
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত বান্দরবান জেলার আলীকদম উপজেলা ভৌগোলিকভাবে দেশের দশম বৃহত্তম প্রশাসনিক একক, যার আয়তন ৮৮৫.৭৭ বর্গ কিলোমিটার। এই অঞ্চলটি দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি এবং সীমিত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে ঐতিহাসিকভাবে উচ্চশিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল। প্রায় ৬৫ হাজার মানুষের এই জনপদটি ম্রো, মারমা, ত্রিপুরাসহ বাঙালি সম্প্রদায়ের মিশ্র সংস্কৃতি ধারণ করে। কৌশলগতভাবে মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন হওয়ায়, আলীকদম শুধু একটি প্রশাসনিক একক নয়, বরং এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। উচ্চশিক্ষার এই দীর্ঘদিনের শূন্যতা পূরণের লক্ষ্যে স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণের উদ্যোগে আলীকদম কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানটিকে দ্রুত একাডেমিক স্বীকৃতি ও পরবর্তীকালে জাতীয়করণের মাধ্যমে সরকার তার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা, অর্থাৎ শিক্ষাক্ষেত্রে সমতা ও পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারে।
নীতিগত প্রস্তাবনা:
আলীকদম কলেজকে দ্রুত চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক পূর্ণ একাডেমিক স্বীকৃতি প্রদান করা এবং অনতিবিলম্বে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক এটিকে সরকারি (জাতীয়করণকৃত) ঘোষণা করা অপরিহার্য। এই দ্বৈত পদক্ষেপের প্রত্যাশিত নীতিগত ফলাফল সুদূরপ্রসারী: ১. সংবিধানের মৌলিক অধিকার (শিক্ষা) নিশ্চিতকরণ: এটি দেশের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলে সংবিধানের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করবে। ২. সামাজিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা জোরদার: শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম গড়ে ওঠার মাধ্যমে সীমান্ত এলাকায় সামাজিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা জোরদার হবে। ৩. আঞ্চলিক উন্নয়ন ত্বরান্বিতকরণ: এটি আঞ্চলিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশের শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে।
জাতীয়করণের সপক্ষে যুক্তি:
আলীকদম কলেজের দাবিটি তিনটি প্রধান নীতিগত মানদণ্ডে সম্পূর্ণরূপে পরিপূরক: ১. ‘কলেজবিহীন উপজেলায় একটি কলেজ সরকারীকরণ’ নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ: ২০২৩ সাল পর্যন্ত আলীকদম একটি স্বতন্ত্র উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানবিহীন উপজেলা ছিল। ২. কৌশলগত প্রয়োজন: পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং সীমান্ত নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য কলেজটির জাতীয়করণ একটি কৌশলগত প্রয়োজন। ৩. প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি: স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় কলেজটি ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের প্রাথমিক অনুমোদন (২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর) এবং পাঠদানের মঞ্জুরি (২০২৫ সালের ২৮ জুলাই) লাভ করে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করেছে।
আলীকদমের ভৌগোলিক, আর্থ-সামাজিক এবং শিক্ষাগত চ্যালেঞ্জসমূহ:
