জীবনের ভিড়ে চিন্তার নির্মল আশ্রয়


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬, ৮:৩২ অপরাহ্ন / ০
জীবনের ভিড়ে চিন্তার নির্মল আশ্রয়

।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ ।।


আমরা তথ্যের যুগে বাস করছি, কিন্তু সব তথ্য জ্ঞান নয়। আমরা মতামতে ঘেরা, কিন্তু সব মত সত্য নয়। আমরা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিই, অথচ অনেক সময় বুঝে উঠি না সিদ্ধান্তটি সত্যিই আমাদের নিজের কি না। দর্শন এই কোলাহলের মধ্যে আমাদের শেখায় কোন প্রশ্ন করা দরকার। কোনো উত্তর গ্রহণের আগে কী যাচাই করা উচিত এবং নিজের জীবনকে কোন মূল্যবোধে পরিচালিত করা যায়। মানুষের জীবনে দর্শন মুখস্থ কোনো মতবাদ নয়, বরং সচেতনভাবে বাঁচার একটি অনুশীলন। দর্শনের কেন্দ্রীয় প্রশ্নগুলো অত্যন্ত বাস্তব। ভালো জীবন কী? ন্যায় কী? আমি কী চাই? আমার ভয় কোথা থেকে আসে? সম্পদ, সাফল্য ও সম্মান কি সুখের সমার্থক? মানুষের প্রতি আমার দায়িত্ব কোথায়? মৃত্যুকে মনে রেখে কীভাবে বাঁচব?

অ্যারিস্টটলের মতে, জীবন ভালো হয় কেবল কোনো স্থির মানসিক অবস্থায় পৌঁছালে নয়, বরং যুক্তি, নৈতিক গুণ ও অভ্যাসের মাধ্যমে ভালো কাজের সক্রিয় অনুশীলনে। এই দৃষ্টিতে দর্শন বইয়ের পাতায় বন্দি নয়; তা বাজারে, কর্মক্ষেত্রে, পরিবারে, বন্ধুত্বে এবং একান্ত সিদ্ধান্তের মুহূর্তে পরীক্ষা হয়।

মানুষের সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তিগুলোর একটি হলো সে নিজের চিন্তাকে সত্য বলে ধরে নেয়। “আমি ব্যর্থ”, “সবাই আমাকে অপছন্দ করে”, “আমার জীবন শেষ”, “এই সুযোগ না পেলে আর কোনো সুযোগ আসবে না” এ ধরনের বাক্য অনেক সময় বাস্তবতার নিরপেক্ষ বিবরণ নয়। এগুলো ভয়, অভিজ্ঞতা, সামাজিক চাপ ও অভ্যাসগত ব্যাখ্যার মিশ্রণ। দর্শন এই বাক্যগুলোর সামনে প্রশ্ন রাখে: প্রমাণ কোথায়? বিকল্প ব্যাখ্যা কি নেই? এই বিশ্বাস আমাকে কীভাবে পরিচালিত করছে?

কেউ কোনো গুজব ছড়ালে সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বাস না করে উৎস যাচাই করা, সামাজিক মাধ্যমে উত্তেজক বক্তব্য দেখে আবেগের বদলে প্রমাণ খোঁজা, নিজের ব্যর্থতার কারণ একটিমাত্র বলে ধরে না নিয়ে নানা সম্ভাবনা বিবেচনা করা এসবই দর্শনের দৈনন্দিন রূপ।

দর্শন আমাদের শেখায় অর্থ কি একমাত্র মাপকাঠি? দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ কী? নিজের চরিত্রের সঙ্গে কোন সিদ্ধান্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ? এই প্রশ্নগুলো সিদ্ধান্তকে আবেগের তৎক্ষণাৎ চাপ থেকে মুক্ত করে। অ্যারিস্টটলের ব্যবহারিক প্রজ্ঞার ধারণা এখানে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ নিয়ম জানা যথেষ্ট নয়; বাস্তব পরিস্থিতিতে কোন কাজটি উপযুক্ত, তা বিচার করার অভ্যাসও প্রয়োজন। অর্থাৎ দর্শন আমাদের শুধু “ভালো হও” বলে না; বরং শেখায় জটিল বাস্তবতায় ভালো কাজটি চিনব কীভাবে।

