তুমি কেন এলে… বাতায়নে চাহি’ কেন হাসো আসিয়া চাঁদের রথে


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : মে ৭, ২০২৬, ৯:৪২ পূর্বাহ্ন /
তুমি কেন এলে… বাতায়নে চাহি’ কেন হাসো আসিয়া চাঁদের রথে


✍️ মমতাজ উদ্দিন আহমদ


প্রথম অধ্যায়: নদীর ধারে একা মেয়ে

সন্ধ্যার ম্লান আলো যখন নদীর জলে ঝলমলে করে ওঠে, তখন গ্রামের মানুষ ঘরে ফিরে আসে। কিন্তু জেসমিন থাকে নদীর ধারে। তার নাম শুনলে গ্রামের লোকে বলে, “ওই নীরব মেয়েটা।” যেন নীরবতা তার পরিচয়, যেন নির্জনতা তার পরিবার।

প্রতিদিন একই সময়ে, একই জায়গায়, জেসমিন বসে থাকে। তার চারপাশে থাকে শুধু নিস্তব্ধতা এবং তার নিজের ছায়া। নদীর জল বয়ে যায় নিরন্তর, যেন সময়ের প্রবাহ। আর জেসমিন বসে থাকে, যেন সময়ের বাইরে।

তার হাতে থাকে ঝরা মল্লিকা ফুল। কোথা থেকে সংগ্রহ করে, কেউ জানে না। হয়তো গ্রামের পুরানো পাঠশালার বাগান থেকে, হয়তো কোনো বাড়ির আঙিনা থেকে। সেই ফুলগুলো তার হাতে ধরা থাকে, যেন তার একাকীত্বের সঙ্গী। তারপর ধীরে ধীরে সে সেগুলো নদীর স্রোতে ভাসিয়ে দেয়।

ফুলগুলো ভেসে যায়। ধীরে ধীরে, নিরবে, যেন তারাও জানে যে এই পৃথিবীতে সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী। জেসমিন তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে, যতক্ষণ না তারা দূরে মিলিয়ে যায়। এবং তখন তার মনে কোনো দুঃখ থাকে না। কারণ সে বুঝেছে, ধরে রাখা মানে যন্ত্রণা। ভেসে যাওয়া মানে মুক্তি।

জেসমিন কখনো কাউকে বলেনি এই কথা। কারণ তার কথা বলার অভ্যাস নেই। গ্রামের মানুষ তাকে দেখে যায়, কিন্তু চেনে না। তারা জানে যে সে একা, কিন্তু বোঝে না যে তার একাকীত্ব একটি সচেতন পছন্দ।

দ্বিতীয় অধ্যায়: নিরালা বনে হার গাঁথা

জেসমিনের বাড়ি ছিল গ্রামের প্রান্তে, একটি পুরানো বটগাছের পাশে। বাড়িটি ছিল ছোট, কিন্তু তার নিজস্ব জগত ছিল বিশাল। তার ঘরের একটি কোণে ছিল একটি দর্পণ, এবং সেই দর্পণের সামনে জেসমিন প্রতিদিন ফুলের মালা গাঁথত।

তার হাত ছিল দক্ষ। প্রতিটি ফুল, প্রতিটি পাপড়ি যত্ন সহকারে সাজিয়ে দিত সে। লাল গোলাপ, সাদা জুঁই, হলুদ সূর্যমুখী—সবকিছু মিলিয়ে তৈরি করত এক অনন্য সৌন্দর্য। এবং তারপর সেই মালা নিজের গলায় পরিয়ে দেখত আয়নায়।

সেই আয়নায় শুধু তার একার মুখ দেখা যেত। তার চোখে ছিল এক গভীর শান্তি, যা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। তার হাসিতে ছিল এক রহস্য, যা কেউ বুঝতে পারে না। এবং সেই নিরালা মুহূর্তগুলোতে, জেসমিন নিজেকে সম্পূর্ণ মনে করত। তার কোনো কিছুর অভাব ছিল না।

তার ঘরের বাইরে ছিল বিশাল বাগান। বাগানটি ছিল জঙ্গলের মতো বন্য। এখানে ফুল ফুটত অপ্রত্যাশিতভাবে, গাছ বাড়ত নিজের মতো। জেসমিন এই বাগানকে ভালোবাসত। এখানে সে একা হতে পারত, নিজের সাথে কথা বলতে পারত, নিজের গান গাইতে পারত।

