রাজার অসুখ ও সুখী মানুষের জামা


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : অগাস্ট ২৮, ২০২৬, ৩:৩৭ অপরাহ্ন / ০
রাজার অসুখ ও সুখী মানুষের জামা

মমতাজ উদ্দিন আহমদ


রাজা অসুস্থ। তাঁর দেহে কোনো দৃশ্যমান ক্ষত নেই। কোনো অঙ্গ বিকল হয়নি। কোনো জ্বরের উত্তাপও নেই। তবু তিনি শান্তিতে বসতে পারেন না, রাতে ঘুম আসে না, আহারে রুচি থাকে না। রাজপ্রাসাদের অসংখ্য কক্ষ। দাস-দাসী, রথ-ঘোড়া, ধনরত্ন, বাগান ও বিলাসের সমস্ত আয়োজন তাঁর চারপাশে উপস্থিত। শুধু অনুপস্থিত একটি জিনিস: মনের শান্তি।

রাজার অসুখ তাই শরীরের নয়, অস্তিত্বের। বাইরে তিনি রাজা, কিন্তু ভিতরে তিনি এক অস্থির মানুষ। তাঁর কাছে পৃথিবীর বহু কিছু আছে। অথচ নিজের মনটিকে নিজের কাছে রাখার ক্ষমতা নেই। এই অসুখের চিকিৎসা করতে আসলে বহু কবিরাজ। সকলেই ব্যর্থ হলেন রাজার অসুখ সারাতে। অবশেষে একজন কবিরাজ আশ্চর্য এক প্রস্তাব দিলেন। প্রস্তাবটি ছিলো রাজ্যের সবচেয়ে সুখী মানুষের জামা এনে রাজাকে পরাতে হবে। সেই জামা নাকি রাজার মনকে সুস্থ করে তুলবে। কিন্তু এই উপকথার প্রকৃত চিকিৎসা কোনো জামায় নয়। চিকিৎসা লুকিয়ে আছে সুখ সম্পর্কে মানুষের ভুল ধারণা ভেঙে যাওয়ার মধ্যে।

মন্ত্রী সেনাপতি ও লোকজন নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন সুখী মানুষের সন্ধানে। প্রথমে গেলেন ধনী ব্যবসায়ীর কাছে। তার গুদাম ভরা পণ্য। অর্থের অভাব নেই। প্রাসাদে অভাব নেই কোনো আরামের। কিন্তু ব্যবসায়ী বলল, বাজার ভালো যাচ্ছে না, পণ্য ঠিকমতো বিক্রি হচ্ছে না। ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। তার ঘরে ধন আছে, কিন্তু মনে নিশ্চয়তা নেই।

তারপর তাঁরা গেলেন আরেক ধনী মানুষের কাছে। সে বলল, মোটামুটি ভালোই ছিল। কিন্তু পরিবারের একজন অসুস্থ হয়ে পড়েছে। অর্থ তাকে চিকিৎসার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু প্রিয়জনের কষ্টের সামনে অর্থের ক্ষমতা সীমিত। সম্পদ দুঃখের সব দরজা বন্ধ করতে পারে না।

মন্ত্রী আরও বহু মানুষের কাছে গেলেন। কারও ব্যবসায় মন্দা, কারও সন্তানের দুশ্চিন্তা। কারও নিজের অসুস্থতা, কারও আয় কমে যাওয়ার ভয়। কারও হারানো সম্পদের আফসোস। প্রত্যেকের জীবনে কিছু সুখ আছে। কিন্তু কোনো না কোনো দুঃখও তার পাশে বসে আছে।