ভূপ্রকৃতি ও সীমান্তের কৌশলগত গুরুত্ব: আলীকদম বান্দরবানের পার্বত্য অঞ্চলের অদূরে অবস্থিত হলেও এর ভূপ্রকৃতি অত্যন্ত বন্ধুর। এর বিশাল আয়তন (৮৮৫.৭৭ বর্গ কিমি) এবং সীমিত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে স্থানীয় জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং তাদের দোরগোড়ায় উচ্চশিক্ষা পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত কঠিন। এই দুর্গমতা শিক্ষার বিকেন্দ্রীকরণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ না থাকায় স্থানীয় শিক্ষার্থীরা, বিশেষত নারীরা, পার্শ্ববর্তী লামা বা জেলা সদরে গিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না। আলীকদমের এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে, শিক্ষার প্রসারের মাধ্যমে স্থানীয় নাগরিক সমাজকে শক্তিশালী করা একটি জাতীয় কৌশল হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত, যা সীমান্ত এলাকার নিরাপত্তা রক্ষায় পরোক্ষভাবে সহায়ক হবে।
জনসংখ্যা ও নৃগোষ্ঠীগত বৈচিত্র্য: আলীকদম একটি মিশ্র জনপদ, যেখানে চাকমা, মারমা, ম্রো, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। এই বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীকে জাতীয় উন্নয়নের মূলধারায় আনতে হলে শিক্ষায় সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা অপরিহার্য। তবে এখানকার গড় সাক্ষরতার হার মাত্র ৩১.৩%। জাতীয় গড়ের (যা বর্তমানে ৭৪% এর কাছাকাছি) তুলনায় এই হার নির্দেশ করে যে, দীর্ঘ কয়েক দশকে এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষাগত সুযোগ সৃষ্টিতে রাষ্ট্রীয়ভাবে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল। আলীকদম কলেজ স্থাপন ও জাতীয়করণ করা হলে এই ঐতিহাসিক নীতিগত ব্যর্থতা সংশোধিত হবে এবং বৃহত্তর মানবসম্পদ উন্নয়নে সরাসরি বিনিয়োগ নিশ্চিত হবে।
উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঐতিহাসিক বঞ্চনা ও কলেজবিহীন থাকার প্রভাব : স্বাধীনতার ৫২ বছর অতিবাহিত হলেও, আলীকদম উপজেলায় ২০২৩ সাল পর্যন্ত কোনো স্বতন্ত্র উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না। এই দীর্ঘদিনের শিক্ষাগত শূন্যতার কারণে স্থানীয় মেধাবী তরুণরা উচ্চশিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এর ফলস্বরূপ, স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষিত পেশাজীবী ও নেতৃত্বের অভাব সৃষ্টি হয়েছে, যা উপজেলাটির সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক ও প্রশাসনিক উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এই পরিস্থিতিকে স্থানীয় উন্নয়নে একটি ‘উন্নয়ন ফাঁদ’ (ডেভেলপমেন্ট ট্র্যাপ) হিসেবে আখ্যা দেওয়া যায়। কলেজটিকে জাতীয়করণের মাধ্যমে শিক্ষিত স্থানীয় নেতৃত্ব তৈরির পথ সুগম করা প্রয়োজন, যাতে এই অঞ্চলের প্রশাসন ও সমাজ পরিচালনায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়।
কলেজের স্বীকৃতি ও জাতীয়করণের সপক্ষে বিস্তারিত যুক্তি:
সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য শিক্ষা নিশ্চিতকরণ: আলীকদম দেশের দশম বৃহত্তম উপজেলা এবং এখানকার প্রায় ৬৫ হাজার জনসংখ্যা দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে। জাতীয়করণের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি শিক্ষার ব্যয়কে সরকারি মানদণ্ডে নিয়ে আসে, যা সাশ্রয়ী শিক্ষা নিশ্চিত করে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যাতায়াত ব্যয়বহুল হওয়ায়, উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য পার্শ্ববর্তী উপজেলা বা জেলা সদরে যাওয়া অত্যন্ত ব্যয়সাধ্য। জাতীয়করণ করা হলে কলেজের ফি কাঠামো সরকারি মানদণ্ডে আসবে, যা শিক্ষার্থীদের ওপর আর্থিক চাপ কমাবে এবং শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার কমাতে সরাসরি সাহায্য করবে। প্রান্তিক অঞ্চলের জন্য সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য এটিই একমাত্র টেকসই এবং দীর্ঘমেয়াদী পথ।