অশ্রুজলের আয়নায় এক আদর্শ জনপদের স্বপ্ন


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : মার্চ ৭, ২০২৬, ৩:৩০ অপরাহ্ন /
অশ্রুজলের আয়নায় এক আদর্শ জনপদের স্বপ্ন

মমতাজ উদ্দিন আহমদ ―


মানুষের জীবনে কখনো কখনো এমন এক সময় আসে, যখন হৃদয়ের এক কূল ভেঙে অন্য কূল গড়ে ওঠে। এই ভাঙা-গড়ার শব্দ বাইরে খুব কমই শোনা যায়; কিন্তু অন্তরের গভীরে তা বজ্রপাতের মতো প্রতিধ্বনি তোলে। যাদের আমরা একদিন আপন ভেবেছিলাম, যাদের সান্নিধ্যে জীবনকে অর্থপূর্ণ বলে মনে হয়েছিল—সময়ের স্রোতে তারাই কখনো দূরের মানুষ হয়ে যায়, কখনো বা প্রতিপক্ষ। তবু এই বিচ্ছেদের মধ্যেও মানুষের প্রতি আমার আস্থা নষ্ট হয়নি।

কারণ মানুষের মধ্যেই আমি এক গভীর রহস্যের সন্ধান পাই। স্রষ্টাকে আমি প্রত্যক্ষ করিনি; কিন্তু ধূলিমাখা, ক্লান্ত, পাপলিপ্ত এই মানুষগুলোর মধ্যেই তাঁর অস্তিত্বের আভাস অনুভব করি। তাই যারা আজ আমাকে শত্রু মনে করে দূরে ঠেলে দিয়েছে, তাদের প্রতিও আমার রাগের চেয়ে মায়াই বেশি জাগে। একদিন তো তারাই আমার জন্য শুভকামনা করেছিল। আজ যদি তারা আমার পতন কামনা করে, তবু আমি মনে করি—সম্ভবত সেই কামনার মধ্যেও কোনো অদৃশ্য মঙ্গল নিহিত আছে।

মুসলিম দার্শনিক ইমাম আল-গাজ্জালী যেমন শিখিয়েছেন—মানুষের জীবনের প্রতিটি দুঃখ আসলে আত্মার এক একটি স্তর অতিক্রম করার সোপান। মানুষের অন্তর্জগতকে পরিশুদ্ধ করার জন্যই কখনো কখনো নিয়তি তাকে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করায়। তাই জীবনের আঘাত আমাকে ভেঙে দেয় না; বরং আমাকে নতুন করে নিজেকে চিনতে শেখায়।

নৈকট্যের নিষ্ঠুরতা ও মানুষের দ্বন্দ্ব:

জীবনের এক অদ্ভুত সত্য হলো—নৈকট্যের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে নিষ্ঠুরতার সম্ভাবনা। দূর থেকে চাঁদকে মনে হয় নির্মল ও কলঙ্কহীন; কিন্তু কাছে গেলে দেখা যায় তার গায়ে অগণিত অন্ধকার দাগ। বাতায়নের ফাঁক দিয়ে আসা সূর্যের আলো ঘরকে আলোকিত করে, অথচ সেই সূর্যের নিকটে গেলে তার তাপই আমাদের দগ্ধ করে দেয়।

মানুষের সম্পর্কও তেমনই। দূরত্ব অনেক সময় সৌন্দর্যকে রক্ষা করে, আর অতিরিক্ত নৈকট্য আমাদের সীমাবদ্ধতাকে নগ্ন করে তোলে।

এই সত্যকে ইতিহাসের আলোয় ব্যাখ্যা করেছিলেন মহান সমাজচিন্তক ইবনে খালদুন। তাঁর অমর গ্রন্থ ‘আল-মুকাদ্দিমা’-এ তিনি সমাজের শক্তির মূল হিসেবে যে ধারণাটি তুলে ধরেছিলেন, তা হলো আসাবিয়্যাহ—গোষ্ঠীগত সংহতি। একটি জাতির উত্থান কিংবা পতন অনেকাংশে নির্ভর করে এই নৈতিক ও সামাজিক ঐক্যের উপর। যখন মানুষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও নৈতিক শক্তি থাকে, তখন সমাজ এগিয়ে যায়; আর যখন বিভাজন ও অবিশ্বাস জন্ম নেয়, তখন সেই সমাজ দুর্বল হয়ে পড়ে।

আদর্শ ও যুক্তির মিলন:

মানুষের ইতিহাসে এমন কিছু মনীষী আছেন, যারা বিশ্বাস ও যুক্তির মধ্যে এক সেতুবন্ধন গড়ে তুলেছেন। আন্দালুসীয় দার্শনিক ইবনে রুশদ তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি দেখিয়েছিলেন—বিশ্বাস ও যুক্তি পরস্পরের বিরোধী নয়; বরং তারা একই সত্যের ভিন্ন দুই পথ।

