
।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ ।।
মানুষ পৃথিবী থেকে চলে যায়; কিন্তু তার পদচিহ্ন মুছে যায় না। কোনো কোনো মানুষ চলে যাওয়ার পরও তাঁদের কণ্ঠস্বর স্মৃতির ভাঁজে ভাঁজে প্রতিধ্বনিত হয়। কোনো পুরোনো পথের ধুলোর মধ্যে তাঁদের পায়ের ছাপ থেকে যায়। কোনো পত্রিকার হলুদ হয়ে যাওয়া পাতায় তাঁদের স্বপ্ন জেগে থাকে। পার্বত্য উপজেলা আলীকদমের প্রয়াত সাংবাদিক, কবি ও সমাজকর্মী উচ্চতমনি তঞ্চঙ্গ্যা তেমনই এক মানুষ। যাঁকে স্মরণ করা মানে লামা-আলীকদমের সাংবাদিকতা, লেখালেখি ও সামাজিক জাগরণের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে ফিরে দেখা।
পাহাড়ের একটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হচ্ছে ‘তঞ্চঙ্গ্যা’। উচ্চতমনি তঞ্চঙ্গ্যা ছিলেন এ জাতির একজন বুদ্ধিদীপ্ত প্রজন্ম। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই তিনি আমাদের ছেড়ে চিরবিদায় নিয়েছেন। একজন মানুষের জীবন শ্বাস-প্রশ্বাসের সময়কাল দিয়ে শেষ হলেও তাঁর কাজ, চিন্তা, বন্ধুত্ব, উৎসাহ ও মানুষের জন্য রেখে যাওয়া দায়বোধের মধ্য দিয়ে তিনি বেঁচে থাকেন। উচ্চতমনি তঞ্চঙ্গ্যা সেই অর্থে আমাদের স্মৃতিতে, আমাদের পেশাগত ইতিহাসে এবং আলীকদমের সাংবাদিকতার প্রারম্ভিক অধ্যায়ে আজও জীবন্ত।
সত্তর-আশির দশকে পার্বত্য আলীকদম উপজেলার সমাজ-সংস্কৃতি ও শিক্ষার পরিবেশ ছিলো বেশ প্রতিকুল। তাই এই পরিবশে উচ্চতমনির শৈশব ও শিক্ষাজীবন ছিল সংগ্রামের। কিন্তু সেই সংগ্রামের ভেতরেই ছিল স্বপ্নের দীপ্তি। আশির দশকে আলীকদম থেকে লামায় এসে পড়াশোনা করা তাঁর সময়ের বাস্তবতায় সহজ কোনো ব্যাপার ছিল না। দুর্গম পাহাড়ি পথ, নদী, বন ও দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করে তাঁকে লামায় আসতে হতো। অনেক সময় পায়ে হেঁটে এসে কোনো বাড়িতে লজিং থেকে তিনি পড়াশোনা করতেন।
তাঁর বাবা ভারত মোহন তঞ্চঙ্গ্যা ছিলেন একজন পাড়া কার্বারী (সর্দার)। তিনি ছিলেন তৎকালীন আলীকদমে একজন স্বশিক্ষিত মানুষ। সন্তানের শিক্ষার প্রতি ছিলেন গভীরভাবে নিবেদিত। সুদূর আলীকদম থেকে পাহাড়-নদী পেরিয়ে প্রায় ২০ মাইল পথ পায়ে হেঁটে তিনি লামায় ছেলেকে দেখতে যেতেন। একজন পিতার এই নিঃশব্দ ত্যাগ উচ্চতমনির শিক্ষাজীবনের পেছনে এক অনুলিখিত মহাকাব্য। আজকের সুযোগ-সুবিধায় বেড়ে ওঠা প্রজন্মের কাছে হয়তো সেই পথচলা অবিশ্বাস্য মনে হবে। কিন্তু সেই সময়ের বহু স্বপ্ন সেই পায়ে হাঁটা পথের ধুলো মেখেই বড় হয়েছিল।
উচ্চতমনি মাধ্যমিক শিক্ষা অর্জন করেছেন লামা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। ১৯৮২ সালে এই বিদ্যালয় থেকে তিনি প্রথম এসএসসি ব্যাচের শিক্ষার্থী হিসেবে এসএসসি পাস করেন। পরে চকরিয়া সরকারি কলেজে ভর্তি হয়ে ১৯৮৪ সালে এইচএসসি পাস ও বান্দরবান কলেজ থেকে ১৯৮৬ সালে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
