
কাজী নজরুল ইসলামের প্রেমের গান মানেই অভিমান, দ্বিধা, অনুচ্চারিত কথা আর হারিয়ে যাওয়ার ভয়। “কেন নিশি কাটালি অভিমানে” গানটিও এ ধরণের একটি প্রেমরসঘন গান। এ গানে অভিযোগের চেয়ে বেশি শোনা যায় ফিরে পাওয়ার আকুতি। রাত পেরিয়ে গেছে, চাঁদ ডুবে গেছে দূর আকাশে। তবু হৃদয়ের অপেক্ষা শেষ হয়নি। যে মানুষটি কাছে আসতে পারত, সে অভিমানে দূরে থেকেছে। আর যে মন তার জন্য জেগে ছিল, তার রাত কেটেছে নীরব দীর্ঘশ্বাসে।
এ গানে বিরহ উচ্চকণ্ঠ বিলাপ নয়। তা নিভৃত, সংযত, অথচ গভীর। গানের সম্বোধনে প্রিয়জন যেন একদিকে অপরাধী, অন্যদিকে এখনও কাঙ্ক্ষিত। অভিমান তাকে আড়াল করেছে, কিন্তু প্রেমের আকর্ষণ মুছে দিতে পারেনি। তাই প্রশ্নের আড়ালে আছে অনুরোধ। কবি প্রশ্ন করেন ‘আর কত দূরে থাকবে? কেন কাছে এসে মনের কথা বললে না? কেন এমন এক রাতকে নীরবতায় শেষ হতে দিলে, যে রাতে মিলনের সম্ভাবনা ছিল?’
রাতের আকাশে চাঁদ ডুবে যাওয়া বিচ্ছেদের সহজ অথচ মর্মস্পর্শী ছবি। চাঁদ এখানে শুধু আকাশের জ্যোতিষ্ক নয়। সে প্রিয় মুখের আভাস, দূর থেকে দেখা আশার আলো। চাঁদ অস্ত গেলে চারদিক অন্ধকার হয়, কিন্তু প্রেমিকের মন অন্ধকারকে মেনে নিতে পারে না। সে জানে, আলো ছিল। কিন্তু কাছে পাওয়া যায়নি। এই ‘দূর বিমান’ যেন দূরত্বেরই এক অনন্ত যাত্রা। প্রিয়জন চোখের সামনে থেকেও নাগালের বাইরে চলে যায়।
চাতকীর তৃষ্ণা এই বিরহের আরেকটি হৃদয়গ্রাহী প্রতীক। বর্ষা নেমেছে, মেঘে আকাশ ভরে গেছে, জলও ঝরছে। তবু চাতকীর পিপাসা মেটে না। কারণ তার তৃষ্ণা শুধু জলের নয়। সে চায় নির্দিষ্ট এক ফোঁটা, নির্দিষ্ট এক মেঘের দান। প্রেমের আকাঙ্ক্ষাও তেমন। চারপাশে কত সান্ত্বনা, কত কথা, কত সঙ্গ আছে। কিন্তু প্রিয়জনের অভাব অন্য কিছু দিয়ে পূরণ হয় না। মান-অভিমানে সে মুখ ফিরিয়ে থাকলে প্রেমিকের কাছে বর্ষাও শুষ্ক লাগে। প্রকৃতির প্রাচুর্য হৃদয়ের শূন্যতা মেটাতে পারে না।
এই গানে প্রকৃতি মানুষের অনুভূতির ভাষা হয়ে ওঠে। মেঘ, চাঁদ, কুমুদী, সরসী সবাই যেন বিরহের নাট্যে নীরব চরিত্র। চাঁদ দূরে থেকেও জলের কুমুদীকে আলো দেয়। কুমুদী তার দিকে চেয়ে ফোটে। সে চাঁদের কলঙ্ক দেখে না। দেখে তার আলো। এই দৃশ্য প্রেমের এক কোমল সত্য প্রকাশ করে। দূরত্ব থাকলেও ভালোবাসা দৃষ্টি ফেরায় না। প্রিয়জনের অপূর্ণতা জেনেও মন তার দিকেই তাকিয়ে থাকে। কলঙ্কী চাঁদও তখন আকর্ষণের কেন্দ্র। কারণ প্রেম নিখুঁত মুখ খোঁজে না, আপন মুখটিকেই আপন করে নেয়।
তবু গানটির ভেতরে সময় ফুরিয়ে যাওয়ার বেদনাও আছে। যে ফাগুনে ফুল রাতে ফুটেছিল, ভোর হলে সেই ঋতু আর থাকবে না। প্রেমের মুহূর্তও এমনই ক্ষণস্থায়ী। কখনো একটি অভিমান, একটি নীরবতা, কিংবা দেরিতে বলা একটি কথা মিলনের সুযোগকে পেরিয়ে যেতে দেয়। যে ফুল ফুটেছে, সে হয়তো নিজের রঙ ছড়িয়ে দিতে পারবে অল্প সময়ের জন্য। আর যে কুঁড়ি লজ্জা, ভয় কিংবা মানের ভারে ফুটল না, সে বাগানেই শুকিয়ে যাবে। এই তুলনায় আছে অনুতাপের আগাম ছায়া। ভালোবাসা প্রকাশের সময় সবসময় ফিরে আসে না।
