
✍️ মমতাজ উদ্দিন আহমদ
প্রথম অধ্যায়: পাহাড়ের নিরবতায় একটি প্রশ্ন
বান্দরবান জেলার দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত আলীকদম উপজেলা। এখানে পাহাড় আর পাহাড়, আকাশ ছোঁয়া শিখরমালা, আর তার বুকে বসে থাকা একটি ছোট জনপদ। প্রায় ৮৮৫.৭৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই অঞ্চলে বাস করে প্রায় ৬৫ হাজার মানুষ—বাঙ্গালী, ম্রো, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা এবং চাকমা সম্প্রদায়ের এক অনন্য সমন্বয়।
কিন্তু এই সুন্দর পাহাড়ি অঞ্চলে একটি দীর্ঘ নিরবতা ছিল—শিক্ষার নিরবতা। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও ২০২৩ সাল পর্যন্ত এখানে কোনো কলেজ ছিল না। দুর্গম পাহাড়ি পথ, সীমিত যোগাযোগ ব্যবস্থা, আর মিয়ানমার সীমান্তের নৈকট্য—এই সবকিছু মিলে তৈরি করেছিল একটি শিক্ষাগত দ্বীপ, যেখানে তরুণরা স্বপ্ন দেখতে পারতো না, কারণ স্বপ্ন দেখার জন্য আলোর দরকার।
এই পটভূমিতেই জন্ম নেয় একটি প্রশ্ন: কেন একটি প্রান্তিক অঞ্চলের সন্তানরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত থাকবে? কেন ভৌগোলিক দূরত্ব হবে জ্ঞানের বাধা?
দ্বিতীয় অধ্যায়: অন্ধকারের পরিসংখ্যান
আলীকদম উপজেলার গড় সাক্ষরতার হার মাত্র ৩১.৩ শতাংশ। এই সংখ্যা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়—এটি একটি সামাজিক বাস্তবতা, একটি মানবিক ট্র্যাজেডি।
কল্পনা করুন: একজন মেধাবী শিক্ষার্থী, যার স্বপ্ন ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়া। কিন্তু তার গ্রামে কোনো কলেজ নেই। তাকে যেতে হবে ৮০-১০০ কিলোমিটার দূরে। দরিদ্র পরিবারের জন্য এটি অসম্ভব। ফলে প্রতি বছর শত শত প্রতিভা হারিয়ে যায় পাহাড়ের কোলে।
এই শিক্ষাগত শূন্যতা তৈরি করে এক “উন্নয়ন ফাঁদ”। শিক্ষার অভাব অর্থনৈতিক সুযোগ সীমিত করে। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা আবার শিক্ষায় বিনিয়োগকে অসম্ভব করে তোলে। এভাবে একটি প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম একই বঞ্চনার চক্রে আবদ্ধ থাকে।
বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। দুর্গম পাহাড়ি পথে একা বা অনিরাপদ যাতায়াত—এই কারণে অনেক পরিবার তাদের মেয়েদের দূরের কলেজে পাঠাতে সাহস করে না। ফলে মেধাবী নারী শিক্ষার্থীরা ঘরে বসে থাকে, তাদের সম্ভাবনা কখনো বিকশিত হয় না।
তৃতীয় অধ্যায়: আলোর সূচনা
এই অন্ধকারের মধ্যেই একটি স্বপ্ন জেগে ওঠে। স্থানীয় নেতৃত্ব, প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ২০২৩ খ্রিস্টাব্দের ৭ জুলাইয়ের একসভায় সিদ্ধান্ত হয় আলীকদম কলেজ প্রতিষ্ঠার। গঠিত হয় ১৯ সদস্যের সাংগঠনিক কমিটি। এই কমিটি থেকে বাছাইকৃত ৪ জন উদ্যোক্ত মিলে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডে আবেদন করেন আলীকদম কলেজ স্থাপন অনুমতি পাওয়ার।
২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড থেকে প্রশাসনিক অনুমোদন পায় এই কলেজ। আর ২০২৫ সালের ২৮ জুলাই পায় পাঠদানের অনুমতি। এটি শুধু একটি প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন নয়—এটি একটি প্রান্তিক জনপদের জন্য নতুন দিগন্তের উন্মোচন।
কলেজটির স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মিত হচ্ছে ৮.৮৪ একর জমির ওপর। আধুনিক একাডেমিক ভবন, ছাত্রাবাস, সীমানা প্রাচীর, দৃষ্টিনন্দন গেইট—সবকিছুই নির্মাণাধীন। ইতোমধ্যে নিজস্ব অর্থানুকুল্যে তৈরী হয়েছে সেমিপাকা একাডেমিক ভবন। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ এবং জেলা প্রশাসন একসাথে বিনিয়োগ করেছে ৩ কোটিরও বেশি টাকা। জমি পাওয়া গেছে দানপত্রের মাধ্যমে। এছাড়াও ২ লাখ টাকা হারে অনুদান দিয়েছেন একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান।
এই বিনিয়োগ শুধু ইট-পাথরের নয়। এটি আশা, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যতের বিনিয়োগ।
চতুর্থ অধ্যায়: জাতীয়করণের অর্থ
