
মানুষের দুঃখের একটি আশ্চর্য অভ্যাস আছে। সে নিজের বর্তমান ঠিকানায় খুব কমই থাকে। যে মানুষ আজ পৃথিবীর এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে বিষণ্ন, সে ভাবে, অন্য কোথাও গেলে তার মন ভালো হবে। সে মনে করে অন্য শহরে, অন্য দেশে, অন্য সংসারে, অন্য কোনো জীবনেই বুঝি সুখ লুকিয়ে আছে। কেউ ভাবে ধনসম্পদ এলে সুখ আসবে। কেউ ভাবে প্রিয় মানুষটি ফিরে এলে সমস্ত শূন্যতা ভরে যাবে। কেউ ভাবে এই পৃথিবীর কোলাহল ছেড়ে দূর কোনো গ্রহে গিয়ে বসবাস করতে পারলেই শান্তি মিলবে। মানুষের কল্পনা তাই সুখের জন্য একের পর এক নতুন ঠিকানা বানায়।
কখনো সেই ঠিকানার নাম হয় মঙ্গলগ্রহ। পৃথিবীর অসহ্য দুঃখ, সম্পর্কের ক্লান্তি, জীবনের অনিশ্চয়তা এবং নিজের ভিতরের অস্থিরতা থেকে পালিয়ে আমরা ভাবি ওপারে নিশ্চয়ই সব ভালো। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যিই স্থান বদলাই, নাকি শুধু নিজের অশান্তিকে সঙ্গে নিয়ে নতুন স্থানে পৌঁছাই?
মহাবিশ্বের বহু গ্রহের মাঝে মঙ্গলগ্রহ আমাদের কল্পনায় এক দূরবর্তী সম্ভাবনা। এই গ্রহ পৃথিবীর দুঃখ থেকে বহু দূরে, মানুষের সংঘাত থেকে মুক্ত, এক অচেনা নক্ষত্রলোকে অবস্থিত। সেখানে যাওয়ার পথ দীর্ঘ, কঠিন ও প্রায় অসম্ভব। মহাকাশযানে গেলে মাসের পর মাস, ধীরগতির বাহনে গেলে শত শত বছর, আর পায়ে হেঁটে গেলে কয়েক হাজার বছর লেগে যেতে পারে। সুখের সন্ধানে আমরা যত দূরেই যেতে চাই, সুখ কোনো ভৌগোলিক গন্তব্য নয়।
পৃথিবী ছেড়ে মঙ্গলে পৌঁছালেই যদি দুঃখের অবসান হতো, তবে মানুষ সুখের জন্য শুধু একটি উন্নত যান ও একটি মহাকাশপথের অপেক্ষা করত। কিন্তু দুঃখ কোনো গ্রহের মাটিতে পড়ে থাকা পাথর নয় যে স্থান বদলালেই তাকে পেছনে ফেলে আসা যাবে। দুঃখের একটি অংশ বাইরের ঘটনায় জন্ম নেয়, কিন্তু তার দীর্ঘস্থায়িত্ব নির্ভর করে আমাদের ভিতরের প্রতিক্রিয়ার ওপর। অপমানের মুহূর্ত কয়েক সেকেন্ডের; কিন্তু অপমানের স্মৃতি আমরা বছরের পর বছর বয়ে বেড়াই। বিচ্ছেদ একটি ঘটনা; অথচ তার অনুরণন আমাদের মনে অসংখ্যবার পুনর্জন্ম নেয়। বাহিরের ঘটনা ক্ষণস্থায়ী হতে পারে, কিন্তু অন্তরের পুনরাবৃত্তিই তাকে দীর্ঘ দুঃখে পরিণত করে।
তাই মানুষ বারবার ভাবে সুখের নদী এ পারে না ওপারে? এ পাড়ের মানুষ ভাবে, ওপারে স্বর্গসুখ; ওপারের মানুষ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবে, প্রকৃত সুখ তো এ পাড়েই পড়ে আছে। দুই পাড়ের মাঝখানে নদী বয়ে যায়, আর মানুষ তার ওপারে সুখের প্রতিচ্ছবি দেখতে দেখতে নিজের পায়ের নিচের মাটিকে অবহেলা করে।
এই উপমার সৌন্দর্য এখানেই যে সুখকে আমরা প্রায়ই ‘অন্যত্র’ নির্বাসিত করি। বর্তমান জীবনকে অসম্পূর্ণ মনে হয়, কারণ আমাদের চোখ ভবিষ্যৎ, অতীত অথবা দূরবর্তী কোনো কল্পিত ভূখণ্ডে নিবদ্ধ থাকে। আমরা ভাবি, যে মুহূর্তটি এখনো আসেনি, সেখানেই পূর্ণতা। যে জায়গায় এখনো যাইনি, সেখানেই মুক্তি। যে মানুষটি এখনো আমাদের জীবনে আসেনি, সেখানেই ভালোবাসার শেষ আশ্রয়। অথচ সুখের সবচেয়ে বড় শত্রু অনেক সময় দুঃখ নয় সুখের প্রতি আমাদের ভুল ধারণা।
