স্রোতের সঙ্গে মানুষের লড়াই, অরণ্যের অন্তঃপুরে


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : অগাস্ট ৫, ২০২৬, ২:২৭ অপরাহ্ন /
স্রোতের সঙ্গে মানুষের লড়াই, অরণ্যের অন্তঃপুরে

তৈনখালের উজানে থাঙ্কুয়াইনের খোঁজে (চতুর্থ পর্ব)


।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ ।।


দোছরী বাজারে সংক্ষিপ্ত বিরতির পর আবার শুরু হলো আমাদের যাত্রা। পাহাড়ি কলার মিষ্টি স্বাদ তখনও মুখে লেগে আছে। নৌকার ইঞ্জিন আবার গর্জে উঠল। আমরা ধীরে ধীরে আরও উজানের দিকে এগিয়ে চললাম। সামনে রাইতুমনি পাড়া। তারও পরে কেয়াংঘাট। কিন্তু আমরা জানতাম, নৌযাত্রার সমাপ্তিই প্রকৃত অভিযাত্রার শুরু।

দোছরী থেকে কেয়াংঘাটের পথটি তুলনামূলক শান্ত হলেও প্রকৃতির রূপ এখানে আরও নিবিড়। খালের দুই তীরের পাহাড় যেন আরও কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। কোথাও বুনো কলাগাছ, কোথাও গর্জনের দীর্ঘ সারি, কোথাও লতাগুল্মে ঢাকা পাথুরে ঢাল। বর্ষার জলে ধোয়া সবুজের এমন গভীরতা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।

ঘড়িতে তখন সাড়ে এগারোটার কিছু বেশি। নৌকার মাঝি ইঞ্জিন বন্ধ করে তীরে ভেড়ালেন। তিনি মৃদু হেসে বললেন,   এরপর আর নৌকা যাবে না।”

কথাটি শুনে আমরা সবাই নেমে পড়লাম। সামনে তাকিয়ে বুঝলাম কেন মাঝির এই সিদ্ধান্ত। খালের বুকজুড়ে বিশাল বিশাল বোল্ডার। কোথাও সাদা ফেনা তুলে স্রোত ধেয়ে যাচ্ছে, কোথাও পানির নিচে ঘূর্ণি তৈরি হয়েছে। বর্ষাকালে এই অংশে নৌকা চালানো সত্যিই ঝুঁকিপূর্ণ।

এখান থেকেই শুরু হবে পায়ে হাঁটার পথ।

আমাদের গন্তব্য আর বেশি দূরে নয়। কিন্তু পাহাড়ি পথের দূরত্ব কিলোমিটারে মাপা যায় না; মাপা যায় ঘাম, ধৈর্য আর সাহসে।

ব্যাগপত্র গুছিয়ে আমরা সারিবদ্ধভাবে হাঁটা শুরু করলাম।

প্রথমে খালের তীর ধরে এগোতে হচ্ছিল। ভেজা মাটি, পাথর, গাছের শিকড় আর ঝুলে থাকা বাঁশের ডাল মিলিয়ে পথটি যথেষ্ট কঠিন। কয়েকদিন আগেই পাহাড়ি ঢলে বন্যা হয়েছিল। তার চিহ্ন এখনও স্পষ্ট। ভাঙা বাঁশ, শুকনো ডালপালা, কাদামাটি আর স্রোতে ভেসে আসা গাছের গুঁড়ি পথের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে আছে। কিছুদূর এগোতেই পথ শেষ হয়ে গেল। সামনে শুধু খাল। জুতা খুলে সবাই পানিতে নামলাম।

পাহাড়ি পানির স্পর্শে শরীর মুহূর্তেই শীতল হয়ে গেল। কিন্তু কয়েক কদম এগোতেই বুঝলাম, এই স্রোতকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। হাঁটুসমান পানি দ্রুত কোমর ছুঁয়ে ফেলল। তারপর বুক পর্যন্ত উঠে এল। নিচে বড় বড় গোলাকার পাথর। সেগুলোর গায়ে শ্যাওলা জমে থাকায় পা রাখলেই পিছলে যাচ্ছে।

আমি, সিনিয়র সাংবাদিক ইকবাল বাহার চৌধুরী, শাহেদ ভাইসহ কয়েকজন হাত ধরাধরি করে এগোতে শুরু করলাম। পাহাড়ি স্রোতে এটাই সবচেয়ে নিরাপদ কৌশল। একজনের ভারসাম্য নষ্ট হলে অন্যজন তাকে সামলে নিতে পারবেন।

