মেঘের দেশে মারাইংতং, পাহাড়জুড়ে সম্ভাবনার হাতছানি


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : অক্টোবর ২৯, ২০২৬, ১১:১৫ পূর্বাহ্ন / ০
মেঘের দেশে মারাইংতং, পাহাড়জুড়ে সম্ভাবনার হাতছানি

সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত আর সবুজ পাহাড়ের টানে বাড়ছে পর্যটক, তৈরি হচ্ছে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান

মমতাজ উদ্দিন আহমদ

আদিগন্ত বিস্তৃত সবুজ পাহাড়ের চূড়ায় মেঘের লুকোচুরি। কখনো পাহাড় ঢেকে যায় সাদা মেঘের চাদরে, কখনো সূর্যের আলোয় ফুটে ওঠে দূরের পাহাড় আর মাতামুহুরী নদীর মনোরম দৃশ্য। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের এমন মায়াবী রূপ দেখতে বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার মারাইংতং পাহাড়ে ছুটে আসছেন প্রকৃতিপ্রেমীরা। অনেকে এর সৌন্দর্যের সঙ্গে রাঙামাটির সাজেকের তুলনা করেন। পর্যটকদের আগমন ঘিরে স্থানীয় গাইড, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও যানবাহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আয়ের সুযোগ বাড়ছে। পরিকল্পিত পর্যটন অবকাঠামো ও সেবার সম্প্রসারণ করা গেলে পাহাড়ি জনপদটির অর্থনীতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

আলীকদম ট্যুর গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মিন্টু পাল বলেন, মারাইংতং পাহাড় দীর্ঘদিন ধরেই প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে পরিচিত। পাহাড়ের ওপর মেঘের খেলা, মাতামুহুরী নদীর দৃশ্য এবং সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা এখানে আসেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্যটকদের জন্য আশপাশের এলাকায় থাকার ব্যবস্থা ও বিভিন্ন সেবা গড়ে ওঠায় ভ্রমণকারীদের আগ্রহ বেড়েছে। আগে মূলত তরুণ ও ট্রেকিংপ্রেমীদের মধ্যে পাহাড়টি জনপ্রিয় ছিল। এখন পরিবার-পরিজন নিয়েও অনেকে ঘুরতে আসছেন।

খুলনা থেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মারাইংতংয়ে আসা পর্যটক মিয়া নুরুদ্দীন বলেন, পত্রিকায় পাহাড়টির সৌন্দর্য সম্পর্কে পড়েছেন। ইউটিউবে বিভিন্ন ভিডিও দেখেও আগ্রহ তৈরি হয়। সে কারণেই এখানে এসেছেন। তাঁর ভাষায়, এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ কল্পনার চেয়েও সুন্দর। তবে পর্যটকদের সুবিধার জন্য থাকার ব্যবস্থা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন আরও প্রয়োজন।

পর্যটকদের নিয়মিত যাতায়াত স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও আশার সঞ্চার করেছে। পাহাড়ে ওঠার পথ দেখানো, গাইড হিসেবে কাজ করা, যানবাহন পরিচালনা এবং খাবারসহ প্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রির মাধ্যমে আয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। স্থানীয় ট্যুর গাইড মো. ইয়াছিন বলেন, আগে মারাইংতংয়ে মূলত তরুণেরা ক্যাম্পিং করতে আসতেন। এখন আশপাশে পর্যটকসেবা বাড়ায় বছরের বিভিন্ন সময়ে পর্যটকের দেখা মেলে। এতে স্থানীয় ব্যবসায়ী, গাইড ও যানবাহন পরিচালকদের উপার্জনের সুযোগ বেড়েছে।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি মারাইংতংয়ের রয়েছে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। বৌদ্ধ ধর্মীয়গুরু উ: উইচারা মহাথেরো জানান, ১৯৯০ সালের দিকে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা পাহাড়ের চূড়ায় গৌতম বুদ্ধের একটি মূর্তি স্থাপনের পরিকল্পনা করেন। পরের বছর তৎকালীন বান্দরবান স্থানীয় সরকার পরিষদের উদ্যোগে সেখানে গৌতম বুদ্ধের আবক্ষ মূর্তি নির্মাণ করা হয়। এরপর থেকে পাহাড়ে ‘মারাইংতং জাদী মহা বৌদ্ধ মেলা’ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

উ: উইচারা মহাথেরো বলেন, বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে পাহাড়ে ওঠার জন্য কার্পেটিং সড়ক নির্মাণের কাজ চলছে। ইতিমধ্যে কাজের প্রায় অর্ধেক শেষ হয়েছে বলে তিনি জানান। পর্যটকদের পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি এর ধর্মীয় মর্যাদা রক্ষার আহ্বানও জানান তিনি।

আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনজুর আলম বলেন, মারাইংতং পাহাড় উপজেলার ঐতিহ্যবাহী পর্যটন আকর্ষণ। সময়ের সঙ্গে এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে। তবে পাহাড়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য অক্ষুণ্ন রেখে পর্যটন কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে প্রশাসন সচেষ্ট রয়েছে। পাহাড়ের সৌন্দর্য রক্ষায় নজরদারির পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে।

মারাইংতং ভ্রমণের পাশাপাশি আলীকদম সদর থেকে আলীর সুড়ঙ্গ এবং আলীকদম-থানচি সড়কের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও উপভোগ করতে পারেন পর্যটকেরা। এতে একই সফরে পাহাড়, আঁকাবাঁকা সড়ক ও বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখার সুযোগ মেলে।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার সম্ভাবনা—এই তিনের সমন্বয়ে মারাইংতং হতে পারে আলীকদমের পর্যটন অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। তবে পর্যটকসেবা সম্প্রসারণের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ যাতায়াত এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে পাহাড়ের সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখেই পর্যটন থেকে স্থানীয় মানুষের আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

কীভাবে আসবেন

ঢাকা থেকে মারাইংতং পাহাড়ে যেতে সরাসরি আলীকদমগামী বাসে যাওয়া যায়। এ ছাড়া কক্সবাজারগামী বাসে চড়ে চকরিয়া বাস টার্মিনালে নেমে সেখান থেকে স্থানীয় বাস, জিপ বা চাঁদের গাড়িতে আলীকদম যেতে পারবেন। আলীকদমগামী বাসে এলে বাসস্ট্যান্ডের আগে ‘আবাসিক’ এলাকার কাছে নামার বিষয়ে চালক বা সহকারীর সঙ্গে কথা বলে নিতে পারেন। সেখান থেকে স্থানীয় গাইডের সহায়তায় মারাইংতং পাহাড়ে ওঠার পথ পাওয়া যায়। পাহাড়ি পথে হাঁটার সময় ও কষ্ট নির্ভর করবে নির্বাচিত পথ এবং আবহাওয়ার ওপর। যাত্রার আগে স্থানীয় গাইড ও প্রশাসনের কাছ থেকে প্রবেশের নিয়ম, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং ভ্রমণের সময়সীমা জেনে নেওয়া জরুরি।