প্রতিটি সন্ধ্যায় সে এই বাগানে বসত এবং নজরুলের গান গাইত। তার কণ্ঠস্বর ছিল মধুর, কিন্তু সেই সুর শুধু বাতাসের কানে পৌঁছাত, মানুষের কানে নয়। এবং সেটাই তার পছন্দ ছিল। কারণ সত্যিকারের সুর শুধু নিজের জন্য গাওয়া উচিত, অন্যদের জন্য নয়।

তৃতীয় অধ্যায়: সেই সন্ধ্যা যখন সবকিছু বদলে গেল

সেদিন ছিল একটি সাধারণ সন্ধ্যা। সূর্য ডুবছিল নদীর পশ্চিম পাড়ে। আকাশ ছিল লাল এবং নীলের মিশ্রণ। জেসমিন বসেছিল তার প্রিয় জায়গায়—নদীর ধারে একটি পাথরের উপর।

তার হাতে ছিল ঝরা মল্লিকা ফুল। সে সেগুলো নদীর জলে ভাসিয়ে দিচ্ছিল, একটি একটি করে। প্রতিটি ফুলের সাথে যাচ্ছিল তার একটি চিন্তা, একটি স্বপ্ন, একটি অনাবৃত আকাঙ্ক্ষা।

তার কলসিটি ছিল তার হাতে। এটি ছিল তার প্রিয় সম্পদ—একটি মাটির কলসি, যা তার দাদি তাকে দিয়েছিল। সে সেটি নদীর জলে ডুবিয়ে দিত, তারপর তুলে আনত। জল ছিল ঠান্ডা এবং সতেজ। প্রতিবার যখন সে কলসিটি জলে ডুবাত, তখন মনে হত যেন নদী তার সমস্ত দুঃখ ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

সেদিন সে ভাবছিল, যদি কলসিটি ভেসে যায়, তাহলে কী হবে? যদি নদী তাকে নিয়ে যায়, তাহলে কী হবে? জীবন তো এমনই—কখনো কিছু ধরে রাখা যায় না। সবকিছুই একদিন ভেসে যায়। তাই কেন এত অভিমান করতে হবে?

এই ভাবনার মধ্যেই সে কলসিটি নদীর স্রোতে ভাসিয়ে দিয়েছিল। এবং তখনই তার কানে পৌঁছেছিল একটি পদধ্বনি।

চতুর্থ অধ্যায়: পথে এক অচেনা যুবক

পদধ্বনি শুনে জেসমিন চমকে উঠেছিল। তার শান্ত নদীর তীর হঠাৎ কেঁপে উঠেছিল। সে ঘুরে তাকিয়েছিল এবং দেখেছিল—একজন যুবক, তার চেয়ে বয়সে একটু বড়, দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসছে।

তার নাম ছিল সাফওয়ান। তিনি ছিলেন শহর থেকে আসা এক পথিক। তার পায়ে ছিল ধুলো, তার চোখে ছিল ক্লান্তি, কিন্তু তার মুখে ছিল এক অপ্রতিরোধ্য হাসি।

সাফওয়ান দেখেছিল জেসমিনের কলসিটি নদীর পানিতে ভেসে যাচ্ছে। তিনি দ্রুত এগিয়ে গিয়েছিলেন এবং পানিতে নেমে সেটি তুলে এনেছিলেন। তার পোশাক ভিজে গিয়েছিল, কিন্তু তিনি কোনো কথা বলেননি। শুধু হাসিমুখে কলসিটি জেসমিনের সামনে রেখে দিয়েছিলেন।

“ভেসে যেতে দিলে কেন?” তিনি বলেছিলেন। তার কণ্ঠস্বর ছিল মধুর, কিন্তু তাতে ছিল এক অদ্ভুত ক্ষমতা। যেন তিনি শুধু একটি প্রশ্ন করেননি, বরং জেসমিনের সমস্ত নীরবতাকে প্রশ্ন করে দিয়েছিলেন।

জেসমিন চুপ করে রেখেছিল। তার মুখে কোনো কথা আসেনি। কারণ তার কাছে কোনো উত্তর ছিল না। অথবা, হয়তো তার কাছে অনেক উত্তর ছিল, কিন্তু সেগুলো বলার সাহস ছিল না।

পঞ্চম অধ্যায়: নিরালা বনে অতিথি

সেই দিনের পর থেকে সাফওয়ান প্রতিদিন নদীর ধারে আসতে লাগল। তিনি ছিলেন একজন ভ্রমণপ্রেমী। তার নিজের কোনো বাড়ি ছিল না, কোনো পরিবার ছিল না। তিনি শুধু ভ্রমণ করতেন, গান গাইতেন, মানুষের গল্প শুনতেন।

