
মমতাজ উদ্দিন আহমদ
প্রকৃতি ও মানুষের অন্তর্জগতের নিবিড় সংযোগ থেকেই জন্ম নেয় নদী-নন্দনতত্ত্ব। সেখানে জলধারা কেবল ভৌগোলিক সত্তা নয়; সে অস্তিত্ব, লোকস্মৃতি ও সৌন্দর্যের এক চলমান পাঠ। দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার পার্বত্য অববাহিকায় প্রবহমান কল্লোলিনী মাতামুহুরীও তাই নিছক কোনো জলরেখা বা নিষ্কাশন-প্রণালী নয়। চিম্বুক পর্বতমালার কোল ঘেঁষে সে বহন করে এক জীবন্ত আদিম সত্তার পরিচয়। এই জনপদের মানুষের কাছে সে এক চিরন্তন গাঙ-মাতা; জীবন, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের অবিনাশী উৎস।
মিয়ানমারের সাথে আলীকদমের সীমান্তঘেঁষা দুর্গম অরণ্যলোক থেকে চকরিয়া ও পেকুয়ার মোহনা পর্যন্ত বিস্তৃত এই নদীতন্ত্রে গড়ে উঠেছে জনপদ, কৃষ্টি ও সভ্যতার এক অন্তর্লীন ইতিহাস যার প্রাণভোমরা নিহিত এই গতিশীল জলের শরীরে। নদী-নন্দনতত্ত্বের দৃষ্টিতে মাতামুহুরী এখানে কেবল প্রকৃতি নয়। এটি প্রকৃতি ও মানবচেতনার পারস্পরিক নির্মাণ। যেখানে সৌন্দর্য স্থির কোনো বস্তু নয়, বরং প্রবাহের মধ্যেই তার জন্ম।
সমকালীন বাংলা গদ্য ক্রমশ নাগরিক কোলাহল ও যান্ত্রিক কৃত্রিমতার ভিড়ে তার স্বভাবজাত ধীরতা হারাচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে মাতামুহুরী–র এই উপাখ্যান নির্মাণ করে এক তপস্যাময় গদ্যের স্বতন্ত্র অববাহিকা। এখানকার বাক্যবিন্যাস কোনো লৌকিক চপলতায় উদ্বেল নয়; বরং পাহাড়ের খাঁজে জন্ম নেওয়া শৈবালের মতোই গাঢ়, গম্ভীর ও ধ্রুপদী। উৎসের নিভৃত খাদ ছেড়ে যেমন এই স্রোতস্বিনী অনন্ত জলধির অভিমুখে যাত্রা করে, তেমনি তার নন্দনতত্ত্ব অনুসরণ করতে করতে লেখকও অগ্রসর হন নিজের আত্মপরিচয় ও অস্তিত্বের গূঢ় দর্শনের দিকে।
মেঘমল্লারের সুর ও নৃ-সাংস্কৃতিক ভূগোল
মাতামুহুরীর এই নন্দনতত্ত্বের একটি বড় স্তম্ভ হলো তার দুই তীরে স্পন্দিত বহুত্ববাদী লোকসংস্কৃতি ও নৃ-সাংস্কৃতিক ভূগোল। পাহাড়ের চূড়ায় আষাঢ়ের প্রথম মেঘ যখন ডমরু বাজিয়ে নামে, তখন ম্রো, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা ও ত্রিপুরা পাড়াগুলোতে জাগ্রত হয় ‘পাহাড়ের মেঘমল্লার’ বা প্রাচীন বর্ষা-সংস্কৃতি।
সমতলের মানুষের কাছে বৃষ্টি যেখানে রোমান্টিক বিরহের উপমা, পাহাড়ের মানুষের কাছে তা জুমের খাড়া ঢালে বীজ বোনার এবং বেঁচে থাকার এক আদিম লড়াই। মারমা তরুণীর পুণ্য জলকেলি আর ম্রো যুবকের বাঁশের বাঁশির করুণ টানে যে সুর ফুটে ওঠে, তা মাতামুহুরীর রূপালী জলের কিনারে এসে একাকার হয়ে যায়। আবার সমতলের জলদাস ও বর্মন সম্প্রদায়ের প্রবীণ জেলেদের মুখে মুখে বেঁচে থাকা নদী-ভাষা যেমন: “কূল-খেকো ঢল”, “উজানি ডাক”, “বুকফাটা চর” কিংবা “মাছকুম” প্রমাণ করে যে, নদীরও একটি নিজস্ব বাকশিল্প আছে। যা কোনো কৃত্রিম অভিধানে লেখা থাকে না। ভাটিয়ালির উদাসী দীর্ঘশ্বাস আর পাহাড়ের জুম-গীতিকার এই যে আত্মিক মিলন, তা-ই এই অববাহিকার মানুষকে হাজার বছরের লোকগাথা ও কৃষ্টির বন্ধনে বেঁধে রেখেছে।
মহাবিশ্বের বিশাল ক্যানভাসে নদী ও বৃষ্টি কেবল প্রকৃতির কোনো আকস্মিক রূপান্তর নয়, বরং তা মহান স্রষ্টা রাব্বুল আলামীনের পরম একত্ববাদ বা তাওহীদের এক একটি প্রদীপ্ত মহাজাগতিক নিদর্শন। চৈত্র-বৈশাখের খরতাপে যখন আলীকদমের মাটি তপ্ত তামার মতো চিরে যায় এবং নদী নাব্যতা হারিয়ে কঙ্কালসার বালুচরে রূপ নেয়, তখন মুমিনের হৃদয় ‘সালাতুল ইস্তিসকার’ সিজদাহয় রোনাজারি করে।
