আলীকদমের সাহিত্য ও সংস্কৃতি: অরণ্য জনপদের মননশীল জাগরণ


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : জুন ২১, ২০২৬, ১২:২১ অপরাহ্ন / ০
আলীকদমের সাহিত্য ও সংস্কৃতি: অরণ্য জনপদের মননশীল জাগরণ

।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ ।।


আলীকদমের অতীত শুধু পাহাড়, নদী, অরণ্য ও জনপদের ক্রমবিকাশের বিবরণ নয়; এর অন্তরালে নিহিত রয়েছে মানুষের স্বপ্ন, স্মৃতি, সৃজনশীলতা এবং সাংস্কৃতিক আত্মপ্রকাশের এক সুদীর্ঘ আখ্যান। মাতামুহুরীর স্রোতধারা যেমন যুগে যুগে এই জনপদের ভৌগোলিক সত্তাকে নির্মাণ করেছে, তেমনি মানুষের ভাষা, গান, লোককথা, সাহিত্য ও শিল্পচর্চা নির্মাণ করেছে এর আত্মিক ভূগোল। ইতিহাসের পৃষ্ঠায় যুদ্ধ, রাজনীতি, প্রশাসনিক পরিবর্তন কিংবা জনবসতির বিবর্তনের কথা যতটা লিপিবদ্ধ হয়েছে, সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাস ততটা সংরক্ষিত হয়নি। ফলে আলীকদমের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের বহু অধ্যায় আজও লোকস্মৃতি, মৌখিক বয়ান ও বিচ্ছিন্ন তথ্যের মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে।

পার্বত্য জনপদের স্বভাবই এমন―এখানে প্রকৃতি মানুষের প্রথম শিক্ষক, পাহাড় প্রথম আশ্রয়, আর লোকসংস্কৃতি প্রথম পাঠশালা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ম্রো, চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, মারমা, ত্রিপুরা ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর সহাবস্থান এই অঞ্চলে এক অনন্য সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণের জন্ম দিয়েছে। জুমের গান, পাহাড়ি উপাখ্যান, লোকবিশ্বাস, উৎসব-পার্বণ, বয়নশিল্প, বাদ্যযন্ত্র এবং মৌখিক কাব্যধারা এ জনপদের সাংস্কৃতিক জীবনকে সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু এসব ঐতিহ্যের অধিকাংশই ছিল স্মৃতিনির্ভর; লিখিত রূপে সংরক্ষণের প্রয়াস ছিল সীমিত।

তবু ইতিহাসের অন্তঃসলিলা ধারার মতো সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রবাহ কখনো থেমে থাকেনি। পাহাড়ের নির্জনতা, মাতামুহুরীর কলতান, বর্ষার মেঘমালা এবং মানুষের সংগ্রামী জীবন ধীরে ধীরে সৃজনশীল প্রকাশের ভাষা খুঁজে নিয়েছে। আশির দশক থেকে শুরু হওয়া বিচ্ছিন্ন সাহিত্যচর্চা, স্থানীয় ম্যাগাজিন প্রকাশ, সাংস্কৃতিক সংগঠনের উত্থান, সাংবাদিকতার বিকাশ এবং পরবর্তীকালে গ্রন্থপ্রকাশের ধারাবাহিকতা আলীকদমকে একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়ের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

আধুনিক কালে আলীকদম প্রেসক্লাব, স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহ, শিক্ষক, কবি, গবেষক ও লেখকদের সম্মিলিত প্রয়াস এ জনপদের সাংস্কৃতিক জাগরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সাহিত্যচর্চা এখানে কেবল নান্দনিক অনুশীলন নয়; বরং ইতিহাস সংরক্ষণ, আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান এবং প্রজন্মান্তরে স্মৃতি হস্তান্তরের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই আলীকদমের সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাস মূলত একটি জনপদের আত্মসন্ধান, আত্মমর্যাদা ও সাংস্কৃতিক বিকাশের ইতিহাস।