তবে মনে রাখা দরকার দর্শন দুঃখ দূর করার কোনো জাদু নয়। সে শোক, ব্যর্থতা, একাকিত্ব বা মৃত্যুকে অস্বীকার করে না। বরং মানুষকে তার দুঃখের সঙ্গে সৎভাবে বসতে শেখায়। কোনো কষ্টের অর্থ খুঁজে পাওয়া মানে কষ্টকে সুন্দর বলে সাজানো নয়। বরং কষ্টের মধ্যে নিজের অবস্থান, প্রয়োজন ও পরবর্তী পদক্ষেপকে স্পষ্ট করা।

দর্শন প্রশ্ন করতে শেখায়, কিন্তু প্রশ্ন করার সঙ্গে শুনতেও শেখায়। যুক্তি মানে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা নয়। সত্যের কাছাকাছি পৌঁছানোর জন্য নিজের অবস্থানও পরীক্ষা করা। এই অভ্যাস পরিবার, বন্ধুত্ব ও নাগরিক জীবনে বিশেষ প্রয়োজনীয়।

আমাদের বাজার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিজ্ঞাপন প্রতিনিয়ত বোঝায় আরও কিছু পেলেই আমরা সম্পূর্ণ হব। নতুন ফোন, বাড়ি, পদোন্নতি, অনুসারী, সামাজিক মর্যাদা এসব জীবনে মূল্যবান হতে পারে, কিন্তু এগুলোকে সুখের একমাত্র শর্ত বানালে মানুষ আকাঙ্ক্ষার দাসে পরিণত হয়।

দর্শন আমাদের আকাঙ্ক্ষাকে পরীক্ষা করে। আমি কি সত্যিই এটি চাই, নাকি অন্যের চোখে সফল দেখাতে চাই? এই অর্জন আমার জীবনকে সমৃদ্ধ করবে, নাকি কেবল তুলনার প্রতিযোগিতায় আমাকে আরও অস্থির করবে? আমার প্রয়োজন কতটুকু, আর আমার অহংকার কতটুকু?

অ্যারিস্টটলের জীবনদর্শনে সুখ কেবল আনন্দের অনুভূতি নয়। তা দীর্ঘ জীবনে নৈতিক ও যুক্তিসম্মত কার্যকলাপের বিকাশের সঙ্গে যুক্ত। এই ধারণা আমাদের শেখায় যে ভালো জীবন কোনো একদিনের উত্তেজনা নয়। বরং প্রতিদিনের অভ্যাস, বন্ধুত্ব, সংযম, সাহস ও দায়িত্বের সমন্বিত ফল।

দর্শন ভয়কে বলে না “তুমি ভয় পেয়ো না।” বরং প্রশ্ন করে ভয়ের প্রকৃতি কী? কোন অংশটি বাস্তব বিপদ, কোন অংশটি কল্পিত আশঙ্কা, আর কোন অংশটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে? এই পার্থক্য বুঝলে ভয় অদৃশ্য না হলেও তার সঙ্গে আচরণ করার পদ্ধতি বদলায়। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার ভয় বা সামাজিক অপমানের ভয় এসব ক্ষেত্রে দর্শন আমাদের নিয়ন্ত্রণযোগ্য ও অনিয়ন্ত্রণযোগ্য বিষয় আলাদা করতে সাহায্য করতে পারে। নিয়ন্ত্রণযোগ্য অংশে কর্মপরিকল্পনা, অনিয়ন্ত্রণযোগ্য অংশে গ্রহণযোগ্যতা এবং উভয়ের মাঝখানে নৈতিক স্থিরতা এই তিনটি জীবনকে ভারসাম্য দেয়।

