স্বপ্ন: আত্মার গোপন ইশতেহার ও নিউরনের নিঃশব্দ বিদ্যুৎ


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : মার্চ ৪, ২০২৬, ৬:৪৭ অপরাহ্ন /
স্বপ্ন: আত্মার গোপন ইশতেহার ও নিউরনের নিঃশব্দ বিদ্যুৎ

— মমতাজ উদ্দিন আহমদ —


রাত যখন নীরবতার চাদর মেলে দেয়, পৃথিবী যখন ক্লান্ত শরীরটাকে অন্ধকারের কোলে শুইয়ে দেয়, তখন মানুষের ভেতরে আরেকটি পৃথিবী জেগে ওঠে—স্বপ্নের পৃথিবী। সেখানে যুক্তির শাসন নেই, সময়ের হিসাব নেই, বাস্তবতার কড়াকড়িও নেই। অথচ সেই অদ্ভুত, ছায়াময় জগতটিই হয়তো আমাদের সবচেয়ে সত্য উচ্চারণ। মনোবিশ্লেষণের জনক সিগমুন্ড ফ্রয়েড মনে করতেন—স্বপ্ন কেবল এলোমেলো ছবির মিছিল নয়; এটি আমাদের অচেতন মনের গোপন ভাষা।

স্বপ্ন নিয়ে দীর্ঘদিনের এই রহস্যময়তাকে বোঝার জন্য আজ আমরা দাঁড়িয়ে আছি দুই ভিন্ন মেরুর মোহনায়—একদিকে সিগমুন্ড ফ্রয়েডের কালজয়ী মনোবিশ্লেষণ, অন্যদিকে আধুনিক নিউরোসায়েন্সের নির্মোহ বৈজ্ঞানিক তথ্য। এই দুইয়ের মিলনেই রচিত হয় আমাদের স্বপ্নের পূর্ণাঙ্গ উপাখ্যান।

স্বপ্ন হতে পারে অতীতের স্মৃতি কিংবা বর্তমানের হাহাকারের মেলবন্ধন। ব্যক্তিগত জীবনের পাতায় তাকালে দেখি, ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দের শহরের প্রেমময় স্মৃতি কিংবা সেই অরণ্যঘেরা দিনগুলোর মাদকতা। কুঞ্জবীথিকার সবুজাভ পরিবেশ কিংবা পাহাড়ের গহীনে নির্জন মুহূর্তগুলো ছিল রূপকথার মতো। শীতের সেই হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডায় উষ্ণতা স্বপ্ন হয়ে স্মৃতিতে হাহাকার করে ফেরে। স্বপ্নের রাজা-রাণীরা আজো পাশে থাকে, অথচ কোথায় যেন এক দুস্তর ব্যবধান। এই যে শূন্যতা, এই যে অতৃপ্তি—হয়তো অবচেতন মন সেই হারানো দিনগুলোকে আজও স্বপ্নের মাঝে ফিরে পেতে চায়। ফ্রয়েড ঠিকই বলেছিলেন, স্বপ্ন অনেক সময় ইচ্ছাপূরণেরই ছদ্মরূপ। বাস্তবে যা আমরা ফিরে পাই না, মন নিজের সঙ্গে গোপন এক সমঝোতা করে বলে ওঠে— “বাস্তবে না পারলে, অন্তত স্বপ্নে তো হোক।”

আরও পড়ুন: কুরআন ও বিজ্ঞানের আলোয় চিন্তার মুক্তি ও সৃষ্টির রহস্য

মনোবিশ্লেষণের জনক সিগমুন্ড ফ্রয়েড-এর দর্শনে উঠে আসে অবচেতনের গোপন রাজপথ। ১৯০০ সালে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্যা ইন্টারপ্রিটেশন অফ ড্রিমস’-এ ঘোষণা করেছিলেন— স্বপ্ন হলো অবচেতনের রাজপথ।” আমাদের যাপিত জীবনে যে দমিত ইচ্ছা, নিষিদ্ধ বাসনা বা অমীমাংসিত দ্বন্দ্বগুলো আমরা লোকলজ্জা বা নৈতিকতার ভয়ে মনের গহীনে চেপে রাখি, তারা মরে যায় না। বরং রাতের আঁধারে তারা প্রতীকের পোশাক পরে আমাদের সামনে হাজির হয়।

ফ্রয়েডের মতে, স্বপ্নের দুটি রূপ আছে: দৃশ্যমান অংশ ও অন্তর্লুকানো অর্থ। সকালে ঘুম থেকে উঠে আমরা যা মনে রাখি—একটি এলোমেলো গল্প বা অদ্ভুত সব দৃশ্য। এটি দৃশ্যমান অংশ। অপরদিকে, সেই দৃশ্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা আদিম বাসনা বা ভয় হচ্ছে অন্তর্লুকানো অর্থ।

যেন নদীর উপরিভাগে ভেসে থাকা চঞ্চল ঢেউ হলো দৃশ্যমান স্বপ্ন, আর গভীরে বয়ে চলা গোপন স্রোত হলো তার প্রকৃত অর্থ। ফ্রয়েড মনে করতেন, স্বপ্ন হলো মনস্তাত্ত্বিক এক সমঝোতা— বাস্তবে যা অসম্ভব, স্বপ্নে অন্তত তা পূর্ণ হোক।”

নিউরোসায়েন্সের চোখে স্বপ্ন হচ্ছে মস্তিষ্কের রাত্রিকালীন রিহার্সাল। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বিজ্ঞান স্বপ্নকে দেখলো সম্পূর্ণ ভিন্ন এক লেন্স দিয়ে। নিউরোসায়েন্টিস্ট জে. অ্যালান হবসন এবং রবার্ট ম্যাককার্লির ‘অ্যাক্টিভেশন-সিন্থেসিস’ তত্ত্ব বলছে, স্বপ্ন কোনো লুকানো বার্তা নয়; বরং এটি মস্তিষ্কের এক ধরণের ‘স্নায়বিক পুনর্গঠন’ প্রক্রিয়া।

