সীমান্তে আরাকান আর্মির ‘মাদক সন্ত্রাস’


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : নভেম্বর ২৫, ২০২৫, ৬:৫৩ পূর্বাহ্ন /
সীমান্তে আরাকান আর্মির ‘মাদক সন্ত্রাস’

|| মমতাজ উদ্দিন আহমদ ||


বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত বহুদিন ধরেই অস্থিরতার ভরকেন্দ্র। মিয়ানমারের আরসা, রোহিঙ্গা সঙ্কট, সীমান্তবাজার নিয়ন্ত্রণ ও মানবপাচারের জটিলতায় দীর্ঘদিন ধরে উত্তপ্ত এই অঞ্চল এখন নতুন এক বিপদের মুখোমুখি—আরাকান আর্মির (AA) নতুন ভূ-রাজনৈতিক উত্থান এবং তাদের ‘মাদক সন্ত্রাসে’র ছায়া। উখিয়া-টেকনাফ থেকে বান্দরবান-আলীকদম-নাইক্ষ্যংছড়ি—এই বিস্তীর্ণ সীমান্তরেখায় যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে, তা বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতির জন্য এক গভীর উদ্বেগের বার্তা। দেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত এখন এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি। রাখাইনে আরাকান আর্মি (AA) দ্রুতগতিতে দখল বিস্তার করছে; অন্যদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ নেটওয়ার্কের ‘স্টেজিং গ্রাউন্ড’-এ পরিণত হয়েছে। ফলে সীমান্ত হয়ে উঠেছে মাদক–অস্ত্র–মানবপাচার তিনটির এক সমন্বিত করিডর। এই নতুন ‘হাইব্রিড সংকট’ বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

গবেষণা বলছে—২০২৩–২৪ সালে কক্সবাজার ও বান্দরবানে মোট ৩৬ কোটি পিস ইয়াবা আটক করা হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। আইসের (মেথামফেটামিন) জব্দের পরিমাণ গত তিন বছরে ৭০০% বেড়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই স্রোত বন্ধ না হলে আগামী পাঁচ বছরে মাদকজনিত সংঘাত বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলকে ‘সশস্ত্র অপরাধের নতুন গোলকধাঁধা’-য় পরিণত করতে পারে।

আরাকান আর্মির উত্থান; সীমান্ত রাজনীতির বিপজ্জনক পুনর্গঠন: আরাকান আর্মি এখন মিয়ানমারের রাখাইনের প্রায় ৬০–৭০% অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ বিস্তার করেছে। আন্তর্জাতিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ACLED-এর তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালে রাখাইনে মোট সংঘর্ষের ৪৭% ক্ষেত্রে সরকারি সেনাবাহিনী পরাজিত হয়েছে—এর অধিকাংশই AA-এর আক্রমণে। এই উত্থানের তিনটি সরাসরি প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়ছে—মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়ায় AA-অনুগত স্থানীয় নেটওয়ার্ক মাদক রুটের পুনঃসংগঠন করে নতুন করিডর তৈরি করছে। দেশের ঘুমধুম–নাইক্ষ্যংছড়ি–আলীকদম এলাকাজুড়ে ‘নিয়ন্ত্রণহীন বাফার জোন’ তৈরি হয়েছে। এক্ষেত্রে  এসব পাহাড়ি এলাকা এখন অনিয়ন্ত্রিত সীমান্ত। মাদক অর্থনীতি থেকে সংগৃহীত অর্থ ব্যবহার হচ্ছে অস্ত্র কেনা, সেনা নিয়োগ ও সামরিক প্রশিক্ষণে। এই ত্রিভুজীয় সম্পর্ক—মাদক, রাজনীতি ও সশস্ত্র সংগ্রাম—বাংলাদেশের জন্য আনছে চরম নিরাপত্তা সংকট।