আলীকদম কলেজের জাতীয়করণ একটি সাধারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি একটি বহুমাত্রিক নীতিগত পদক্ষেপ।
প্রথমত, এটি সংবিধান স্বীকৃত শিক্ষার মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নের একটি পদক্ষেপ। সরকারি ব্যবস্থাপনায় এলে শিক্ষার ব্যয় কমে যায়। দরিদ্র এবং প্রান্তিক পরিবারের শিক্ষার্থীরা তখন সহজেই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। একটি মেধাবী কিন্তু গরিব শিক্ষার্থী আর অর্থের অভাবে স্বপ্ন দেখতে পারবে না।
দ্বিতীয়ত, এটি নারী শিক্ষার প্রসারে যুগান্তকারী প্রভাব ফেলবে। স্থানীয় একটি সরকারি কলেজ থাকলে নিরাপত্তা এবং সাংস্কৃতিক কারণে অনেক পরিবার তাদের মেয়েদের উচ্চশিক্ষায় পাঠাতে সাহস করবে। ফলে নারী শিক্ষার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
তৃতীয়ত, এটি সীমান্ত অঞ্চলের সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা জোরদার করবে। গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক সুযোগের অভাব তরুণদের বিপথগামী হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। একটি কার্যকর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তরুণদের ইতিবাচক ধারায় সম্পৃক্ত করে এবং সামাজিক সংহতি গড়ে তোলে।
পঞ্চম অধ্যায়: সাংস্কৃতিক সেতু
আলীকদম কলেজ শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি একটি সাংস্কৃতিক সেতু।
এই অঞ্চলে বাস করে বাঙালী, ম্রো, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা এবং চাকমা সম্প্রদায়। প্রতিটি সম্প্রদায়ের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য রয়েছে। একটি কলেজ এই বৈচিত্র্যকে সম্মান করে, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের তরুণদের একসাথে নিয়ে আসে এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া তৈরি করে।
শিক্ষার মাধ্যমে এই বৈচিত্র্য হয়ে ওঠে শক্তি, বিভাজন নয়।
ষষ্ঠ অধ্যায়: চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনা
কিন্তু পথ মসৃণ নয়। অতীতে অনেক কলেজ জাতীয়করণের পর শিক্ষক সংকটে পড়েছে। শিক্ষক আত্তীকরণে বিলম্ব হলে একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
আলীকদম কলেজের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি এড়াতে প্রয়োজন পরিকল্পিত শিক্ষক নিয়োগ এবং অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা। শুরু থেকেই অভিজ্ঞ শিক্ষকদের নিয়োগ দিতে হবে। অস্থায়ী ভিত্তিতে যোগ্য শিক্ষকদের রাখতে হবে, যাতে কোনো শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
একই সাথে অবকাঠামো উন্নয়নও অব্যাহত রাখতে হবে। পাঠাগার, ল্যাবরেটরি, খেলার মাঠ—সবকিছুই প্রয়োজন।
কিন্তু এই চ্যালেঞ্জগুলো অসম্ভব নয়। সঠিক পরিকল্পনা এবং সদিচ্ছা থাকলে সবকিছু সম্ভব।
সপ্তম অধ্যায়: অর্থনৈতিক প্রভাব
একটি কলেজ শুধু শিক্ষা প্রদান করে না—এটি অর্থনৈতিক উন্নয়নও আনে।
শিক্ষিত জনশক্তি হয়ে ওঠে উন্নয়নের চালিকা শক্তি। আলীকদম কলেজ থেকে বেরিয়ে আসা শিক্ষার্থীরা হবে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, ব্যবসায়ী। তারা শুধু নিজেদের জীবন পরিবর্তন করবে না, বরং তাদের অঞ্চলের উন্নয়নেও অবদান রাখবে।
কলেজ নির্মাণের কাজ স্থানীয় শ্রমিকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। কলেজ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সেবা (খাদ্য সরবরাহ, পরিবহন, নির্মাণ) স্থানীয় উদ্যোক্তাদের ব্যবসার সুযোগ তৈরি করবে।
এভাবে একটি কলেজ হয়ে ওঠে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু।
অষ্টম অধ্যায়: নিরাপত্তা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা
আলীকদম মিয়ানমার সীমান্তের কাছে অবস্থিত। এই অঞ্চলের নিরাপত্তা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা জাতীয় নিরাপত্তার সাথে জড়িত।
শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক সুযোগের অভাব তরুণদের বিপথগামী করে তোলে। তারা হয়ে ওঠে অপরাধ বা অন্যান্য অবৈধ কাজের সহজ শিকার। কিন্তু শিক্ষা এবং সুযোগ থাকলে তারা ইতিবাচক কাজে নিয়োজিত হয়।
আলীকদম কলেজ তাই শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার একটি হাতিয়ার।
নবম অধ্যায়: স্বপ্ন দেখার অধিকার
একটি মেয়ে, নাম ফাতিমা। তার বয়স ১৮ বছর। তার স্বপ্ন ডাক্তার হওয়া। কিন্তু তার গ্রাম আলীকদমে কোনো কলেজ নেই। তার পরিবার গরিব, দূরের কলেজে পাঠানোর সামর্থ্য নেই। তাই তার স্বপ্ন থেকে যায় স্বপ্ন, বাস্তব হয় না।
কিন্তু এখন আলীকদম কলেজ হয়েছে। ফাতিমা এখন তার গ্রামেই কলেজে পড়তে পারবে। তার স্বপ্ন এখন বাস্তব হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এটাই আলীকদম কলেজের প্রকৃত অর্থ—প্রান্তিক জনপদের সন্তানদের স্বপ্ন দেখার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া।
দশম অধ্যায়: ভবিষ্যতের রোডম্যাপ
আলীকদম কলেজ এখন একটি ইন্টারমিডিয়েট কলেজ। কিন্তু ভবিষ্যতে এটি হবে একটি সম্পূর্ণ ডিগ্রি কলেজ। তারপর হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়।
এই রোডম্যাপ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন:
দ্রুত পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক স্বীকৃতি প্রদান — কলেজটিকে সম্পূর্ণ একাডেমিক স্বীকৃতি দিতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে।
অগ্রাধিকারভিত্তিতে জাতীয়করণ — কলেজটিকে দ্রুত জাতীয়করণ করতে হবে, যাতে শিক্ষার ব্যয় কমে এবং আরও বেশি শিক্ষার্থী উপকৃত হয়।
আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় — শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য সংস্থার মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে।
অবকাঠামো উন্নয়ন — পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, পার্বত্য জেলা পরিষদ এবং শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ সমন্বয় করতে হবে।
পরিকল্পিত শিক্ষক নিয়োগ — শুরু থেকেই যোগ্য এবং অভিজ্ঞ শিক্ষকদের নিয়োগ দিতে হবে।
৩-৫ বছরের মধ্যে ডিগ্রি কলেজে উন্নীতকরণ — এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য, কিন্তু অর্জনযোগ্য।
একাদশ অধ্যায়: উপসংহার—একটি কৌশলগত রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ
আলীকদম কলেজের একাডেমিক স্বীকৃতি এবং জাতীয়করণ কোনো সাধারণ উন্নয়ন প্রকল্প নয়। এটি একটি কৌশলগত রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ।
স্বাধীনতা পরবর্তীকাল থেকে এই জনপদে কলেজ সৃষ্টি না হওয়ায় উল্লেখযোগ্য শিক্ষিত নেতৃত্ব গড়ে উঠেনি। ফলে অর্ধশিক্ষিত নেতৃত্বের কাছে বারবার ধরাশয়ী হয়েছে এই জনপদের মাটি, মানুষ ও প্রকৃতি।
এটি একদিকে শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করবে। অন্যদিকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে জাতীয় উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত করবে। একই সাথে সীমান্ত অঞ্চলের নিরাপত্তা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আলীকদম কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুবিধা পাবে না। বরং এটি একটি জ্ঞানভিত্তিক, সচেতন এবং সক্ষম সমাজে রূপান্তরের পথে এগিয়ে যাবে।
তাই নীতিনির্ধারকদের জন্য এটি এখন আর একটি বিকল্প নয়। এটি একটি অপরিহার্য দায়িত্ব।
পাহাড়ের কোলে জ্ঞানের এই আলো যেন কখনো নিভে না। যেন প্রতিটি শিশু, প্রতিটি নারী, প্রতিটি পরিবার এই আলোর সুবিধা পায়। সেটাই হোক আলীকদম কলেজের প্রকৃত সার্থকতা।
স্বপ্ন দেখুন। শিখুন। এগিয়ে যান।
এটাই আলীকদম কলেজের বার্তা।
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
মোবাইল: 01556-560126 / 01645-950296
ইমেইল: momtaj.news@gmail.com
তারিখ: 05/05/2026 খিষ্টাব্দ।
আপনার মতামত লিখুন :