
‘সুখ’ মানুষের প্রাচীনতম অনুসন্ধান। সভ্যতার শুরু থেকেই মানবমন এই এক শব্দকে ঘিরে রচনা করেছে দর্শন, ধর্ম, সাহিত্য ও নৈতিকতার অসংখ্য পথরেখা। সমাজ–সভ্যতা বদলেছে। জ্ঞান বদলেছে। প্রযুক্তিও বদলেছে। কিন্তু মানুষ কোথায় শান্তি খুঁজে পাবে এই প্রশ্ন একই থেকেছে। সুখ কোনো একটি জাতি, ভূগোল বা ধর্মের একক ধারণা নয়। বরং এটি মানবজীবনের আন্তঃনির্ভরশীল, বহুস্তরীয় ও বহুপর্যায়ের অভিজ্ঞতা।
বিংশ শতকের দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল তাঁর সুবিখ্যাত রচনা ‘দ্য কনকোয়েস্ট অফ হ্যাপিনেস’–এ সুখকে স্পষ্টত মানবিক, যুক্তিভিত্তিক এবং কার্যকরী এক নীতিমালায় ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন।
রাসেল এই রচনা সুখ সম্পর্কে মানুষের গভীরতম প্রশ্নগুলোর এক আন্তঃসভ্যতাগত সংলাপ। আজকের বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে অর্থনৈতিক দোলাচল, রাজনৈতিক দমন, ব্যক্তিগত মনস্তাপ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নিঃসঙ্গতার ভিড়ে সুখের প্রশ্ন আবারও জরুরি হয়ে উঠেছে। তাই সুখের ধারণাকে প্রাচ্য–প্রতীচ্য দর্শন, দার্শনিক ঐতিহ্য, ধর্মীয় সূত্রের আলোয় এই নিবন্ধে পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে।
রাসেল সুখকে দেখেছিলেন মানবসত্তার স্বাভাবিক অবস্থা হিসেবে। তাঁর মতে সফল অভিযোজন, সৃজনশীলতা, সুস্থ সম্পর্ক, নিরাপত্তা ও অর্থপূর্ণ ব্যস্ততার সম্মিলনেই সুখ জন্ম নেয়। বিষণ্নতা, হীনমন্যতা, প্রতিযোগিতার বিষ, অযৌক্তিক ভয়, আর কৃত্রিম সামাজিক সংকোচ এসব সুখকে ধ্বংস করে।
রাসেল মনে করেন, সুখকে অর্জন করতে হলে মানুষকে “মনের ভিতরকার অন্ধকার থেকে মুক্ত” হতে হবে। আহমদ ছফা তাঁর অনুবাদে এই যুক্তিকে বাংলা মননের জন্য আরও সুস্পষ্ট করেছেন। সুখ শুধুমাত্র মানুষের অনুভূতিই নয়, এটি একটি নৈতিক সিদ্ধান্তও বটে।
কনফুসিয়াস সুখকে দেখেছেন মূলত নীতি, শৃঙ্খলা ও সামাজিক সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে। তাঁর মতে, মানুষের ব্যক্তিগত সুখ কখনোই সমাজের সামঞ্জস্য থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। সুখ আসে দায়িত্ব পালন থেকে, মানুষের প্রতি মমতা থেকে ও সামাজিক ভারসাম্য রক্ষার মাধ্যমে। কনফুসিয়াস বলেছিলেন: “যা তুমি নিজে পেতে চাও না, তা অন্যের প্রতি প্রয়োগ করো না।” এই নীতি সুখের নৈতিক কাঠামো গড়ে দেয়।
অপরদিকে, তাওবাদের প্রতিষ্ঠাতা লাওস সুখকে দেখেছেন সম্পূর্ণ বিপরীত অভিজ্ঞতায়–প্রকৃতির স্বভাবধর্ম অনুসরণে। মানুষের অতি-আকাঙ্ক্ষা, নাম-যশের মোহ, অস্থিরতা–সবই তাকে সুখ থেকে দূরে সরায়। লাওস বলেছেন, “যার কিছু চাইবার নেই, তার কাছে পৃথিবীর সবকিছুই রয়েছে।” তাই তার সুখ–দর্শন মূলত সরলতা, সংযম, অন্তর্গত শান্তি ও প্রকৃতির সঙ্গে মিতালি।
কনফুসিয়াস ও লাওস দুই মেরুর প্রাচ্য চিন্তাবিদ। কিন্তু সুখের ক্ষেত্রে দুজনেই আত্মিক ভারসাম্য ও নৈতিকতার ওপর জোর দেন।
পৃথিবীতে বহু ধর্ম আছে। এরমধ্যে অন্যতম প্রধান ধর্ম ইসলামে সুখ (সাকিনা) হলো হৃদয়ে অবতীর্ণ প্রশান্তি। ইসলামিক ও কুরআনিক পরিভাষায় এর অর্থ হৃদয় বা মনে আল্লাহর পক্ষ থেকে নেমে আসা পরম শান্তি ও গভীর আশ্বাস। যা মানুষকে ভয়, উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত করে স্থিরতা দান করে। আল-কুরআন বলে, “আল্লাহর স্মরণেই হৃদয় শান্ত হয়।” সুখ তাই নৈতিক জীবন, ন্যায়–ইবাদত, পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব, কৃতজ্ঞতায় পূর্ণ মন। ইসলাম সুখকে পার্থিব–আধ্যাত্মিক দুই স্তরে স্থাপন করেছে।
