আলীকদমের প্রত্নতাত্ত্বিক নিশান ও জনবসতির ইতিবৃত্ত


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : মে ২২, ২০২৬, ১:৪৭ অপরাহ্ন /
আলীকদমের প্রত্নতাত্ত্বিক নিশান ও জনবসতির ইতিবৃত্ত

।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ ।।


আলীকদম কেবল একটি প্রশাসনিক ভূখণ্ড নয়, বরং এটি ইতিহাসের এক জীবন্ত সংগ্রহশালা। মাতামুহুরী উপত্যকার এই প্রাচীন জনপদে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের বিবর্তন, যুদ্ধ এবং সংমিশ্রণের ইতিহাস।

১. প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন: আলীর পাহাড় ও প্রাচীন ইটভাটা

উপজেলা সদর থেকে মাত্র ২-৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত ‘আলীর পাহাড়’ এই জনপদের প্রাচীনত্বের সাক্ষ্য বহন করে। এই পাহাড়ে খোদাইকৃত ৩-৪টি রহস্যময় সুড়ঙ্গ প্রমাণ করে যে, অতি প্রাচীনকালেই এখানে উন্নত ও কৌশলগত জনবসতি বিদ্যমান ছিল।

পাহাড়ের পাদদেশ ঘেঁষে নয়াপাড়া এলাকায় প্রাচীন ইটভাটার ধ্বংসাবশেষ এবং মাটির নিচে চাপা পড়া প্রাচীন ইটগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, মাতামুহুরী নদীর কূল ঘেঁষেই গড়ে উঠেছিল প্রাচীন নির্মাণশৈলী। প্রতিরক্ষা বা আশ্রয়ের প্রয়োজনে এই সুড়ঙ্গ এবং অট্টালিকা নির্মাণের জন্য নয়াপাড়া এলাকাতেই ইট পোড়ানো হতো বলে ধারণা করা যায়।

২. তৈন রাজ্যের উত্থান ও পতন (১৭১১-১৭২৪ খ্রি.)

ইতিহাসবিদ অধ্যাপক আলমগীর মোহাম্মদ সিরাজউদ্দিনের ‘রাজাজ অব দি চিটাগাং হিলট্রাক্টস্’ গ্রন্থের তথ্যমতে, ১৭১১ খ্রিস্টাব্দে চন্দন খাঁ ওরফে তৈন খাঁ মাতামুহুরী সীমান্তে একটি স্বাধীনচেতা উপজাতীয় রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি আরাকান রাজের অনুগত সামন্ত হলেও তাঁর বংশধররা পরবর্তীকালে মোগলদের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কে জড়ান।

তৈন খাঁর চতুর্থ পুরুষ জালাল খাঁ মোগলদের আনুগত্য স্বীকার করে খাজনা দিতে সম্মত হলেও ১৭২৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি মোগল শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। দোহাজারী ঘাঁটির মোগল ফৌজদার কৃষাণ চাঁদ এই বিদ্রোহ দমনে অভিযান চালালে জালাল খাঁর বাহিনী পর্যুদস্ত হয় এবং তারা পুনরায় আরাকানে বিতাড়িত হন। এই সংঘাত আলীকদমের ভূ-রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়।

৩. জাতিগত বৈচিত্র্য: আগমন ও বসতি স্থাপনের ইতিহাস

আলীকদমের লোকজ ইতিহাস অনেক ক্ষেত্রে রূপকথা ও কিংবদন্তির আড়ালে ঢাকা পড়লেও বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর আগমনের ধারাটি নিম্নরূপ:

  • তঞ্চঙ্গাদের পদচারণা (১৪১৮-১৫১০ খ্রি.): জনশ্রুতি ও ঐতিহাসিক তথ্যমতে, ১৪১৮ সালের দিকে রাজা মারাক্যা তৈন সুরেশ্বরীর নেতৃত্বে তঞ্চঙ্গারা আরাকান থেকে আলীকদমে আগমন করেন এবং ১৫১০ সাল পর্যন্ত তাদের শক্তিশালী অবস্থান বজায় ছিল।
  • মুরুং সম্প্রদায়ের আগমন (সপ্তদশ শতাব্দী): সপ্তদশ শতাব্দীর দিকে মুরুংরা আরাকান থেকে পালিয়ে এসে মাতামুহুরী উপত্যকায় স্থায়ী বসতি গড়ে তোলে। ১৭৮৭ সালের ২৪ জুন ব্রহ্ম সম্রাটের এক চিঠিতেও মুরুংদের পার্বত্য চট্টগ্রামে আগমনের প্রেক্ষাপট বর্ণিত আছে।
  • মার্মাদের বসতি স্থাপন: বোমাংগ্রীর নেতৃত্বে মার্মারা আরাকান থেকে এই পার্বত্য অঞ্চলে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে, যা এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক বলয়কে সমৃদ্ধ করেছে।
  • ত্রিপুরাদের আগমন: যদিও প্রাচীনকাল থেকেই বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামে ত্রিপুরাদের শক্তিশালী রাজত্ব ছিল, তবে আলীকদম অঞ্চলে তাদের বর্তমান বসতির বিস্তার মূলত পূর্ব পাকিস্তান আমল থেকে বলে জানা যায়।
  • বাঙালিদের আগমন: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে হিন্দু ও মুসলিম বণিক-মহাজনরা বাণিজ্য ব্যপদেশে এই দুর্গম জনপদে প্রথম পদার্পণ করেন এবং কালক্রমে স্থানীয় জনপদের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠেন।

উপসংহার ও প্রত্যাশা

অজস্র চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আলীকদম আজ স্বাধীন বাংলাদেশের একটি উদীয়মান উপজেলা। সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অনেক ঐতিহাসিক সত্য ও উন্নয়নের সম্ভাবনা হীনম্মন্যতার অন্ধকারে নিমজ্জিত। তবে বর্তমান প্রজন্মের সচেতনতা এবং ঐতিহাসিক তথ্যের নির্মোহ বিশ্লেষণের মাধ্যমে আলীকদম নতুন আলোর উদ্ভাসিত হবে—এটাই সর্বজনীন প্রত্যাশা।

তথ্যসূত্র:

১. অধ্যাপক আলমগীর মোহাম্মদ সিরাজউদ্দিন, রাজাজ অব দি চিটাগাং হিলট্রাক্টস্

২. শ্রী উচ্চতমণি তঞ্চঙ্গা, গণপদচারণে আলীকদম

৩. লামা-আলীকদম প্রেস ক্লাব প্রকাশিত ‘মাতামুহুরী’ (১ম সংখ্যা)।


লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

মোবাইল: 01556-560126 / 01645-950296

ইমেইল: momtaj.news@gmail.com

তারিখ: ২২/০৫/2026 খিষ্টাব্দ।