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষার অধিকার নিশ্চিতকরণ: আলীকদম কলেজ জাতীয়করণ হলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত হবে। এই কলেজ ম্রো, ত্রিপুরা, মারমা ও চাকমাসহ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উচ্চশিক্ষা গ্রহণের একমাত্র ভরসা। কলেজটি জাতীয়করণ করা হলে এটি সরকারি সুযোগ-সুবিধা, উন্নত অবকাঠামো এবং মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগের নিশ্চয়তা বাড়াবে, যা সকল প্রান্তিক শিক্ষার্থীর শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করবে। এছাড়া, কলেজটি জাতীয়করণ হলে এটি পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কর্তৃক পরিচালিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বৃত্তির জন্য আরও উপযোগী ও স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পাবে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, এই দুর্গম এলাকায় নারী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ প্রায় অসম্ভব ছিল। কলেজের জাতীয়করণ হলে ছাত্রাবাসসহ উন্নত অবকাঠামো তৈরি হবে, যা নারীর উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণের হার বহুগুণে বাড়াতে সহায়ক হবে। এই প্রক্রিয়ায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য প্রণীত উচ্চশিক্ষার কোটা ব্যবস্থা কার্যকর করা সম্ভব হবে।
বৈষম্য দূরীকরণ ও সরকারি শিক্ষানীতির প্রতিফলন: বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী সকল নাগরিকের জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। আলীকদমের মতো আর্থ-সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া এবং বৃহৎ একটি উপজেলায় দীর্ঘকাল ধরে কোনো স্বতন্ত্র কলেজ না থাকা ছিল একটি বড় নীতিগত বৈষম্য। স্থানীয় উদ্যোগে এটি স্থাপিত হওয়ায়, এটিকে দ্রুত একাডেমিক স্বীকৃতি শেষে জাতীয়করণ করা হলে তা সরকারের ‘শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য দূরীকরণ’ নীতির একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। আলীকদম কলেজবিহীন উপজেলা হওয়ায় এটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কলেজ সরকারীকরণের মূল শর্ত সরাসরি পূরণ করে। জাতীয়করণ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষককে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (শিক্ষা) ক্যাডারের অধীনে নিয়ে আসে, যা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার গুণগত মান উন্নত করার জন্য অপরিহার্য। প্রত্যন্ত অঞ্চলে মেধাবী ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের দীর্ঘমেয়াদী নিয়োগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে এখানকার শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা সম্ভব হবে।
সীমান্ত নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা: আলীকদম উপজেলাটি কৌশলগতভাবে মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন হওয়ায় এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্ত এলাকার তরুণদের শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত রাখলে তারা নানা ধরনের অসামাজিক কার্যকলাপে বা সহিংস গোষ্ঠীগুলোতে সহজে জড়িয়ে পড়তে পারে। গবেষণায় দেখা যায়, অর্থনৈতিক সুযোগ ও শিক্ষার অভাব তরুণদের বিদ্রোহে অংশগ্রহণের দিকে চালিত করে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘাতের ইতিহাস বিবেচনায়, একটি মানসম্মত ও জাতীয়করণকৃত কলেজ তরুণদের শিক্ষামুখী করে সমাজের মূলধারায় আনবে এবং সামাজিক সংহতি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এই পদক্ষেপটিকে নিছক একটি শিক্ষামূলক ব্যয় হিসেবে না দেখে, এটিকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য করা উচিত।
