চব্বিশের বিপ্লব: সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির পুনর্জাগরণের সন্ধিক্ষণ


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : জুলাই ১৫, ২০২৬, ৮:১০ পূর্বাহ্ন / ০
চব্বিশের বিপ্লব: সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির পুনর্জাগরণের সন্ধিক্ষণ

।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ ।।


ফরাসি বিপ্লবের জন্য ১৭৮৯, রুশ বিপ্লবের জন্য ১৯১৭, বার্লিন প্রাচীর পতনের জন্য ১৯৮৯ সন তিনটি বিশ্ব-ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এই বিশ্ব-ঐতিহাসিক ও মহাকাব্যিক সনগুলোর পাশে বাংলাদেশের ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ও অভূতপূর্ব রাজনৈতিক-সামাজিক পরিবর্তন তেমনই এক মাইলফলক। কেউ মানুক আর না মানুক চব্বিশের গণঅভ‌্যুত্থান ঐতিহাসিক মানদণ্ডে স্থান পাবে। আলোচিত হবে অনাধিকালের ইতিহাসে। এই সময়কে কেউ গণঅভ্যুত্থান, কেউ ছাত্র-জনতার বিপ্লব, আবার কেউ রাষ্ট্রীয় পুনর্জাগরণের সূচনা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। ব্যাখ্যায় ভিন্নতা থাকতে পারে। একটি বিষয় অস্বীকার করা কঠিন- এই ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিক চেতনায় গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

তাৎক্ষণিক আবেগে কোনো বিপ্লবের প্রকৃত মূল্যায়ন নয়। বিপ্লব পরবর্তী তা মানুষের চিন্তা, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংস্কৃতিকে কতখানি বদলে দিয়েছে তার ওপরই নির্ভর করে। সেই অর্থে ২০২৪-কে ক্ষমতার পরিবর্তনের আলোচনায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাষ্ট্র, নাগরিক এবং নৈতিকতার সম্পর্ককে নতুনভাবে ভাবার একটি ঐতিহাসিক আহ্বান। কিন্তু শাসকগোষ্ঠীরা তাকে নতুন করে ভাবছে কি? এ প্রশ্ন উঠতেই পারে।

ভয়ের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে নাগরিকদের আত্মমর্যাদার অনুসন্ধান করতে হচ্ছে এখনো। কারণ স্বৈরসারের রেখে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো আঙ্গুল উঁচায় নাগরিকদের স্বাধীনতায়। সমাজের সবচেয়ে বড় সম্পদ অর্থ নয়; পারস্পরিক আস্থা। স্বৈরশাসনের সময় মানুষ ভয়ে কথা বলে। আত্মসংযমকে নিরাপত্তা মনে করে। নীরবতাকে বেঁচে থাকার কৌশল বানিয়ে ফেলে। তখন সামাজিক সম্পর্কের ভেতরে অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়। চব্বিশের গণঅভ‌্যুত্থানের পর যদি সত‌্যিকার রাজনৈতিক পরিবর্তন হয় তবে মানুষ পুনরায় কথা বলার সাহস ফিরে পাবে। প্রশ্ন করার অধিকার পাবে। তবেই সেটি সামাজিক অর্থে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। সংসদে আমরা এখনো দেখি রাজনৈতিকগুলো পুরোনো কাসুন্দি ঘেঁটে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করছে। দেশের উন্নয়নে বিশেষজ্ঞ না হয়ে কেউ কেউ স্বৈরসারের রেখে যাওয়া সংবিধান নিয়েই বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেছেন।

পুরোনো কাসুন্দির কারিগর এবং তাদের রক্ষাকবচ দলগুলোর ইতিহাস বারবার সতর্ক থাকার আহ্বান জানায়। কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা ক’জনইবা নিয়ে থাকেন। বিপ্লব-পরবর্তী সমাজে প্রতিশোধের ভাষা যদি ন্যায়বিচারের ভাষাকে ছাপিয়ে যায়, তবে পুরোনো বিভাজনের জায়গায় নতুন বিভাজন জন্ম নেয়। তাই সামাজিক পুনর্গঠনের প্রথম শর্ত হলো বিজয়ের উচ্ছ্বাসকে নাগরিক সহমর্মিতায় রূপান্তর করা। একটি সমাজ তখনই পরিণত হয়, যখন সে ভিন্নমতকে শত্রু নয়, সহনাগরিক হিসেবে দেখতে শেখে।

