
আলীকদম উপজেলার তৈনখালের বুক চিরে নৌকা এগিয়ে চলেছে। দুই তীরের পাহাড় যেন ক্রমশ আরও কাছে সরে আসছে। কোথাও বাঁশঝাড়, কোথাও গর্জন, চাপালিশ, তেলসুর আর বুনো কলাগাছের ঘন সমাবেশ। মনে হচ্ছিল, পাহাড় দু’হাত প্রসারিত করে জলধারাটিকে আগলে রেখেছে।
এই জলধারার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মনে হলো- একটি খালেরও তো জীবন আছে। আছে জন্ম, নাম, ইতিহাস, স্মৃতি। প্রতিটি বাঁক যেন অতীতের একটি করে অধ্যায়। প্রতিটি ঢেউ যেন বহন করে নিয়ে চলেছে বহু শতাব্দীর পদচিহ্ন।
তাই নৌকার দুলুনির মাঝেই মনে পড়ল তৈনখালের ইতিহাস।
প্রথম দর্শনে তৈনখালকে কেবল একটি পাহাড়ি খাল মনে হতে পারে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে এটি মাতামুহুরীর প্রাণস্পন্দনের অন্যতম প্রধান শিরা। খরস্রোতা মাতামুহুরীর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপনদী হিসেবে এটি চিম্বুক পর্বতশ্রেণির পশ্চিম ঢাল এবং মাতামুহুরী সংরক্ষিত অরণ্যের পূর্বপ্রান্তের অনুচ্চ পাহাড়মালা থেকে উৎসারিত হয়েছে। অসংখ্য ঝিরি ও পাহাড়ি জলধারা একত্র হয়ে এঁকেবেঁকে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত আলীকদমের ঐতিহাসিক আলীর পাহাড়ের পাদদেশে এসে মাতামুহুরীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে।
এই মিলন যেন দুটি জলধারার নয়, দুটি ইতিহাসেরও।
তৈনখালের নামও বহন করে একটি দীর্ঘ জনপদের স্মৃতি।
প্রথম পড়ুন: (প্রথম পর্ব : পাহাড়ের আহ্বান) “তৈনখাল ভ্রমণ ও থাঙ্কুয়াইন ঝর্ণা দর্শন”
পঞ্চদশ শতকের সূচনালগ্নে আরাকানের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নির্যাতনের মুখে দৈনাংক বা বর্তমান তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠীর একটি অংশ দলপতি মারেক্যা এবং তৈন সুরেশ্বরীর নেতৃত্বে পশ্চিমমুখী যাত্রা শুরু করেন। বহু দুর্গম পথ অতিক্রম করে তাঁরা এসে আশ্রয় নেন আজকের আলীকদমের এই অরণ্যঘেরা উপত্যকায়। প্রথম বসতি গড়ে ওঠে এই জলধারার তীরেই।
জনশ্রুতি বলে, মৈসাং রাজার কনিষ্ঠ পুত্র তৈন সুরেশ্বরীর স্মৃতিকে ধারণ করেই খালটির নাম রাখা হয়েছিল ‘তৈনছড়ি’। সময়ের দীর্ঘ প্রবাহে উচ্চারণ বদলেছে, শব্দের রূপ পাল্টেছে। ‘তৈনছড়ি’ একসময় মানুষের মুখে মুখে হয়ে উঠেছে তৈনখাল।
ইতিহাসের এই স্মৃতি কেবল লোককথায় সীমাবদ্ধ নয়। চাকমা রাজবংশের বংশানুক্রমিক বিবরণগ্রন্থ শ্রীশ্রী রাজনামা বা চাকমা রাজন্যবর্গ গ্রন্থেও মৈসাং রাজার উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখান থেকে জানা যায়, মৈসাং ছিলেন চাকমা রাজবংশের ২০২তম রাজা এবং তাঁর পূর্বসূরি মংছুই ছিলেন ২০১তম রাজা। এই তথ্যগুলো তৈনখালের নামকরণের পেছনের ঐতিহ্যকে আরও দৃঢ় ভিত্তি দেয়।
