
।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ ।।
সময়ের নিজস্ব কোনো শব্দ নেই, তবুও তার পদধ্বনি শোনা যায় মানুষের অভ্যাসে, বিবর্তিত রুচিতে আর ম্লান হয়ে আসা স্মৃতির ধূসর পাতায়। আমরা যারা এই বর্তমানের জাঁকজমকপূর্ণ ডিজিটাল ডামাডোলের মাঝে দাঁড়িয়ে আছি, আমাদের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য আছে। আমরা সেই বিরল ‘সেতুবন্ধনের প্রজন্ম’―যারা এক হাতে ছুঁয়েছি গরুর গাড়ির ধুলোমাখা চাকা, আর অন্য হাতে বিদ্ধ করেছি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আকাশচুম্বী গতির স্বপ্ন। আমরা যেন দুই শতাব্দীর এক মোহনায় দাঁড়িয়ে থাকা নীরব সাক্ষী―অতীতের নির্মল সরলতা আর বর্তমানের জটিল যান্ত্রিকতার মাঝে এক কম্পমান রেখা।
আমাদের শৈশব সিক্ত ছিল মাটির সোঁদা গন্ধে। কানামাছি, গোল্লাছুট কিংবা দাঁড়িয়াবান্ধার সেই উৎসবগুলো ছিল আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণা। আজকের অত্যাধুনিক গেম-কনসোলের ভিড়ে সেই আনন্দগুলো আজ ডাইনোসরের মতো বিলুপ্ত। জাম্বুরা দিয়ে বানানো ফুটবল কিংবা সুপারির খোলে তৈরি করা গাড়ি―এসব ছিল কল্পনার রাজত্ব, যেখানে দারিদ্র্য ছিল না, ছিল কেবল আনন্দের অফুরান ভাণ্ডার। আমরা ঘুড়ি উড়িয়েছি দিগন্তহীন আকাশে, আর নিজেরাও উড়তে শিখেছি স্বপ্নের অদম্য ডানায়।
আমরাই সেই ‘শেষ জেনারেশন’, যারা চিঠির খামে ভাঁজ করা কাঁপাকাঁপা আবেগ পাঠিয়েছি। কিংবা ১ টাকার পোস্ট কার্ডে সংক্ষিপ্ত বার্তা লিখে মনের ভাব উজাড় করেছি। যেখানে প্রতিটি শব্দ ছিল দীর্ঘ অপেক্ষার প্রতিধ্বনি। ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টা শুনে বুকের ভেতর যে কম্পন জাগত, তা আজকের নীলরঙা ‘সিন’ টিক মার্কের গতিময়তায় খুঁজে পাওয়া ভার। আমরা সেই প্রজন্ম, যারা টেলিগ্রামের শব্দ শুনে এক অজানা আশঙ্কায় শিউরে উঠতাম―যেখানে প্রতিটি অক্ষর ছিল জীবন-মৃত্যুর এক সংক্ষিপ্ত অথচ ভারী সংবাদবাহী। অপরদিকে, টাইপ মেশিনে টুকটাক শব্দে লিখতে লিখে দিন পার করে দিয়েছি।
আমাদের পাঠশালা কিংবা পড়ার টেবিল আলোকিত হতো হ্যারিকেন আর কুপির মৃদু হলদেটে শিখায়। সেই অনুজ্জ্বল আলোয় দস্যু বনহুর কিংবা মাসুদ রানার রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চার কিংবা সাইমুম সিরিজের ঈমান দীপ্ত করার মতো লিখা আমাদের কিশোর কল্পনাকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গে রূপ দিত। ইকোনো বা রেডলিফ কলমের সেই ঘ্রাণ আর নতুন বইয়ের গন্ধ শুঁকে আমরা যে আনন্দ পেতাম, তা কোনো উজ্জ্বল স্ক্রিনের ই-বুকে পাওয়া অসম্ভব। আমাদের মেরুদণ্ড গড়ে উঠেছিল শাসনের কড়া শাসনে; স্কুল-মাদরাসার শিক্ষকের বেতের বাড়ি আর বাবার ‘উত্তম-মধ্যম’―এসবের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল মানুষ গড়ার এক ঐকান্তিক আরাধনা। বড়দের দেখে সাইকেল থেকে নেমে সালাম দেওয়ার সেই বিনয় আজ কেবল রূপকথার গল্পের মতো শোনায়। এখনকার প্রজন্মের মতো অল্প বিদ্যা ভয়ংকর স্বভাবের কাউকে আমাদের ছাত্রাবস্থায় খুঁজে পাওয়া যেতো না।
