
(প্রথম পর্ব)
রুটিতে রুজি হয়, মানুষ ভাত-রুটি খেয়ে বাঁচে, কিন্তু রুটির বাইরেও তার একটা ক্ষুধা আছে, যে ক্ষুধা রুটিতে মেটে না সে হলো শিল্পের ক্ষুধা। মানুষ নিজের ভেতরের নিঃশব্দ কথাকে বাইরে আনতে চায়, আনন্দ-বেদনাকে রূপ দিতে চায়, আর অন্যের চোখের আয়নায় নিজেকে খুঁজে পেতে চায়। এই অতৃপ্ত তৃষ্ণা থেকেই শিল্পের জন্ম।
যে আদিম মানুষ গুহার দেয়ালে হরিণ ও প্রাণী শিকারের ছবি এঁকেছিল, আগুনের চারপাশে নেচেছিল, শিকারের গল্প অঙ্গভঙ্গিতে ফুটিয়েছিল, সে জানত না যে এক মহাযাত্রার প্রথম পদক্ষেপ সে ফেলছে। সেই রেখা, সুর আর শরীরী ভাষার গর্ভেই ঘুমিয়ে ছিল শিল্পের শাখা- চিত্রকলা, সংগীত, নৃত্য ও নাট্যকলা।
শিল্প হলো মানুষের অনুভূতি, কল্পনা ও অভিজ্ঞতার সৃজনশীল প্রকাশ। রং, রেখা, সুর, শব্দ কিংবা পাথরের মাধ্যমে শিল্পী নিজের অন্তর্লোককে বাইরের জগতে দাঁড় করান। শিল্পকে কেউ বলেছেন প্রকৃতির অনুকরণ, কেউ আবেগের প্রকাশ, কেউ সৌন্দর্যের সৃষ্টি। এই মতভেদই বুঝিয়ে দেয়, শিল্পকে একটি বাক্যের খাঁচায় বন্দি করা যায় না।
নাটক শিল্পবৃক্ষেরই এক জীবন্ত শাখা, তবে তার স্বভাব আলাদা। চিত্রকর তুলিতে রং মাখান। ভাস্কর পাথরে প্রাণ খোঁজেন। নাট্যশিল্পীর মাধ্যম তাঁর নিজের শরীর, কণ্ঠ আর উপস্থিতি। একটি ছবি বছরের পর বছর স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। নাটক বয়ে যায় সময়ের নদীতে। আলো জ্বলে, উইংস ওঠে, নাটক জন্ম নেয়। পর্দা নামলে মিলিয়ে যায়। তাই নাটক এক ক্ষণস্থায়ী মায়া, যার সৌন্দর্য ক্ষণস্থায়িত্বেই।
শিল্পকর্ম একজন স্রষ্টার নিভৃত সাধনার ফল। কিন্তু নাটক গড়ে ওঠে যৌথ শ্রমে। নাট্যকারের কলম, নির্দেশকের দৃষ্টি, অভিনেতার প্রাণ, আলোকশিল্পীর ছায়া আর সংগীতজ্ঞের আবহসুরে।
তবু পার্থক্যের চেয়ে মিলের জমিই বেশি উর্বর। উভয়েই মানুষের অনুভূতি থেকে জন্মায়। নাটকের ভেতরে শিল্পের সব শাখা এসে মিলেছে। মঞ্চসজ্জায় চিত্র ও স্থাপত্য, পোশাক ও আলোয় রঙের ভাবনা, সংলাপে সাহিত্য, আবহে সংগীত, চলাফেরায় নৃত্যের ছন্দ। তাই নাটককে বলা হয় সমন্বিত শিল্প। শিল্প এক বিস্তীর্ণ নদী হলে নাটক তার সবচেয়ে চঞ্চল স্রোত।
এই স্রোতের উৎস প্রাচীন গ্রিসে। নাটকের জন্ম মনোরঞ্জনের তাগিদে নয়, উপাসনার আঙিনায়। এথেন্সে মদ, উর্বরতা ও আনন্দের দেবতা ডায়োনিসাসের সম্মানে প্রতি বছর সিটি ডায়োনিসিয়া উৎসব হতো। অর্ধবৃত্তাকার উন্মুক্ত প্রেক্ষাগৃহের মাঝখানের গোল জায়গায় থাকত দেবতার বেদি। আর গায়কদল তাকে ঘিরে নেচে-গেয়ে স্তুতি করত। এই সমবেত গানের নাম ডিথিরাম্ব। ঐতিহ্য বলে, থেস্পিস নামের এক গায়ক দল ছেড়ে এগিয়ে এসে এক চরিত্রের কণ্ঠে কথা বললেন। তখন প্রথম অভিনেতার জন্ম হলো। এস্কাইলাস যোগ করলেন দ্বিতীয় অভিনেতা, সফোক্লিস তৃতীয়। গান থেকে সংলাপ, সংলাপ থেকে দ্বন্দ্ব, দ্বন্দ্ব থেকে নাটক। ট্র্যাজেডিতে মানুষ নিয়তির মুখোমুখি হলো, অ্যারিস্টোফেনিসের কমেডিতে ক্ষমতাবানেরা হাসির কাঠগড়ায় উঠলেন। অ্যারিস্টটলের পোয়েটিকস পাশ্চাত্য নাট্যতত্ত্বের ভিত গড়ল। রোমে নাটকের আসন পরে দখল করল রক্তাক্ত প্রদর্শনী, আর সাম্রাজ্যের পতনের সঙ্গে ইউরোপের মঞ্চে নামল দীর্ঘ নীরবতা।