পাহাড়ের একটি প্রত্যন্ত জনদপ থেকে জেলা সদরে গিয়ে তার শিক্ষাজীবন কেবল পরীক্ষার ফলাফল, সনদ বা শ্রেণিকক্ষের স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। সেই সময়ে তিনি লেখালেখি ও সংবাদ লেখার চর্চা শুরু করেন। তার লেখায় উঠে এসেছিল পাহাড়ের মানুষের জীবন, শিক্ষা, উন্নয়ন, দুঃখ, সম্ভাবনা ও স্বপ্নের কথাও দেশের মানুষের কথা।
১৯৯৮ সালে আলীকদম প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপটকে ঘিরে তার সাথে আমার পরিচয়। তিনি আমার বয়সে সিনিয়র ছিলেন। আমার ১৪ বছর আগেই তিনি এসএসসি পাস করেন। আলীকদম প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠার প্রথমলগ্নে আমাদের উঠাবসা, লেখালেখির চর্চা আজকের প্রজন্মের কাছে হয়তো গল্পের মতো শোনাবে। কিন্তু আমাদের কাছে সেটি ছিল বাস্তব জীবনের এক দীর্ঘ যাত্রা। পাহাড়ি পথ, নদী, বন, অনিশ্চয়তা ও ক্লান্তি পেরিয়ে কত পথ হেঁটেছি তার সাথে।
আজ উচ্চতমনি নেই। কিন্তু সেই পথের প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি পাহাড়, প্রতিটি নদী যেন তাঁর স্মৃতি বহন করে। কখনো মনে হয়, উচ্চতমনি বসে আসেন আমার পাশে, আলীকদম প্রেসক্লাবের টেবিলে। হয়তো তিনি দাঁড়িয়ে আছেন হাসিমুখে, হাতে কোনো কাগজ, চোখে নতুন লেখার আলো।
কিছু স্মৃতি সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয় না। বরং সময় যত পেরোয়, তারা তত গভীরে গিয়ে বসে। উচ্চতমনির সঙ্গে আমার সম্পর্ক কিংবা যোগাযোগটাও তেমনই। যার শুরু প্রেসক্লাবের টেবিলে, বিস্তার কোনো সংবাদ লেখাকে ঘিরে আর পূর্ণতা পেয়েছে পেশাগত সহযাত্রায়।
উচ্চতমনি কবিতা লিখতেন। নানা বিষয়ে লিখতেন। কিন্তু তাঁর লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল নিজের মানুষ ও নিজের জনপদের প্রতি দায়বদ্ধতা। তিনি দূরের কোনো বিমূর্ত পৃথিবী নিয়ে শুধু কল্পনা করতেন না; তিনি লিখতেন আলীকদমের মানুষ, পাহাড়ের জীবন, সমাজের সমস্যা, শিক্ষার প্রয়োজন, উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা এবং প্রান্তিক মানুষের অনুচ্চারিত কথাগুলো নিয়ে।
তাঁর লেখার আগ্রহ আমাকে নিয়মিত লেখালেখিতে উৎসাহিত করেছিল। একজন অগ্রজের কলম কখনো কখনো তার সতীর্থের ভেতরের নীরব লেখককে জাগিয়ে তোলে। উচ্চতমনি আমার জন্য সেই জাগরণের অন্যতম মানুষ ছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন দুর্গম জনপদে থেকেও কলমের দিগন্ত বিস্তৃত হতে পারে। রাজধানীর বাইরে থেকেও জাতীয় পরিসরে কথা বলা যায়।