জেসমিনের গ্রামে এসে তিনি একটি পুরানো পাঠশালার ধারে একটি ছোট্ট ঘর ভাড়া নিয়েছিলেন। এবং প্রতিদিন সন্ধ্যায় তিনি নদীর ধারে আসতেন, যেখানে জেসমিন থাকত।

প্রথম দিকে জেসমিন তার সাথে কথা বলত না। সে শুধু বসে থাকত, তার ফুল ভাসাত, এবং সাফওয়ানকে উপেক্ষা করত। কিন্তু সাফওয়ান হাল ছাড়েনি। তিনি প্রতিদিন গান গাইতেন। তার গান ছিল সুন্দর, কিন্তু তাতে ছিল একটি বিশেষ অর্থ। যেন তিনি জেসমিনের নীরবতার সাথে কথা বলছিলেন।

একদিন সাফওয়ান বলেছিলেন, “তুমি কেন কথা বলো না?”

জেসমিন উত্তর দিয়েছিল, “কথা বলার মতো কিছু নেই।”

“কিন্তু তুমি তো গান গাও,” সাফওয়ান বলেছিলেন। “আমি শুনেছি তোমার গান। তা অত্যন্ত সুন্দর।”

জেসমিন অবাক হয়েছিল। কারণ তার গান শুনেছে এমন কাউকে সে কখনো দেখেনি। তার গান ছিল শুধু তার নিজের জন্য, বাতাসের জন্য, নদীর জন্য। কিন্তু সাফওয়ান শুনেছিল। এবং সেটি বুঝেছিল।

ষষ্ঠ অধ্যায়: আয়নায় দুটি ছবি

সময় কেটে যেতে লাগল। সাফওয়ান এবং জেসমিন প্রতিদিন নদীর ধারে দেখা করতে লাগল। তারা কথা বলত, গান গাইত, নদীর জল দেখত। এবং ধীরে ধীরে, অনেক অনিচ্ছায়, জেসমিন আবিষ্কার করল যে তার নিরালা বনে একটি অতিথি এসেছে।

একদিন সাফওয়ান জেসমিনের ঘরে এসেছিল। তিনি দেখেছিলেন সেই দর্পণ, যেখানে জেসমিন প্রতিদিন নিজেকে দেখত। এবং তিনি বলেছিলেন, “এখানে এসে দাঁড়াও।”

জেসমিন এসেছিল। এবং তখন তার দর্পণে দেখা গিয়েছিল দুটি ছবি। তার নিজের এবং সাফওয়ানের। এবং সেই মুহূর্তে জেসমিন বুঝেছিল—তার নিরালা জগত এখন আর একা নয়।

সাফওয়ান তার কাঁধে হাত রেখেছিল এবং বলেছিল, “এটাই জীবন। একা থাকা সুন্দর, কিন্তু কাউকে সাথে নেওয়াও সুন্দর।”

জেসমিন তখন প্রথমবারের মতো কাঁদেছিল। তার চোখ থেকে ঝরে পড়েছিল অসংখ্য অশ্রু। কারণ তার মনে ছিল ভয়, ছিল অভিমান, ছিল এক অজানা আনন্দ।

সপ্তম অধ্যায়: ধ্যান ভাঙা এবং নতুন ধ্যান

সাফওয়ান এসেছিল জেসমিনের নিরালা বনে। এবং তিনি গান গাইতেছিলেন। তার গান ছিল নজরুলের গান—”আমার নিরালা বনে আমি গাঁথি হার, তুমি গান গাহি ধ্যান ভাঙো অকারণে।”

জেসমিন শুনেছিল এই গান। এবং তখন তার মনে হয়েছিল, যেন সাফওয়ান তার জন্যই এই গান গাইছেন। যেন তিনি বলছেন, “আমি জানি তুমি একা থাকতে পছন্দ করো। কিন্তু আমি এসেছি তোমার ধ্যান ভাঙতে। আমি এসেছি তোমার নিরালা বনে আলো নিয়ে আসতে।”

এবং সেটাই ছিল সত্য। সাফওয়ান এসেছিল জেসমিনের জীবনে আলো নিয়ে আসতে। তার আগমনে জেসমিনের নির্জন নদী তীরে ঢেউ উঠেছিল। তার নিরালা বনের নীরবতা ভেঙে গিয়েছিল। এবং সেই ভাঙনের মধ্যেই জেসমিন খুঁজে পেয়েছিল এক নতুন সুর।