আঞ্চলিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর বিনিয়োগ : স্থানীয় জনগণের উদ্যোগে কলেজটি স্থাপিত হলেও, এর নিয়মিত পরিচালন ব্যয়, উন্নত ল্যাবরেটরি স্থাপন, আধুনিক পাঠাগার তৈরি এবং মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগের জন্য বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থের জোগান অপরিহার্য। এই কলেজের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে ইতোমধ্যে আঞ্চলিক সংস্থাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড প্রায় ২ কোটি টাকা এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ ছাত্রাবাস নির্মাণ ও সীমানা প্রাচীরের জন্য অতিরিক্ত ১.০৩ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। জেলা প্রশাসকও ২০ লাখ টাকার অনুদান ঘোষণা দিয়ে ১০ লাখ টাকার চেক প্রদান করেছেন। এই সম্মিলিত আঞ্চলিক বিনিয়োগ (যা ৩.২৬ কোটি টাকার বেশি) নিশ্চিত করে যে সরকার জাতীয়করণের পর তাৎক্ষণিক মূলধনী ব্যয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ থেকে রেহাই পাচ্ছে। সরকারের দায়িত্ব হবে এখন এই সম্পদকে ক্যাডার শিক্ষক নিয়োগ এবং স্থায়ী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী টেকসই রূপ দেওয়া।
আলীকদম কলেজের প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি ও অগ্রগতি:
স্থাপন ও অনুমোদনের আইনি প্রক্রিয়া (২০২৩-২০২৫): আলীকদম কলেজ স্থানীয় জনগণের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার ফল, যা স্থানীয় প্রশাসন এবং উদ্যোক্তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে দ্রুত আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। ২০২৩ সালের ১০ জুলাই ১৯ সদস্যবিশিষ্ট একটি কলেজ স্থাপন কমিটি গঠন করা হয়। তাদের সক্রিয় উদ্যোগের ফলে ২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড থেকে কলেজ স্থাপনের প্রশাসনিক অনুমোদন লাভ করে। এরপর, ২০২৫ সালের ২৮ জুলাই বোর্ডের মঞ্জুরি ও অনুমোদন প্রাপ্তির মাধ্যমে আলীকদম কলেজ আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠদানের অনুমতি পায়। স্থাপনা অনুমোদনের মাত্র আট মাসের মধ্যে পাঠদানের অনুমতি প্রাপ্তি প্রমাণ করে যে স্থানীয় কলেজ কমিটি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার (জনাব মনজুর আলম, যিনি কলেজ কমিটির সভাপতি) দ্রুত গতিতে বোর্ডের পরিদর্শন ছকের শর্তাবলী পূরণ করেছেন। এই দ্রুত অগ্রগতি জাতীয়করণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা ও সদিচ্ছার প্রমাণ বহন করে।
প্রয়োজনীয় ভূমি ও অবকাঠামোগত ভিত্তি: কলেজটির স্থায়ী ক্যাম্পাস আলীকদম উপজেলার তারাবুনিয়া এলাকায় ৮.৮৪ একর দান ও ক্রয়সূত্রে অর্জিত জমিতে স্থাপিত, যা প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। অবকাঠামোগত উন্নয়নে আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর বিনিয়োগ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড ইতোমধ্যে প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন পাঁচতলা ফাউন্ডেশন বিশিষ্ট একাডেমিক ভবন নির্মাণ করছে, যেখানে লিফট সুবিধাও থাকবে। পাশাপাশি, বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের ৫৮ লাখ টাকার বরাদ্দে সীমানা প্রাচীর এবং ছাত্রাবাস নির্মাণে অতিরিক্ত ৪৫ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এই সকল নির্মাণ কাজ কলেজের দ্রুত সম্প্রসারণ ও মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করেছে।