তবে এ জনপদের সাহিত্যচর্চার লিখিত দলিল খুব বেশি পাওয়া যায় না। পাহাড়ের নীরবতা, মাতামুহুরীর স্রোতধারা এবং অরণ্যের গভীরতা দীর্ঘকাল মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করলেও সেই অনুভবের সাহিত্যিক রূপায়ণের তথ্য বিচ্ছিন্ন ও সীমিত।

প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, আশির দশকে (১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে) প্রয়াত সাংবাদিক শ্রী উচ্চতমনি তঞ্চঙ্গ্যা সম্পাদনায় ‘পাহাড়িক গুঞ্জন’ নামে একটি ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়েছিল। এটি ছিল আলীকদমের সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চার প্রাচীনতম লিখিত নিদর্শনগুলোর অন্যতম। দুর্ভাগ্যবশত এর কোনো কপি বর্তমানে অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি। জীবদ্দশায় উচ্চতমনি তঞ্চঙ্গ্যা নিজেও জানিয়েছিলেন যে, তাঁর কাছেও এর কোনো সংরক্ষিত কপি অবশিষ্ট নেই। তবুও ‘পাহাড়িক গুঞ্জন’-এর নাম আজও আলীকদমের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এক অগ্রদূতের স্মারক হয়ে আছে।

স্বাধীনতা-উত্তর আলীকদমে সাহিত্যচর্চার একটি সুস্পষ্ট ধারা গড়ে উঠতে শুরু করে নব্বই দশকের শেষভাগে। ২০০৮ সালের অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয় সাংবাদিক ও গবেষক মমতাজ উদ্দিন আহমদের গ্রন্থ ‘প্রেক্ষণ: পার্বত্য চট্টগ্রাম গিরিনন্দিনী আলীকদম’। আলীকদমের ইতিহাস, ভূগোল, সমাজ, সংস্কৃতি ও সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে রচিত এই গ্রন্থটি দীর্ঘদিন ধরে উপজেলাটিকে জানার অন্যতম প্রামাণ্য পরিচিতি-গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

পরবর্তীকালে ২০১১ সালের অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয় তাঁর গবেষণাগ্রন্থ ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের মুরুং উপজাতী’। পাহাড়ের অন্যতম ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মুরুং (ম্রো) জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন, সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও সামাজিক ঐতিহ্য নিয়ে রচিত এই গ্রন্থটি পার্বত্য নৃ-সংস্কৃতি গবেষণার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

একই সময়ে আলীকদমে কবিতা ও সৃজনশীল সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রেও নতুন জাগরণ দেখা যায়। শিক্ষক ও কবি জয়নব আরা বেগম ― যাঁর কলমে শব্দ আর শিক্ষকতার চক ধুলো মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় ― ২০১৭ সালের একুশে বইমেলায় পাঠকের হাতে তুলে দেন তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সমর্পিত শব্দাবলী’। এই শিরোনামেই যেন লুকিয়ে আছে কবির আত্মনিবেদনের ভাষ্য ― শব্দের কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়ার এক নীরব প্রতিজ্ঞা।

পরের বছর, আরও গভীর এক উপলব্ধি নিয়ে আসে দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘আঁধার ক্ষেত্রে বুনেছি ভোরের বীজ’। নামটি নিজেই একটি কবিতা ― যেখানে হতাশার অন্ধকারেও আশার বীজ বোনার সাহস দেখান কবি, যেন প্রতিটি দুঃসময় থেকেই জন্ম নেয় নতুন ভোরের সম্ভাবনা।

এই দুটি কাব্যগ্রন্থের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে কবির বহুমাত্রিক জীবনদর্শন। এক হাতে তিনি জীবনকে দেখেছেন নানা কোণ থেকে, নানা ব্যাখ্যায়; অন্য হাতে এঁকেছেন মাতামুহুরী নদীর কলধ্বনি, পাহাড়ের নীরব উচ্চতা আর সেখানকার মানুষের সহজ-সরল জীবনযাত্রার নান্দনিক ছবি। প্রকৃতি যেন তাঁর কাছে শুধু পটভূমি নয়, বরং জীবন্ত এক চরিত্র ― যার সাথে কথা বলে কবির অন্তর্গত সত্তা।

