
কাজী নজরুল ইসলাম পথের দিশা কবিতায় যে প্রশ্নটি ছুড়ে দিয়েছিলেন—
“রে অগ্রদূত, চলতে কি তুই পারবি আপন প্রাণ বাঁচিয়ে?”
আজ সেই প্রশ্ন পাহাড়ঘেরা আলীকদমে দাঁড়িয়ে থাকা সাংবাদিকতার বুকের ভেতর আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে।
কারণ আজ আলীকদম প্রেসক্লাব কোনো সাধারণ প্রশাসনিক টানাপোড়েনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে না। এটি একটি পরিকল্পিত নৈতিক দখলদারির মুখোমুখি। যেখানে ইতিহাস, গঠনতন্ত্র, অভিজ্ঞতা ও পেশাগত মর্যাদাকে পায়ের নিচে ফেলে দিয়ে ক্ষমতার জোরে ‘নতুন প্রেসক্লাব’ বানানোর অপচেষ্টা চলছে।
প্রেসক্লাব কি খেলনা?
নাকি ক্ষমতাবানের খেয়ালখুশির পরীক্ষাগার?
আলীকদম প্রেসক্লাবের একটি সুস্পষ্ট গঠনতন্ত্র আছে—১৯৯৯ সালে প্রণীত। সেখানে বলা আছে, পূণাঙ্গ সদস্য হতে হলে কমপক্ষে পাঁচ বছর প্রিন্ট মিডিয়ায় কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এটি কোনো বিলাসিতা নয়; এটি সাংবাদিকতার ন্যূনতম মানদণ্ড।
কিন্তু আজ সেই গঠনতন্ত্রকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, ফেসবুক আর অনলাইন নামসর্বস্ব তথাকথিত সংবাদদাতাদের দিয়ে প্রেসক্লাব সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রশ্ন হলো— এটি কি সাংবাদিকতার সম্প্রসারণ, নাকি সাংবাদিকতার অপমৃত্যু?
নজরুল এমন দৃশ্য আগেই দেখেছিলেন বলেই লিখেছিলেন—
“ছুঁড়ছে পাথর, ছিটায় কাদা, কদর্যের এই হোরী খেলায়
শুভ্র মুখে মাখিয়ে কালি ভোজপুরীদের হট্টমেলায়!”
আজ শুভ্র মুখে কালি মাখানো হচ্ছে একটি প্রতিষ্ঠানের—যার মাঠ সাংবাদিকতার বয়স ২৮ বছর। যার হাত ধরে এই প্রেসক্লাব এতদূর এগিয়েছে।
সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো—এই সংকটের পেছনে কোনো পেশাগত ব্যর্থতা নেই, কোনো আর্থিক দুর্নীতি নেই, কোনো সাংগঠনিক অযোগ্যতাও নেই। অভিযোগ একটাই— পরিবারের একজন সদস্যের ব্যক্তিগত অপকর্ম।
রাষ্ট্র কি তাহলে এখন বংশানুক্রমিক অপরাধে বিশ্বাস করে? একজন নাগরিকের দায় কি তার ভাইয়ের কাজের ওপর নির্ভর করবে? এই যুক্তি মানলে তো আইন, ন্যায়বিচার আর সভ্যতা—সবকিছুই ভেঙে পড়ে।
নজরুল একে বলেছিলেন ভয়ংকর ভণ্ডামি—
“ভগবান আজ ভূত হল যে পড়ে দশ-চক্র ফেরে”
আজ ন্যায়বোধও যেন ভূত হয়ে গেছে—ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু কারো বিবেক দখল করতে পারছে না।
প্রশাসন না প্রভু?