আঞ্চলিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সম্মিলিত বিনিয়োগ: কলেজটিতে আঞ্চলিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সম্মিলিত বিনিয়োগ এই প্রতিষ্ঠানের আঞ্চলিক গুরুত্বকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ মিলে ইতোমধ্যে ৩.২৬ কোটি টাকার বেশি অর্থ অবকাঠামো উন্নয়নে নিশ্চিত করেছে। জেলা প্রশাসকও উন্নয়ন তহবিলে ২০ লাখ টাকার অনুদান ঘোষণা করেছেন। এই বৃহৎ বিনিয়োগ স্থানীয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে একটি স্থায়ী উচ্চশিক্ষার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন। জাতীয়করণ করা হলে এই বিনিয়োগ সরকারি সম্পদে পরিণত হবে এবং কলেজের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্বের গ্যারান্টি দেবে।
জাতীয়করণ নীতিমালার প্রেক্ষাপটে আলীকদম কলেজ: আলীকদম কলেজের সরকারীকরণ প্রক্রিয়াটি সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষক ও কর্মচারী আত্তীকরণ বিধিমালা, ২০১৮ (এস.আর.ও.নং-২৪৫-আইন/২০১৮)-এর আওতায় সম্পন্ন হবে। এই বিধিমালা অনুযায়ী, জাতীয়করণের জন্য কলেজ পরিচালনা পর্ষদকে অবশ্যই প্রতিষ্ঠানের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি সরকারের নির্দেশনা অনুসারে রেজিস্ট্রিকৃত দলিলমূলে সরকারের অনুকূলে হস্তান্তর করতে হবে। আলীকদম কলেজের ক্ষেত্রে, স্থানীয় কমিটির এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সক্রিয় সদিচ্ছা থাকায় এই প্রক্রিয়াটি দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব। কলেজটিকে ‘নির্বাচিত বেসরকারি কলেজ’ হিসেবে চিহ্নিতকরণের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি করা আবশ্যক।
শিক্ষক নিয়োগে স্থিতাবস্থা ও বর্তমান সংকট: জাতীয়করণের পর প্রায়শই যে ঐতিহাসিক ঝুঁকিটি সৃষ্টি হয়, তা হলো শিক্ষক সংকট। ২০১৬ সালের পর জাতীয়করণকৃত ৩২১টি কলেজের অধিকাংশেই দীর্ঘসূত্রতা এবং বাংলাদেশ সরকারী কর্ম কমিশনের (PSC) মাধ্যমে শিক্ষক আত্তীকরণে বিলম্বের কারণে ব্যাপক শিক্ষক শূন্যতা (প্রায় অর্ধেক পদ খালি) সৃষ্টি হয়েছে। আলীকদম যেহেতু একটি নতুন প্রতিষ্ঠান, এখানে জাতীয়করণের প্রক্রিয়া শুরুর সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষক সংকট সৃষ্টি হলে, প্রতিষ্ঠানের সূচনাতেই একাডেমিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। এই অচলাবস্থা এড়ানোর জন্য, জাতীয়করণের প্রজ্ঞাপন জারির সঙ্গে সঙ্গেই মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরকে (মাউশি) একটি বিশেষ অ্যাড-হক নীতি গ্রহণ করতে হবে। এই নীতির অধীনে, পিএসসি কর্তৃক স্থায়ী ক্যাডার শিক্ষক নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত, চুক্তিভিত্তিক বা ডেপুটেশন-এর মাধ্যমে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের পদায়ন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে শিক্ষার গুণগত মান বজায় থাকে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের ক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা: পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য বিশেষ বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে, যেখানে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন এবং উচ্চশিক্ষার কোটা বৃদ্ধির মাধ্যমে স্থানীয় ছেলেমেয়েদের উচ্চতর শিক্ষার পথ সুগম করার কথা বলা হয়েছে। আলীকদম কলেজকে জাতীয়করণ করা হলে এটি কেবল সাধারণ সরকারি কলেজ হিসেবে পরিচালিত না হয়ে, বরং একে সিএইচটি অঞ্চলের জন্য প্রণীত বিশেষ উন্নয়ন নীতির কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এই অঞ্চলে সাংস্কৃতিক ও মাতৃভাষাভিত্তিক পাঠ্যক্রমের সঙ্গে জাতীয় শিক্ষানীতির সমন্বয় সাধন করা প্রয়োজন, যা সামাজিক সংহতি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে এবং শিক্ষিত জনগোষ্ঠী স্থানীয় নেতৃত্ব ও গণতান্ত্রিক চর্চাকে শক্তিশালী করবে।