চব্বিশের গণঅভ‌্যুত্থান পরবর্তী রাজনীতিকে রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস হিসেবেই ভোগ করছেন। রাজনৈতিক নৈতিকতার পুনর্নির্মাণে তারা অগ্রসর হয়নি। রাজনীতিকে তারা রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জনের কৌশল বানিয়েছে মাত্র। জুলাই সনদ নিয়ে সংসদে মাননীয় একজন মন্ত্রীর কথা থেকে সেটা বুঝা যায়। অথচ প্রকৃত রাজনীতি হওয়ার কথা ছিলো জনকল্যাণের নৈতিক শিল্প। বিশ্বের গণতন্ত্রের ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, বিপ্লবের পরে ব্যক্তি বদলেছে, শাসক বদলেছে, পতাকা বদলেছে কিন্তু ক্ষমতার সংস্কৃতি বদলায়নি। ফলে নতুন শাসনও পুরোনো অভ্যাসের পুনরাবৃত্তি করেছে। সেটা আমাদের দেশেও ঘটে চলেছে।

এই বাস্তবতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় সেন্ট অগাস্টিনের একটি গভীর উপলব্ধিকে। তাঁর মতে রাষ্ট্রের বাহ্যিক কাঠামো নয়, মানুষের অন্তর্নিহিত নৈতিকতাই ইতিহাসের প্রকৃত নিয়ামক। একইভাবে ইবনে খলদুন দেখিয়েছিলেন, সামাজিক সংহতি (আসাবিয়্যা) যদি ন্যায় ও জনআস্থার ভিত্তিতে বিকশিত না হয়, তবে রাজনৈতিক শক্তিও দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

বাংলাদেশের জন্য আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ক্ষমতায় কে আছে, সেটি নয়; বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কতটা স্বাধীন, জবাবদিহিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক হতে পারছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতি যদি ব্যক্তি-নির্ভরতা থেকে প্রতিষ্ঠান-নির্ভরতায় রূপান্তরিত না হয়, তবে যে কোনো পরিবর্তনই সাময়িক হয়ে থাকবে।

গণঅভ‌্যুত্থান পরবর্তী দেশের অর্থনীতিকে ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়নে নেওয়া সম্ভব হয়নি। স্বৈরচার আমলের দখল সংস্কৃতি ফিরে আসতে দেখেছে দেশবাসী। অর্থনীতির ভাষায় উন্নয়ন কেবল জিডিপির বৃদ্ধি নয়। উন্নয়নের নৈতিকতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অমর্ত্য সেন উন্নয়নকে মানুষের সক্ষমতার বিস্তার হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। অর্থাৎ উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন সাধারণ মানুষ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের বাস্তব সুযোগ লাভ করে। গণঅভ‌্যুত্থান পরবর্তী সেটা কি আদৌ সম্ভব হয়েছে?

বাংলাদেশের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে প্রবৃদ্ধির ভাষায় সাফল্যের গল্প বলেছে। কিন্তু একই সঙ্গে বৈষম্য, দুর্নীতি, সম্পদের কেন্দ্রীভবন এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যদি ২০২৪-এর ঘটনাপ্রবাহ রাষ্ট্রকে অধিকতর স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নীতিনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দিকে পরিচালিত করতে পারে, তবে সেটিই হবে এর অন্যতম দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব। কারণ অর্থনীতি শেষ পর্যন্ত সংখ্যার নয়; বিশ্বাসের বিজ্ঞান। বিনিয়োগ যেমন আস্থার ওপর দাঁড়ায়, তেমনি বাজারও দাঁড়ায় ন্যায়সঙ্গত প্রতিযোগিতা ও সুশাসনের ভিত্তিতে।

দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে হলে ভয়মুক্ত সৃজনশীলতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। ভিন্নমতের সম্মান বজায় রাখতে হবে। কোনো জাতির সংস্কৃতি তার আত্মার ভাষা। সাহিত্য, সংগীত, নাটক, চলচ্চিত্র কিংবা চিত্রকলা সমাজের নৈতিক তাপমাত্রাও প্রকাশ করে। যখন সংস্কৃতি ক্ষমতার মুখপাত্র হয়ে পড়ে, তখন শিল্পের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়। আবার যখন সংস্কৃতি দায়িত্বহীন উচ্ছৃঙ্খলতায় ভেসে যায়, তখনও তার গভীরতা হারায়। প্রকৃত সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটে তখনই, যখন শিল্পী স্বাধীনভাবে প্রশ্ন করতে পারেন, কিন্তু দায়িত্ববোধও হারান না। আমরা প্রিয় মাতৃভূমির সংস্কৃতি দায়িত্বহীন উচ্ছৃঙ্খলতায় ভেসে যাওয়াকে রোধ করার পক্ষে কথা বলি। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এই ভারসাম্যের ওপর। স্বাধীনতা ও শালীনতা, সমালোচনা ও সহমর্মিতা, ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সৃজনশীল সংলাপই হতে পারে নতুন সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের ভিত্তি।