প্রশাসনের দায়িত্ব প্রতিষ্ঠান রক্ষা করা, ধ্বংস করা নয়। কিন্তু যখন প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে একটি স্বায়ত্তশাসিত পেশাজীবী প্রতিষ্ঠান ভেঙে ফেলার নির্দেশ আসে, তখন সেটি প্রশাসন থাকে না—তা হয়ে ওঠে প্রভুত্ববাদ।
প্রেসক্লাব কোনো সরকারি দপ্তর নয়।
এটি সাংবাদিকদের পেশাগত আশ্রয়স্থল।
এখানে ‘আহ্বায়ক কমিটি’ চাপিয়ে দেওয়া মানে হলো— সাংবাদিকতাকে নতজানু হতে বাধ্য করা।
নজরুল প্রশ্ন করেছিলেন—
“মন্ত্র কি তোর শুনতে দেবে নিন্দাবাদীর ঢক্কা-নিনাদ?” আজ নিন্দাবাদীর ঢক্কা এত জোরে বাজছে যে সত্যের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।
আলীকদমের প্রশ্ন, বাংলাদেশের প্রশ্ন
এটি শুধু আলীকদমের ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের প্রান্তিক সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ প্রশ্ন। আজ আলীকদমে যা হচ্ছে, কাল তা অন্য উপজেলায় হবে, পরশু অন্য জেলায়।
যদি ইতিহাসের ধারকরা সরিয়ে দেওয়া হয়,
যদি অভিজ্ঞতা অপরাধ হয়ে দাঁড়ায়,
যদি গঠনতন্ত্র মূল্যহীন হয়ে যায়—
তবে সাংবাদিকতা থাকবে না, থাকবে কেবল পরিচয়পত্রধারী অনুগত বাহিনী। অলরেডি অনুগত বাহিনীর বল্গাহীন লেজুড়বৃত্তি দেখা যাচ্ছে। এসব অগ্রিম কল্পনা করে বুঝি নজরুল তখনই সতর্ক করেছিলেন—
“জাতির পরাণ-সিন্ধু মথি স্বার্থ-লোভী পিশাচ যারা
সুধার পাত্র লক্ষীলাভের ক’রতেছে ভাগ বাঁটোয়ারা”।
আজ সেই ভাগ-বাঁটোয়ারার খেলাই চলছে।
প্রতিবাদই পথ:
এই লেখা কোনো করুণা ভিক্ষা নয়। এটি একটি স্পষ্ট উচ্চারণ— ষড়যন্ত্রকারীরা সময়ের কালস্রোতে ভেস্তে যাবে। প্রেসক্লাব আর প্রতিষ্ঠাতারা ঠিকে থাকবে অনন্তকালের ভেলার যাত্রী হয়ে।
কারণ এটি ইট-সিমেন্টের ভবন নয়; এটি ২৮ বছরের ঘাম, সাহস ও সত্যের ইতিহাস। নজরুল যে ‘অগ্রদূত’-এর খোঁজ করেছিলেন, আজ তার একটাই কাজ— ভয়কে অস্বীকার করে দাঁড়িয়ে থাকা। কারণ পথের দিশা হারালে শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, রাষ্ট্রও অন্ধ হয়ে যায়।
যখন প্রেসক্লাব ভাঙা হয়, তখন গণতন্ত্রও দুর্বল হয়
আলীকদম প্রেসক্লাব ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা প্রশ্নে কিছু কথা
কাজী নজরুল ইসলাম পথের দিশা কবিতায় যে প্রশ্নটি উচ্চারণ করেছিলেন—
“রে অগ্রদূত, চলতে কি তুই পারবি আপন প্রাণ বাঁচিয়ে?”
আজ তা কেবল কবিতার পঙ্ক্তি নয়, বাংলাদেশের প্রান্তিক সাংবাদিকতার বাস্তব প্রশ্ন।
আলীকদম প্রেসক্লাবের সাম্প্রতিক সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপের ধারাবাহিক বাস্তবতার আরেকটি অধ্যায়। এখানে প্রশ্ন কেবল একটি প্রেসক্লাবের নেতৃত্ব বা কমিটি নিয়ে নয়; প্রশ্নটি আরও গভীর—
কে নির্ধারণ করবে সাংবাদিকতার মানদণ্ড? সাংবাদিকরা, না ক্ষমতার বলয়?
গঠনতন্ত্র বনাম ক্ষমতার ইচ্ছা
আলীকদম প্রেসক্লাবের গঠনতন্ত্র ১৯৯৯ সালে প্রণীত। সেখানে সদস্যপদের জন্য স্পষ্ট শর্ত রয়েছে—ন্যূনতম পাঁচ বছরের প্রিন্ট মিডিয়ায় কাজের অভিজ্ঞতা। এটি কোনো ব্যক্তিগত শখ নয়; এটি পেশাগত শুদ্ধতার ভিত্তি।
কিন্তু আজ দেখা যাচ্ছে, সেই গঠনতন্ত্রকে উপেক্ষা করে, প্রেসক্লাব ভেঙে নতুন কাঠামো চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের সরিয়ে দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর তথাকথিত সংবাদকর্মীদের দিয়ে প্রেসক্লাব সাজানোর প্রস্তাব আসছে।
এটি কি আধুনিকায়ন?