মাদকপাচারের নতুন পথ ও নতুন নেটওয়ার্ক:  আরাকান আর্মির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে রাখাইন অঞ্চল দিয়ে মাদকপাচারের নতুন রুট সক্রিয় হয়েছে—এটি সীমান্তবাসী, প্রশাসন এবং গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক প্রতিবেদনে উঠে আসছে। ইয়াবা ও আইস (ক্রিস্টাল মেথ) এখন আগের চেয়ে বেশি পরিমাণে বাংলাদেশে ঢুকছে। এর পেছনে তিনটি কারণ বিশেষভাবে লক্ষণীয়- ১. ক্ষমতার শূন্যতা: মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ হ্রাস পাওয়ায় মাদক সিন্ডিকেটগুলো নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছে। ২. স্বার্থসংশ্লিষ্টতা: বহু স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী, যার মধ্যে আরাকান আর্মির প্রভাবশালী অংশও রয়েছে, মাদক ব্যবসাকে অর্থসংস্থানের পথে পরিণত করেছে। ৩. সীমান্তের দুর্বল অবকাঠামো: দুর্গম পাহাড়ি সীমান্তরেখা, খাল-ঝিরি ও বনের জটিল পথ মাদক বহনকে সহজ করে তুলেছে। ফলে গত কয়েক মাসে টেকনাফ, বান্দরবান, কক্সবাজার সীমান্তে যে পরিমাণ ইয়াবা ও আইস আটক হয়েছে, তা আগের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সামাজিক বিপর্যয়: মাদক কেবল একটি অপরাধ নয়; এটি সামাজিক কাঠামোতে ছিদ্র সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে—বিশেষত কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য এলাকার যুবসমাজ—মাদকের স্রোতে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। এরফলে বাড়ছে পরিবারের ভাঙন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গ্যাং কালচার, কিশোর অপরাধ, সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কে যুবসমাজের যুক্ত হওয়া। আর এগুলোকে কেন্দ্র রেখেই নতুন সামাজিক সংকট তৈরি হচ্ছে। আরাকান আর্মির দোসররা যখন সীমান্তের ওপারে মাদক সন্ত্রাসের ঘাঁটি তৈরি করছে, তখন তার সরাসরি অভিঘাত পড়ছে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম ও জাতীয় নিরাপত্তায়।

রোহিঙ্গা ক্যাম্প; এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ নেটওয়ার্কের ‘হটস্পট’: দুই দফায়—২০১৭ সালে ৭ লাখ এবং বিভিন্ন সময়ে আরও প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা আগমনের ফলে কক্সবাজার এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী ঘনত্বপূর্ণ এলাকা। UNODC-এর রিপোর্ট বলছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো এখন ব্যবহৃত হচ্ছে- ১. ইয়াবা ও আইসের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে, ২. মাদকবাহকদের নিয়োগ কেন্দ্রে, ৩. অস্ত্র মজুতের জায়গা হিসেবে, ৪. মানবপাচারের ‘ট্র্যাপ-জোন’ হিসেবে। এখানে প্রতিদিন গড়ে ৪–৫টি গ্যাং সংঘর্ষ ঘটে, যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা খাতকে আরও চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করাচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম; নতুন ভূরাজনৈতিক সংকটের কেন্দ্র: পার্বত্য চট্টগ্রাম (বান্দরবান–রুমা–থানচি–আলীকদম–রোয়াংছড়ি) এখন হয়ে উঠেছে- ১. গোপন সশস্ত্র করিডর: সাম্প্রতিক গোয়েন্দা তথ্য বলছে, বাংলাদেশ সীমান্তের বিপরীতে আরাকান আর্মি, রোহিঙ্গা মিলিটেন্ট ও কিছু স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে “অপারেশনাল যোগাযোগ” বাড়ছে। ২. মাদক লজিস্টিক নেটওয়ার্ক: পাহাড়ি ঝিরি ও অরণ্য পথ ব্যবহার করে মাদক আনা হচ্ছে। রাতের আঁধারে মশাল, মোটরবাইক, খচ্চরপথ—সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক ‘অদৃশ্য হাইওয়ে’। ৩. সীমান্ত জনগোষ্ঠীর ভঙ্গুর অবস্থা: ম্রো, মার্মা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা—এই ছোট জাতিগোষ্ঠীগুলোর জীবন এখন দ্বিমুখী চাপের নিচে- পাহাড়ি গ্যাং ও সীমান্তের অস্ত্র-ও-মাদক সিন্ডিকেট, ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ নিরাপত্তা অঞ্চলের একটি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এই সংকট শুধু মাদক নয় বরং এটি আঞ্চলিক ভূরাজনীতির খেলা। চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র-তিন শক্তির প্রতিযোগিতামূলক প্রভাব বলয় এখন মিয়ানমারকে ঘিরে। ভারতের দৃষ্টিতে রাখাইন হলো “এক্ট ইস্ট পলিসি”-র প্রবেশদ্বার। চীনের কাছে এটি বেল্ট-অ্যান্ড-রোডের সামুদ্রিক গেটওয়ে। যুক্তরাষ্ট্র চাই দক্ষিণ চীন সাগরের বিকল্প চাপ বিন্দু। আরাকান আর্মির উত্থান এই তিন শক্তির হিসাব পাল্টে দিয়েছে। ফলে সীমান্তে যে মাদক-সন্ত্রাস দেখা যাচ্ছে, তার ভিতরে রয়েছে বড় শক্তিগুলোর কৌশলগত ছায়া।

