আসাবিয়্যা ও ইনসাফের রাজনীতি: ইসলামী রাষ্ট্রচিন্তার দর্পণে বাংলাদেশ


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : ফেব্রুয়ারী ২৪, ২০২৬, ৮:২৫ পূর্বাহ্ন /
আসাবিয়্যা ও ইনসাফের রাজনীতি: ইসলামী রাষ্ট্রচিন্তার দর্পণে বাংলাদেশ

মমতাজ উদ্দিন আহমদ


রাজনীতি যদি সময়ের সঙ্গে সমাজের সংলাপ হয়, তবে ইবনে খলদুনের ভাষায় সেটি মূলত সামাজিক শক্তির রূপান্তর প্রক্রিয়া। খলদুন রাষ্ট্রকে কোনো বিমূর্ত নৈতিক সত্তা হিসেবে দেখেননি। তিনি রাষ্ট্রকে দেখেছেন একটি ঐতিহাসিক-সামাজিক নির্মাণ হিসেবে। যার ভিত্তি হলো আসাবিয়্যা—গোষ্ঠীগত সংহতি বা সামাজিক ঐক্য। চব্বিশ-পরবর্তী বাংলাদেশের যে সন্ধিক্ষণকে ইবনে খলদুন–এর রাষ্ট্রতত্ত্ব, আসাবিয়্যা ধারণা এবং রাজনৈতিক চক্র তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণে বুঝতে গেলে তিনটি মৌলিক ধারণা সামনে আনতে হয়— ১. আসাবিয়্যার পুনর্গঠন, ২. রাষ্ট্রের জীবনচক্র ও ৩. নৈতিকতা বনাম ক্ষমতার রূপান্তর।

ইবনে খলদুনের মতে, ইতিহাসের বাঁকবদল ঘটে তখনই, যখন একটি নতুন সামাজিক সংহতি পুরনো ক্ষমতাকাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করে। বিপ্লব বা গণআন্দোলন মূলত নতুন আসাবিয়্যার প্রকাশ—একটি সম্মিলিত চেতনা, যা বিদ্যমান শাসনব্যবস্থার বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। চব্বিশের ছাত্র-জনতার উত্থান যদি একটি শক্তিশালী সামাজিক ঐক্যের বহিঃপ্রকাশ হয়, তবে প্রশ্ন হলো— এই আসাবিয়্যা কি সাময়িক আবেগ, নাকি দীর্ঘমেয়াদি সংগঠিত শক্তি? খলদুন বলেন, আবেগপ্রসূত ঐক্য দ্রুত জ্বলে ওঠে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক রূপ না পেলে দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। চব্বিশ-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামী শক্তির উত্থানকে কোনোভাবে হালকা করে নেওয়া যাবে না। সুতরাং ইসলামী রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে—তারা কি এই নতুন সামাজিক চেতনাকে ধারণ করে বিস্তৃত নাগরিক ঐক্যে রূপ দিতে পারবে?

খলদুন রাষ্ট্রকে জীবন্ত সত্তার মতো দেখেছেন, যার জন্ম, বিকাশ, স্থিতি ও পতন আছে। তাঁর মতে— প্রথম পর্যায়ে আসে বিজয় ও আদর্শিক শক্তি, দ্বিতীয় পর্যায়ে ক্ষমতার সংহতি, তৃতীয় পর্যায়ে প্রশাসনিক স্থিতি, পরবর্তীতে বিলাসিতা ও অবক্ষয়। বিপ্লব-পরবর্তী সমাজ সাধারণত প্রথম পর্যায়ে থাকে—উদ্দীপনা ও নৈতিক উচ্চারণে পূর্ণ। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত সরকার ছিলো প্রথম পর্যায়ের। ২০২৬ এর ১২ ফেব্রুয়ারীর নির্বাচন পরবর্তী বাংলাদেশে শুরু হয়েছে বিপ্লব পরবর্তী ক্ষমতার বাঁক বদলের প্রকৃত পরীক্ষা। এখন চলছে দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ের কাজ। অর্থাৎ ক্ষমতার সংহতি ও প্রশাসনিক স্থিতি। এখন বিপ্লবের আদর্শকে প্রশাসনিক কাঠামোয় রূপ দেওয়ার পালা। কিন্তু বিদ্যমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেটা কি আদৌ সম্ভব হবে? তারা কি বিপ্লবের নৈতিক ভাষ্যকে কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক নীতিতে রূপান্তর করতে পারবে? নাকি বিপ্লবী আবেগ ধীরে ধীরে ক্ষমতার বাস্তবতায় ক্ষয়প্রাপ্ত হবে?