নাকি সাংবাদিকতার প্রাতিষ্ঠানিক অবমূল্যায়ন?
নজরুল লিখেছিলেন—
“ছুঁড়ছে পাথর, ছিটায় কাদা, কদর্যের এই হোরী খেলায়
শুভ্র মুখে মাখিয়ে কালি…”
আজ সেই কাদা ছিটানো হচ্ছে সাংবাদিকতার শরীরে।
হস্তক্ষেপের নজির: নতুন কিছু নয়
দুঃখজনক হলেও সত্য—বাংলাদেশে সাংবাদিকতার ওপর প্রশাসনিক ও ক্ষমতাগত হস্তক্ষেপ নতুন নয়।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আমরা দেখেছি—
এসব ঘটনা প্রমাণ করে—সমস্যাটি ব্যক্তি নয়, কাঠামোগত।
পরিবার দায়ী নয়, দায় ব্যক্তি
একজন সাংবাদিকের আত্মীয়স্বজনের কর্মকাণ্ডকে অজুহাত বানিয়ে তাঁর পেশাগত অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ করা নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য। সভ্য রাষ্ট্রব্যবস্থায় অপরাধ ব্যক্তিগত, বংশানুক্রমিক নয়।
এই মৌলিক সত্য অস্বীকার করলে রাষ্ট্র আইনের নয়, প্রতিশোধের যন্ত্রে পরিণত হয়।
নজরুল এ ধরনের ভণ্ডামিকেই আঘাত করেছিলেন—
“ভগবান আজ ভূত হল যে পড়ে দশ-চক্র ফেরে”
আজ ন্যায়বোধও যেন দশ চক্রে ঘুরছে, কিন্তু কোথাও স্থির হচ্ছে না।
প্রেসক্লাব রাষ্ট্রের অধস্তন নয়
প্রেসক্লাব কোনো সরকারি দপ্তর নয়। এটি সাংবাদিকদের পেশাগত প্ল্যাটফর্ম, যেখানে স্বাধীন মত, অনুসন্ধানী দৃষ্টি ও নৈতিক অবস্থান লালিত হয়।
প্রশাসনের কাজ সহযোগিতা করা, দখল নেওয়া নয়।
কিন্তু যখন প্রশাসনিক নির্দেশে প্রেসক্লাব ভাঙার কথা ওঠে, তখন সেটি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট থাকে না—তা হয়ে ওঠে গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য অশনিসংকেত।
নজরুল প্রশ্ন করেছিলেন—
“মন্ত্র কি তোর শুনতে দেবে নিন্দাবাদীর ঢক্কা-নিনাদ?”
আজ ঢক্কা এত জোরে বাজছে যে যুক্তির শব্দ চাপা পড়ছে।
আলীকদমের সংকট, জাতীয় বার্তা
আলীকদমে যা ঘটছে, তা দেশের অন্য প্রান্তিক জনপদের জন্যও সতর্কবার্তা। আজ যদি ইতিহাসধারী সাংবাদিকদের সরিয়ে দেওয়া যায়, কাল যে কোনো জায়গায় একই কাজ করা যাবে।
তখন প্রেসক্লাব থাকবে, কিন্তু সাংবাদিকতা থাকবে না।
থাকবে পরিচয়পত্র, থাকবে ক্ষমতার ছায়া—কিন্তু থাকবে না স্বাধীন কণ্ঠ।
নজরুল তাই বলেছিলেন—
“জাতির পরাণ-সিন্ধু মথি স্বার্থ-লোভী পিশাচ যারা
সুধার পাত্র ক’রতেছে ভাগ বাঁটোয়ারা”
আজ সাংবাদিকতার সুধাপাত্রও সেই ভাগ-বাঁটোয়ারার টেবিলে।
শেষ কথা
এই লেখা কোনো ব্যক্তিগত আর্তি নয়।
এটি একটি পেশাগত উচ্চারণ—
প্রেসক্লাব ভাঙা মানে কেবল একটি ভবন ভাঙা নয়;
এটি সত্য বলার জায়গা সংকুচিত করা।
যে রাষ্ট্র সাংবাদিকতার কণ্ঠ রুদ্ধ করে, সে রাষ্ট্র একদিন নিজেই সত্যহীন হয়ে পড়ে।
পথের দিশা তাই এখনো একটাই—
ভয় নয়, নীতির পক্ষে দাঁড়ানো।
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব।
আপনার মতামত লিখুন :