নজরুলের কাব্যভাষার সৌন্দর্য এখানেই যে, তিনি প্রেমের ব্যক্তিগত বেদনা সহজ প্রকৃতিচিত্রে মিশিয়ে দেন। শ্রোতা নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে চাতকীর তৃষ্ণা বুঝতে পারে। নিজের অপ্রকাশিত কথাগুলো খুঁজে পায় কুমুদীর চাঁদপানে চেয়ে থাকা চোখে। গানের দৃশ্যগুলো তাই শুধু কল্পনা নয়। তারা স্মৃতির দরজা খুলে দেয়। কোনো অপেক্ষার রাত, কোনো অসমাপ্ত কথা, কোনো ফিরে না পাওয়া বসন্ত সব এসে মিশে যায় এই সুরে।
প্রেমে অভিমান কখনো কখনো মধুর। কারণ তার মধ্যে থাকে প্রত্যাশা। কিন্তু সেই অভিমান যদি কথার পথ বন্ধ করে দেয়, তবে তা বিচ্ছেদের কারণও হতে পারে। গানের প্রশ্নটি তাই আজও প্রাসঙ্গিক। প্রিয়জনকে দূরে সরিয়ে রেখে ভালোবাসা কি পূর্ণ হয়? মনের দরজা বন্ধ রাখলে কি আরেকটি বসন্তের নিশ্চয়তা থাকে? নজরুল উত্তর সরাসরি দেন না। তিনি শুধু রাত, মেঘ আর ফুলের ভাষায় মনে করিয়ে দেন যে মুহূর্তে ভালোবাসা ডাকছে, তাকে অকারণে ফিরিয়ে দিও না।
তাই নজরুলের কালজয়ী গান “কেন নিশি কাটালি অভিমানে” এই পঙ্ক্তির ভেতরে রাত জাগা প্রেমিকের অভিযোগ আছে, কিন্তু তার চেয়েও বড় আছে মমতা। সে এখনও প্রিয়জনকে প্রশ্ন করছে। অর্থাৎ সম্পর্কের সুতো এখনও ছিঁড়ে যায়নি। তার মনে ক্ষোভ থাকলেও ভালোবাসা নিভে যায়নি। এই দ্বন্দ্বই গানটিকে বিরহের গভীরতা দেয়। গান শেষে শ্রোতার মনে থেকে যায় এক নরম বিষাদ। চাঁদ হয়তো ডুবে গেছে, ফাগুনও ফুরোবে, কিন্তু বলা হয়নি যে কথাটি সেটিই হয়তো প্রেমের সবচেয়ে দীর্ঘ প্রতিধ্বনি হয়ে বেঁচে থাকে।
এই গানের আবেদন তাই কোনো এক যুগের প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের সম্পর্ক বদলায়, সময় বদলায়, কিন্তু না-বলা কথার ভার থেকে যায়। কখনো একজন অপেক্ষা করে, অন্যজন নিজের অভিমানকে ঢাল করে রাখে। পরে দুজনেই বুঝতে পারে, কথাটি বলার সহজ সময়টি পেরিয়ে গেছে। নজরুল এই দেরির যন্ত্রণাকে প্রকৃতির ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্যের পাশে রাখেন। ফুল যেমন রাতের অন্ধকারে ফোটে, তেমনি হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষাও নিভৃতে জন্মায়। তাকে স্বীকার করার সাহস না থাকলে, সে সৌন্দর্য অচিরেই ম্লান হয়। প্রেমের এই সত্য গানটিকে শুধু বিরহের স্মারক করে না। করে সময় থাকতে ভালোবাসার দিকে এগিয়ে যাওয়ার এক কোমল আহ্বান।
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
মোবাইল: 01556-560126 / 01645-950296
তারিখ: ১৮/১০/202৬ খিষ্টাব্দ।
আপনার মতামত লিখুন :