আলীকদম হোক পরিকল্পিত ‘গ্রীন সিটি জেলা’


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬, ৮:১৬ অপরাহ্ন / ০
আলীকদম হোক পরিকল্পিত ‘গ্রীন সিটি জেলা’

মমতাজ উদ্দিন আহমদ


বান্দরবানের আলীকদম উপজেলাকে বাংলাদেশের প্রস্তাবিত ৬৫তম জেলা করার দাবি উঠেছিল ২০১৮ সালে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী বরাবর গ্রীন পলিসি মুভমেন্টের আহ্বায়ক মো. মহিউদ্দিনের উপস্থাপিত স্মারকলিপি প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সামনে এনেছে। স্মারকলিপিতে আলীকদমকে একটি পরিকল্পিত “গ্রীন সিটি জেলা” হিসেবে গড়ে তোলা, লামা থেকে নতুন উপজেলা সৃষ্টি, পার্বত্য অঞ্চলের কয়েকটি প্রশাসনিক একককে নতুন কাঠামোয় যুক্ত করা এবং সরকারি সেবা জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

আমাদের মত হলো আলীকদমকে জেলা করার প্রস্তাবটি নীতিগতভাবে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। তবে জেলা ঘোষণা যেন কেবল নামফলক, নতুন দপ্তর এবং প্রশাসনিক ভবন নির্মাণে সীমাবদ্ধ না থাকে। এর সঙ্গে থাকতে হবে পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ বাস্তবতার প্রতি সংবেদনশীলতা, পরিবেশগত সুরক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা।

প্রাপ্ত তথ্যনুযায়ী, জেনারেল আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্র অধ্যাদেশ (১৯৫৯)-এর আওতায় ‘গজালিয়া’ ও ‘আলীকদম’ ইউনিয়ন কাউন্সিল গঠিত হয়। বিশাল বিস্তৃত ছিল আলীকদম ইউনিয়নের সীমানা, যা বর্তমান পুরো উপজেলা এবং লামার দুটি ইউনিয়ন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ১৯৬৪ সালে লামা ইউনিয়ন আলীকদম থেকে পৃথক হয়ে নতুন যাত্রা শুরু করে। অবশেষে, ১৯৮২ সালের ৭ নভেম্বর প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে ৮৮৫.৮৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের আলীকদম থানা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যা পরবর্তীতে উপজেলায় রূপান্তরিত হয়। অর্থাৎ আলীকদমের প্রশাসনিক স্বাতন্ত্র্য একেবারে নতুন কোনো ধারণা নয়; বরং কয়েক দশক ধরে এটি একটি পৃথক প্রশাসনিক বাস্তবতা হিসেবে বিকশিত হয়েছে।

আলীকদম: আয়তন, জনসংখ্যা ও অবস্থানের বাস্তব চিত্র

এই উপজেলার আয়তন ৮৮৫.৭৮ বর্গকিলোমিটার। এর ভৌগোলিক অবস্থান ২১°২১´ থেকে ২১°৫০´ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯২°১৫´ থেকে ৯২°৩৪´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে। উত্তরে লামা, দক্ষিণে মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চল, পূর্বে থানচি এবং পশ্চিমে লামা ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা। এই সীমানা আলীকদমকে একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী, পাহাড়ি, পরিবেশগতভাবে স্পর্শকাতর এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশাসনিক অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

প্রস্তাবিত জেলা কাঠামোর সম্ভাব্য চারটি প্রধান উপজেলা আলীকদম, লামা, নাইক্ষ্যংছড়ি ও থানচিকে একসঙ্গে দেখলে দাবিটির পরিসর আরও স্পষ্ট হয়। জনশুমারি ২০২২-ভিত্তিক বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর উপাত্ত-উৎসে আলীকদমের জনসংখ্যা প্রায় ৬৩.৮ হাজার, লামার প্রায় ১.৪০ লাখ, নাইক্ষ্যংছড়ির প্রায় ৭৬.৫ হাজার এবং থানচির প্রায় ২৯.৮ হাজার। এই চার উপজেলার সরল যোগফল প্রায় ৩,০৯,৭৫৬ জন। তবে এটি একটি সম্ভাব্য প্রস্তাবিত কাঠামোর হিসাব, কোনো অনুমোদিত জেলার সরকারি জনসংখ্যা নয়।