আমি আমার ক্ষুদ্র জীবনেও সেই মিলনের পথেই চলতে চেয়েছি। আদর্শকে কেবল চিন্তার অলংকার হিসেবে নয়, কর্মের বাস্তবতায় প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছি। কারণ কর্মহীন আদর্শ যেমন নিস্তেজ, তেমনি আদর্শহীন কর্মও দিকহীন।

আলীকদমের পাহাড়ে রোপিত স্বপ্ন:

আমার দীর্ঘ আটাশ বছরের সাংবাদিকতা জীবন কেবল সংবাদ সংগ্রহের কাজ ছিল না; ছিল এক অনবরত সামাজিক সাধনা। পাহাড়ি জনপদ আলীকদমের নির্জন পথে পথে ঘুরে আমি চেষ্টা করেছি জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে। পাঠাগার গড়েছি, প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠা করেছি, মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছি আর তরুণদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ দিতে একটি আলীকদম কলেজ প্রতিষ্ঠার যারপরনেই উদ্যোগ নিয়েছি।

ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়ের বুর্দিয়ো বলেছিলেন—সমাজে শুধু অর্থই পুঁজি নয়; জ্ঞান, শিক্ষা ও সংস্কৃতিও এক ধরনের শক্তিশালী পুঁজি, যাকে তিনি কালচারাল ক্যাপিটাল ও সিম্বলিক ক্যাপিটাল নামে অভিহিত করেছিলেন। একটি সমাজ যত বেশি জ্ঞান ও সংস্কৃতির আলোয় সমৃদ্ধ হয়, তার ভিত ততই দৃঢ় হয়।

আমার এই সামান্য প্রয়াস ছিল সেই সাংস্কৃতিক পুঁজি নির্মাণের ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা।

এই স্বপ্নের ভেতরেই আমি খুঁজে পাই ইসলামী সমাজচিন্তার আরেক মহান আলোকবর্তিকা শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী–এর শিক্ষা। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘হুজজাতুল্লাহিল বালিগাহ’-এ তিনি যে সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক সাম্যের কথা বলেছেন, আমি আমার সামান্য ক্ষমতায় ২৮ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে আলীকদমের মানুষের জন্য সেই ন্যায্য অধিকারটুকুই চেয়েছি।

আদর্শ জনপদের স্বপ্ন:

মানবসভ্যতার ইতিহাসে আদর্শ সমাজের স্বপ্ন নতুন নয়। মুসলিম দার্শনিক আল-ফারাবী তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে একটি আদর্শ নগরের কল্পনা করেছিলেন—মদিনাতুল ফাদিলা, অর্থাৎ নৈতিকতা ও জ্ঞানের আলোয় নির্মিত একটি উত্তম সমাজ। সেখানে মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতা ও জ্ঞানের বিকাশই ছিল সামাজিক অগ্রগতির মূল ভিত্তি।

আমার আলীকদমের স্বপ্নও ঠিক তেমনই—একটি ছোট্ট পাহাড়ি জনপদ, যেখানে শিক্ষার আলো মানুষের জীবনকে আলোকিত করবে; যেখানে জ্ঞানের শক্তি মানুষকে মুক্ত করবে অজ্ঞতা ও সংকীর্ণতা থেকে।

উপসংহার: অশ্রুর ভেতরেই আলোর জন্ম

আমার বন-পাহাড়ের রাখাল ভাইয়েরা যে ভালোবাসার মালা আমার গলায় পরিয়েছে, সেটিই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্মান। ক্ষমতার পাহারাদাররা যতই চক্রান্ত করুক, আমি সত্য ও সৌন্দর্যের জয়গান গেয়ে যাব।

পথে কাঁটা আছে, আঘাত আছে, রক্তক্ষরণও আছে—কিন্তু গন্তব্যের দিশা তাতে বদলায় না। পথের কাঁটা আমার পা রক্তাক্ত করতে পারে, কিন্তু আমার গন্তব্য পাল্টে দিতে পারবে না।

আমি তাই আজও সেই নির্ভীক তরুণদের ডাক দিয়ে ফিরি—যারা যশের কাঙাল নয়, সত্যের সাধক; যারা দারিদ্র্যকে ভয় পায় না, অন্যায়ের সামনে মাথা নত করে না। তারাই একদিন নতুন ভাবধারার বীজ বুনবে, তারাই গাইবে আগামী দিনের গান।

অশ্রুজলের মুকুরে যে প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে, তা দুর্বলতার নয়—সেটি এক অদম্য আত্মার প্রতিচ্ছবি। আর সেই প্রতিচ্ছবিতেই আমি দেখতে পাই ভবিষ্যতের প্রভাত।

লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

তারিখ: ০৭.০৩.২০৩৬ খ্রি.