
পাহাড়ের দুপুর কখন যে বিকেলের দিকে গড়িয়ে গেল, তা বুঝতেই পারিনি। রাইতু বিডি কটেজের বারান্দা থেকে শেষবারের মতো থাঙ্কুয়াইন ঝর্ণার দিকে তাকালাম। পাহাড়ের বুক চিরে জল তখনও একই ছন্দে নেমে আসছে। মানুষের আগমন কিংবা প্রস্থান কোনোটিই যেন তার অনন্ত সুরকে স্পর্শ করতে পারে না। ঝর্ণার নিজস্ব সময় আছে, নিজস্ব ভাষা আছে। আমরা কেবল সেই ভাষার ক্ষণিক শ্রোতা।
ফেরার প্রস্তুতি নিলাম। ব্যাগপত্র গুছিয়ে আবার নেমে এলাম তৈনখালের পাথুরে তীরে। যে পথ দিয়ে এসেছিলাম, সেই পথ ধরেই ফিরতে হবে। সামনে আবারও বুকসমান পানি, পিচ্ছিল পাথর, তীব্র স্রোত। তবে এবার পথটি আর কঠিন মনে হচ্ছিল না। কারণ গন্তব্যে পৌঁছানোর আনন্দ মানুষকে ফিরে আসার শক্তিও দিয়ে দেয়।
আমরা ধীরে ধীরে খালের স্রোতের দিকে এগিয়ে চললাম। এবার আর তাড়াহুড়ো নেই। মাঝে মাঝেই থেমে চারদিকে তাকাচ্ছিলাম। পাহাড়ের রং বিকেলের আলোয় বদলে গেছে। সকালের সবুজ এখন আরও গভীর, আরও নিবিড়। সূর্যের কোমল আলো গাছের ডালে, খালের জলে আর ভেজা পাথরের গায়ে সোনালি রেখা এঁকে দিচ্ছে।

স্রোত পার হওয়ার সময় সকালের সেই উত্তেজনা আর ছিল না। অভিজ্ঞতা আমাদের সাবধান করেছে, আবার সাহসও দিয়েছে। সবাই একে অন্যকে সহযোগিতা করেই পথ পেরোলাম। ভেলার মাঝিও দূর থেকে আমাদের দেখে হাত নাড়লেন। পাহাড়ি মানুষের এই ছোট ছোট আন্তরিক আচরণগুলোই ভ্রমণকে আপন করে তোলে।
কেয়াংঘাটে ফিরে নৌকায় উঠতেই আবার ইঞ্জিনের পরিচিত শব্দ শোনা গেল। তৈনখালের স্রোত এবার আমাদের পক্ষে। উজানে ওঠার সময় যে পথ দীর্ঘ মনে হয়েছিল, ভাটির স্রোতে সে পথ যেন অনেক দ্রুত পেরিয়ে যেতে লাগল। নৌকা পানির বুক চিরে এগিয়ে চলছে, আর আমরা নীরবে তাকিয়ে আছি দুই তীরের পাহাড়ের দিকে।
এই নীরবতার মধ্যেই মনে পড়ছিল দিনের শুরুতে দেখা নদী টিটি, ডালের ওপর বসে থাকা মাছরাঙা, দোছরী বাজারের নিস্তব্ধতা, বুকসমান পানি পেরোনোর রোমাঞ্চ, থাঙ্কুয়াইনের জলধ্বনি আর রাইতু বিডি কটেজের সেই নিরাভরণ দুপুর। একটি দিনের ভ্রমণ কত দ্রুত মানুষের স্মৃতির অংশ হয়ে যায়!
অন্যান্য পর্বগুলি পড়তে ক্লিক করুন:
১. (প্রথম পর্ব : পাহাড়ের আহ্বান) “তৈনখাল ভ্রমণ ও থাঙ্কুয়াইন ঝর্ণা দর্শন”
২. ২য় পর্ব: ইতিহাস, নদী আর নামের অন্বেষণ
৩. ৩য় পর্ব: স্রোতের বিপরীতে অরণ্যের আরও গভীরে
৪. ৪র্থ পর্ব: স্রোতের সঙ্গে মানুষের লড়াই, অরণ্যের অন্তঃপুরে
৫. ৫ম পর্ব: যেখানে জল প্রার্থনা হয়ে ঝরে, পাহাড় দেয় নীরব আশ্রয়
৬. ৬ষ্ঠ পর্ব: পাহাড়ের নীরব আতিথ্যে এক দুপুর
কিন্তু এই সৌন্দর্যের মাঝেও একটি বিষণ্নতা আমাকে বারবার স্পর্শ করছিল।
তৈনখালের বুক একসময় ছোট-বড় অসংখ্য পাথরে ভরা ছিল। সেই পাথরই পাহাড়ি স্রোতের স্বাভাবিক গতি নিয়ন্ত্রণ করত, জলধারাকে দিত তার নিজস্ব ছন্দ। কিন্তু বছরের পর বছর নির্বিচারে পাথর উত্তোলনের কারণে সেই প্রাকৃতিক ভারসাম্য অনেকটাই নষ্ট হয়েছে। কোথাও স্রোতের চরিত্র বদলে গেছে, কোথাও খালের তলদেশ ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। প্রকৃতি তার ক্ষত নিয়ে নীরবে বেঁচে থাকে, কিন্তু সেই ক্ষতের দায় মানুষের। পর্যটনের প্রসারও তাই হতে হবে দায়িত্বশীল।
আলীকদমের পাহাড়, তৈনখাল, থাঙ্কুয়াইন কিংবা মাতামুহুরী এসব কেবল ভ্রমণস্থল নয়; এগুলো আমাদের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। পর্যটক হিসেবে আমাদের প্রথম দায়িত্ব এই সৌন্দর্যকে অক্ষুণ্ণ রাখা। প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট, পানির বোতল, সিগারেটের ফিল্টার কিংবা অন্য কোনো অপচনশীল বর্জ্য ফেলে পাহাড়কে দূষিত করার কোনো অধিকার আমাদের নেই।