উপজেলা২০২২ জনসংখ্যাআয়তনপ্রধান সীমানা ও বৈশিষ্ট্য
আলীকদমপ্রায় ৬৩,৮০০৮৮৫.৭৮ বর্গ কিমিউত্তরে লামা; দক্ষিণে মিয়ানমার; পূর্বে থানচি; পশ্চিমে লামা ও নাইক্ষ্যংছড়ি
লামাপ্রায় ১,৩৯,৬৯০৬৭১.৮৩ বর্গ কিমিউত্তরে বান্দরবান সদর ও লোহাগাড়া; দক্ষিণে নাইক্ষ্যংছড়ি ও আলীকদম; পূর্বে রুমা, থানচি ও আলীকদম; পশ্চিমে চকরিয়া
নাইক্ষ্যংছড়িপ্রায় ৭৬,৪৮০৪৬৩.৬০ বর্গ কিমিউত্তরে লামা ও আলীকদম; দক্ষিণ-পূর্বে মিয়ানমার; পশ্চিমে উখিয়া ও রামু
থানচিপ্রায় ২৯,৭৯০১,০২০.৮২ বর্গ কিমিউত্তরে রুমা ও বিলাইছড়ি; পশ্চিমে লামা ও আলীকদম; পূর্ব ও দক্ষিণে মিয়ানমার-সংলগ্ন অঞ্চল

চার উপজেলার আয়তনের সরল যোগফল প্রায় ৩,০৪২.০৩ বর্গকিলোমিটার। ভৌগোলিকভাবে এর মধ্যে আলীকদম ও থানচি বড় আয়তনের, দুর্গম ও সীমান্ত-সংলগ্ন; লামা তুলনামূলকভাবে জনবহুল এবং নাইক্ষ্যংছড়ি মিয়ানমার ও কক্সবাজার-সংলগ্ন যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগভূমি। এই বৈচিত্র্য একটি একক জেলা সদর থেকে সেবা সমন্বয়ের সম্ভাবনা যেমন তৈরি করে, তেমনি সীমানা নির্ধারণে পৃথক উপজেলা-ভিত্তিক পরিকল্পনার প্রয়োজনও দেখায়।

আলীকদম বর্তমানে আলীকদম সদর, চৈক্ষ্যং, নয়াপাড়া ও কুরুকপাতাসহ চারটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত।

সূচকআলীকদমলামানাইক্ষ্যংছড়িথানচি
২০২২ জনসংখ্যাপ্রায় ৬৩,৮০০প্রায় ১,৩৯,৬৯০প্রায় ৭৬,৪৮০প্রায় ২৯,৭৯০
আয়তন৮৮৫.৭৮ বর্গ কিমি৬৭১.৮৩ বর্গ কিমি৪৬৩.৬০ বর্গ কিমি১,০২০.৮২ বর্গ কিমি
বর্তমান ইউনিয়ন৪টি৭টি ও ১ পৌরসভা৫টি৪টি
সীমান্ত/ভূকৌশলমিয়ানমার-সংলগ্ন; মাতামুহুরী অববাহিকাচকরিয়া, বান্দরবান ও পাহাড়ি উপজেলার সংযোগমিয়ানমার ও কক্সবাজার-সংলগ্নমিয়ানমার-সংলগ্ন; গভীর পাহাড়ি ও পর্যটন এলাকা

জেলা হলে প্রথম লাভ হবে সেবার দূরত্ব কমানো:

আলীকদম জেলা ঘোষণার সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি হলো প্রশাসনিক সেবা জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া। পাহাড়ি ও বিস্তৃত এলাকার মানুষের জন্য জেলা সদরকেন্দ্রিক সেবা গ্রহণ প্রায়ই সময়, অর্থ ও অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুক্ত। ভূমি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, সমাজসেবা, নারী ও শিশু সুরক্ষা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সড়ক এবং আইনশৃঙ্খলা এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ যদি দূরবর্তী জেলা সদরনির্ভর হয়, তাহলে নাগরিকের অধিকার বাস্তবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