জানা যায়, উচ্চতমনির সাংবাদিকতা জীবনের শুরুর দিকে রাঙামাটির বিশিষ্ট সাংবাদিক এ কে এম মকছুদ আহমেদ অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিলেন। তিনি দৈনিক গিরিদর্পণ ও সাপ্তাহিক বনভূমি-এর সম্পাদক ছিলেন। একইভাবে দৈনিক দেশ বাংলা-এর সম্পাদক ফেরদৌস আহমদ কোরাইশীও তার লেখালেখিতে উৎসাহ ও সহযোগিতা করেছেন। তাঁদের স্নেহ ও দিকনির্দেশনায় পাহাড়ি জনপদ থেকে উঠে আসা একজন পাহাড়ি তরুণের জন্য ছিল এক ধরনের আলোকবর্তিকা।
সেই সময়ে দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে জাতীয় পর্যায়ের পত্রিকায় লেখা পাঠানো আজকের মতো সহজ ছিল না। যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল, তথ্য সংগ্রহের সুযোগ সীমিত, সংবাদ পাঠানোর উপায় অনিশ্চিত। এর সঙ্গে ছিল নানা ধরনের ভয়, চাপ ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা। তবু উচ্চতমনি কলম থামাননি।
উচ্চতমনি লিখেছেন মানুষের কথা। লিখেছেন পাহাড়ের কথা, শিক্ষা, সমাজ, উন্নয়ন ও মানুষের জীবনযাত্রার কথা। হয়তো তার লেখা বড় শিরোনাম তৈরি করেনি, কিন্তু তা ছিল সময়ের কাছে রাখা এক ধরনের সাক্ষ্য। আশির দশকের সেই কলম প্রমাণ করেছি এই পাহাড়েও মানুষ আছে, তাদেরও স্বপ্ন আছে, তাদের কথাও শোনা দরকার।
১৯৯৮ থেকে শেষ দিন পর্যন্ত পেশাগত সহযাত্রা:
পূর্বেই বলেছি উচ্চতমনি ও আমার সম্পর্কের একটি বিশেষ অধ্যায় শুরু হয় ১৯৯৮ সাল থেকে। সেই সময় থেকে তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমার পেশাগত পথচলা তাঁর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। আমরা একই জনপদের সাংবাদিকতা, লেখালেখি ও সামাজিক বাস্তবতার সহযাত্রী ছিলাম।
১৯৯৮ সালের পর থেকে পেশাগত জীবনের নানা বাঁকে উচ্চতমনির সঙ্গে আমার যোগাযোগ, আলোচনা ও সহযোগিতা অব্যাহত ছিল। সংবাদ সংগ্রহ, স্থানীয় সমস্যার গুরুত্ব বোঝা, মানুষের বক্তব্যকে যথাযথভাবে তুলে ধরা, পাহাড়ি সমাজের বহুমাত্রিক বাস্তবতা নিয়ে চিন্তা করা এসব ক্ষেত্রে তাঁর সঙ্গে কথোপকথন আমার কাছে ছিল অত্যন্ত মূল্যবান।
আমরা দুজনেই জানতাম, স্থানীয় সাংবাদিকতায় থাকে একটি জনপদের স্মৃতি সংরক্ষণের কাজ। একটি রাস্তা না থাকার খবর, একটি বিদ্যালয়ের সংকট, একটি নদীভাঙনের বেদনা, একজন কৃষকের দুর্দশা, কোনো গ্রামের মানুষের উন্নয়নের দাবি এসবই ভবিষ্যতের ইতিহাসের উপাদান।
উচ্চতমনি সংবাদকে মানুষের জীবন থেকে আলাদা করে দেখতেন না। তাঁর কাছে সাংবাদিকতা ছিল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক নৈতিক দায়িত্ব। তাই তাঁর সঙ্গে পেশাগত পথচলা ছিল শুধু সহকর্মিতার সম্পর্ক নয়; ছিল এক ধরনের নৈতিক সহযাত্রা।
লামা-আলীকদম প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা স্বপ্ন:
উচ্চতমনি তঞ্চঙ্গ্যা ছিলেন আলীকদম প্রেস ক্লাবের একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। আমিও সেই প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। এই যৌথ ভূমিকা আমাদের পথচলায় একটি প্রাতিষ্ঠানিক মাত্রা দিয়েছিল। সেই সময় লামা ও আলীকদমে সাংবাদিকতার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আজকের মতো বিস্তৃত ছিল না। সংবাদকর্মীদের নিয়মিত মিলনস্থল, মতবিনিময়ের জায়গা, পেশাগত সহযোগিতার কাঠামো সবকিছুই ছিল সীমিত। সেই বাস্তবতায় আলীকদম প্রেস ক্লাব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ ছিল সময়ের তুলনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আলীকদম প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠার যাত্রায় আমাদের আরও দুইজন মহারথি হচ্ছে সাংবাদিক মো. কামরুজ্জামান ও মুহাম্মদ আবু শামা। মূলত: প্রেসক্লাবকে ঘিরে আমরা চারজনই ছিলাম একপ্রাণের মতোই।
আলীকদম প্রেস ক্লাব ছিল আমাদের পেশাগত আত্মপরিচয়ের একটি ঘর। সেখানে আমরা সংবাদ নিয়ে কথা বলতাম, স্থানীয় সমস্যার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করতাম, সাংবাদিকতার নৈতিকতা নিয়ে ভাবতাম এবং একে অন্যকে উৎসাহ দিতাম। পাহাড়ি অঞ্চলের সংবাদকর্মীদের জন্য এই প্রতিষ্ঠান ছিল সম্মিলিত কণ্ঠের একটি প্রাথমিক মঞ্চ।
প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাকালীন দিনগুলোর কথা ভাবলে আজও উচ্চতমনির মুখ মনে পড়ে। তাঁর মধ্যে ছিল মেধা, সংবেদনশীলতা, মানুষের প্রতি মমতা এবং নিজের জনপদকে এগিয়ে নেওয়ার এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা। তিনি হয়তো বড় শহরের আলোচিত সংবাদপ্রতিষ্ঠানের প্রধান হননি; কিন্তু আলীকদমের মতো দুর্গম উপজেলা থেকে কলম হাতে জাতীয় সংবাদপত্রে লেখা পাঠানো এবং স্থানীয় সাংবাদিকতার ভিত গড়ে তোলা এ কাজের ঐতিহাসিক গুরুত্ব কোনো বড় পদমর্যাদার চেয়ে কম নয়।
‘পাহাড়িকা গুঞ্জন’:
উচ্চতমনির সাংবাদিকতা ও লেখালেখি জীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য কাজ ছিল ১৯৮৬ সালে আলীকদম থেকে ‘পাহাড়িকা গুঞ্জন’ নামে একটি স্মরণিকা বা গ্রন্থ প্রকাশ। দুর্গম একটি উপজেলা থেকে এমন প্রকাশনা বের করা সেই সময়ের বাস্তবতায় নিঃসন্দেহে সাহসী ও উদ্যোগী কাজ ছিল। ‘পাহাড়িকা গুঞ্জন’ ছিল আলীকদমের ইতিহাস, মানুষ, সমাজ, সংস্কৃতি ও সম্ভাবনাকে বৃহত্তর পরিসরে পরিচিত করার এক প্রয়াস। পাহাড়ের একটি ছোট জনপদকে নিজের কণ্ঠে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছিল এই উদ্যোগ। প্রান্তিক অঞ্চলের ইতিহাস অনেক সময় বড় শহরের নথিতে হারিয়ে যায়। স্থানীয় মানুষের স্মৃতি, সংগ্রাম, সংস্কৃতি ও স্বপ্ন যদি কেউ লিখে না রাখে, তবে একদিন তা কেবল মৌখিক স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে। উচ্চতমনি এই সত্যটি বুঝেছিলেন। তাই তাঁর প্রকাশনা ছিল ভবিষ্যতের জন্য রেখে যাওয়া এক সামাজিক দলিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে, এই বইটি এখন আর পাওয়া যায় না। উচ্চতমনি শেষ বয়সের দিকে একটু মানসিক অসুস্থতায় ভূগছিলেন। তাই তার এই মহৎ সৃষ্টি তিনি নিজেও সংরক্ষণ করে যেতে পারেননি।