সুখকে যদি আমরা সব সমস্যার অনুপস্থিতি বলে মনে করি, তবে পৃথিবীর কোথাও তার সন্ধান পাব না। কারণ সমস্যা, যন্ত্রণা, ক্ষয়, বিচ্ছেদ ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টির অবিচ্ছেদ্য অংশ। নদীর এ পাড়ে যেমন ঢেউ আছে, ওপারেও তেমনি ঢেউ। পৃথিবীতে যেমন ঝড় আছে, মঙ্গলগ্রহেও তেমনই নীরব নিঃসঙ্গতা থাকতে পারে। স্থান বদলালেই অস্তিত্বের মৌলিক প্রশ্ন বদলায় না।
চোখ বন্ধ করলেই মানুষের সামনে এক বিশাল জগৎ খুলে যায় স্মৃতি, অনুভূতি, ভয়, আকাঙ্ক্ষা, কল্পনা, অভিমান, ভালোবাসা এবং অনুচ্চারিত কথার জগৎ। এই জগৎ বাইরে দৃশ্যমান নয়, কিন্তু আমাদের জীবনের অধিকাংশ সিদ্ধান্ত, আনন্দ ও বেদনা সেখানেই গঠিত হয়।
কেন বহু বছর আগে দেখা কোনো মুখ হঠাৎ শরতের বিকেলে মনে পড়ে চোখ ভিজিয়ে দেয়? কেন একটি পুরোনো গান আমাদের এমন এক সময়ে ফিরিয়ে নিয়ে যায়, যে সময়কে আমরা ভেবেছিলাম ভুলে গেছি? কেন কোনো সামান্য শব্দ বুকের গভীরে বহুদিনের ঘুমন্ত ক্ষত জাগিয়ে তোলে? কারণ মানুষ কেবল বাহ্যিক ঘটনার মধ্যে বাস করে না; সে বাস করে ঘটনার অর্থে, স্মৃতির ব্যাখ্যায় এবং অনুভূতির অনুরণনে।
সুখ তাই কেবল বাহির থেকে পাওয়া কোনো বস্তু নয়। সে জন্ম নেয় আমরা কীভাবে জীবনকে দেখি, কীভাবে ঘটনাকে ব্যাখ্যা করি, কীভাবে ক্ষতকে ধারণ করি এবং কীভাবে অস্থিরতার মধ্যেও নিজের ভিতরে একটি সমন্বিত আশ্রয় নির্মাণ করি তার ওপর। অন্তর্জগতকে বোঝা মানে নিজের প্রতিটি অনুভূতিকে জোর করে দমন করা নয়। বরং অনুভূতিকে চিনতে শেখা, তার উৎস বুঝতে শেখা এবং তাকে নিজের সমগ্র অস্তিত্বের কর্তা হতে না দেওয়া।
প্রকৃত সুখ পেতে হলে নিজের ভিতরকে ‘ডিজাইন’ করতে হবে। এই ‘ডিজাইন’ এর অর্থ হলো নিজের চেতনার ভিত নির্মাণ করা। যেমন একজন স্থপতি জানেন, ঝড় থামানো তার হাতে নেই, কিন্তু এমন একটি ঘর নির্মাণ করা তার হাতে আছে যার ভিত্তি ঝড়ে সহজে ভেঙে পড়বে না। তেমনি মানুষও জীবনের প্রতিটি ঝড় বন্ধ করতে পারে না, কিন্তু নিজের প্রতিক্রিয়াকে ধীরে ধীরে পরিণত, সংযত ও স্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
নিজেকে নির্মাণের প্রথম ধাপ আত্মপরিচয়। আমি কীসে আহত হই? কোন স্মৃতি আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে? কোন ভয় আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে? আমি কি অন্যের কথায় নিজের মূল্য নির্ধারণ করি? আমি কি সুখকে ভবিষ্যতের কাছে বন্ধক রেখেছি? এই প্রশ্নগুলো অস্বস্তিকর, কিন্তু আত্মজিজ্ঞাসার দরজা খুলে দেয়। যে মানুষ নিজের ভিতরের অন্ধকারকে দেখতে শেখে, সে ধীরে ধীরে অন্ধকারের সঙ্গে সহাবস্থান ও তার রূপান্তরের কৌশলও আয়ত্ত করতে পারে।