জেলা সদর স্থাপিত হলে নতুন প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে ভূমি প্রশাসন, জেলা হাসপাতাল, শিক্ষা অফিস, কৃষি ও মৎস্য সম্প্রসারণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় জোরদার করা সম্ভব হতে পারে। বিশেষ করে দুর্গম ইউনিয়নগুলোর ক্ষেত্রে মোবাইল প্রশাসন, ডিজিটাল সেবা, স্যাটেলাইট স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে।

তবে জেলা সদর স্থাপন করলেই সেবা নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন দক্ষ জনবল, সড়ক ও সেতু, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, স্বাস্থ্যকর্মী, শিক্ষক, বিচারিক ও ভূমি-সংক্রান্ত সক্ষমতা। তাই আলীকদম জেলা ঘোষণার সঙ্গে একটি পর্যায়ভিত্তিক জেলা উন্নয়ন রূপরেখাঅনুমোদন করা জরুরি।

সীমান্ত ও কৌশলগত গুরুত্বকে উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে:

আলীকদমের দক্ষিণে মিয়ানমার-সংলগ্ন সীমান্ত। সীমান্ত অঞ্চলকে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় অর্থনীতি, বৈধ বাণিজ্য, যোগাযোগ, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং জননিরাপত্তাকে একই কাঠামোয় দেখতে হবে। জেলা পর্যায়ের প্রশাসনিক সমন্বয় থাকলে সীমান্ত-সংক্রান্ত বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, স্থানীয় সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন দপ্তরের মধ্যে যোগাযোগ আরও কার্যকর হতে পারে।

সীমান্তবর্তী অঞ্চলে রাষ্ট্রের উপস্থিতি মানে শুধু নিরাপত্তা চৌকি নয়; বিদ্যালয়, হাসপাতাল, বাজার, সড়ক, ডিজিটাল সংযোগ এবং নাগরিক মর্যাদার নিশ্চয়তাও। আলীকদম জেলা হলে সীমান্ত উন্নয়নকে একটি মানবিক ও অংশগ্রহণমূলক কাঠামোর অধীনে আনা সম্ভব হবে। এতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আস্থা যেমন বাড়বে, তেমনি সীমান্ত এলাকার বৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও শক্তিশালী হতে পারে।

‘গ্রীন সিটি জেলা’ শুধু আকর্ষণীয় নাম নয়:

স্মারকলিপির সবচেয়ে দূরদর্শী দিক হলো আলীকদমকে “গ্রীন সিটি জেলা” হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব। তবে এই ধারণাকে কেবল সৌরবাতি, পার্ক বা সবুজ রঙের ভবনে সীমাবদ্ধ করলে চলবে না। পাহাড়ি অঞ্চলে গ্রীন সিটি মানে হবে ভূমি, বন, পানি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য।

একটি প্রকৃত গ্রীন সিটি জেলার পরিকল্পনায় পাহাড় কাটা নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকিপূর্ণ ঢালে নির্মাণ নিষেধ, নদী ও ছড়া সংরক্ষণ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, বর্জ্য পৃথকীকরণ, সৌরশক্তি, পরিবেশবান্ধব সড়ক, গণপরিবহন, স্থানীয় নির্মাণসামগ্রী, দুর্যোগ-সহনশীল ঘরবাড়ি এবং কম-কার্বন প্রশাসনিক ভবন থাকতে হবে। বন ও পাহাড়কে বাদ দিয়ে উন্নয়ন করলে তা দীর্ঘমেয়াদে বন্যা, ভূমিধস, পানির সংকট ও জীববৈচিত্র্যহানির ঝুঁকি বাড়াবে।

আলীকদমের পাহাড়, নদী, বন ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে কেন্দ্র করে নিয়ন্ত্রিত ইকো-ট্যুরিজম গড়ে তোলা যেতে পারে। কিন্তু পর্যটন উন্নয়ন যেন স্থানীয় মানুষের জমি, পানি, সংস্কৃতি ও জীবিকার ওপর চাপ সৃষ্টি না করে। পর্যটন আয়ের একটি অংশ স্থানীয় ইউনিয়ন, পাহাড়ি জনগোষ্ঠী, সংরক্ষণ তহবিল এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ফেরত যাওয়ার ব্যবস্থা থাকা উচিত।