প্রকৃতির কাছ থেকে আমরা সৌন্দর্য নিই। তার বিনিময়ে অন্তত পরিচ্ছন্নতাটুকু ফিরিয়ে দিতে পারি। আমার বিশ্বাস, আলীকদম বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় প্রকৃতি-পর্যটনের জনপদ। থাঙ্কুয়াইন, ক্রাতং, লাদমেরাগ, পালংখিয়াং, চাইম্প্রা, তামাংঝিরি প্রতিটি ঝর্ণাই নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে অনন্য। প্রয়োজন শুধু পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এবং প্রকৃতির প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা।
নৌকা ধীরে ধীরে আমতলী লংঘাটের দিকে এগিয়ে চলছিল। পরিচিত ঘাট চোখে পড়তেই মনে হলো, একটি ভ্রমণ শেষ হচ্ছে; কিন্তু তার গল্প শেষ হচ্ছে না। বরং এই যাত্রাই নতুন যাত্রার আহ্বান জানিয়ে যাচ্ছে।
পেছনে পড়ে রইল থাঙ্কুয়াইন। পেছনে পড়ে রইল তৈনখালের আঁকাবাঁকা জলপথ। কিন্তু তাদের জলধ্বনি রয়ে গেল অন্তরের ভেতর।
মানুষ জীবনের নানা প্রয়োজনে ভ্রমণ করে। কেউ বিশ্রামের জন্য, কেউ অভিযানের জন্য, কেউ ছবি তোলার জন্য। কিন্তু কিছু ভ্রমণ আছে, যা মানুষকে নিজের কাছেই ফিরিয়ে আনে। থাঙ্কুয়াইন আমার কাছে তেমনই একটি ভ্রমণ। এখানে এসে আমি উপলব্ধি করেছি প্রকৃতির সবচেয়ে বড় শিক্ষা তার নীরবতা। পাহাড় কখনো উচ্চকণ্ঠ নয়, নদী নিজের গন্তব্য নিয়ে অহংকার করে না, ঝর্ণা তার সৌন্দর্যের ঘোষণা দেয় না। তবু তারা যুগের পর যুগ মানুষের হৃদয় জয় করে চলেছে।
সম্ভবত এ কারণেই সভ্যতার কোলাহলে ক্লান্ত মানুষ বারবার পাহাড়ের কাছে ফিরে আসে। ফিরে আসে নদীর কাছে। ফিরে আসে ঝর্ণার কাছে। শেষবারের মতো মনে মনে থাঙ্কুয়াইনকে প্রণাম জানালাম। হয়তো আবার কোনো বর্ষায় দেখা হবে। হয়তো আবার তৈনখালের স্রোত ডেকে নেবে। কারণ কিছু পথ একবার হাঁটা শেষ হয় না। কিছু জলধ্বনি একবার শোনা শেষ হয় না। তারা মানুষের ভেতরে বয়ে চলে অবিরাম।
পরিশিষ্ট : ভ্রমণ-তথ্য
কীভাবে যাবেন :
রুট–১: ঢাকা/চট্টগ্রাম/কক্সবাজার থেকে আলীকদম। সেখান থেকে পানবাজার হয়ে আমতলী লংঘাট। ইঞ্জিনচালিত নৌকায় দোছরী বাজার–রাইতুমনি পাড়া কেয়াংঘাট। এরপর ৩০–৪৫ মিনিট হাঁটলেই থাঙ্কুয়াইন ঝর্ণা।
রুট–২: আলীকদম–থানচি সড়কের ১৩ কিলোমিটার পয়েন্ট থেকে পাহাড়ি পথ ধরে ট্রেকিং করেও যাওয়া যায়।
নৌকা ভাড়া :
আমতলী লংঘাট থেকে কেয়াংঘাট পর্যন্ত রিজার্ভ নৌকা সাধারণত ৪০০–৫০০ টাকা।
বর্ষায় ১৫–১৬ জন এবং শুষ্ক মৌসুমে ৭–৮ জন যাতায়াত করতে পারেন।
মধ্যাহ্নভোজ : রাইতু বিডি কটেজে জনপ্রতি প্রায় ৩০০ টাকা।
দেশি মুরগির ঝোল, মরিচ ভর্তা, ডাল, সিমের ভাজি ও ভাতের ঘরোয়া আয়োজন বিশেষভাবে উপভোগ্য।
উপযুক্ত সময় : বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময় (জুলাই–অক্টোবর) থাঙ্কুয়াইন ঝর্ণা সবচেয়ে প্রাণবন্ত থাকে।
মনে রাখবেন : স্থানীয় গাইডের পরামর্শ মেনে চলুন। পাহাড়ি স্রোতকে কখনো হালকাভাবে নেবেন না। প্লাস্টিক ও অপচনশীল বর্জ্য প্রকৃতিতে ফেলবেন না। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও জীবনাচারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকুন।
শেষ কথা: আসুন, আমরা ভ্রমণ করি দর্শক হয়ে নয়; দায়িত্বশীল পথিক হয়ে। প্রকৃতিকে ভালোবাসি, তাকে সংরক্ষণ করি। কারণ পাহাড়, নদী ও ঝর্ণা এসব কেবল ভৌগোলিক স্থান নয়, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উত্তরাধিকার।
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
মোবাইল: 01556-560126 / 01645-950296
ইমেইল: momtaj.news@gmail.com
তারিখ: ০৩/০৮/2026 খিষ্টাব্দ।
আপনার মতামত লিখুন :