একসময় পানি গলা ছুঁয়ে গেল। স্রোতের ধাক্কায় দাঁড়িয়ে থাকাই কঠিন হয়ে উঠল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হলো, পাহাড় যেন আমাদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছে। প্রকৃতির সৌন্দর্য সহজে ধরা দেয় না; তাকে অর্জন করতে হয় পরিশ্রম দিয়ে।

অবশেষে আমরা ওপারে উঠতে পারলাম। দম নিয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখলাম, দলের অন্য সদস্যরা খাল পার হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সবাই সাঁতার জানতেন না। তাঁদের জন্য স্থানীয়রা একটি বাঁশের ভেলা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন।

একে একে সবাই সেই ভেলায় খাল পার হলেন।

প্রতিজনের কাছ থেকে নেওয়া হলো ২০ টাকা করে।

আমি ভেলার মাঝির সঙ্গে কথা বললাম। জানতে চাইলাম, এত অল্প পথ পারাপারের জন্য এই ভাড়া কেন? তিনি জানালেন, প্রশাসনের নির্ধারিত রেট।”

স্থানীয় মানুষের জীবিকার বাস্তবতা বিবেচনা করলে বিষয়টি বোঝা যায়। তবু বিশ ফুটেরও কম একটি খাল পার হতে জনপ্রতি বিশ টাকা কিছুটা বেশি বলেই আমার মনে হয়েছিল। এরপর আবার শুরু হলো হাঁটা।এবার পথ আরও কঠিন।

কোথাও কোমরসমান পানি, কোথাও বুকসমান। কোথাও পাথরের ওপর ভর দিয়ে উঠতে হচ্ছে, কোথাও আবার খালের মাঝখান দিয়েই এগোতে হচ্ছে। বর্ষার ঢলে ভেসে আসা বাঁশের কঞ্চি আর গাছের ডাল পথকে আরও দুর্গম করে তুলেছে। কখনো পানির নিচে কী আছে বোঝাই যাচ্ছে না। প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে সতর্কতার সঙ্গে।

এই কঠিন পথেই সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করলেন আমাদের দুই প্রবীণ সহযাত্রী।

মহেশখালী প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ফরিদুল আলম দেওয়ান চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা করছেন। বয়স ষাট পেরোলেও তাঁর উদ্যমে কোনো ভাটা নেই। আগের দিনই তিনি মারাইংতং পাহাড়ের অনেকটা ওপরে উঠে গিয়েছিলেন। আজও একই দৃঢ়তায় পাথুরে পথ অতিক্রম করছেন।

অন্যদিকে ইকবাল বাহার চৌধুরী যেন পাহাড়ি স্রোতেরই মানুষ। কখনো সাঁতরে, কখনো পাথর ধরে, কখনো অন্যদের হাত বাড়িয়ে দিয়ে তিনি এগিয়ে চলছিলেন। তাঁর অভিজ্ঞতা ও আত্মবিশ্বাস দলের অনেকের মনোবল বাড়িয়ে দিয়েছিল।

আমাদের দলের আরেকটি বিষয় আমাকে মুগ্ধ করেছিল। কেউ বিরক্ত হননি। কেউ অভিযোগ করেননি। বরং একে অপরকে সাহায্য করেছেন, হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, হাসি-ঠাট্টায় ক্লান্তিকে হালকা করেছেন। পাহাড়ে ভ্রমণের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য সম্ভবত এখানেই গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই মানুষ একে অপরের আরও কাছাকাছি চলে আসে।

আমি মাঝেমধ্যে সবার আগে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। আবার কোথাও থেমে পেছনের সবাইকে অপেক্ষা করছিলাম। মনে হচ্ছিল, আমরা শুধু একটি ঝর্ণার দিকে হাঁটছি না; বরং একসঙ্গে একটি স্মৃতি নির্মাণ করছি।

হঠাৎ সামনের একজন থেমে হাত তুলে ইশারা করলেন। আমরা সবাই দাঁড়িয়ে গেলাম।

দূরে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা একটি সাদা জলরেখা চোখে পড়ছে। আরও কয়েক কদম এগিয়ে যেতেই জলরেখাটি ধীরে ধীরে পূর্ণ রূপ নিল। পাথুরে দেয়ালের বুক চিরে আকাশ থেকে যেন সাদা রেশমের ফিতা নেমে এসেছে। সেই আমাদের বহু প্রতীক্ষিত থাঙ্কুয়াইন ঝর্ণা। দীর্ঘ পথের সমস্ত ক্লান্তি মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে গেল। আমরা নীরবে দাঁড়িয়ে রইলাম। কারণ কিছু সৌন্দর্যের সামনে মানুষ কথা বলতে পারে না। শুধু মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে।

পঞ্চম পর্ব : যেখানে জল প্রার্থনা হয়ে ঝরে


লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।