স্মারকলিপিতে প্রস্তাবিত আলীকদম জেলার অন্তর্ভুক্ত হিসেবে আলীকদম, থানচি, নাইক্ষ্যংছড়ি, লামা, লামা থেকে প্রস্তাবিত নতুন উপজেলা এবং নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে প্রস্তাবিত বাইশারীর কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বর্তমান বান্দরবান ও রাঙ্গামাটি জেলার কয়েকটি এলাকার পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাবও উত্থাপিত হয়েছে।

এই অংশটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। কারণ প্রশাসনিক সীমানা পরিবর্তন এর সঙ্গে যুক্ত থাকে জনগোষ্ঠীর পরিচয়, ভূমি-অধিকার, বাজার-সম্পর্ক, আদালত ও ভূমি অফিসে যাতায়াত, স্থানীয় পরিষদ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ রাজনৈতিক-সামাজিক বাস্তবতা। ফলে কোনো সীমানা পরিবর্তন স্থানীয় জনগণের মতামত, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ, ভূমি-অধিকার এবং বিদ্যমান স্থানীয় প্রশাসনিক কাঠামো বিবেচনা ছাড়া করা যাবে না।

বাংলাদেশের সরকারি জেলা তালিকায় বর্তমানে ৮টি বিভাগে ৬৪টি জেলা রয়েছে। তাই আলীকদমকে জেলা করা হলে এটি বাংলাদেশের ৬৫তম জেলা হবে। এটি এখনো দাবী ও স্মারকলিপিভিত্তিক প্রস্তাব। জাতীয় প্রশাসন পুনর্গঠন-সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি বা নিকার নতুন জেলা, উপজেলা ও প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের মতো বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়ন-সমন্বয়ের সঙ্গে যুক্ত।

সুতরাং প্রস্তাবটি নিকার পর্যায়ে বিবেচিত হলে অন্তত পাঁচ ধরনের সমীক্ষা প্রয়োজন: জনসংখ্যা ও সেবার চাহিদা, ভূগোল ও যোগাযোগ, আর্থিক ব্যয় ও রাজস্ব সম্ভাবনা, সীমান্ত ও নিরাপত্তা, এবং সামাজিক-পরিবেশগত প্রভাব। জেলা ঘোষণা হবে কি না তার আগে আলীকদমের মানুষের জন্য কোন প্রশাসনিক কাঠামো সবচেয়ে কার্যকর, সেটিই মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত।

জেলা হলে অর্থনীতি কীভাবে বদলাতে পারে?

আলীকদমের অর্থনীতি কৃষি, বনজ সম্পদ, বাঁশ-বেত, ক্ষুদ্র ব্যবসা, স্থানীয় বাজার এবং পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল। জেলা সদর হলে কৃষি সম্প্রসারণ, পাহাড়ি কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও বিপণন, স্থানীয় উৎপাদক সমবায়, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ঋণ, হস্তশিল্প, মধু, ফল, মসলা এবং বাঁশ-বেতপণ্যের বাজারজাতকরণে সমন্বিত নীতি নেওয়া সম্ভব হবে।

তবে উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভূমি ও জীবিকার নিরাপত্তা থাকতে হবে। রাস্তা বা পর্যটন প্রকল্পের নামে অনিয়ন্ত্রিত ভূমি অধিগ্রহণ, বন উজাড় বা পানির উৎস দখল করলে আলীকদমের সবুজ অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। উন্নয়নের মাপকাঠি হবে স্থানীয় মানুষের আয়, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপদ বাসস্থান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ শুধু ভবন বা সড়কের দৈর্ঘ্য নয়।