কিন্তু জেসমিন ভয় পেয়েছিল। কারণ সে জানত, একবার যদি হৃদয়ের দরজা খুলে দেয়, তাহলে আর ফিরে যাওয়া যাবে না। তার শান্ত নদীতে ঢেউ উঠবে। তার নির্জন বনের নীরবতা ভেঙে যাবে। এবং তারপর যদি সাফওয়ান চলে যায়, তাহলে কী হবে? তার নদী আর কখনো শান্ত থাকবে না। তার বন আর কখনো নিরালা থাকবে না।

অষ্টম অধ্যায়: অভিমান এবং অপেক্ষা

জেসমিন সাফওয়ানকে এড়িয়ে চলতে লাগল। সে নদীর ধারে আসা বন্ধ করে দিল। তার ফুল ভাসানো বন্ধ করে দিল। তার গান গাওয়া বন্ধ করে দিল। এবং সাফওয়ানের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।

কিন্তু এটাই ছিল মানুষের স্বভাব। মানুষ একাকীত্ব চায়, আবার একাকীত্ব ভাঙলেও অভিমান করে। মানুষ নিজেকে আয়নায় দেখতে ভালোবাসে, কিন্তু অন্য কেউ যখন সেই আয়নায় উঁকি দেয়, তখন তার ভেতরটা কেঁপে ওঠে অজানা আনন্দে।

সাফওয়ান বুঝেছিল জেসমিনের অভিমান। তিনি জানতেন যে এটি ভালোবাসার একটি রূপ। তাই তিনি অপেক্ষা করেছিলেন। প্রতিদিন নদীর ধারে এসেছিলেন, যদিও জেসমিন আসত না। এবং প্রতিদিন গান গাইতেন, যদিও কেউ শুনত না।

একদিন সাফওয়ান বলেছিলেন, “তুমি কেন আসো না? তুমি কেন আমাকে এড়িয়ে চলো?”

জেসমিন উত্তর দিয়েছিল, “কারণ আমি ভয় পাই। আমি ভয় পাই যে তুমি একদিন চলে যাবে। এবং তখন আমার নদী আর কখনো শান্ত থাকবে না।”

সাফওয়ান হাসিমুখে বলেছিলেন, “তুমি সঠিক। আমি একদিন চলে যাব। কারণ আমি একজন ভ্রমণপ্রেমী। কিন্তু তার আগে, আমরা যা সময় পেয়েছি, সেটি উপভোগ করতে পারি না?”

নবম অধ্যায়: চাঁদের রথে চড়ে আসা

একটি পূর্ণিমার রাত ছিল। চাঁদ ছিল পূর্ণ এবং উজ্জ্বল। সাফওয়ান জেসমিনের ঘরের বাইরে এসেছিল এবং গান গাইছিল। তার গান ছিল এত সুন্দর যে মনে হচ্ছিল যেন চাঁদ নিজেই রথে চড়ে এসেছে।

জেসমিন তার ঘরের জানালা থেকে দেখেছিল সাফওয়ানকে। তার চোখ ছিল উজ্জ্বল, তার হাসি ছিল অসাধারণ। এবং সেই মুহূর্তে জেসমিন বুঝেছিল যে তার অভিমান আর টিকে থাকতে পারবে না।

সে বেরিয়ে এসেছিল। এবং সাফওয়ানের পাশে দাঁড়িয়েছিল। তারা দুজন একসাথে চাঁদের দিকে তাকিয়ে ছিল। এবং সেই মুহূর্তে, তাদের মধ্যে কোনো কথার প্রয়োজন ছিল না। তাদের নীরবতাই ছিল সবচেয়ে বড় কথা।

সাফওয়ান বলেছিল, “দেখো, জেসমিন। জীবন এমনই। কখনো একা থাকা, কখনো সাথে থাকা। কখনো নীরবতা, কখনো সুর। কিন্তু সবকিছুই সুন্দর, যদি আমরা তা উপভোগ করতে পারি।”

দশম অধ্যায়: তুমি কেন এলে পথে

জেসমিন এবং সাফওয়ান প্রতিদিন নদীর ধারে দেখা করতে লাগল। তারা ফুল ভাসাত, গান গাইত, জীবনের কথা বলত। এবং ধীরে ধীরে, জেসমিন বুঝেছিল যে তার নিরালা বনে এসেছে এক অপূর্ব অতিথি।

কিন্তু একটি প্রশ্ন সবসময় তার মনে থাকত—”তুমি কেন এলে পথে?”