খ্রিস্টধর্মে সুখ মানে ব্লেসডনেস (পরম আনন্দ)। যিশুর “সারমন অন দ্য মাউন্ট”–এ বলা হয়েছে মৃদুভাষী, করুণাময়, ন্যায়পরায়ণ, দরিদ্রের বন্ধু–এই সকল মানুষই সুখী। অর্থাৎ সুখ হলো প্রেম, ক্ষমা, ন্যায়, আত্মোৎসর্গ ও যিশুর অনুকরণ।
বৌদ্ধ মত মতে, সুখের মূলতত্ত্ব হচ্ছে দুঃখের নির্মূল। চারটি আর্যসত্য বলে, তৃষ্ণা ও আসক্তিই দুঃখের মূল। তাই সুখ মানে লোভ-ঘৃণা-মোহ থেকে মুক্তি, ধ্যান, মধ্যম পথ ও অন্তর্মুক্তির অনুশীলন। গৌতম বুদ্ধ সরলভাবে বলেছেন, “সুখ হলো শান্ত মনের আরেক নাম।”
প্রাচীন ভারতীয় দর্শনে সুখ মানে আনন্দ। যা আত্মার প্রকৃত লক্ষণ। উপনিষদে বলা হয়– “আনন্দাদে্ব খল্বিমানি ভূতানি জাযন্তে।”
অর্থাৎ আনন্দ থেকেই সৃষ্টির উৎপত্তি। ভগবদ্গীতায় সুখকে দুটি ভাগে দেখানো হয়েছে। আত্মিক সুখ, যা স্থির, স্থায়ী ও সত্যের উপলব্ধিতে জন্ম নেয়; জাগতিক সুখ, যা ক্ষণস্থায়ী। কৃষ্ণ এখানে সুখকে কর্ম ও জ্ঞান–দুই ধারায় ব্যাখ্যা করেছেন।
বাংলা সাহিত্য সুখ সম্পর্কে দিয়েছে সবচেয়ে মানসিক, মানবিক ও পরিশীলিত ব্যাখ্যা। লালন শাহ বলেন, “সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিলাম আনমনে”। সুখ তাঁর কাছে আত্মজিজ্ঞাসা, অহং–বর্জন ও মানুষের ভিতরের মানুষ চেনার শিক্ষা।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সুখকে দেখেছেন আত্মার স্বাধীনতা ও মানবিকতার বিকাশ হিসেবে। তাঁর মতে– “মানুষের সুখ মানুষের মধ্যেই।”⁽⁷⁾
নজরুল ইসলামের সুখ হলো মুক্তি। অন্যায়, দাসত্ব ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি। তাঁর লেখা প্রমাণ করে, ন্যায় প্রতিষ্ঠাই সত্যিকারের সুখ।
জীবনানন্দ দাশ সুখকে নীরব প্রকৃতির সান্নিধ্যে দেখেছেন। শামসুর রাহমান দেখেছেন নাগরিক স্বাধীনতার স্বপ্নে। আল মাহমুদ দেখেছেন কৃষিজীবনের প্রেমময় মাটিতে। আর হুমায়ূন আহমেদ দেখেছেন সাধারণ মানুষের ক্ষুদ্র অথচ নির্মল আনন্দে।
বাংলা সাহিত্য তাই সুখকে দিয়েছে নৈতিকতা, মানবতা, প্রেম, আত্মজিজ্ঞাসা, প্রকৃতিপ্রেম, সামাজিক ন্যায়, এক বিস্তৃত ও বহুস্তরীয় মানসগঠন।
মানুষ সুখ চায়। এটি তার অস্তিত্বের মৌলিক সত্য। কিন্তু সুখের পথে মানুষের যাত্রা কেবল ব্যক্তিগত নয়। এটি সাংস্কৃতিক, সামাজিক, নৈতিক ও আত্মিক এক দীর্ঘ অন্বেষণ।
রাসেল তাঁর যুক্তিবাদী জ্ঞান দিয়ে যে সুখ–কাঠামো নির্মাণ করেছেন। কনফুসিয়াস দায়িত্বশীলতা দিয়ে তাকে নৈতিকতা দিয়েছেন। লাওস দিয়েছেন প্রকৃতির লয়ে মিশে থাকার শান্তি। ধর্মসমূহ দিয়েছে আধ্যাত্মিক দিশা। আর বাংলা সাহিত্য দিয়েছে মানবিকতার হৃদয়স্পর্শী রূপ।
সুতরাং সুখের আদর্শ কোনো একক পথে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানবতার সম্মিলিত যাত্রা, অভিজ্ঞতার সমন্বয়, এবং জীবনের গভীরতর অর্থ খুঁজে পাওয়ার স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা।
আজ যখন বিশ্ব অস্থির, তখন সুখের প্রশ্ন আমাদের নতুন করে ভাবায়– মানুষের স্বাধীনতা, সম্মান, নিরাপত্তা ও মানবিক সম্পর্ক যত বেশি প্রসারিত হবে– সুখ তত বেশি সহজলভ্য হবে।
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
মোবাইল: 01556-560126 / 01645-950296
তারিখ: 30/08/202 খিষ্টাব্দ।
আপনার মতামত লিখুন :