তঞ্চঙ্গ্যা সমাজের প্রকাশনা ও সাহিত্যচর্চার বিভিন্ন আলোচনাতেও তাঁর নাম পাওয়া যায়। একটি ইতিহাসভিত্তিক প্রকাশিত লেখায় তাঁকে বাংলাদেশ তঞ্চঙ্গ্যা কল্যাণ সংস্থার গঠনতন্ত্র প্রণয়ন কমিটির সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ থেকেও বোঝা যায়, তাঁর ভূমিকা শুধু স্থানীয় সাংবাদিকতায় সীমাবদ্ধ ছিল না; বৃহত্তর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরেও তিনি সক্রিয় ছিলেন।
মানুষ উচ্চতমনি:
উচ্চতমনি ছিলেন মানুষের কাছাকাছি থাকা একজন মানুষ। ভালো, সৎ, পরোপকারী ও জনবান্ধব হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন। মানুষের সমস্যায় পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেন। তাঁর মধ্যে নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষার চেয়ে মানুষের প্রতি দায়বোধ ছিল বেশি। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের ইউনিসেফ প্রকল্পে সমন্বয়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাঁর কর্মজীবনের এটি ছিল একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। সাংবাদিকতা, সমাজসেবা ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড বিভিন্ন ক্ষেত্রেই তিনি মানুষের জীবনকে কাছ থেকে দেখেছেন। তাঁর জীবনে মেধা ছিল, স্বপ্ন ছিল, কাজের শক্তি ছিল। কিন্তু মানুষের জীবন সবসময় স্বপ্নের মতো সরল পথে এগোয় না। নব্বইয়ের দশকের দিকে তিনি মানসিক অসুস্থতায় আক্রান্ত হন এবং দীর্ঘদিন অসহায় অবস্থায় জীবনযাপন করেন। একজন মেধাবী ছাত্র, কবি, লেখক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী ও সম্ভাবনাময় নেতার জীবনে এমন কঠিন পরিণতি ছিল গভীরভাবে বেদনাদায়ক। তবে তাঁর দুঃসময়ে কিছু মানুষ মানবিকতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য জীনামেজু অনাথ আশ্রমের ভান্তে উ নন্দ মালা মহাথেরো। উচ্চতমনির অসহায়ত্ব দেখে তিনি দীর্ঘদিন তাঁর চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তায় পাশে ছিলেন।
