বাংলাদেশের জ্বালানি নীতি, LNG নির্ভরতা ও ইরান সংকটের বাস্তব সমীকরণ


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ২৯, ২০২৬, ৬:৩৯ অপরাহ্ন /
বাংলাদেশের জ্বালানি নীতি, LNG নির্ভরতা ও ইরান সংকটের বাস্তব সমীকরণ
।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ ।।

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আজ সরাসরি বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির সঙ্গে সংযুক্ত। দেশটি বর্তমানে প্রাকৃতিক গ্যাস চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পূরণ করছে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) দিয়ে। মহেশখালীভিত্তিক ভাসমান টার্মিনাল (FSRU) ব্যবহার করে বাংলাদেশ মূলত কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পাশাপাশি স্পট মার্কেট থেকেও LNG কিনছে। কিন্তু এই LNG মূল্য নির্ধারণ হয় আন্তর্জাতিক সূচক—বিশেষত JKM (Japan Korea Marker)—এর ওপর ভিত্তি করে, যা মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক অস্থিরতায় অত্যন্ত সংবেদনশীল।

ইরানকে ঘিরে কোনো বড় ধরনের সংঘাত শুরু হলে হরমুজ প্রণালী ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে, যার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের LNG ও জ্বালানি শিপমেন্টের বড় অংশ চলাচল করে। এর ফলে LNG কার্গোর বীমা খরচ বাড়বে, শিপিং রিস্ক প্রিমিয়াম যুক্ত হবে এবং স্পট মার্কেটে দাম হঠাৎ করেই বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের সময় বাংলাদেশ যেভাবে স্পট মার্কেট থেকে LNG কেনা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল, ইরান সংকট তেমন পরিস্থিতি আবারও সৃষ্টি করতে পারে—বরং আরও তীব্রভাবে।

এ ধরনের মূল্যঝাঁকুনির সরাসরি প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচের ওপর। LNG-ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো তখন পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হয় না, ফলে লোডশেডিং, শিল্প উৎপাদন হ্রাস এবং সার উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটে। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের একটি যুদ্ধক্ষেত্র বাংলাদেশের গ্রাম-শহরের ঘরে ঘরে অন্ধকার নামিয়ে দিতে সক্ষম।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জ্বালানি নীতি কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং কৌশলগত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান সংকটের মতো ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রমাণ করে—অত্যধিক আমদানি নির্ভরতা একটি কাঠামোগত দুর্বলতা। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, জ্বালানি বৈচিত্র্য এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল সরবরাহ চুক্তি—এসব এখন আর নীতিগত বিলাসিতা নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন।

বাংলাদেশের জন্য তাই আগ্রাসী পশ্চিমা যুদ্ধনীতির পরোক্ষ সমর্থন নয়, বরং জ্বালানি স্থিতিশীলতা ও বহুপাক্ষিক শান্তির পক্ষে অবস্থান নেওয়াই হবে বাস্তববাদী কৌশল। কারণ হরমুজ প্রণালীর প্রতিটি অস্থির ঢেউ শেষ পর্যন্ত এসে আছড়ে পড়ে বঙ্গোপসাগরের অর্থনীতিতে।

লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

তারিখ: ২৯.০১.২০২৬