 “সবকিছু মেনে নাও” বলে অন্যায় সহ্য করা যেমন ভুল, তেমনি “নিজের হাতে সবকিছু” ভাবাও বাস্তবতাবিরোধী। প্রজ্ঞা হলো কোথায় প্রতিরোধ করতে হবে, কোথায় পরিবর্তন আনতে হবে এবং কোথায় অনর্থক মানসিক যুদ্ধ থেকে সরে আসতে হবে তা বুঝতে পারা। দর্শন কাউকে ধনী হওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না। অসুস্থতা সারায় না, সম্পর্কের সব দ্বন্দ্ব মুছে দেয় না। প্রতিটি প্রশ্নের একক উত্তরও দেয় না। কখনো দর্শন বরং অস্বস্তিকর প্রশ্ন তৈরি করে যে জীবনকে এতদিন স্বাভাবিক ভাবছিলাম, তা কি সত্যিই আমার নির্বাচিত জীবন? আমি কি নীতির কথা বলি, কিন্তু সুবিধামতো তা ভঙ্গ করি? এই অস্বস্তিই দর্শনের শক্তি। মিথ্যা নিশ্চয়তার বদলে সত্যনিষ্ঠ অনিশ্চয়তা গ্রহণ করা অনেক সময় পরিণত জীবনের সূচনা। দর্শন আমাদের আরাম দিতে পারে, কিন্তু তার আগে সে আমাদের আত্মপ্রবঞ্চনা থেকে জাগিয়ে তোলে।

দর্শন শুরু করার জন্য বিশাল গ্রন্থাগার প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন একটি ঘটনার ওপর কয়েক মিনিট থামা যথেষ্ট। আজ কী ঘটল? আমি কী অনুভব করলাম? আমার প্রতিক্রিয়ার পেছনে কোন বিশ্বাস কাজ করল? আমি কি প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, নাকি অভ্যাস ও ভয় আমাকে চালিয়েছে? অন্য ব্যাখ্যা কী হতে পারে? আগামীকাল একই পরিস্থিতিতে আমি কী ভিন্নভাবে করতে পারি?

এভাবে একটি ছোট নোটবুক রাখা যায়। কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক বক্তব্য শুনলে তিনটি প্রশ্ন করা যায়: দাবিটি কী, তার প্রমাণ কী, এবং এর সম্ভাব্য ফল কী? কোনো নৈতিক দ্বন্দ্বে চারটি মূল্যবোধ লিখে দেখা যায়: সত্য, ন্যায়, মমতা ও দায়িত্ব কোনটি কীভাবে প্রভাবিত হচ্ছে? কোনো তর্কে উত্তর দেওয়ার আগে অপর পক্ষের বক্তব্য নিজের ভাষায় পুনরায় বলা যায়। এতে ভুল বোঝাবুঝি কমে এবং নিজের যুক্তির দুর্বলতাও ধরা পড়ে।

দর্শন মানুষকে এমন কোনো জীবন দেয় না যেখানে দুঃখ নেই, দ্বন্দ্ব নেই, ভুল নেই। সে বরং এমন একটি মন গড়ে তুলতে সাহায্য করে, যা দুঃখের মধ্যে অর্থ খোঁজে, সিদ্ধান্তের আগে থামে, প্রমাণ ছাড়া বিশ্বাস করে না, মতভেদে মানুষকে হারিয়ে ফেলতে চায় না এবং সাফল্যের অর্থ নিজে নির্ধারণ করতে শেখে।

দর্শন আমাদের জীবনের বাইরে কোনো দূরবর্তী মিনার নয়; এটি জীবনের ভেতরের একটি জাগ্রত আলো। কখনো সে প্রশ্ন, কখনো সংশয়, কখনো আত্মসমালোচনা, কখনো সাহস, কখনো সংযম এবং কখনো অন্যের কথা মন দিয়ে শোনার ক্ষমতা হয়ে প্রকাশ পায়। শেষ পর্যন্ত দর্শনের সবচেয়ে বড় উপহার হয়তো এই: সে আমাদের জীবনকে শুধু কাটিয়ে দিতে নয়, বুঝে বাঁচতে শেখায়।


লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

মোবাইল: 01556-560126 / 01645-950296

তারিখ: ০৯/০৯/202৬ খিষ্টাব্দ।