এই দৃশ্য আমাদের পরিচিত। মানুষকে বাইরে থেকে দেখে আমরা তার পূর্ণ জীবনকে বিচার করি। তার পোশাক, বাড়ি, গাড়ি, পদমর্যাদা ও সামাজিক সাফল্য দেখে মনে করি এই মানুষটি নিশ্চয়ই সুখী। কিন্তু মানুষের অন্তর তো জানালাবিহীন কোনো প্রাসাদ নয় যে বাইরে দাঁড়িয়ে তার ভিতরের আবহাওয়া বোঝা যাবে। অনেক হাসির নিচে অশ্রু থাকে। অনেক প্রাচুর্যের আড়ালে থাকে আতঙ্ক। অনেক সাফল্যের অন্তঃপুরে রয়েছে নিঃসঙ্গতা।

শেষ পর্যন্ত এক দোকানদার মন্ত্রীকে জানালেন, লোকালয়ের বাইরে নদীর ধারে একটি ছোট কুটিরে এক মানুষ থাকে। তার কোনো ধনসম্পদ নেই, রাজকীয় আয়োজন নেই, তবু সে নাকি বেশ সুখে আছে। মন্ত্রী সেখানে গিয়ে দেখলেন একটি বড় গাছের নিচে লোকটি বসে আছে। নদীর বাতাস তার শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে, আর সে আপনমনে গান গাইছে।

তার ঘর ছোট, জীবন সরল, প্রয়োজন সামান্য। সে যখন যা দরকার, তখন সেই কাজ করে। অল্প রান্না করে, অল্প খায়। নিজের মতো ঘুমায়। ভয়ের কোনো বড় প্রাসাদ তার মনে নেই। সে নিজেকে স্বাধীন বলে মনে করে। কারণ তার সুখ অন্যের অনুমোদন, বাজারের ওঠানামা কিংবা সম্পদের প্রদর্শনের ওপর নির্ভরশীল নয়।

মন্ত্রী আনন্দিত হলেন। অবশেষে সুখী মানুষ পাওয়া গেছে! এখন শুধু তার জামাটি সংগ্রহ করে রাজাকে পরালেই রোগ সেরে যাবে। কিন্তু সুখের সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ প্রকাশ পেতে দেরী হলো না! কারণ সেই মানুষের গায়ে কোনো জামাই নেই। বাসায়ও তার কোনো জামা নেই। যে সুখী মানুষের জামা রাজাকে সুস্থ করার কথা ছিল, তার নিজেরই জামা নেই!

এই জামাহীনতা দরিদ্রতার চিত্র নয়। এটি একটি দার্শনিক প্রতীক। জামা এখানে পোশাকের চেয়ে বেশি কিছু। কারণ জামা সামাজিক পরিচয়, বাহ্যিক মর্যাদা, ভোগের চিহ্ন এবং অন্যের চোখে নিজের মূল্য প্রমাণ করার আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। রাজা সেই জামাটি চেয়েছিলেন, কারণ তিনি ভাবতেন সুখ একটি বাহ্যিক বস্তু। সুখী মানুষের ব্যবহার করা কোনো জিনিস নিজের গায়ে ধারণ করলেই সুখের সংক্রমণ ঘটবে।

কিন্তু সুখ ধার করা যায় না। অন্যের প্রাসাদ নিজের নিঃসঙ্গতা সারাতে পারে না। অন্যের পোশাক নিজের আত্মঅসন্তোষ ঢাকতে পারে না। অন্যের জীবন অনুসরণ করে নিজের শান্তি অর্জন করা যায় না। সুখ কোনো বস্তু নয় যে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া যাবে। কোনো সুগন্ধি নয় যে অন্যের শরীর থেকে নিজের শরীরে মেখে নেওয়া যাবে। সুখ মূলত একটি অন্তর্গত অবস্থা। যা জন্ম নেয় মানুষ তার প্রাপ্ত জীবনকে কীভাবে গ্রহণ করছে, তার ওপর।

