
মমতাজ উদ্দিন আহমদ
আজকের আলীকদমকে দেখলে তার অতীতের রহস্যঘেরা পরিচয়টি হয়তো অস্পষ্ট মনে হতে পারে। চারপাশে সবুজের বুক চিড়ে আধুনিক সড়ক, যেখানে একসময় ছিল ঘন বনে আচ্ছাদিত আঁকাবাঁকা পথ আর ছড়াপথ। একসময়ের দুর্গম পাহাড়ি ঢাল এখন জনবসতি ও ফসলের ক্ষেতে ভরপুর। তবে এই আধুনিকতার আড়ালে লুকিয়ে আছে মাতামুহুরী নদীর মায়ায় গড়ে ওঠা এক প্রাচীন জনপদের সমৃদ্ধ ইতিহাস, যার সূচনা হয়েছিল এক রাজকীয় ট্র্যাজেডির পর।
পরাক্রমশালী শাহ সুজার করুণ পরিণতি
১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির মসনদ নিয়ে মুঘল সম্রাট শাহজাহানের পুত্রদের মধ্যে শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ফলস্বরূপ পরাজিত হন শাহ সুজা। তিনি তাঁর বিশ্বস্ত অনুচর ও পরিবার নিয়ে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে যান আরাকানে। কিন্তু সেখানেও তিনি বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হন। আরাকানের রাজা তাঁকে হত্যা করলে মুঘল সৈন্যদের এক বিরাট দল দিশেহারা হয়ে পড়ে। তারা না পারত দিল্লির আওরঙ্গজেবের কাছে ফিরে যেতে, না পারত আরাকানে থাকতে। এই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে তারা এক নির্জন ভূখণ্ডে আশ্রয় খোঁজা শুরু করে। তাদের এই যাত্রাই আলীকদমের ইতিহাসের প্রথম মানব বসতি স্থাপনের ভিত্তি তৈরি করে।
ফতে খাঁর নেতৃত্বে প্রথম বসতি
এই পরাজিত মুঘল দলটির নেতৃত্ব দেন মুঘল সেনাপতি ফতে খাঁ। তিনি তাঁর অনুসারীদের নিয়ে মাতামুহুরী নদীর কূল ঘেঁষে এক দুর্গম অরণ্যে আশ্রয় নেন। এই স্থানটি বেছে নেওয়ার কারণ ছিল এর প্রাকৃতিক নিরাপত্তা। একদিকে মাতামুহুরী নদীর খরস্রোতা ধারা, অন্যদিকে ঘন অরণ্য ও উঁচু পাহাড় – সব মিলিয়ে এটি ছিল মুঘলদের আত্মগোপন ও নতুন জীবন শুরুর জন্য আদর্শ স্থান। এখানে ফতে খাঁর নেতৃত্বে মুঘল যোদ্ধারা শুধু একটি দুর্গই নির্মাণ করেননি, বরং নিজেদের জন্য একটি নতুন জনপদও গড়ে তুলেছিলেন। তারা জঙ্গল কেটে জমি পরিষ্কার করে চাষাবাদ শুরু করেন এবং এটিই ছিল আলীকদমের প্রথম আনুষ্ঠানিক মানব বসতি।
চাকমা ও মোগলদের সহাবস্থান
ফতে খাঁ এবং তাঁর সঙ্গীরা শুধু নিজেদের বসতি স্থাপন করেই ক্ষান্ত হননি, বরং স্থানীয় জুমিয়া জনগোষ্ঠীর, বিশেষ করে চাকমাদের, সাথে একটি সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তখন আরাকানিদের অত্যাচারে বিতাড়িত হয়ে বহু চাকমা এই অঞ্চলে আশ্রয় নিচ্ছিল। ফতে খাঁ তাদের আশ্রয় দেন এবং তাদের জুম চাষের অধিকার নিশ্চিত করেন। এর বিনিময়ে চাকমারা তাকে তাদের ‘আদিরাজা‘ হিসেবে মেনে নেয়। এই মিথস্ক্রিয়া থেকে এক নতুন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ধারার জন্ম হয়। মুঘলদের ভাষা ও সংস্কৃতি চাকমাদের জীবনে প্রবেশ করে। ফার্সি ও আরবি শব্দ চাকমা ভাষায় মিশে যায়, মুঘল পোশাক ও রীতিনীতি চাকমাদের মধ্যে প্রচলিত হয়। এই মিশ্র সংস্কৃতির কারণে স্থানীয় চাকমারা মুঘলদেরকে ‘মোগল্যা‘ নামে ডাকতে শুরু করে, যা তাদের রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বতন্ত্র পরিচয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে।
প্রেম ও আক্ষেপের লোকগাথা
এই সংমিশ্রণের সবচেয়ে মানবিক দিকটি উঠে আসে লোকগাথায়। ফতে খাঁ ও একজন চাকমা রমণীর ভালোবাসার গল্প স্থানীয়দের মুখে মুখে প্রচলিত আছে। এই প্রেমের আখ্যানটি ‘মানিক বি‘ ও ‘চাটিগা ছড়া‘-তে বিধৃত। এই ছড়াগুলো শুধু ভালোবাসার গল্প বলে না, বরং এই মিশ্র সম্পর্কের পরিণতি এবং এক ভিন্ন সমাজে মিশে যাওয়ার বেদনাও ফুটিয়ে তোলে। এই আক্ষেপ প্রমাণ করে যে, আলীকদমের ইতিহাস কেবল সামরিক বা রাজনৈতিক ঘটনা ছিল না, বরং তা ছিল মানুষের আবেগ ও অনুভূতির এক জটিল আলেখ্য।
একটি রাজত্বের সমাপ্তি ও অমর উত্তরাধিকার
ফতে খাঁ ও তাঁর বংশধরদের এই নতুন রাজ্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৭২৪ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রামের মোগল নবাবের সাথে স্থানীয় জমিদার জালাল খাঁ-এর বিবাদের জেরে মোগলরা এই অঞ্চলে আক্রমণ চালিয়ে ফতে খাঁর হাতে গড়া দুর্গটি ধ্বংস করে দেয়। এই আক্রমণের ফলে আলীকদমে সরাসরি মুঘল শাসনের সমাপ্তি ঘটে। তবে এই পতন সত্ত্বেও ফতে খাঁর উত্তরাধিকার মুছে যায়নি। আলীর পাহাড়, ফতে খাঁর চর, এবং স্থানীয় লোকগাথার মধ্য দিয়ে তাঁর স্মৃতি আজও অমলিন। এই জনপদ একসময় মুঘল ট্র্যাজেডির শিকার হওয়া যোদ্ধাদের আশ্রয়স্থল ছিল, কিন্তু তাদের দৃঢ়তা এবং মাতামুহুরী নদীর মায়াময় আহ্বানে এটি হয়ে ওঠে এক মিশ্র সংস্কৃতির জীবন্ত জনপদ, যার প্রতিটি পাথর, প্রতিটি নদী ও উপত্যকা তার সমৃদ্ধ ইতিহাসকে বহন করে চলেছে।
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
মোবাইল: 01556-560126 / 01645-950296
ইমেইল: momtaj.news@gmail.com
তারিখ: ০৪/০৬/2026 খিষ্টাব্দ।
আপনার মতামত লিখুন :