। প্রকৃতি যেন ইচ্ছা করেই তার সব সৌন্দর্য একবারে প্রকাশ করে না; পথিককে ধীরে ধীরে নিজের গভীরে নিয়ে যায়।
বর্ষার রেশ তখনও পুরোপুরি কাটেনি। তৈনখালের জল ছিল স্বচ্ছ, গভীর এবং প্রাণময়। কোথাও পানির রং গাঢ় সবুজ, কোথাও নীলাভ, কোথাও ঘোলাটে, কোথাও বা সূর্যের আলোয় রূপালি। বড় বড় পাথরের গায়ে ধাক্কা খেয়ে স্রোত সাদা ফেনা তুলছিল। আবার কোথাও স্থির জলের ওপর পাহাড়ের ছায়া এমন নিখুঁতভাবে প্রতিফলিত হচ্ছিল যে, মনে হচ্ছিল আকাশ আর পাহাড় যেন জলের মধ্যেই আরেকটি পৃথিবী গড়ে তুলেছে।
আমি মনে মনে ভাবছিলাম, তৈনখালের আসল সৌন্দর্য কেবল তার গন্তব্যে নয়; বরং এই দীর্ঘ জলপথেই। প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি ঢেউ, প্রতিটি পাথর যেন ভ্রমণকারীর ধৈর্যের পরীক্ষা নেয়। যে ধৈর্য ধরে এগিয়ে যেতে পারে, প্রকৃতি কেবল তাকেই তার অন্তরঙ্গ রূপ দেখায়।
এই যাত্রায় সবচেয়ে বেশি আনন্দ পাচ্ছিলেন মহেশখালীর সাংবাদিক বন্ধুরা। সমুদ্রের বিস্তীর্ণ জলরাশি তাঁদের কাছে পরিচিত, কিন্তু পাহাড়ি খালের এই নিবিড় সৌন্দর্য ছিল একেবারেই নতুন। কেউ ক্যামেরা হাতে একের পর এক ছবি তুলছেন, কেউ মোবাইলে ভিডিও ধারণ করছেন, আবার কেউ নীরবে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁদের বিস্মিত চোখ দেখে মনে হচ্ছিল, পাহাড়ও যেন নতুন অতিথিদের আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাচ্ছে।
প্রকৃতি কেবল গাছ আর পাহাড়ের সমষ্টি নয়; তার প্রাণ লুকিয়ে থাকে পাখির ডানায়, বাতাসের শব্দে, জলের স্রোতে। কিছুদূর এগোতেই খালের তীরে দেখা মিলল এক জোড়া নদী টিটি। পাহাড়ি ঝিরি ও খালের ধারে বিচরণকারী এই দুর্লভ পাখিটি আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (IUCN)-এর লাল তালিকায় স্থান পেয়েছে। তাদের ক্ষিপ্র চলাফেরা, জলের ধারে থেমে থেমে খাদ্য খোঁজা আর হঠাৎ ডানা মেলে উড়ে যাওয়া সবকিছুই চোখে লেগে থাকার মতো। ভ্রমণের শুরুতেই এমন একটি বিরল পাখির দেখা পাওয়া আমাদের সবার জন্যই ছিল বাড়তি আনন্দের।
আরও কিছুদূর এগোতেই একটি উজ্জ্বল নীল-সবুজ মাছরাঙা বিদ্যুতের মতো নৌকার পাশ দিয়ে উড়ে গেল। একটু সামনে গিয়ে দেখি, দুটি মাছরাঙা একটি শুকনো ডালের ওপর নিশ্চুপ বসে আছে। তাদের চোখ নিবদ্ধ খালের স্বচ্ছ জলের দিকে। মুহূর্তের মধ্যেই একটির তীক্ষ্ণ ঝাঁপ আর তারপর ঠোঁটে ছোট্ট একটি মাছ। প্রকৃতির এই নিখুঁত শিকারদৃশ্য আমাদের সবাইকে মুগ্ধ করে দিল।
খালের তীরে মাঝেমধ্যে দেখা যাচ্ছিল ছোট ছোট পাহাড়ি চারণভূমি। সেখানে নিশ্চিন্তে ঘাস খাচ্ছে গরু আর ছাগলের পাল। দূরে কোথাও ধোঁয়া উঠছে; বোঝা গেল কাছেই কোনো পাহাড়ি পাড়া। মানুষের উপস্থিতি এখানে প্রকৃতির প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং সহাবস্থানের এক শান্ত উদাহরণ।