সুখী মানুষটির জামা ছিলো না। কিন্তু তার কাছে ছিল বাতাস অনুভব করার অবসর। নদীর দিকে তাকানোর চোখ। অল্পের মধ্যে তৃপ্ত থাকার ক্ষমতা। নিজের জীবনকে অন্যের জীবনের সঙ্গে অবিরাম তুলনা না করার স্বাধীনতা। তার অনাবৃত শরীর যেন ঘোষণা করেছিল মানুষের প্রকৃত উষ্ণতা কাপড়ে নয়, অন্তরের প্রশান্তিতে।

মন্ত্রী যখন রাজাকে জানালেন যে সুখী মানুষটি জামাহীন, রাজা নীরব হয়ে গেলেন। এই নীরবতা পরাজয়ের নয়; এটি আত্মজাগরণের সূচনা। তিনি বুঝলেন, এতদিন তিনি সুখকে ভুল জায়গায় খুঁজেছেন। রাজপ্রাসাদ, ফুলের বাগান, মূল্যবান অলংকার, অসংখ্য পরিচারকের মাঝে। কিন্তু এসব জীবনের আরাম বাড়াতে পারে, কিন্তু মনের শান্তি নিশ্চিত করতে পারে না।

রাজা বুঝলেন, তাঁর অসুখের মূল কারণ অভাব নয়; অতৃপ্তি। তিনি যা পেয়েছেন, তার দিকে তাকাননি; যা পাননি, তার দিকেই তাঁর সমস্ত দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল। তাঁর রাজ্য পূর্ণ ছিল| কিন্তু তাঁর মন ছিল অভাবের হিসাবখাতা। সেই হিসাব যত বেড়েছে, শান্তি তত কমেছে।

মানুষের দুঃখের একটি বড় কারণ হলো সে বর্তমানকে ভবিষ্যতের কাছে বন্ধক রাখে। আজকের বাতাস, আজকের অন্ন, আজকের প্রিয়জন, আজকের সুস্থতা এসবের মূল্য সে বোঝে না। কারণ সে বিশ্বাস করে, আরও কিছু পাওয়া গেলে তবেই জীবন পূর্ণ হবে। কিন্তু ‘আরও’-এর কোনো শেষ নেই। একটি ইচ্ছা পূর্ণ হলে আরেকটি ইচ্ছা জন্ম নেয়। এক শিখর জয় করলে চোখ আরেক শিখরের দিকে ওঠে। আকাঙ্ক্ষা প্রয়োজনীয়, কিন্তু আকাঙ্ক্ষার লাগামহীন বিস্তার মানুষকে নিজের অর্জনের মধ্যেও দরিদ্র করে তোলে।

এখানে সন্তুষ্টির অর্থ স্থবিরতা নয়। অল্পে সুখী হওয়া মানে উন্নতির ইচ্ছা ত্যাগ করা নয়, অন্যায় বা দারিদ্র্যকে মহিমান্বিত করাও নয়। সন্তুষ্টি হলো যা নেই তার জন্য চেষ্টা করতে গিয়ে যা আছে তাকে অবজ্ঞা না করা। মানুষ তার ঘর বড় করবে, আয় বাড়াবে, জ্ঞান অর্জন করবে, জীবনের উন্নতি চাইবে। কিন্তু সেই পথে নিজের বর্তমান শান্তি, সম্পর্ক, স্বাস্থ্য ও মানবিকতা বিসর্জন দেবে না।

সন্তুষ্টি মানুষকে নিষ্ক্রিয় করে না। বরং তাকে লোভের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে। যে ব্যক্তি জানে তার প্রয়োজন কোথায় শেষ, সে অন্যের জীবন হরণ না করেও নিজের জীবন নির্মাণ করতে পারে। যে ব্যক্তি অল্পের সৌন্দর্য বোঝে, সে অধিকের আকাঙ্ক্ষাকেও সংযত ও অর্থপূর্ণ রাখতে পারে।