এই প্রশ্নের উত্তর সাফওয়ান কখনো সরাসরি দেয়নি। কিন্তু একদিন তিনি বলেছিলেন, “কারণ জীবন চায় যে আমরা একা না থাকি। কারণ প্রতিটি মানুষের জন্য কেউ না কেউ আছে। কারণ তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করছিলে, এবং আমি তোমার জন্য খুঁজছিলাম।”

এবং সেটাই ছিল সত্যিকারের উত্তর। সাফওয়ান এসেছিল কারণ জেসমিনের নিরালা বনে আলো দরকার ছিল। এবং জেসমিন অপেক্ষা করছিল কারণ তার একাকীত্ব ভাঙার জন্য কেউ দরকার ছিল।

একাদশ অধ্যায়: নজরুলের গান এবং জীবনের সত্য

নজরুল লিখেছিলেন, “তুমি কেন এলে পথে ঝরা মল্লিকা ভাসাইতেছিনু একাকিনী নদী-স্রোতে।”

এই গানটি শুধু একটি প্রেমের গান নয়। এটি জীবনের এক গভীর সত্য। আমরা সবাই কোনো না কোনো সময় জেসমিনের মতো নদীর ধারে ফুল ভাসাই। আমরা নিজের ছোট্ট জগতে সুখ খুঁজে নিই। আমরা মনে করি যে একা থাকাই সবচেয়ে নিরাপদ, সবচেয়ে সুন্দর।

কিন্তু হঠাৎ একদিন কেউ এসে পথ আটকে দাঁড়ায়। সে আমাদের কলসি তুলে দেয়, আমাদের ধ্যান ভাঙে, আমাদের আয়নায় নিজের ছবি মিশিয়ে দেয়। এবং তখন আমরা বুঝি যে জীবন শুধু একা থাকার জন্য নয়। জীবন হলো ভাগ করে নেওয়ার জন্য।

জেসমিনের গল্প আমাদের শেখায় যে প্রেম হলো একটি সাহসী পদক্ষেপ। এটি হলো নিজের নিরাপদ জগত থেকে বেরিয়ে আসা এবং অন্যকে আমন্ত্রণ জানানো। এটি হলো ঝুঁকি নেওয়া, কারণ প্রেম সবসময় ঝুঁকিপূর্ণ।

কিন্তু সেই ঝুঁকির মধ্যেই লুকিয়ে আছে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সুর।

দ্বাদশ অধ্যায়: অভিমান এবং প্রত্যাশা

মানুষের হৃদয় অত্যন্ত জটিল। এটি একাকীত্ব চায়, আবার একাকীত্ব ভাঙলেও অভিমান করে। এটি নিজেকে আয়নায় দেখতে ভালোবাসে, কিন্তু অন্য কেউ যখন সেই আয়নায় উঁকি দেয়, তখন এটি কেঁপে ওঠে অজানা আনন্দে।

জেসমিন এই সত্যটি বুঝেছিল। তিনি বুঝেছিল যে প্রেম হলো একটি বিরোধাভাসপূর্ণ অনুভূতি। এটি আনন্দ এবং ভয় উভয়ই নিয়ে আসে। এটি নিরাপত্তা এবং অনিশ্চয়তা উভয়ই নিয়ে আসে।

কিন্তু তবুও, জেসমিন সাফওয়ানকে ভালোবেসেছিল। কারণ প্রেম হলো জীবনের সবচেয়ে সত্যিকারের অভিজ্ঞতা। এটি আমাদের সম্পূর্ণ করে, আমাদের রূপান্তরিত করে, আমাদের নতুন করে জন্ম দেয়।

ত্রয়োদশ অধ্যায়: ফুল ভাসানো এবং চোখ রাখা তীরের দিকে

জেসমিন এখনও ফুল ভাসায়। কিন্তু এখন তার ফুল ভাসানোর অর্থ বদলে গেছে। এটি আর একাকীত্বের প্রকাশ নয়, এটি এখন ভালোবাসার প্রকাশ।

প্রতিটি ফুল যখন সে নদীতে ভাসায়, তখন সে চোখ রাখে তীরের দিকে। কারণ সে জানে যে সাফওয়ান সেখানে আছে। এবং হয়তো, সাফওয়ান সেই ফুলটি তুলে আনবে, যেমন প্রথমদিন তুলে এনেছিল তার কলসি।