রাজনীতি শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার সোপান নয়। এটি সময়ের প্রেক্ষাপটে সমাজ ও রাষ্ট্রের একটি গভীর সংযোগ। প্রতিটি জাতির ইতিহাসে এমন কিছু সন্ধিক্ষণ আসে, যখন পুরনো বয়ান ভেঙে নতুন পথরেখা তৈরি হয়। চব্বিশের ছাত্র-জনতার বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে আজ তেমনই এক মুহূর্ত উপস্থিত। বিশেষ করে ইসলামী রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে যে তর্ক-বিতর্ক দানা বেঁধেছে, তার উত্তর খুঁজতে আমাদের ফিরে যেতে হবে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সমাজতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক দার্শনিকদের পাঠশালায়। ইবনে খলদুন থেকে শাহ ওয়ালিউল্লাহ—তাঁদের দর্শনের আলোয় বর্তমানের সংকট ও সম্ভাবনাকে বিচার করা আজ সময়ের দাবি।

ইবনে খলদুনের রাষ্ট্রদর্শনের মূল চাবিকাঠি হলো ‘আসাবিয়্যা’ বা সামাজিক সংহতি। খলদুন মনে করতেন, কোনো আন্দোলন কেবল বিমূর্ত আদর্শ দিয়ে টিকে থাকে না; তার জন্য প্রয়োজন একটি সুসংগঠিত গোষ্ঠীগত ঐক্য। বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতির প্রধানতম চ্যালেঞ্জ এখানেই। দীর্ঘদিন ধরে এই রাজনীতি কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ধর্মীয় আবেগের ‘আসাবিয়্যা’র ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু খলদুনীয় তত্ত্বমতে, আসাবিয়্যা যদি সংকীর্ণ হয়, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী রাষ্ট্র নির্মাণে ব্যর্থ হয়। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে ধর্মকে কেবল আচারিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে একে ‘ন্যায়ভিত্তিক নাগরিক সংহতি’তে রূপান্তর করা প্রয়োজন। তরুণ প্রজন্মের বহুমাত্রিক পরিচয়—ধর্মীয়, জাতীয় ও বৈশ্বিক—এই তিনের সমন্বয় ঘটিয়ে যদি একটি বৃহত্তর সামাজিক ঐক্য বা ‘নতুন আসাবিয়্যা’ তৈরি করা না যায়, তবে আদর্শিক রাজনীতি কেবল স্লোগানেই থমকে থাকবে।

রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব কেবল বিজয়ের ওপর নয়, বরং তার বৈধতা বা ‘লেজিটিমেসি’র ওপর নির্ভরশীল। পঞ্চম শতাব্দীর প্রখ্যাত চিন্তক আল-মাওয়ার্দী তাঁর ‘আল-আহকাম আস-সুলতানিয়্যাহ’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, শাসকের প্রধান কাজ হলো শরিয়াহর মূল্যবোধ সংরক্ষণ এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তবে এই বৈধতা অর্জনের পথটি হতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মাওয়ার্দীর এই তত্ত্ব এক কঠোর বার্তা দেয়—ইসলামী রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে ক্ষমতার উৎস হিসেবে কেবল ধর্মীয় দাবির ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বরং সাংবিধানিক কাঠামোর প্রতি অঙ্গীকার, আইনের শাসন এবং জনগণের সম্মতির মাধ্যমেই প্রকৃত রাজনৈতিক বৈধতা অর্জন করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের শক্তি যখন ব্যক্তির ঊর্ধ্বে ওঠে, তখনই রাষ্ট্র স্থিতিশীলতা পায়।