সার্বিক বিবেচনায় সীমান্ত এলাকা এখন রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধ ও বড় কৌশল দরকার। এক্ষেত্রে সীমান্ত নিরাপত্তার সম্পূর্ণ আধুনিকায়ন। এক্ষেত্রে পাহাড়ি সীমান্তে ড্রোন নজরদারী বাড়াতে হবে। ভূখণ্ড-স্ক্যান প্রযুক্তি, নাইট ভিশন টাওয়ার, বিজিবির জন্য “মোবাইল র‍্যাপিড রেসপন্স ইউনিট”, পাহাড়ি এলাকায় বর্ডার পোস্ট পুনর্গঠন ও বান্দরবানে আর্মড কাস্টমস ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি অবলম্বন করতে হবে। নিরাপত্তা বাড়াতে অভ্যন্তরীণ জোনিং, বায়োমেট্রিক বাধ্যতামূলক, গ্যাং নেটওয়ার্ক ভাঙতে বিশেষ টাস্কফোর্স ও অপরাধ দমনে “সাইবার-ইন্টেলিজেন্স সেল” গঠন করা যেতে পারে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম দেশের এক দশমাংশ ভূখন্ড। এ ভূখন্ডের স্থিতিশীলতার জন্য রাষ্ট্রের উপস্থিতি বাড়ানো দরকার। এক্ষেত্রে সীমান্ত রোড নির্মাণ শেষ করা, দুর্গম এলাকায় স্থায়ী সেনা/বিজিবি পোস্ট স্থাপন বৃদ্ধি করা, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্যাকেজ তৈরী করা এবং আতঙ্কমুক্ত পাহাড় নিশ্চিত করতে “পাহাড়ি কমিউনিটি প্রোটেকশন নেটওয়ার্ক” তৈরী করা যেতে পারে।

বাংলাদশেকে আঞ্চলিক কূটনীতিতে আরও দক্ষ হতে হবে। মিয়ানমার প্রশ্নে বাংলাদেশকে আগ্রাসী হতে হবে। এক্ষেত্রে জাতিসংঘে সীমান্ত-সংকট নিয়ে পৃথক রেজোলিউশন, AA–জান্তা যুদ্ধে বাংলাদেশের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে আন্তর্জাতিক জনমত তৈরি, ভারতের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনবিষয়ক সমন্বয় বাড়ানো ও চীনের সঙ্গে মাদক রুট নিয়ন্ত্রণে বিশেষ আলোচনার উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। কূটনীতি ছাড়া এই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান অসম্ভব।কূটনৈতিক কৌশল: আরাকান আর্মি এখন রাখাইনের বাস্তব শক্তি। বাংলাদেশের উচিত- তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীনসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে আলোচনা জোরদার করা, সীমান্তে স্থিতি নিশ্চিত করতে মিয়ানমার সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানো, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে নতুন ভূরাজনীতির আলোকে পুনর্বিন্যস্ত করা। অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ ও সামাজিক পুনর্বাসন: মাদকবিরোধী অভিযান শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব নয়; স্কুল-কলেজ পর্যায়ে প্রতিরোধমূলক শিক্ষা, পরিবারভিত্তিক কাউন্সেলিং ও আসক্তদের পুনর্বাসন-এসব সামাজিক পদক্ষেপ সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সার্বিক বিবেচনায় দেখা যাচ্ছে সীমান্তে এখন একটি ‘নতুন যুদ্ধ’ শুরু হয়েছে। তবে এই যুদ্ধের রূপসংজ্ঞা প্রচলিত নয়। এই যুদ্ধ বন্দুকের নয়। বুলেটেরও নয়। বরং মাদক, সশস্ত্র রাজনীতি, আন্তর্জাতিক অপরাধ অর্থনীতি ও ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। বাংলাদেশের সীমান্তকে এখন শুধু পাহারা দিলেই চলবে না; পুনর্গঠন করতে হবে—প্রযুক্তি দিয়ে, কৌশল দিয়ে, রাজনীতি দিয়ে। রাষ্ট্র যদি এখনই সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে আরাকান আর্মির এই ‘মাদক সন্ত্রাস’ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলকে অদূর ভবিষ্যতে এক স্থায়ী নিরাপত্তা সংকটে ঠেলে দেবে।

লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।