এবং এটাই হলো প্রেমের সবচেয়ে সুন্দর দিক। এটি আমাদের অপেক্ষা করতে শেখায়। এটি আমাদের আশা রাখতে শেখায়। এটি আমাদের বিশ্বাস করতে শেখায়।

চতুর্দশ অধ্যায়: যে পথে তুমি এসেছিলে

সাফওয়ান একদিন বলেছিল, “জেসমিন, আমাকে একটি প্রতিশ্রুতি দাও।”

“কী প্রতিশ্রুতি?” জেসমিন জিজ্ঞাসা করেছিল।

“যে পথে আমি এসেছিলাম, সেই পথ যেন আর কখনো একা না থাকে। যে নদীতে তুমি ফুল ভাসাতে, সেই নদীতে যেন সবসময় আমাদের দুজনের ছবি থাকে। যে বনে তুমি একা গান গাইতে, সেই বনে যেন আমাদের দুজনের সুর মিশে থাকে। আমি তোমার হাত ধরে থাকতে চাই।”

জেসমিন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এবং সেই মুহূর্তে, তারা দুজন বুঝেছিল যে প্রেম হলো এক অনন্য যাত্রা। এটি শুধু দুজন মানুষের মিলন নয়, এটি দুটি আত্মার একীকরণ।

পঞ্চদশ অধ্যায়: জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সুর

নজরুল লিখেছিলেন, “আমার নিরালা বনে আমি গাঁথি হার, তুমি গান গাহি ধ্যান ভাঙো অকারণে।”

কিন্তু এই গানের আসল অর্থ হলো—প্রেম হলো একটি সুন্দর ব্যাঘাত। এটি আমাদের শান্তি ভাঙে, কিন্তু সেই ভাঙনের মধ্যেই আমরা খুঁজে পাই জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সুর।

জেসমিন এবং সাফওয়ান এই সত্যটি জীবন্ত করে তুলেছে। তারা প্রমাণ করেছে যে একাকীত্ব সুন্দর, কিন্তু ভালোবাসা আরও সুন্দর। তারা প্রমাণ করেছে যে নিরালা বন ভালো, কিন্তু সেই বনে একজন সঙ্গী থাকা আরও ভালো।

এবং সেই সঙ্গীর সাথে জীবন যাপন করা, তার সাথে ফুল ভাসানো, তার সাথে গান গাওয়া, তার সাথে নদীর নীরব প্রবাহ দেখা—এটাই হলো জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সুর।

সমাপনী কথা: চিরন্তন প্রেমের গল্প

জেসমিন এবং সাফওয়ানের গল্প শেষ হয় না। এটি চলে যায় প্রতিটি প্রেমের গল্পে। এটি চলে যায় প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে, যারা একদিন একা ছিল এবং পরে কাউকে খুঁজে পেয়েছে।

প্রতিটি জেসমিনের জন্য একটি সাফওয়ান আছে। এবং প্রতিটি সাফওয়ান খুঁজে বেড়ায় তার জেসমিনকে। কারণ জীবন চায় যে আমরা একা না থাকি। জীবন চায় যে আমরা আমাদের ফুল ভাসাই, কিন্তু সেই ফুল ভাসানোর সময় কেউ আমাদের পাশে থাকুক।

এবং যখন সেই কেউ আসে, যখন সে আমাদের কলসি তুলে দেয়, যখন সে আমাদের ধ্যান ভাঙে, যখন সে আমাদের আয়নায় নিজের ছবি মিশিয়ে দেয়—তখন আমরা বুঝি যে এটাই ছিল জীবনের আসল অর্থ।

তুমি কেন এলে পথে? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো কোনোদিন পাওয়া যায় না। কিন্তু এটুকু বোঝা যায়—জীবন কখনো পুরোপুরি একা থাকতে দেয় না। এবং সেটাই হলো জীবনের সবচেয়ে সুন্দর রহস্য।

পাদটীকা: এই গল্পটি একটি উদযাপন—প্রেমের, জীবনের, এবং সেই অসাধারণ মুহূর্তের যখন দুটি একা হৃদয় একসাথে হয়ে যায়। কারণ জীবন শুধু একা থাকার জন্য নয়। জীবন হলো ভাগ করে নেওয়ার জন্য। এবং সেই ভাগাভাগির মধ্যেই লুকিয়ে আছে চিরন্তন সুখ।


লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

মোবাইল: 01556-560126 / 01645-950296

ইমেইল: momtaj.news@gmail.com

তারিখ: 07/05/2026 খিষ্টাব্দ।