১৯৯৮ সাল থেকে উচ্চতমনির মৃত্যু পর্যন্ত আমার পেশাগত পথচলা তাঁর স্মৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই দীর্ঘ সময়ে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি পাহাড়ি অঞ্চলের সাংবাদিকতার পরিবর্তন যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি, সংবাদমাধ্যমের বিস্তার, নতুন প্রজন্মের আগমন এবং স্থানীয় সমস্যাকে বৃহত্তর পরিসরে তুলে ধরার নানা সুযোগ। কিন্তু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মূল দায়িত্বটি বদলায়নি। সাংবাদিকতার কাজ এখনও মানুষের কথা বলা, ক্ষমতার কাছে প্রশ্ন রাখা, অবহেলিত বাস্তবতাকে দৃশ্যমান করা এবং সময়ের সত্যকে নথিবদ্ধ করা। উচ্চতমনি এই মূল দায়িত্বের প্রতি বিশ্বাসী ছিলেন। আমাদের পেশাগত সম্পর্কের মধ্যে মতবিনিময় ছিল, স্মৃতি ছিল, কখনো পরিকল্পনা ছিল, কখনো উদ্বেগ ছিল। কিন্তু সবকিছুর কেন্দ্রে ছিল পাহাড়ের মানুষ।
আজ পেশাগত জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ফিরে তাকালে বুঝতে পারি উচ্চতমনির মতো মানুষরা ইতিহাসের বড় শিরোনাম না হয়েও ইতিহাস তৈরি করেন। তাঁরা প্রতিষ্ঠানের প্রাচীর গড়ে তোলেন, তরুণদের উৎসাহ দেন, স্থানীয় স্মৃতি সংরক্ষণ করেন এবং মানুষের সমস্যাকে সংবাদে পরিণত করেন। তাঁদের কাজের মূল্য অনেক সময় তাঁদের জীবদ্দশায় যথেষ্ট স্বীকৃতি পায় না। কিন্তু পরবর্তী প্রজন্ম তাঁদের পথের ওপর দাঁড়িয়েই সামনে এগোয়।
উচ্চতমনি চলে যাওয়ার পর তাঁর ছেলে নয়ন মনি তঞ্চঙ্গ্যা আমার পরামর্শে মাঠ সাংবাদিকতায় যুক্ত হয়েছেন। অত্যন্ত নম্র-ভদ্র এই ছেলেটার মধ্যে তার বাবার প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাই। একজন সন্তানের কাছে বাবা একটি ব্যক্তিগত পৃথিবী। কিন্তু আমাদের কাছে উচ্চতমনি ছিলেন একটি সময়ের প্রতিনিধি একটি প্রজন্মের প্রতীক। যারা দুর্গম পাহাড়ি জনপদ থেকে শিক্ষা, সাংবাদিকতা ও সামাজিক কাজের পথে এগিয়ে এসেছিল।
পাহাড়ের উচ্চতমনি শহরের আলোচিত সাংবাদিক হয়তো হতে পারেননি। তাঁর নামও এই প্রজন্মের অনেকেই জানে না। কিন্তু পার্বত্য আলীকদমের মাঠ সাংবাদিকতা ও প্রতিষ্ঠানটি রাতারাতি তৈরী হয়নি। ইতিহাস তৈরি হয় নীরব মানুষের হাতে। যারা প্রতিকূলতার মধ্যে প্রথম কলম ধরেছিলেন। আজকের প্রজন্মের কোনো হঠকারি সিদ্ধান্তে প্রেসক্লাব গড়ে উঠেনি। তা ছিলো বুদ্ধিবৃত্তিক ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের ফসল। যারা এনালগ যুগে বসে আলীকদম থেকে কথা বলেছিলেন, পাহাড়ের মানুষের হয়ে কথা বলেছিলেন, প্রান্তিক জনপদের স্বপ্নকে শব্দে রূপ দিয়েছিলেন।
মানুষ পৃথিবী থেকে চলে যায়; কিন্তু ভালোবাসা, বন্ধুত্ব ও কর্মের স্মৃতি থেকে যায়। উচ্চতমনি তঞ্চঙ্গ্যা আমাদের সময়ের একজন নীরব পথিকৃৎ। তাঁর স্মৃতি বেঁচে থাকবে যতদিন কোনো তরুণ প্রান্তিক জনপদ থেকে কলম হাতে স্বপ্নের দিকে হাঁটতে শুরু করবে।
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
মোবাইল: 01556-560126 / 01645-950296
তারিখ: ০৫/১০/202৬ খিষ্টাব্দ।
আপনার মতামত লিখুন :