ইবনে খলদুন একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য করেন— ধর্ম আসাবিয়্যাকে শক্তিশালী করে, কিন্তু ক্ষমতা ধরে রাখতে প্রশাসনিক দক্ষতা অপরিহার্য। অর্থাৎ, নৈতিক আদর্শ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রেরণা হতে পারে; কিন্তু রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন— অর্থনৈতিক ভারসাম্য, ন্যায়বিচার ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা। বাংলাদেশের বর্তমান সন্ধিক্ষণে ইসলামী রাজনীতির জন্য তাত্ত্বিক শিক্ষা হলো— শুধু আদর্শিক ভাষণ নয়; বরং সামাজিক ন্যায়, অর্থনৈতিক নীতিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী রাজনৈতিক ক্ষমতাকে দেখেছিলেন সমাজ সংস্কারের হাতিয়ার হিসেবে। তাঁর দর্শনে, কোনো সমাজে যখন অর্থনৈতিক বৈষম্য প্রকট হয় এবং নৈতিক অবক্ষয় ঘটে, তখন সেই রাষ্ট্র অনিবার্যভাবে পতনের দিকে ধাবিত হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যে ‘চেতনা ব্যবসা’ বা ‘ফ্যাসিবাদী জালেম’ হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়, তা মূলত নৈতিক দেউলিয়াপনারই ফল। ওয়ালিউল্লাহর দর্শন আমাদের শেখায় যে, দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা কেবল ক্ষমতার লড়াইয়ে নয়, বরং শিক্ষা, নৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক উন্নয়নের ভেতর দিয়ে আসে। বর্তমান বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তারা কতটা জনকল্যাণমূলক ও দুর্নীতিবিরোধী কর্মসূচির মাধ্যমে সমাজের দর্পণ হয়ে উঠতে পারছে তার ওপর।

খলদুন বলেন, শাসনের স্থায়িত্ব নির্ভর করে জনগণের স্বীকৃতির ওপর। যখন শাসকগোষ্ঠী জনস্বার্থ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তখন আসাবিয়্যা দুর্বল হয় এবং পতন অনিবার্য হয়। বিপ্লব ও নির্বাচন পরবর্তী মুহূর্তে সবচেয়ে বড় কাজ হলো— বৈধতার নতুন সামাজিক চুক্তি (social contract) নির্মাণ। যদি ক্ষমতাসীন সরকার চব্বিশের রক্তঝরা অভ্যুত্থানকে পাশ কাটিয়ে পথচলা শুরু করে তবে ইসলামী রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের পথ আবারে ত্বরান্বিত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ইসলামী রাজনৈতিক শক্তি যদি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আস্থা অর্জন করতে চায়, তবে তাদের আদর্শকে অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিক কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।

বিশ শতকের মওদূদী বা কুতুবের ‘আদর্শিক রাষ্ট্র’ ভাবনা এক সময়কার প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, বর্তমানের বহুমাত্রিক সমাজে তার প্রয়োগ নিয়ে নতুন করে ভাবার অবকাশ রয়েছে। আদর্শ যখন বাস্তবতার সাথে সংলাপে ব্যর্থ হয়, তখন তা কঠোরতায় রূপ নেয়। বর্তমান প্রজন্মের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা অনেক বেশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গির প্রত্যাশী। নজরুলের ‘খুন’ বনাম ‘রক্ত’ বিতর্কের মতো ভাষার শুদ্ধতা নিয়ে পড়ে না থেকে বরং ‘ইনকিলাব’ বা ‘ইনসাফ’-এর মতো শব্দগুলোর মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদের বিরোধিতায় যে সেতুবন্ধন তৈরি হচ্ছে, তাকেই রাজনৈতিক পুঁজি করতে হবে। খলদুনের জীবনচক্র তত্ত্ব অনুযায়ী, বিলাসিতা ও স্বার্থপরতা আসাবিয়্যাকে ধ্বংস করে; তাই ক্ষমতার মোহ ছেড়ে আত্মশুদ্ধির পথেই নতুন প্রভাতের স্বপ্ন দেখতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, আদর্শ কোনো স্থির জলরাশি নয়, বরং প্রবহমান নদীর মতো। ইবনে খলদুন আমাদের শিখিয়েছেন যে, রাষ্ট্র টিকে থাকে না কেবল শক্তিতে, টিকে থাকে সংহতিতে। আদর্শ টিকে থাকে না কেবল আবেগে, টিকে থাকে ন্যায় ও দক্ষতায়। বাংলাদেশের ইসলামী রাজনৈতিক শক্তিগুলো যদি অতীতের ছায়া পেরিয়ে ঐতিহাসিক দায়ের স্বীকারোক্তি দিতে পারে এবং তরুণ প্রজন্মের বিশ্বদৃষ্টির সাথে নিজেদের মেলাতে পারে, তবেই তারা ইতিহাসের পৃষ্ঠায় নাম লেখাতে পারবে। মনে রাখতে হবে, সময়ের বাস্তবতা বুঝে যে নিজেকে রূপান্তরিত করতে পারে, ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে সেই শক্তিই টিকে থাকে। আগামীর বাংলাদেশ কি বিভাজনের ভাষা ছেড়ে ঐক্যের নতুন কোনো আসাবিয়্যা খুঁজে পাবে? সময় হয়তো তার উত্তর দেবে, তবে প্রস্তুতির সময় এখনই।

লেখক: সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক; সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

তারিখ: 24/02/2026