মক্কা জোটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৬, ৭:৪৩ অপরাহ্ন / ০
মক্কা জোটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ

।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ ।।

২০২৬ সালের ৭ আগস্ট মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট নানান ধরণের আলোচনা হচ্ছে। জনপ্রিয় আলোচনায় একে কখনো ইসলামিক ন্যাটো বলা হচ্ছে। যদিও এটি চুক্তিটির সরকারি নাম নয় এবং এখনো ন্যাটোর মতো পূর্ণাঙ্গ সামরিক কমান্ড বা একই মাত্রার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি। বাংলাদেশের জন্য মূল প্রশ্ন হলো: দেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত, অর্থনৈতিক স্বার্থ, আঞ্চলিক শান্তি এবং বহুমুখী কূটনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই নতুন নিরাপত্তা কাঠামোয় কী ধরনের অংশগ্রহণ সম্ভব?

মক্কায় স্বাক্ষরিত চুক্তির সরকারি ঘোষণায় বলা হয়েছে, এর লক্ষ্য তিন দেশের কালেক্টিভ সিকিউরিটি (সম্মিলিত নিরাপত্তা) শক্তিশালী করা, আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কালেক্টিভ ডিটারেন্স (সম্মিলিত প্রতিরোধক্ষমতা) বাড়ানো এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতায় অবদান রাখা। চুক্তির কেন্দ্রীয় নীতি হলো তিন দেশের কোনো একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণকে তিন দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে।

রয়টাটার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চুক্তিটির সামরিক প্রতিশ্রুতির সুনির্দিষ্ট পরিধি এবং কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে অন্যরা কী ধরনের সহায়তা দেবে তা প্রকাশিত ঘোষণায় বিস্তারিতভাবে নির্ধারিত হয়নি। আল-জাজিরা-ও জানিয়েছে, সহায়তার মাত্রা, ধরন ও রূপ সদস্যদের পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা-সহযোগিতা কাঠামো হলেও একে সরলভাবে ন্যাটো’র অনুলিপি বা অবিলম্বে একক সামরিক জোট হিসেবে চিহ্নিত করা অতিরঞ্জিত হবে।

বাংলাদেশের জুনিয়র পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন কবির রয়টার্সকে বলেছেন, ইসলামী দেশগুলোর মধ্যে কোনো নিরাপত্তা-ব্যবস্থা থাকলে বাংলাদেশ তার অংশগ্রহণ বিবেচনা করতে পারে এবং বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে। রয়টার্স আরও জানিয়েছে, সৌদি আরব বাংলাদেশকে চুক্তিতে যোগদানের আমন্ত্রণ জানিয়েছে বলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র দাবি করেছে। তবে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে জোটে যোগ দিয়েছে এমন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা আনুষ্ঠানিক সদস্যপদ ঘোষণা তখনও হয়নি।

বাংলাদেশের নিরাপত্তা-পরিবেশের ক্ষেত্রে বঙ্গোপসাগর, সমুদ্রপথ, সাইবার নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ, আন্তঃদেশীয় অপরাধ, দুর্যোগ মোকাবিলা ও সমুদ্রসম্পদ রক্ষার মতো বিষয়গুলো ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে। মক্কা জোটে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ যদি প্রতিরক্ষা-সংলাপ, সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি বিনিময়, দুর্যোগ-উদ্ধার এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তায় সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করতে পারে, তবে তা দেশের প্রতিরক্ষা কূটনীতিকে বহুমাত্রিক করতে পারে।

তবে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা মানেই যুদ্ধের প্রতিশ্রুতি নয়। বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক মডেল হতে পারে প্রথম পর্যায়ে পর্যবেক্ষক মর্যাদা, নিয়মিত কূটনৈতিক সংলাপ, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, শান্তিরক্ষা প্রশিক্ষণ, এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা। এতে বাংলাদেশ সামরিক ব্লকের কঠোর বাধ্যবাধকতা গ্রহণ না করেও নিরাপত্তা-সহযোগিতার সুফল পেতে পারে।

বাংলাদেশ ১৯৭৪ সাল থেকে ওআইসির সদস্য। ফলে মুসলিম বিশ্বের বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের উপস্থিতি নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে ওআইসি মূলত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতার সংগঠন। মক্কা জোটের মতো পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি তার থেকে আলাদা। এই দুই কাঠামোর পার্থক্য বজায় রেখেই বলা যায়, মক্কা জোটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে তার সম্পর্ককে একটি নতুন নিরাপত্তা-সংলাপের মাত্রা দিতে পারে।

বাংলাদেশ মক্কা জোটে অংশ নিলে তার সবচেয়ে ইতিবাচক অবদান হতে পারে উন্নয়নশীল মুসলিম দেশগুলোর নিরাপত্তা, জলবায়ু ঝুঁকি, খাদ্যনিরাপত্তা, শরণার্থী সমস্যা ও দুর্যোগ মোকাবিলাকে নিরাপত্তা-আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা।

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা সংস্থা বাংলাদেশকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের অন্যতম বৃহৎ অবদানকারী দেশ হিসেবে উল্লেখ করেছে। বাংলাদেশ ১৯৮৮ সালে প্রথম জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে ইউনিফর্মড পার্সোনেল পাঠায়। পরবর্তী দশকগুলোতে বিভিন্ন দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় অবদান রেখেছে। এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পদ। তাই মক্কা জোটে শান্তিরক্ষা, বেসামরিক সুরক্ষা, চিকিৎসা সহায়তা, দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্গঠন এবং মানবিক কূটনীতির অভিজ্ঞতা ইত্যাদি বাংলাদেশের সম্ভাব্য ভূমিকা  হিসেবে মক্কা জোটে আলোচনায় যুক্ত করতে পারে। এতে বাংলাদেশ শান্তি ও নিরাপত্তার নীতিনির্ধারক অংশীদার হিসেবে নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।

বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক শক্তি হলো একদিকে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বন্ধুত্ব, অন্যদিকে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা। রয়টার্সের বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন, আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশের বহুমুখী সম্পর্কের ভারসাম্য জটিল হতে পারে। কিন্তু এই ঝুঁকি থাকলেই অংশগ্রহণ অসম্ভব হয়ে যায় না; বরং দক্ষ কূটনীতি, স্বচ্ছ শর্ত এবং সীমিত ও বিষয়ভিত্তিক সহযোগিতার মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো সম্ভব। সংবাদ মাধ্যমটি জানিয়েছে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মক্কা চুক্তির বিকাশ ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। একই সঙ্গে বিশ্লেষকেরা মনে করেন, পাকিস্তান-সম্পৃক্ত প্রতিরক্ষা কাঠামোতে বাংলাদেশের প্রবেশ ভারত স্বাগত নাও জানাতে পারে।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও জনগণের পারস্পরিক সম্পর্ক সবই দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতা। কোনো নতুন জোটে সম্ভাব্য অংশগ্রহণ যেন এই সম্পর্ককে শূন্য-সম প্রতিযোগিতায় পরিণত না করে, সে জন্য আগাম কূটনৈতিক যোগাযোগ প্রয়োজন। একইভাবে পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের সঙ্গেও বাংলাদেশকে স্পষ্ট করতে হবে যে ঢাকার অংশগ্রহণ কোনো তৃতীয় দেশের বিরুদ্ধে সামরিক অবস্থান নয়।

আধুনিক নিরাপত্তায় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, জ্বালানি, সমুদ্রবন্দর, সরবরাহ-শৃঙ্খল, সাইবার অবকাঠামো, খাদ্য ও পানি সবই জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। মক্কা জোটের তিন প্রতিষ্ঠাতা দেশের নিজস্ব শক্তি ভিন্ন ভিন্ন। তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প ও সামরিক সক্ষমতা, সৌদি আরবের অর্থনৈতিক ও জ্বালানি গুরুত্ব, এবং পাকিস্তানের সামরিক অভিজ্ঞতা ও কৌশলগত অবস্থান। এই বৈচিত্র্য বাংলাদেশকে প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষা-শিল্প সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। তবে সামরিক জোটের সঙ্গে অর্থনৈতিক সুবিধাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এক করে দেখা যাবে না। বাংলাদেশের জন্য যে কোনো সহযোগিতায় প্রযুক্তি হস্তান্তর, স্থানীয় শিল্পে বিনিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন, স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় পর্যালোচনা করা জরুরি।

বাংলাদেশ চাইলে একাধিক ধাপে এগোতে পারে। প্রথম ধাপে জোটের পূর্ণাঙ্গ সদস্য না হয়ে রাজনৈতিক সংলাপ ও পর্যবেক্ষক পর্যায়ে যুক্ত হওয়া যেতে পারে। দ্বিতীয় ধাপে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, শান্তিরক্ষা প্রশিক্ষণ, সাইবার নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তার মতো অযুদ্ধমূলক সহযোগিতা বাড়ানো যেতে পারে। তৃতীয় ধাপে পূর্ণ সদস্যপদের প্রশ্ন বিবেচনা করলে চুক্তির বাধ্যবাধকতা, প্রত্যাহারের অধিকার, সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়া এবং সংসদীয় জবাবদিহি স্পষ্ট করতে হবে।

মক্কা জোটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণকে কেবল “ইসলামিক ন্যাটো” বা ভারতের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক ফ্রন্ট হিসেবে দেখলে আলোচনাটি আতঙ্ক, অনুমান ও শূন্য-সম ভূরাজনীতির মধ্যে আটকে যাবে। প্রকৃত সম্ভাবনা আরও বিস্তৃত। বাংলাদেশ চাইলে এই নতুন কাঠামোকে ব্যবহার করতে পারে নিরাপত্তা-সংলাপ, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, সামুদ্রিক সহযোগিতা, শান্তিরক্ষা, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি শক্তিশালী করার জন্য। তবে ইতিবাচক অংশগ্রহণের অর্থ অন্ধভাবে কোনো জোটে যোগ দেওয়া নয়। বাংলাদেশকে এমন কোনো ব্যবস্থায় যুক্ত হতে হবে না, যেখানে তার সার্বভৌম সিদ্ধান্ত সংকুচিত হয়, প্রতিবেশীদের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা বাড়ে, অথবা অন্য দেশের সংঘাতে তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টেনে নেওয়া হয়। বরং বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থান হবে শান্তি, উন্নয়ন, মানবিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে একটি দায়িত্বশীল মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে।

সবশেষে বলা যায়, মক্কা জোট বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাব্য কূটনৈতিক দরজা। তবে চূড়ান্ত গন্তব্য নয়। দরজাটি খোলা থাকুক; কিন্তু প্রবেশের আগে বাংলাদেশকে দেখতে হবে, ভেতরের কাঠামো তার সার্বভৌম মর্যাদা, অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, আঞ্চলিক শান্তি এবং জনগণের নিরাপত্তার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ। সঠিক শর্ত, স্বচ্ছ কূটনীতি ও ভারসাম্যপূর্ণ নেতৃত্ব থাকলে এই সম্ভাবনা বাংলাদেশের জন্য নতুন নিরাপত্তা-অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদার একটি ইতিবাচক অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে।


লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

মোবাইল: 01556-560126 / 01645-950296

তারিখ: ০৪/-৯/২০২৬ খিষ্টাব্দ।