সম্ভাব্য খাতজেলা-ভিত্তিক পরিকল্পনার অগ্রাধিকার
কৃষিপাহাড়ি ফসল, ফল ও মসলার মূল্যশৃঙ্খল; সংরক্ষণাগার ও বাজার সংযোগ
পর্যটনধারণক্ষমতা-ভিত্তিক ইকো-ট্যুরিজম, স্থানীয় গাইড ও সম্প্রদায়ভিত্তিক আয়
স্বাস্থ্যজেলা হাসপাতাল, দুর্গম এলাকায় মোবাইল মেডিকেল ইউনিট, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য
শিক্ষাআবাসিক/দুর্গম বিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষা, মাতৃভাষা-সংবেদনশীল সহায়তা
পরিবেশপাহাড়, বন, ছড়া ও জলাধার সংরক্ষণ; বর্জ্য ও পাহাড়ধস ব্যবস্থাপনা
ডিজিটাল সেবাঅনলাইন ভূমি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা ও জরুরি সেবা
সীমান্ত উন্নয়নবৈধ বাণিজ্য, নিরাপত্তা, দুর্যোগ প্রস্তুতি ও স্থানীয় আস্থার সমন্বয়

আমাদের প্রস্তাব:

আলীকদমকে জেলা করার দাবি ইতিবাচকভাবে বিবেচনার জন্য সরকার একটি আলীকদম জেলা সম্ভাব্যতা ও সীমানা কমিশন গঠন করতে পারে। এতে প্রশাসন, পরিসংখ্যান, স্থানীয় সরকার, পরিবেশ, সড়ক, নিরাপত্তা, অর্থনীতি, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক বিশেষজ্ঞ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে। কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশ্য করতে হবে এবং আলীকদম, লামা, থানচি, নাইক্ষ্যংছড়ি ও সম্ভাব্য পুনর্বিন্যাস-এলাকার মানুষের গণশুনানি করতে হবে।

একই সঙ্গে জেলা ঘোষণা চূড়ান্ত হওয়ার আগেই কয়েকটি অন্তর্বর্তী পদক্ষেপ নেওয়া যায়: আলীকদমে বিশেষায়িত সরকারি সেবা কেন্দ্র, উন্নত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জরুরি সড়ক ও সেতু প্রকল্প, ডিজিটাল প্রশাসনিক হাব, পাহাড়ধস ও বন্যা সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, পর্যটন ব্যবস্থাপনা সেল এবং সীমান্ত উন্নয়ন সমন্বয় কমিটি। এসব পদক্ষেপ জেলা ঘোষণার প্রস্তাবকে বাস্তব উপকারের সঙ্গে যুক্ত করবে।

শেষকথা: আলীকদমকে বাংলাদেশের ৬৫তম জেলা করার দাবি কেবল একটি প্রশাসনিক মর্যাদার দাবি নয়; এটি প্রান্তিক ও সীমান্তবর্তী মানুষের কাছে রাষ্ট্রীয় সেবা, উন্নয়ন ও নিরাপত্তা পৌঁছে দেওয়ার দাবি। বড় আয়তন, মিয়ানমার-সংলগ্ন অবস্থান, পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, প্রায় ৬৩.৮ হাজার মানুষের বসতি, পর্যটন ও কৃষি সম্ভাবনা এবং প্রশাসনিক দূরত্ব সব মিলিয়ে আলীকদমের জন্য জেলা-পর্যায়ের কাঠামো বিবেচনার যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে।

আমরা তাই দাবিটির নীতিগত সমর্থন জানাই। তবে সমর্থনটি শর্তহীন নয়। আলীকদম জেলা হতে হলে এটি যেন আরও একটি প্রশাসনিক সদর নয়, বরং সেবা-কেন্দ্রিক, পরিবেশ-সুরক্ষিত, সাংস্কৃতিকভাবে সংবেদনশীল, সীমান্ত-সচেতন এবং অংশগ্রহণমূলক উন্নয়নের মডেলহয়। স্মারকলিপিটি নিকার পর্যায়ে গ্রহণ করে পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা, গণশুনানি ও পরিবেশগত মূল্যায়নের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

আলীকদমকে জেলা করা হলে বাংলাদেশের মানচিত্রে শুধু একটি নতুন নাম যুক্ত হবে না; সঠিক পরিকল্পনা থাকলে পাহাড়, সীমান্ত, মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থানের একটি নতুন প্রশাসনিক দৃষ্টান্তও তৈরি হতে পারে।


লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

মোবাইল: 01556-560126 / 01645-950296

তারিখ: ০৬.০৯.২০২৬ খিষ্টাব্দ।