আরও একটি লোকবিশ্বাস আজও পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়ায়। বলা হয়, মাতামুহুরী ও তৈনছড়ির মোহনায়, বর্তমান আলীকদমের জলাভূমি অঞ্চলে বাঁশ-বেতের এক অস্থায়ী সিংহাসনে বসেই তৈন সুরেশ্বরী তাঁর অনুসারীদের নিয়ে নতুন জীবনের সূচনা করেছিলেন। কিংবদন্তির সত্যতা যাচাই করা কঠিন; কিন্তু পাহাড়ি জনপদের ইতিহাসে এ ধরনের লোকস্মৃতি প্রায়ই লিখিত ইতিহাসের সমান্তরাল দলিল হয়ে ওঠে।
তৈনখালের সৌন্দর্যে শুধু স্থানীয় মানুষই মুগ্ধ হননি; ঔপনিবেশিক আমলেও এই জলধারা বিদেশি অভিযাত্রীদের বিস্মিত করেছিল।
১৮৬৬ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ক্যাপ্টেন টি. এইচ. লেউইন। পরের বছর তিনি তৈনখালের উজানে ভ্রমণ করেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Hill Tracts of Chittagong and the Dwellers Therein-এ তিনি এই জলধারার যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা আজও বাংলা পাহাড়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রকৃতিচিত্র হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তিনি লিখেছিলেন, নুড়িপাথরে ভরা সরু খালের বুক দিয়ে দ্রুতবেগে জল বয়ে চলেছে। দুই পাশের প্রায় উল্লম্ব পাহাড় এত উঁচু যে সূর্যের আলো কেবল ফাঁকফোকর গলে এসে পানির ওপর ক্ষণিকের দীপ্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে। মাথার অনেক ওপরে ঝুলে আছে বিশাল বৃক্ষফার্ন। আর শাখাহীন সুউচ্চ গর্জনগাছ দাঁড়িয়ে আছে যেন কোনো প্রাচীন মন্দিরের শুভ্র স্তম্ভ। সেই সবুজের অন্তরাল ভেদ করে কলাগাছের স্বচ্ছ পান্নারঙা পাতা আলোকে আরও অলৌকিক করে তুলেছে।
প্রায় দেড়শো বছর পেরিয়ে গেছে।
কিন্তু আজও তৈনখালের বুক দিয়ে নৌকায় ভেসে চললে মনে হয়, লেউইনের সেই বিস্ময় যেন একটুও পুরোনো হয়নি। পাহাড়ের রং বদলেছে, মানুষের বসতি বেড়েছে, অনেক পাথর হারিয়ে গেছে-তবু জল, আলো, অরণ্য আর নৈঃশব্দ্যের যে অনির্বচনীয় মেলবন্ধন তিনি দেখেছিলেন, তার রেশ এখনো বাতাসে ভেসে বেড়ায়।
ইতিহাসের এই দীর্ঘ জলরেখা মনে নিয়েই আমরা আবার ফিরে এলাম বর্তমানের অভিযাত্রায়।
সকাল তখন প্রায় নয়টা পেরিয়েছে।
তৈনখালের উজানে আমাদের নৌকা এগিয়ে চলেছে অজানা এক জলপ্রপাতের দিকে, আর পাহাড় যেন প্রতি মুহূর্তে নতুন নতুন বিস্ময়ের দুয়ার খুলে দিচ্ছে।
(চলবে – তৃতীয় পর্ব : নৌযাত্রা, পাহাড়, পাখি এবং তৈনখালের রূপের উন্মোচন)
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
মোবাইল: 01556-560126 / 01645-950296
তারিখ: ০৩/০৮/2026 খিষ্টাব্দ।
আপনার মতামত লিখুন :