
“আলগা কর গো খোঁপার বাঁধন” কাজী নজরুল ইসলামের একটি কালজয়ী প্রেমের গান। কবির এই আবদারে আছে অনুযোগের ছল, কিন্তু অন্তরে অন্তরে তা মুগ্ধতারই স্বীকারোক্তি। প্রিয়ার খোঁপার বাঁধনে তাঁর হৃদয় যে ফেঁসে গেছে। প্রিয়ার কেশবিন্যাসের সোনালি ফিতের ফাঁসে জড়িয়ে গেছে কবির “আন্ধা এশ্ক” অর্থাৎ বিবেচনাহীন, আত্মসমর্পিত প্রেম। সে কথা তিনি গোপন করেননি। বরং হাসিমাখা কণ্ঠে জানিয়েছেন, “দিল ওহি মেরা ফঁস্ গয়ি” অর্থাৎ আমার মনখানি তো সেইখানেই বন্দি। খোঁপা বাঁধা থাকুক বা খুলে যাক, নজরুলের প্রেমিকের হৃদয়ের বন্ধন যেন আর খোলে না। গানটিতে কৌতুকের আড়ালে কবির এই প্রেমসত্যই মৃদু হাসিতে উঁকি দেয়।
প্রিয়ার বিনোদ-বেণী, জরির ফিতা, কেশের গন্ধ রূপের এই সামান্য অনুষঙ্গগুলোই প্রেমিক কবির কাছে হয়ে ওঠেছে মোহের জাল। কখন যে কেশের সুবাস কবির প্রেমকাতর লোভী মনকে টেনে এনেছে, তিনি নিজেও বুঝতে পারেননি। তারপর প্রেমের বেহুঁশিতে তিনি যেন প্রিয়ার হাতের কাছে গিয়ে ধরা পড়েছেন। বাজুবন্ধের অলংকারে তাঁর বন্দিত্ব পেয়েছে আরও এক রূপ। গানটিতে অলংকার শুধুমাত্র সাজের সামগ্রী নয়। তা প্রেমের আকর্ষণ, শরীরী সৌন্দর্যের ইশারা, আর মুগ্ধ হৃদয়ের কল্পিত শৃঙ্খল।
গানটিতে কবি যেন নিজেই নিজের পরাজয়ের কাহিনি বলেছেন। প্রিয়ার রূপের কাছে তিনি বশীভূত। অথচ সেই বশীভবনে তার কোনো অনুতাপ নেই। কেশের সৌরভ তাকে টেনে আনে, বাজুবন্ধ তাঁকে আটকে রাখে। এই আত্মসমর্পণেই তিনি খুঁজে পান প্রেমের এক মধুর আনন্দ। তাঁর অভিযোগের ভাষা আছে, কিন্তু অভিযোগের ভার নেই। কারণ তিনি জানেন যে বাঁধনে তিনি জড়িয়েছেন, সেই বাঁধনই তাঁর পরম প্রাপ্তি।
প্রেয়সীর কানের দুলের দোল, চোখের চাহনি কবির হৃদয়ে ঘটায় বিরাট আলোড়ন। দুলের আঘাতে যেন প্রাণ বিদ্ধ হয়; চোখের চোরাচাহনি হরণ করে নেয় কবির নিদ্রা। বাংলা আর বিদেশী শব্দের মিশেলে রচিত গানটির প্রতিটি পঙক্তির অতিশয়োক্তি কৌতুকের অলংকার হয়ে ওঠেছে। গানটিতে প্রেমিক কবি নিদ্রাহীন, বেহুঁশ, দিশাহারা হয়ে আছেন। কিন্তু তাঁর কণ্ঠে বিষাদের বদলে মুগ্ধতার সুর। তিনি যেন প্রিয়াকে দায়ী করেন, অথচ সেই দোষারোপের প্রতিটি বাক্যেই প্রিয়ার রূপের প্রশস্তি গেয়ে যায়।
শেষের চিত্রকল্পে প্রিয়ার দেহ হয়ে গেছে এক স্নিগ্ধ দেউড়ি। সেখানে প্রেম এসে বেড়াতে ঢুকেছে, কিন্তু আর ফিরে যায়নি। এই না-ফেরার মধ্যে আছে প্রেমিকের সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ। মন প্রিয়ার রূপে আশ্রয় পেয়ে আর আগের স্বাধীনতায় ফিরতে চায় না। গানটিতে “আলগা কর” কথাটি খোঁপার বাঁধন খোলার আবদার হলেও হৃদয়ের বাঁধন মজবুত করার আহ্বান! গানে প্রেমিক কবির ছলভরা মিনতি হচ্ছে কেশের বন্ধন খুলুক, কিন্তু প্রেমের বন্ধন অটুট থাকুক।
গানটি যখন রচনাকালে কবির বয়স হয়েছিল ৩৩ বছর চারমাস। কাহারবার সহজ, প্রাণচঞ্চল চলন গানের এই দুষ্টুমাখা প্রেমাবেদনকে স্বাভাবিক দোল দিয়েছেন কবি। গানের কথায় শব্দভঙ্গির অনুরণন খুবই চমকপ্রদ। গজল-রঙের ললিত আবহে রচিত গানে যেমন আছে অনুযোগ, তেমনি আছে সুরের মুর্ছনা। রূপের সঙ্গে রস, কেশের গন্ধের সঙ্গে দৃষ্টির নেশা, আর অভিমানের সঙ্গে কৌতুক মিলে গানটিকে করে তুলেছে সজীব ও চিত্রময়।
এ গান তাই নিছক প্রেয়সীর রূপবর্ণনা নয়। এটি রূপে-গন্ধে আচ্ছন্ন এক কবির হাস্যরসিক জবানবন্দি। প্রিয়ার সৌন্দর্যের কাছে পরাস্ত হয়েও তাঁর কণ্ঠে নেই পরাজয়ের দুঃখ। আছে মুগ্ধতার উল্লাস, দুষ্টুমির আবরণে ঢাকা নিবেদন। কবি মুক্তির কথা বললেও মুক্তি চান না। খোঁপার বাঁধন আলগা করতে বললেও হৃদয়ের বাঁধনের সুখে বন্দি থাকতে চেয়েছেন।
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
মোবাইল: 01556-560126 / 01645-950296
তারিখ: 07/11/2026 খিষ্টাব্দ।
আপনার মতামত লিখুন :