অন্তর্জগতের ওপর কাজ করার কথা শুনে কেউ ভাবতে পারেন, তবে কি বাইরের অন্যায়, দারিদ্র্য, অসুস্থতা বা সামাজিক সংকটের গুরুত্ব নেই? অবশ্যই আছে। সুখকে শুধু ব্যক্তিগত মানসিক কৌশলে সীমাবদ্ধ করা যায় না। মানুষের পরিবেশ, সম্পর্ক, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা তার সুস্থতায় গভীর প্রভাব ফেলে। কিন্তু বাহিরের বাস্তবতা যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, তার সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটি গড়ে ওঠে অন্তরের মধ্যস্থতায়।
অন্তরের শক্তি মানে অন্যায় মেনে নেওয়া নয়। বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েও নিজেকে ঘৃণা ও প্রতিহিংসার আগুনে সম্পূর্ণ পুড়িয়ে না ফেলা। দুঃখকে অস্বীকার নয়, দুঃখের দ্বারা সম্পূর্ণ সংজ্ঞায়িত না হওয়াই আত্মমুক্তি। বাইরের ঝড় থামবে কি না, তা সবসময় আমাদের হাতে নেই। কিন্তু ঝড়ের ভিতর দাঁড়িয়ে আমরা দিশেহারা হব, নাকি ধীরে ধীরে পথ খুঁজব তার কিছুটা সিদ্ধান্ত আমাদের।
মঙ্গলগ্রহ এখানে কোনো জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গন্তব্যের চেয়ে বেশি। এটি মানুষের দূরবর্তী সুখের কল্পনার প্রতীক। আমরা যে সুখকে সবসময় দূরের কোনো ‘ওপারে’ খুঁজি, মঙ্গলগ্রহ সেই ভ্রমেরই মহাজাগতিক রূপ। পৃথিবী থেকে মঙ্গলে যাওয়ার কল্পনা আমাদের হাসায়, কিন্তু নিজের বর্তমান থেকে ভবিষ্যতের কোনো কাল্পনিক সুখে পালিয়ে যাওয়ার অভ্যাসটি আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা।
শেষ পর্যন্ত হয়তো বুঝতে হয়, মঙ্গলগ্রহে পৌঁছেও মানুষ নিজের মনকে সঙ্গে নিয়ে যাবে। তার পুরোনো ভয়, অপূর্ণতা, অভিমান ও অস্থিরতা মহাকাশযানের লাগেজে নয়, চেতনার গভীরে বহন করবে। তাই পালানোর আগে, স্থান বদলানোর আগে, অন্য জীবনের স্বপ্ন দেখার আগে নিজের ভিতরের ভূগোলটি একবার পড়া দরকার। সেখানে কোনো শুকনো মরুভূমি আছে, কোথাও অযত্নে পড়ে থাকা স্মৃতির বন, কোথাও জমে থাকা অশ্রুর হ্রদ, আবার কোথাও এমন এক নির্মল আকাশ যার দিকে আমরা বহুদিন তাকাইনি।
সুখ নদীর এ পাড়ে নয়, ওপারেও নয়; মঙ্গলগ্রহে নয়, দূর নক্ষত্রের কোনো অজানা আলোতেও নয়। সুখের প্রথম বীজ রোপিত হয় মানুষের অন্তরে। তাকে লালন করতে হয় সচেতনতা দিয়ে, সেচ দিতে হয় আত্মজিজ্ঞাসা দিয়ে, আর ঝড়ের মধ্যেও তাকে টিকিয়ে রাখতে হয় সংযম, অর্থপূর্ণ সম্পর্ক ও সৎ জীবনের আলোয়।
অতএব সুখের সন্ধানে পৃথিবী ত্যাগের আগে নিজের অন্তরে ফিরে এসো। কারণ অনেক সময় আমরা যে স্বর্গের জন্য দূর আকাশে যাত্রা করতে চাই, তার প্রথম দরজাটি নীরবে খুলে থাকে আমাদের নিজের হৃদয়ের ভিতরেই।
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
মোবাইল: 01556-560126 / 01645-950296
তারিখ: 8/29/2026 খিষ্টাব্দ।
আপনার মতামত লিখুন :