সেই নীরবতা ভাঙল বিস্ময়কর উপায়ে। যে গির্জা নাটককে পৌত্তলিক বলে নিষিদ্ধ করেছিল, খ্রিষ্ট্রীয় দশম শতকে তারই বেদির পাশে নাটক আবার চোখ মেলল। এর নাম লিটার্জিক্যাল প্লে, অর্থাৎ উপাসনাবিধির নাট্যরূপ। ইস্টার সানডের ভোরের প্রার্থনায়, প্রধান উপাসনার অংশ হিসেবে, যাজকেরা যিশুর কবরের সামনে স্বর্গদূত ও শোকার্ত নারীদের কথোপকথন ল্যাটিন সুরে গাইতেন। দূত জিজ্ঞেস করেন, “তোমরা কাকে খুঁজছ? নারীরা বলেন, নাজারেথের যিশুকে। দূত জানান, তিনি পুনরুত্থিত। উপাসনার পাঠের সঙ্গে জোড়া এই ছোট অলংকরণের নাম ট্রোপ, আর “কোয়েম কোয়েরিটিস” ট্রোপই মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় নাটকের আদি বীজ। বেদির পাশে ছিল কল্পিত কবর। যাজকেরাই ছিলেন অভিনেতা। অভিনয় ছিল সংযত। নাটক তখনও উপাসনার সেবক। নিষিদ্ধ হয়েও মানুষের গল্প দেখার আকাঙ্ক্ষা ঘুরে এসেছিল সেই দরজা দিয়েই।
কাহিনি বিস্তৃত হলো। বড়দিনের জন্মকাহিনি ও অন্যান্য বাইবেলীয় ঘটনা যুক্ত হলো। দর্শকের ভিড়ে গির্জার দেয়াল সংকীর্ণ হয়ে এল। নাটক তাই দরজা পেরিয়ে প্রাঙ্গণে, সেখান থেকে শহরের হাট-চত্বরে নেমে এল। ল্যাটিনের জায়গা নিল মুখের ভাষা, যাজকের জায়গায় এলেন কামার, তাঁতি, মুদি। ধর্মীয় নাট্যোৎসব তখন তিনটি ধারায় বিকশিত হলো। মিস্ট্রি প্লেতে সৃষ্টি, আদমের পতন, নোয়ার (নুহের) বন্যা থেকে যিশুর কুশবিদ্ধ হওয়া ও শেষ বিচার পর্যন্ত গোটা বাইবেলীয় ইতিহাস ছোট ছোট নাটকের মালায় গাঁথা হতো। এর নাম নাট্যচক্র বা সাইকেল। ইংল্যান্ডে ইয়র্ক, চেস্টার, ওয়েকফিল্ড ও এন-টাউনের চক্র বিখ্যাত। অভিনয় হতো গ্রীষ্মের বড় উৎসব কর্পাস ক্রিস্টিতে। মিরাকল প্লেতে দেখানো হতো সাধু-সন্ত ও কুমারী মেরির অলৌকিক কাহিনি। মর্যালিটি প্লেতে পাপ-পুণ্য, মৃত্যু ও সৎকর্ম মানুষের রূপ ধরে মঞ্চে এল। এর প্রসিদ্ধ উদাহরণ এভরিম্যান (আনুমানিক পঞ্চদশ শতক), যেখানে মৃত্যুর ডাকে বন্ধু ও ধন মানুষকে ছেড়ে যায়, সঙ্গী থাকে সৎকর্ম। ওয়েকফিল্ডের দ্য সেকেন্ড শেফার্ডস প্লে-র মেষপালক আর নোয়ার জেদি স্ত্রীর হাস্যরসে ধর্মীয় নাটক থেকে লৌকিক নাটকের দিকে যাত্রার ইঙ্গিত মেলে।