যতই উজানে উঠছিলাম, পাহাড় ততই উঁচু হয়ে উঠছিল। গর্জন, চাপালিশ, তেলসুর, বেতঝাড়, বাঁশঝাড় আর অজস্র লতাগুল্মে পাহাড়ের ঢাল ঘন হয়ে উঠেছে। সূর্যের আলো পাতার ঘন জালের ভেতর দিয়ে ভেঙে ভেঙে নেমে আসছিল। কোথাও আলো, কোথাও ছায়া মনে হচ্ছিল প্রকৃতি যেন নিজের হাতে এক অনন্ত জলরঙের ছবি এঁকে চলেছে।
একসময় আমার মনে পড়ল ক্যাপ্টেন টি. এইচ. লেউইনের সেই বিখ্যাত বর্ণনার কথা। প্রায় দেড়শ বছর আগে তিনিও এই জলপথে বিস্মিত হয়েছিলেন। সময় বদলেছে, মানুষের পদচারণা বেড়েছে, অনেক পাথর হারিয়ে গেছে; কিন্তু পাহাড়ের আত্মা এখনও অমলিন। সেই উপলব্ধি আমার ভ্রমণকে আরও গভীর করে তুলল।
ঘড়ির কাঁটা তখন প্রায় সকাল এগারোটা ছুঁইছুঁই। সামনে দেখা দিল দোছরী বাজার। পাহাড়ঘেরা ছোট্ট এই বাজারটি বহু বছর ধরে উজানের মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। আমাদের নৌকাও ধীরে ধীরে ঘাটে ভিড়ল।
নৌকা থেকে নেমে প্রথমেই চোখে পড়ল বাজারের নিস্তব্ধতা। একসময় এই দোছরী বাজার ছিল বেশ প্রাণচঞ্চল। আশপাশের পাহাড়ি পাড়ার মানুষ তাঁদের কৃষিপণ্য, ফলমূল, বাঁশ, বেত, কাঠ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে এখানে আসতেন। কিন্তু কয়েক বছর আগে ভয়াবহ বন্যা এবং অগ্নিকাণ্ড বাজারটির প্রায় সমস্ত অস্তিত্ব মুছে দেয়। পরে নতুন করে কয়েকটি দোকান নির্মিত হলেও আগের সেই কোলাহল আর ফিরে আসেনি। এখন হাতে গোনা তেরো-চৌদ্দটি দোকান নিয়ে বাজারটি টিকে আছে।
বাজারে দায়িত্বরত সেনাবাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছিলেন। নিয়ম অনুযায়ী আমরা সবাই জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি তাঁদের কাছে জমা দিলাম। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর আন্তরিকভাবেই তাঁরা আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিলেন।
দীর্ঘ নৌযাত্রার পর স্থানীয় একটি দোকান থেকে পাহাড়ে উৎপাদিত দেশীয় কলা কিনে সবাই খানিকটা বিশ্রাম নিলাম। সেই কলার স্বাদেও যেন পাহাড়ি মাটির আলাদা এক মাধুর্য ছিল।
কিন্তু বিশ্রামের সময় বেশি নয়।
কারণ সামনে অপেক্ষা করছে আরও দুর্গম পথ।
দোছরী থেকে রাইতুমনি পাড়া কেয়াংঘাট, তারপর শেষ হবে নৌযাত্রা। শুরু হবে হাঁটা স্রোতের বিরুদ্ধে, পাথরের ওপর দিয়ে, বুকসমান পানি ডিঙিয়ে, থাঙ্কুয়াইন ঝর্ণার দিকে।
নৌকার ইঞ্জিন আবার চালু হলো।
আমরাও প্রস্তুত হলাম অভিযানের সবচেয়ে কঠিন এবং সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায়ের জন্য।
(চতুর্থ পর্ব : স্রোতের সঙ্গে মানুষের লড়াই)
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
তারিখ: ০৪/০৮/২০২৬ খিষ্টাব্দ।
আপনার মতামত লিখুন :