আমাদের সময়ের টেলিভিশন ছিল এক জাদুর বাক্স―বিটিভির সেই ঝিরঝিরে পর্দায় ম্যাকগাইভার কিংবা আলিফ লায়লা দেখার জন্য বাঁশের এন্টেনা ঘোরানোর যে প্রাণান্তকর যুদ্ধ, তা ছিল আমাদের ধৈর্য আর সংহতির পরীক্ষা। লোডশেডিং তখন অভিশাপ ছিল না, বরং তা ছিল পাড়ার বন্ধুদের সাথে আড্ডা আর পরিবারের ঘনিষ্ঠতার এক অঘোষিত নিমন্ত্রণপত্র। আমরা ট্রানজিস্টরের নব ঘুরিয়ে বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা, ডয়সেবেলে কিংবা রেডিও তেহেরানের বাংলা খবর শুনতাম, আর ‘অনুরোধের আসর’-এ গানের ডালি যখন বাজত, মনে হতো পুরো পৃথিবীটা আমাদের ক্ষুদ্র ছাদের ওপর এসে ভিড় করেছে।
আমরা অভাবের মাঝে বড় হয়েছি। কিন্তু সেই অভাব আমাদের সৃজনশীলতা কেড়ে নেয়নি। বরং শিখিয়েছে মানিয়ে নিতে, শিখিয়েছে অল্পতে তৃপ্ত হওয়ার পরম ধর্ম। প্রতিসপ্তাহের বাবার কাছ থেকে ২/৪ টাকা পাবো সেটা ছিলো অনেক কাঙ্খিত। পিরিচে ঢেলে ‘সুরুৎ’ শব্দে চা পানের সেই তৃপ্তি কিংবা পাটিতে বসে সবাই মিলে ভাত খাওয়ার সেই নিবিড় আন্তরিকতা আধুনিক ডাইনিং টেবিলের ক্যাটারিং শিল্পে খুঁজে পাওয়া দায়। আমাদের বন্ধুত্ব ছিল অকৃত্রিম―যেখানে কোনো ‘স্ট্যাটাস’ ছিল না, ছিল কেবল বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে অনন্ত পথ হাঁটার এক অমোঘ নিশ্চয়তা। দূরের বন্ধুকে মনপ্রাণ উজাড় করে পত্র লিখে ডাকপোস্টে পাঠানো ছিলো সৃজনশীলতার একটি জীবন্ত অংশ।
আজ সময়ের স্রোতে আমরা অনেক দূরে চলে এসেছি। এখন আর দেখিনা মাতামুহুরী তীরের সেই নদী পাড়। নদীর বুকটাও আগের মতো নেই। দখলে দুষণে নদীর বুকে এখন প্রতিধ্বনীত হয় আত্মগোঙানী। এখন আর দেখা মেলেনা সেই নিবিড় ঘন বন। যেখানে লতায় লতায় কিংবা ঘন বনের গাছের ডালে পাখির কিছির মিছির কিংবা বাদুরের দুষ্টুমি প্রকৃতিকে মাতিয়ে রাখতো। আমাদের পকেটে এখন স্মার্টফোন, ঘর এসি-তে নিয়ন্ত্রিত, কিন্তু মনটা আজও পড়ে থাকে সেই পড়ন্ত বিকেলের ধুলোমাখা মাঠে কিংবা খরস্রোতা মাতামুহুরীর পাড়ে। আমরা হয়তো ইতিহাসের শেষ পাতা, কিন্তু সেই পাতাটি ছিল সবথেকে রঙিন আর আবেগঘন। আমরা এক অদ্ভুত প্রজন্ম―অ্যানালগ আবেগ আর ডিজিটাল বাস্তবতার এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমরা আজ হারানো সুরের শেষ রাখাল।
স্মৃতির দর্পণে ফিরে তাকালে মনে হয়, আমরা আসলে কিছুই হারাইনি। আমরা কেবল সময়ের ভাঁজে পরম মমতায় রেখে এসেছি আমাদের শ্রেষ্ঠ দিনগুলো। আর সেই দিনগুলোই আজও আমাদের ভেতরে আলো জ্বেলে রাখে―নির্জনতায়, নিস্তব্ধতায়, অনন্তকাল।
পরিশেষে বলা যায়, আমরা কেবল সময়ের বিবর্তনের সাক্ষী নই, বরং দুটি ভিন্ন জগতের মোহনায় দাঁড়িয়ে থাকা এক নিঃসঙ্গ অভিযাত্রী। প্রযুক্তির এই গগনচুম্বী গতির ভিড়ে আমাদের শরীর অভ্যস্ত হয়ে উঠলেও, আমাদের আত্মা আজও সেই ধুলোমাখা পথ আর হ্যারিকেনের মৃদু আলোয় শান্তি খোঁজে। আমরাই হয়তো সেই শেষ প্রজন্ম, যারা গতির চেয়ে অনুভূতিকে এবং কৃত্রিমতার চেয়ে অকৃত্রিমতাকে বেশি ভালোবাসতে শিখেছিলাম। ইতিহাসের পাতায় আমাদের এই অধ্যায়টি হয়তো একদিন ফিকে হয়ে আসবে, কিন্তু আমাদের বুকের গহীনে সযত্নে রাখা সেই ‘সোনালী অতীত’ আগামীর যান্ত্রিক পৃথিবীতে এক ফোঁটা মানবিকতার পরশ হয়ে বেঁচে থাকবে―অনন্তকাল।
লেখক: মমতাজ উদ্দিন আহমদ: প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক; সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
তারিখ: 04.03.2026
আপনার মতামত লিখুন :