সুখী মানুষটি তাই অলস নয়। সে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী কাজ করে। তার কর্ম জীবনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, প্রদর্শনের জন্য নয়। রাজা অসুস্থ ছিলেন কারণ তাঁর সমস্ত আয়োজন ছিল বাহিরের জন্য। অথচ অন্তরের কোনো আয়োজন ছিল না। নদীতীরের মানুষটি সুখী ছিল কারণ তার বাহ্যিক জীবন সরল হলেও অন্তরের সঙ্গে তার জীবনের বিরোধ ছিল না।

তাহলে সুখের জামা কোথায়? ‘অসুস্থ’ রাজার জন্য সুখী মানুষের জামা আনা সম্ভব হয়নি। কারণ সুখের জামা বলে কোনো বস্তু নেই। সুখের জামা যদি কোথাও থাকে, তবে তা মানুষের নিজের বোধ, গ্রহণক্ষমতা, কৃতজ্ঞতা, সংযম ও অন্তরের স্বাধীনতার বুননে তৈরি। সেটি বাজারে বিক্রি হয় না। রাজপ্রাসাদের ভাণ্ডারে জমা থাকে না। অন্যের গায়ে দেখে নিজের গায়েও পরা যায় না।

সুখের জামা হলো ভোরের আলোয় জেগে উঠে নিজের জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া। প্রিয়জনের মুখে সামান্য হাসি দেখে হৃদয় উষ্ণ হওয়া। প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভোগ না করে অল্পের মধ্যে সৌন্দর্য আবিষ্কার করা। প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করা আমি কি সত্যিই বেঁচে আছি, নাকি শুধু আরও কিছু পাওয়ার অপেক্ষায় দিন পার করছি?

মানুষ বাইরের অর্জনকে অন্তরের শান্তির একমাত্র মাপকাঠি বানায়। তখন সে প্রাসাদে থেকেও ভিখারি হয়ে যায়। আবার যে মানুষ অল্পের মধ্যে নিজের প্রয়োজন, স্বাধীনতা ও কৃতজ্ঞতার স্থান খুঁজে পায়, সে কুটিরে থেকেও রাজকীয় হয়ে ওঠে। রাজত্ব তখন সিংহাসনে নয়; রাজত্ব হলো নিজের মনের ওপর নিজের অধিকার।

‘রাজার অসুখ ও সুখী মানুষের জামা’ একটি সরল অথচ গভীর সত্যের রূপক। এটি আসলে একটি জীবনবোধ। সুখ বাহ্যিক প্রাচুর্যের ফল নয়। সুখ হলো প্রাপ্ত জীবনের সঙ্গে অন্তরের একটি শান্ত সমঝোতা। ধনসম্পদ, আরাম ও সাফল্য জীবনে প্রয়োজনীয় হতে পারে, কিন্তু তারা নিজেরাই সুখের নিশ্চয়তা নয়। সুখ জন্ম নেয় যখন মানুষ তার আকাঙ্ক্ষাকে জ্ঞান দিয়ে পরিচালনা করে। অভাবের মধ্যেও প্রাপ্তিকে দেখতে শেখে এবং অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবনকে অবিরাম তুলনা করা বন্ধ করে।

রাজা শেষ পর্যন্ত কোনো জামা পেলেন না। পেলেন তার চেয়েও মূল্যবান একটি উপলব্ধি। তিনি বুঝলেন, যে মানুষ সুখী হতে জানে, তার গায়ে হয়তো কোনো জামা নেই। কিন্তু তার অন্তরে আছে এমন এক উষ্ণতা যা রাজপ্রাসাদের অগ্নিকুণ্ডেও মেলে না।

সুখী হতে হলে সুখী মানুষের জামা খুঁজে বেড়ানোর প্রয়োজন নেই। নিজের অন্তরের অসুখটিকে চিনে, নিজের প্রাপ্ত জীবনটিকে ভালোবাসতে শেখাই সুখের প্রথম ও প্রকৃত চিকিৎসা।


লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

মোবাইল: 01556-560126 / 01645-950296

তারিখ: 28/8/28/2026 খিষ্টাব্দ।