মঞ্চের গঠনেও এই যুগ ছিল উদ্ভাবনী। ইংল্যান্ডে নাটক হতো পেজেন্ট ওয়াগনে, চাকাওয়ালা গাড়ির ওপর ভ্রাম্যমাণ মঞ্চে। শহরের নির্দিষ্ট স্থানে গাড়িগুলো পরপর এসে দাঁড়াত, দর্শক এক জায়গায় দাঁড়িয়েই একের পর এক নাটক দেখতেন। প্রতিটি নাটকের দায়িত্ব নিত একেকটি পেশাজীবী সংগঠন বা গিল্ড। বিষয় নির্বাচনে প্রায়ই পেশার সঙ্গে মিল রাখা হতো: জাহাজ-কারিগরেরা নোয়ার জাহাজের নাটক করত, রুটিওয়ালারা শেষ ভোজের। একজন তত্ত্বাবধায়ক অভিনেতা বাছাই, মহড়া ও সময় সামলাতেন। আধুনিক নির্দেশকের পূর্বাভাস সেখানেই। ছিল সাইমালটেনিয়াস সেটিং বা যুগপৎ মঞ্চসজ্জা। একটি বিশাল মঞ্চেই পাশাপাশি স্বর্গ, দানবের মুখের মতো নরক, পৃথিবী ও প্রাসাদ সাজানো থাকত। অভিনেতা হেঁটে গেলেই দৃশ্য বদলে যেত, দর্শক বসে একসঙ্গে সৃষ্টিজগৎ দেখতেন। ইংল্যান্ডে মঞ্চ ঘুরত দর্শকের কাছে, ফ্রান্সে দর্শক স্থির থাকতেন, দৃশ্যগুলো থাকত একসঙ্গে।
রেনেসাঁর আলোয় পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকের ইতালি প্রাচীন গ্রিস-রোমকে নতুন করে আবিষ্কার করল। ভিচেঞ্জার তেয়াত্রো অলিম্পিকোর মতো প্রেক্ষাগৃহ গড়ে উঠল, এল প্রসেনিয়াম আর্চ ও দৃষ্টিকোণভিত্তিক দৃশ্যপট। যার ওপর আজও আমাদের মঞ্চ দাঁড়িয়ে। একই সময়ে পথে-প্রান্তরে জন্ম নিল ইতালির পেশাদার ভ্রাম্যমাণ নাট্যধারা কমেডিয়া ডেল‘ আর্তে। সেখানে সংলাপ লেখা থাকত না, ছিল শুধু কাহিনির রূপরেখা। মুখোশধারী আরলেকিনো, পান্তালোনে আর কলম্বিনারা উপস্থিত বুদ্ধি ও শারীরিক কসরতে দর্শক মাতাত। এই ধারাতেই নারীরা প্রথম পেশাদার অভিনেত্রী হয়ে মঞ্চে উঠলেন। এর উত্তরাধিকার প্রাণ পেল মলিয়েরের কমেডিতে।
স্পেনের স্বর্ণযুগে লোপে দে ভেগা ও কালদেরোন ধর্ম, সম্মান ও প্রেমের অসংখ্য নাটক লিখলেন। উঠোনঘেরা কোররালই ছিল সাধারণ মানুষের নাট্যশালা। ইংল্যান্ডে ১৫৭৬ সালে জেমস বারবেজ গড়লেন প্রথম স্থায়ী পেশাদার মঞ্চ “দ্য থিয়েটার”। গ্লোবের আলো-আঁধারিতে মার্লো, বেন জনসন ও শেক্সপিয়র নাটককে মানবমনের অতলে নামালেন। ফ্রান্সে রাজদরবারের ছায়ায়, স্থান-কাল-ঘটনার ঐক্যের কঠোর অনুশাসনে কর্নেই ও রাসিন ট্র্যাজেডি লিখলেন। মলিয়ের সমাজের ভণ্ডামিকে হাসির আয়নায় দাঁড় করালেন।
পূর্বের আকাশে জাপান গড়ল সম্পূর্ণ আলাদা নাট্যভুবন। কান’আমি ও জেয়ামি নো নাটকে মুখোশ, ধীর নাচ ও প্রতীকী মঞ্চে আধ্যাত্মিক কাহিনির নীরব গভীরতা এনেছিলেন। সপ্তদশ শতকের শুরুতে ইজুমো-নো-ওকুনি নামের এক নারী কাবুকির সূচনা করলেন। যার জমকালো পোশাক ও দর্শকের মাঝ দিয়ে যাওয়া পথ হানামিচি আজও বিস্ময় জাগায়। সাধারণ মানুষের জন্য ছিল পুতুলনাট্য বুনরাকু। মঞ্চের রূপ আলাদা হলেও গল্প বলার তাগিদ সব সভ্যতায় এক।
তথ্যসূত্র: ১. জিয়া হায়দার, থিয়েটারের কথা। ২. দর্শন চৌধুরী, বাংলা থিয়েটারের ইতিহাস। ৩. গীতা সেনগুপ্ত, বিশ্বরঙ্গালয় ও নাটক।
লেখক: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, নাটক্যকলা বিভাগ, ২য় বর্ষ।
তারিখ: ১৬/১০/২০২৬ খিষ্টাব্দ।
আপনার মতামত লিখুন :