আবার একই সাথে তাঁর কবিতা নিছক প্রকৃতিপ্রেমেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সমাজের অসঙ্গতি, মানবিক যন্ত্রণা ও সংবেদনশীলতার প্রতিও তাঁর কলম সোচ্চার হয়েছে বারবার। প্রকৃতি আর সমাজ ― এই দুই বিপরীত মেরুকে এক সুতোয় গাঁথার এক বিরল কাব্যিক দক্ষতা প্রদর্শন করেছেন কবি জয়নব আরা বেগম, যা তাঁকে সমকালীন কবিদের মধ্যে এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

২০১৯ সালে প্রকাশিত তাঁর গবেষণাগ্রন্থ ‘প্রাথমিক শিক্ষা: মননে-স্বরূপে’ শিক্ষাচিন্তা ও শিক্ষাব্যবস্থার ওপর একটি মূল্যবান সংযোজন। এই বইটি প্রাথমিক শিক্ষার ওপর গবেষণাধর্মী একটি মননশীল বই। এখানে লেখকের দেখা বাংলাদেশ ও ইংল্যণ্ডের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার ওপর তুলনামূলক বিশ্লেষণা যেমন আছে তেমনি রয়েছে প্রাথমিক শিক্ষার মননশীল বিকাশের ওপর যুগপৎ ধারণার সাবলীল প্রকাশ।

২০১৯ সালে প্রকাশিত হয় ‘দামতুয়া বান্দরবান ভ্রমণ গাইড’, যার রচয়িতা মমতাজ উদ্দিন আহমদ ও রফিক উল্লাহ। পার্বত্য বান্দরবানের পর্যটন, ইতিহাস ও ভ্রমণ-তথ্যভিত্তিক এ গ্রন্থ পর্যটক ও গবেষকদের জন্য সমানভাবে সহায়ক। বিশেষ করে এই ভ্রমণ গাইডে বান্দরবানের সকল পর্যটনস্থানে সচিত্র ভ্রমণ যেভাবে বিন্যস্ত হয়েছে তেমনিভাবে আলীকদম উপজেলার প্রায় ৩০টি পর্যটন স্পটের সচিত্র বর্ণনায় এ জনপদকে একটি পর্যটন উপজেলা হিসেবে চিত্রত করার প্রয়াস রাখা হয়েছে।

২০২০ সালের অমর একুশে বইমেলায় মমতাজ উদ্দিন আহমদ ও জয়নব আরা বেগমের যৌথ সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘পত্র-সাহিত্যে নজরুল’। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পত্রসাহিত্যকে কেন্দ্র করে রচিত এই গ্রন্থ সাহিত্য-গবেষণার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য প্রয়াস। এ গ্রন্থে নজরুলের পত্রগুলোর জীবনঘনিষ্ঠতা, অন্তরঙ্গ ও শিল্পসত্ত্বার বিস্তৃত সাহিত্যক আলোচনা করা হয়েছে। কবির মানসলোকের রহস্যকুঞ্চিকা অতি চমৎকারভাবে উদ্ভাসিত হয়েছে এসব পত্রের ব্যাখ্যামূলক আলোচনায়। কবির দৃষ্টিভঙ্গি, প্রণয়াকাঙ্ক্ষা, রসবোধ, মানবতাবোধ, স্বজাতির প্রতি মূল্যায়ন, সমসাময়িক চিন্তাধারা, সাহিত্য-সংস্কৃতি, হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক, আর্থ-সামাজিক অবস্থা, রাজনৈতিক ভাবনা সর্বোপরি ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের এক অসাধারণ প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে এ গ্রন্থে। যা বাংলার পত্র-সাহিত্যে আলোচনার এক অমূল্য সংযোজন।

এই ধারাবাহিকতায়, ২০২০ সালে নতুন প্রজন্মের সাহিত্যচর্চারও এক উজ্জ্বল সূচনা ঘটে। সেই বছর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী শাফকাত শফিক-এর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘হিমাদ্রী’ প্রকাশিত হয় ― যা প্রমাণ করে, সৃজনশীলতার কোনো বয়সসীমা নেই।