অতঃপর আকাশ ভেঙে যখন রহমতের বারিধারা নেমে আসে। তখন মৃত জমিন পুনরায় জীবন লাভ করে যা মূলত মানুষের মৃত্যুর পর পুনরুত্থানেরই এক চাক্ষুষ পার্থিব প্রমাণ। পাহাড়ের বুক চিরে তৈনখাল, চৈক্ষ্যং খাল, বমু খাল কিংবা দোছরী ও ফাত্তারা খালের মতোন প্রজারূপী উপনদীগুলোর যে পথচলা, তা সৃষ্টিলগ্ন থেকে আপন মাবুদের দরবারে এক অবিরত তাসবিহ পাঠ ও সিজদাহর মহাস্রোত। নদী যখন সাগরের নোনা জলের বুকে নিজের আমিত্বকে নিঃশেষে বিলীন করে দেয়, ঠিক তেমনই একজন মোমিন বান্দাও তার জাগতিক অহংকার স্রষ্টার হুকুমের কাছে সমর্পণ করে খুঁজে পায় এক পরম আরোগ্যের মহাসুনিবিড় আশ্রয়।
করপোরেট গ্রাস ও নদীর দীর্ঘশ্বাস:
কিন্তু আজকের মাতামুহুরী কেবল রূপকথার নদী নয়। সে আজ মানুষের অপরিনামদর্শী লোভ, পাহাড় কাটা ও করপোরেট আগ্রাসনের এক রক্তাক্ত দলিল। ১৮৮০ সালের ১৭ নভেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার নদীকে জলদানের মহৎ উদ্দেশ্যে যে রিজার্ভ ফরেস্টকে সুরক্ষিত ঘোষণা করেছিলেন, বনদস্যুদের অবাধ বৃক্ষনিধনে সবুজাভ বনে শ্মশানের ছাইয়ের ধূসরতা পরিলক্ষিত হয়। নদীর চরাঞ্চলজুড়ে তামাক কোম্পানির বিষাক্ত নীল চাষ মাটির পুষ্টি ও নদীর পানিকে মৎস্যশূন্য করে তুলছে। পাহাড় ক্ষয়ে পলি জমার কারণে নদীর ঐতিহ্যবাহী গভীর ‘কুম’ বা মাছের আধারগুলো আজ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এই নদী হত্যা কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়, এটি এক রাজনৈতিক অপরাধ। এই পরিবেশ-সংকটের বাস্তব দলিলকে ধারণ করে এই গ্রন্থ কেবল অতীতের নস্টালজিয়া ছড়ায় না, বরং নদী-সভ্যতাকে বাঁচিয়ে রাখার এক অন্তিম আইনি ও সামাজিক আন্দোলনের ডাক দেয়।
পরিশেষে, মাতামুহুরী এখানে জীবন, যৌবন ও প্রেমের উম্মেষের পাশাপাশি মৃত্যু ও বিলয়ের এক পরম দার্শনিক রূপক হিসেবে হাজির হয়। নদীপাড়ের মানুষ মুখে মুখে যে মৌখিক ইতিহাস বা অলিখিত আর্কাইভ বহন করে চলেছে, তাতে ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আর বানের জলে ভেসে যাওয়া গ্রামীণ জনপদের স্মৃতি আজও জীবন্ত।
শৈশবে যাদের সাথে ‘জবাদাইল্যার কুম’-এর অতল গভীরে ডুব দিয়ে মাটি তোলার উন্মাদনায় মেতেছি, তাদের অনেকেই আজ মহাকালের মহাস্রোতে হারিয়ে গেছে। নদীর এই অবিরাম ভাঙন আর নতুন চরের সৃষ্টি যেন মানুষের নশ্বর অস্তিত্বেরই এক শান্ত অক্ষরচিত্র। ভেজা জানলার চিলতে ফাঁক দিয়ে আসা মেঠোপথের সোঁদা গন্ধ আর মায়ের ডাক বুকে নিয়ে, জীবনের প্রান্তবেলায় দাঁড়িয়ে লেখকের কলম আজ চিনে নেয় জলের কাছে মানুষের শেষ প্রত্যাবর্তনের অমোঘ সত্যকে। বৃষ্টি, নদী আর তারুণ্যের এই ত্রিমাত্রিক দিনলিপি তাই চিরকাল বাংলা সাহিত্যে এক স্বতন্ত্র ও অবিনাশী ‘নদী-প্রকৃতি সাহিত্য’ (Riverine Literature) হিসেবে স্পন্দিত হতে থাকবে।
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
মোবাইল: 01556-560126 / 01645-950296
ইমেইল: momtaj.news@gmail.com
তারিখ: ২৮/০৭/2026 খিষ্টাব্দ।
আপনার মতামত লিখুন :