চব্বিশের পর প্রজন্মের মনস্তত্ত্ব বদলেগেছে। তবে প্রতিবাদ থেকে প্রজ্ঞার অভিযাত্রা সুখকর মনে হচ্ছে না। একইসাথে মন্ত্রী-এমপিদের কথায়ও প্রজ্ঞার অভিযাত্রা লক্ষ‌্যণীয় নয়। ছাত্র-যুবসমাজ ও দেশপ্রেমিক জনতা ইতিহাসের পরিবর্তনের প্রধান শক্তি। প্রতিটি বিপ্লবের পরে তাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রতিবাদকে প্রজ্ঞায় রূপান্তর করা।

রাস্তায় স্লোগান দেওয়া অপেক্ষাকৃত সহজ। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, দক্ষতা, নৈতিকতা। নানান ধরণের জটিল বাস্তবতার সঙ্গে সংলাপের ক্ষমতা থাকতে হয় শাসকগোষ্ঠীর। যারা শুধু প্রতিবাদ করতে জানে কিন্তু প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করতে শেখে না তারা সময়ের ব‌্যবধানে বিলীন হয়। ইতিহাসে তারা দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয় না।

২০২৪-এর তরুণ প্রজন্মের সামনে তাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব আবেগকে জ্ঞানে, ক্ষোভকে নীতিতে এবং প্রতিবাদকে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে রূপ দেওয়া।

আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তায় রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক মূলত একটি নৈতিক চুক্তি। রাষ্ট্র নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও অধিকার নিশ্চিত করে। নাগরিক দায়িত্ব, আইনমান্যতা ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে সেই রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে। তাই আধুনিক রাষ্ট্র ও দেশপ্রেমিক নাগরিকের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ‌্য।

এই অবিচ্ছেদ‌্য ‘চুক্তি’ ভেঙে গেলে রাষ্ট্রের বাহ্যিক কাঠামো হয়তো অক্ষুণ্ন থাকে। কিন্তু তার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়। এসব রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠীও ক্ষীণবল, দুর্বল ও মেরুদণ্ডহীন হয়ে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে একসময় নিক্ষিপ্ত হয়। যা চব্বিশের অভ‌্যুত্থান আমাদেরকে শিখিয়ে গেছে। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় প্রয়োজন দলীয় অন্ধ আনুগত‌্যে ধ্বসে যাওয়া প্রশাসনিক কাঠামোকে সংস্কার করা। পাশাপাশি নাগরিক আস্থার পুনর্নির্মানে হাত দেওয়া জরুরী। এই আস্থা সংবিধানের উৎকট ব‌্যাখ‌্যায় কিংবা আইন দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হবে না। তা প্রতিষ্ঠিত হয় ন্যায়, স্বচ্ছতা এবং ধারাবাহিক জবাবদিহিতার মাধ্যমে।

পরিশে বলা যায়, বিপ্লবের প্রকৃত বিজয় মানুষের অন্তরে। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো বিপ্লবের সাফল্য তার উচ্ছ্বাসে নয়। দশ বছর পরে তার প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধেই বিপ্লবকে বিচার করা হয়। এখনো নানান প্রশ্ন ঘুরপাক খায়- চব্বিশের বিপ্লব কি সমাজকে ন্যায়ভিত্তিক করেছে? রাজনীতিকে কি জবাবদিহিমূলক করেছে? অর্থনীতিকে কি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করেছে? সংস্কৃতিকে কি আরও স্বাধীন ও দায়িত্বশীল করে তোলেছে? এসব প্রশ্নের সদুত্তর হয়তো এখনি পাওয়া সম্ভব নয়। ইতিহসা তার বিচার করবে। ক্ষমতার সুফলভোগীরা যদি চব্বিশের পরিবর্তনকে ক্ষমতার হাতবদলে সীমাবদ্ধ ভেবে বুঁদ হয়ে থাকেন, তবে ইতিহাস অচিরেই তাকে আরেকটি রাজনৈতিক অধ্যায় হিসেবেই স্মরণ করবে।

রাষ্ট্রের প্রকৃত পুনর্জন্ম সংসদ ভবনে মাননীয় এমপিদের আত্মপ্রচারে ঘটবে না। গণতন্ত্রের স্থায়িত্ব সংবিধানের ব‌্যা‌খ‌্যায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। মনে রাকতে হবে কোনো বিপ্লবের সবচেয়ে বড় সাফল্য নতুন সরকার প্রতিষ্ঠায় নয়। নাগরিক রাষ্ট্রের মৌলিক সুবিধাগুলো পাচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে হবে।

২০২৪-এর ঘটনাপ্রবাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আজও রয়ে গেছে। এইসময়ে কি শুধু একটি রাজনৈতিক অধ্যায় পরিবর্তন ঘটেছিল নাকি একটি নতুন নৈতিক রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি নির্মিত হয়েছিল? এই প্রশ্নের উত্তরই একদিন ইতিহাস লিখবে।


লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব,

বান্দরবান পার্বত‌্য জেলা।

01556560126

তারিখ: 15/07/2026