কাব্যগ্রন্থটির ভাষাশৈলী বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এক কিশোরী মনের অন্তর্গত জাগরণ কীভাবে কবিতার রূপ নিয়েছে। ভালোবাসার নানা রং, জীবনকে দেখার সারল্যমাখা দৃষ্টিভঙ্গি আর বয়সোচিত জীবনবোধের গভীর ব্যাখ্যা ― সবকিছু মিলেমিশে গেছে তাঁর কাব্যভাষায়, যা পাঠকের সামনে তুলে ধরে এক নবীন কণ্ঠস্বরের আন্তরিক উচ্চারণ।

২০২২ সালের অমর একুশে বইমেলায় কবি ও ছড়াকার এমডি জিয়াবুলের দুটি কাব্যগ্রন্থ―‘রূপ-লাবণ্যে আলীকদম’ এবং ‘প্রতিবাদী কলম’―প্রকাশিত হয়। ‘রূপ-লাবণ্যে আলীকদম’ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত ‘জন্মভূমি’ ও ‘প্রিয় আলীকদম’ কবিতাদ্বয়ে আলীকদমের সবুজ পাহাড়, মাতামুহুরীর কলতান, অরণ্যের স্নিগ্ধতা এবং জনপদের প্রতি গভীর মমত্ববোধ এক আবেগঘন কাব্যভাষায় ফুটে উঠেছে। এ কবিতাগুলো শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যচিত্র নয়; বরং নিজ ভূমি, জনপদ ও সাংস্কৃতিক শিকড়ের প্রতি একজন কবির আন্তরিক ভালোবাসারও কাব্যিক দলিল।

২০২৬ সালের অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাফকাত শফিক-এর আত্মজৈবনিক ইংরেজি গ্রন্থ WHITE SORROW: The Soliloquy of a Youth। এ গ্রন্থের মাধ্যমে আলীকদমের নতুন প্রজন্ম বিশ্বভাষায় নিজেদের অভিজ্ঞতা ও আত্মকথন প্রকাশের সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

সাহিত্যের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক সংগঠন গঠনের ক্ষেত্রেও আলীকদমের রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস। নব্বই দশকের শেষভাগে ‘মাতামুহুরী কালচারাল ক্লাব’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যদিও সংগঠনটি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, তবুও এটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রাথমিক প্রচেষ্টার স্মারক হয়ে আছে।

১৯৯৯ সালে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক জহর কুমার সিংহ-এর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ঝিলিক সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী’। পরের বছর সোহেল ইকবাল-এর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘প্রতিভা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী’। ২০০০ সালে ‘প্রতিভা’ নামে একটি সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ম্যাগাজিনও প্রকাশিত হয়। সেই ম্যাগাজিনেই ‘কালের দর্পণে আলীকদম’ শীর্ষক নিবন্ধে প্রথমবারের মতো আলীকদমের পরিচিতি ও ইতিহাসকে ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করেন মমতাজ উদ্দিন আহমদ। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ‘ঝিলিক’ ও ‘প্রতিভা’ আজও আলীকদমের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সক্রিয় রয়েছে।

সময়ের প্রবাহে আলীকদমের সাহিত্যচর্চা আরও বিস্তৃত হয়েছে। মমতাজ উদ্দিন আহমদের রচিত ও প্রকাশিতব্য ‘মায়াবনবিহারিনী (জীবনমুখী গল্পের সংগ্রহ),’ ‘কুরআনের আলোয় মানুষ, মহাবিশ্ব ও সভ্যতা (সাহিত্যিক-আধ্যাত্মিক জ্ঞানভিত্তিক ইসলামী চিন্তার গ্রন্থ)’, ‘দ্রোহ, দর্শন ও জীবনের অন্বেষা (সময়, সভ্যতা ও মানুষের আত্মঅন্বেষার প্রবন্ধসমূহ)’, ‘মাতামুহুরীর নন্দনতত্ত্ব: নিসর্গ ও অস্তিত্ব (বর্ষা, নদী ও আত্মঅন্বেষার আখ্যান)’, ‘আলীকদমের ইতিহাস, উপাখ্যান ও সংস্কৃতি’, ‘আলীকদম সন্দর্শন (ভ্রমণ গাইড)’, ‘ইসলামের রূপরেখা’ এবং ‘হৃদয়মঞ্জুরী (কবিতাসংগ্রহ)’ প্রভৃতি গ্রন্থ এ জনপদের সাহিত্যিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরকে সমৃদ্ধ করেছে।