তবে স্বপ্ন কি কেবলই মনের আর্তি? আধুনিক নিউরোসায়েন্স একে দেখছে ভিন্নভাবে। সহজ কথায়, ঘুমের দ্রুত চক্ষু সঞ্চালন বা চোখের মণির দ্রুত নড়াচড়ার স্তরে আমাদের মস্তিষ্কের বিচারবুদ্ধি বা যুক্তির অংশটি বিশ্রাম নিলেও আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অংশটি ভীষণ সক্রিয় থাকে। এই সময়েই মস্তিষ্ক সারাদিনের জমা হওয়া স্মৃতি ও অভিজ্ঞতাগুলো গুছিয়ে নেয় এবং এলোমেলো স্নায়বিক সংকেত থেকে তৈরি করে বিচিত্র সব স্বপ্নের দৃশ্যপট। যেহেতু তখন যুক্তি কাজ করে না, তাই স্বপ্নের আবেগগুলো আমাদের কাছে খুব তীব্র ও বাস্তব মনে হয়। বিজ্ঞানীদের মতে, এই স্বপ্ন আসলে মনের এক ধরণের ‘প্রতিরক্ষা মহড়া’ বা সিমুলেশন, যা আমাদের বাস্তব জীবনের সম্ভাব্য বিপদ বা মানসিক চাপ সামলানোর জন্য ভেতরে ভেতরে প্রস্তুত করে তোলে। অনেকে লক্ষ্য করেছেন, অনেক সময় সারাদিন যা নিয়ে খুব দুশ্চিন্তা করেন, রাতে স্বপ্নে সেই সমস্যারই কোনো বিচিত্র সমাধান বা পরিস্থিতি দেখতে পান। এটিই হলো মস্তিষ্কের সেই ‘প্রতিরক্ষা মহড়া’।

তাহলে প্রশ্ন জাগে—স্বপ্ন কি দমিত বাসনার ভাষা, নাকি নিউরনের এলোমেলো বিদ্যুৎ চমক? হয়তো উত্তরটি লুকিয়ে আছে এই দুটির সমন্বয়ে। আমাদের মস্তিষ্কের জৈব প্রক্রিয়াই (নিউরনের সক্রিয়তা) সেই ক্যানভাস তৈরি করে, যেখানে আমাদের ব্যক্তিগত ইতিহাস, শৈশবের ট্রমা, সংস্কৃতি আর গোপন আকাঙ্ক্ষাগুলো (ফ্রয়েডীয় অবচেতন) রঙের প্রলেপ দেয়। ফ্রয়েড যেখানে স্বপ্নের ভেতরের ‘বার্তা’ পড়তে চেয়েছেন, নিউরোসায়েন্স সেখানে সেই বার্তা তৈরির ‘যন্ত্রপাতি’ ব্যাখ্যা করেছে। এক পক্ষ অর্থের সন্ধানী, অন্য পক্ষ প্রক্রিয়ার বিশ্লেষক। “স্বপ্ন হলো সেই দীপ্ত সেতু, যা মানুষের শরীর আর মনের মাঝে এক রহস্যময় সংযোগ রক্ষা করে।”

অনেকের মতে স্বপ্ন আত্মপরিচয়ের অদেখা দর্পণ। স্বপ্ন দেখা মানে কেবল ঘুমিয়ে থাকা নয়, এটি আসলে নিজেকে নতুন করে চেনা। আমরা দিনে যে ‘সামাজিক মুখোশ’ পরে থাকি, রাতে স্বপ্ন তা খুলে ফেলে আমাদের আদিম রূপটি সামনে আনে। আমরা যখন স্বপ্নে উড়ি, তখন হয়তো সেটি স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা; যখন পড়ে যাই, তখন হয়তো তা নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়। স্বপ্ন আমাদের প্রশ্ন করে— “তুমি কি সত্যিই নিজেকে চেনো?” এটি আত্মার সেই দিনলিপি, যেখানে আমরা নিজের অজান্তেই প্রতিদিন কিছু না কিছু লিখে রাখি।

স্বপ্ন হতে পারে অনেকের কাছে রাত্রিকালীন কবিতা! স্বপ্ন নিছক কোনো অর্থহীন চলচ্চিত্র নয়, আবার এটি কেবল রাসায়নিক বিক্রিয়াও নয়। মানুষ কেবল রক্ত-মাংসের শরীর নয়, সে এক জটিল অনুভূতি ও স্মৃতির সমন্বিত রূপ। আর স্বপ্ন হলো সেই সমন্বয়ের এক জাদুকরী রাত্রিকালীন কবিতা। “স্বপ্ন তাই কেবল ঘুমের অলংকার নয়; এটি মানুষের অন্তর্জগতের সেই নিভৃত দর্পণ, যেখানে তাকালে হয়তো আমরা চিনতে পারি—দিনের কোলাহলে হারিয়ে ফেলা আমাদের সেই অকৃত্রিম সত্তাটিকে।”

তাই স্বপ্নকে ভয় না পেয়ে তাকে শুনতে শেখা দরকার। কারণ যে নিজের স্বপ্নের দর্পণে তাকাতে সাহস করে, সে-ই শেষ পর্যন্ত নিজের অদেখা মুখটি দেখতে পায়। দিনের কোলাহলের চেয়ে রাতের এই মৌন আলাপচারিতাই হয়তো আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্যটি বলে দেয়।


লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

তারিখ: ০৫/০৩/২০২৬ খ্রি:।