উপসংহার ও নীতিগত সুপারিশমালা: আলীকদম কলেজের একাডেমিক স্বীকৃতি ও জাতীয়করণের দাবিটি কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন নয়, বরং এটি প্রান্তিক অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়ন, রাষ্ট্রীয় অগ্রগতি এবং শিক্ষাক্ষেত্রে সমতা প্রতিষ্ঠার একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ। ভৌগোলিক দুর্গমতা, নিম্ন সাক্ষরতার হার এবং ঐতিহাসিক শিক্ষাগত বঞ্চনার প্রেক্ষাপটে, আলীকদম কলেজের দ্রুত জাতীয়করণ একটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে নিম্নলিখিত সুনির্দিষ্ট নীতিগত পদক্ষেপগুলো গ্রহণের সুপারিশ করা হলো:
১. একাডেমিক স্বীকৃতি দ্রুত জারি: শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ (মাউশি) অবিলম্বে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সাথে সমন্বয় করে ২৮ জুলাই ২০২৫ তারিখে প্রাপ্ত পাঠদানের অনুমতির ভিত্তিতে কলেজের পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক স্বীকৃতি দ্রুত জারি করার জন্য নির্দেশ দেবে।
২. ‘নির্বাচিত বেসরকারি কলেজ’ হিসেবে প্রজ্ঞাপন জারি: আলীকদম উপজেলা সরকারি কলেজবিহীন থাকায়, অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত হিসেবে দ্রুত চিহ্নিত করে ‘নির্বাচিত বেসরকারি কলেজ’ হিসেবে প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে।
৩. আন্তঃমন্ত্রণালয় সহযোগিতা: আলীকদমের সংবেদনশীল সীমান্ত অবস্থানের কারণে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি উচ্চ-পর্যায়ের কমিটি গঠন করা উচিত, যাতে জাতীয়করণ প্রক্রিয়াটিকে দ্রুত নিষ্পত্তি করা যায় এবং শিক্ষাকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা এজেন্ডার অংশ হিসেবে দেখা হয়।
৪. শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সম্পৃক্তি: আঞ্চলিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর (সিএইচটিবিডি/বিএইচডিসি) অর্থায়নে নির্মিত অবকাঠামোতে মানসম্মত ল্যাবরেটরি, উন্নত পাঠাগার ও ডিজিটাল ক্লাসরুম স্থাপনের জন্য শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরকে (ইইডি) অবিলম্বে সম্পৃক্ত করতে হবে, যা স্থায়ী ও উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করবে।
৫. শূন্যপদ পূরণে বিশেষ নীতি: জাতীয়করণের গেজেট জারির পর সৃষ্ট নিয়োগ নিষেধাজ্ঞার কারণে শিক্ষক সংকট এড়াতে, মাউশি অবিলম্বে একটি বিশেষ অ্যাড-হক নীতি গ্রহণ করে অস্থায়ী বা ডেপুটেশন-এর মাধ্যমে অভিজ্ঞ শিক্ষক পদায়ন নিশ্চিত করবে, যতক্ষণ না পিএসসি কর্তৃক স্থায়ী ক্যাডার শিক্ষক নিয়োগ সম্পন্ন হয়।
৬. পূর্ণাঙ্গ ডিগ্রি কলেজে উন্নীতকরণের রূপরেখা: আলীকদম এবং বৃহত্তর অঞ্চলের উচ্চশিক্ষার চাহিদা পূরণের জন্য, জাতীয়করণের পর ৩-৫ বছরের মধ্যে কলেজটিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একটি পূর্ণাঙ্গ ডিগ্রি কলেজে (অনার্স কোর্স সহ) উন্নীতকরণের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে, যা সিএইচটিবিডি কর্তৃক নির্মিত ৫-তলা ফাউন্ডেশনের একাডেমিক ভবনকে কাজে লাগাবে।
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
মোবাইল: 01556-560126 / 01645-950296
ইমেইল: momtaj.news@gmail.com
তারিখ: ২১/০৪/2026 খিষ্টাব্দ।
আপনার মতামত লিখুন :