উপসংহার:

সব মিলিয়ে বলা যায়, আলীকদমের সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাস হয়তো সংখ্যায় দীর্ঘ নয়, কিন্তু তা গভীরতায় সমৃদ্ধ। এই ইতিহাসের শিকড় প্রোথিত রয়েছে মাতামুহুরীর জলে, পাহাড়ের সবুজ ঢালে, জুমক্ষেতের শ্রমে, লোকবিশ্বাসের উত্তরাধিকারে এবং মানুষের অদম্য সৃষ্টিশীলতায়। অরণ্যের নিভৃত জনপদ থেকে আধুনিক সাংস্কৃতিক পরিসরে উত্তরণের যে যাত্রা, তা কেবল কয়েকজন লেখক, কবি বা সাংস্কৃতিক কর্মীর কৃতিত্ব নয়; বরং এটি সমগ্র আলীকদমবাসীর সম্মিলিত সাংস্কৃতিক অভিযাত্রার ফসল।

আলীকদমের সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। এটি শিক্ষা বিস্তার, সাংবাদিকতার বিকাশ, সামাজিক সংগঠন, সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং স্থানীয় ইতিহাসচর্চার সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। এখানকার সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগগুলো প্রমাণ করে যে, সভ্যতার বিকাশ কেবল নগরকেন্দ্রিক নয়; প্রত্যন্ত পার্বত্য জনপদও নিজস্ব ঐতিহ্য, ভাষা, অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীলতার আলোকে একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল নির্মাণ করতে পারে।

বিশেষত আলীকদমে প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ, সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যক্রম, স্থানীয় লেখক ও গবেষকদের শ্রম এবং সাংবাদিকতার বিকাশ এ জনপদের বৌদ্ধিক জাগরণের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এগুলো কেবল সাহিত্যসৃষ্টি নয়; বরং ইতিহাস সংরক্ষণ, সংস্কৃতি লালন এবং পার্বত্য জনগোষ্ঠীর জীবন ও ঐতিহ্যকে বৃহত্তর জাতীয় পরিসরে উপস্থাপনেরও এক মহৎ প্রয়াস।

আজ যখন আলীকদমের ইতিহাস নতুনভাবে লিপিবদ্ধ হচ্ছে, তখন সাহিত্য ও সংস্কৃতির এই বিকাশধারা কেবল একটি উপজেলার সাংস্কৃতিক অর্জন হিসেবেই নয়, বরং সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধিক ও নান্দনিক জাগরণের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবেও বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখে। পাহাড়, নদী, মানুষ ও স্মৃতির এই সম্মিলিত সুরধ্বনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তাদের শেকড়ের সন্ধান দেবে―এই প্রত্যাশাই রইল।

মাতামুহুরীর কলকল ধ্বনি, পাহাড়ের নীলাভ নীরবতা এবং মানুষের স্বপ্নময় অভিযাত্রা যুগে যুগে যেমন আলীকদমকে বাঁচিয়ে রেখেছে, তেমনি সাহিত্য ও সংস্কৃতির এই ধারাবাহিক চর্চাই ভবিষ্যতে এ জনপদের আত্মপরিচয়কে আরও সুদৃঢ় করবে। অরণ্যের বুক চিরে যে জনপদ একদিন আত্মপ্রকাশ করেছিল, আজ সেই জনপদ সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার আলোয় নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় নির্মাণ করে চলেছে। ইতিহাসের পথ বেয়ে এগিয়ে চলা এই সাংস্কৃতিক অভিযাত্রা তাই শেষ নয়; বরং এটি আগামী দিনের জন্য এক নতুন সূচনা।


লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

মোবাইল: 01556-560126 / 01645-950296

ইমেইল: momtaj.news@gmail.com

তারিখ: ২১/০৬/2026 খিষ্টাব্দ।