মৃত্যু: মহাবিশ্বের নীরব সত্য


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬, ৫:১৪ অপরাহ্ন / ০
মৃত্যু: মহাবিশ্বের নীরব সত্য

।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ ।।


মৃত্যু মানুষের জীবনের সবচেয়ে নিশ্চিত অথচ সবচেয়ে কঠিনভাবে গ্রহণযোগ্য সত্য। মৃত্যু জীবনের জৈবিক সমাপ্তি হলেও এটি সম্পর্ক, স্মৃতি, সময়বোধ এবং অর্থ-অন্বেষণের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। মৃত্যু আমাদের পরিচিত পৃথিবীর অর্থ বদলে দেয়। মৃত্যুর গবেষণায় যুক্ত পদার্থবিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব, ধর্মতত্ত্ব, দর্শন এবং সাহিত্য। মৃত্যু শরীরের অবসান ঘটায়; কিন্তু শোক মানুষের স্মৃতি, ভাষা ও সম্পর্কের মধ্যে দীর্ঘকাল বেঁচে থাকে।

জতীন্দ্রমোহন বাগচীর ‘কাজলা দিদি’ কবিতাটি অনেকেই পড়েছেন। বাঁশবাগানের মাথায় চাঁদ উঠেছে, পুকুরপাড়ে জোনাকি জ্বলছে, লেবুফুলের গন্ধে রাত জেগে আছে, শিউলিফুল ঝরে পড়েছে, ডালিমগাছের ডালে বুলবুলি লুকিয়েছে। প্রকৃতি এখানে একটি শিশুর স্মৃতির সক্রিয় অংশ। কাজলা দিদি নেই, কিন্তু তাঁকে ঘিরে থাকা প্রকৃতির প্রতিটি চিহ্ন এখনও আছে। শিশুটি মাকে জিজ্ঞেস করে, তার প্রিয় দিদি কোথায়। সে ধরে নেয় দিদি হয়তো আবার আসবে, পুতুলের বিয়েতে যোগ দেবে, ফুল মাড়াতে নিষেধ করবে, পাখি উড়িয়ে দিতে বারণ করবে। শিশুর কাছে মৃত্যু সাময়িক দূরত্ব। সে বিশ্বাস করে, মানুষটি কোথাও গেছে এবং ফিরে আসবে। শিশুটি কাজলা দিদিকে ভুলে যায় না। দৈনন্দিন কথোপকথনের মধ্যে তাঁকে জীবিত রাখে। সে যে প্রশ্ন করে, তার মধ্যেই দিদির সঙ্গে তার সম্পর্ক অব্যাহত থাকে। কবিতার মায়ের কাছে মৃত্যু একটি স্থায়ী বিচ্ছেদ। তিনি জানেন, শিশুর প্রশ্নের সরল উত্তর দিলে শিশুর পৃথিবী ভেঙে যাবে। তাই তাঁর কান্না ভাষাহীন।

জৈবিক অর্থে মৃত্যু জীবনের সমাপ্তি। শরীরবৃত্তীয় কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ হলে চিকিৎসাবিজ্ঞান মৃত্যু নির্ণয় করে। মানুষের কাছে মৃত্যু হলো সম্পর্কের বিচ্ছেদ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ভাঙন এবং পরিচিত জগতের পুনর্গঠন। একজন মানুষ মারা গেলে তাঁর শরীর অনুপস্থিত হয়, কিন্তু তাঁর ভূমিকা সঙ্গে সঙ্গে অদৃশ্য হয় না। তিনি ছিলেন কারও মা, কারও ভাই, কারও বন্ধু, কারও শিক্ষক, কারও প্রতিবেশী। মৃত্যুর পর সেই সম্পর্কের সামাজিক ও মানসিক প্রতিধ্বনি থেকে যায়। পরিবারের খাবার টেবিলে একটি খালি চেয়ার, ফোনে আর না-আসা একটি নম্বর, উৎসবে অনুপস্থিত একটি কণ্ঠ এসবই মৃত্যুর দৈনন্দিন রূপ।

মৃত্যুর সঙ্গে এই দর্শনের সম্পর্ক গভীর। মানুষ প্রতিদিন একটু একটু করে বদলায়। শিশুকাল থেকে কৈশোর, কৈশোর থেকে যৌবন, যৌবন থেকে বার্ধক্য প্রতিটি স্তরে আগের সত্তা আংশিকভাবে বিলীন হয়। মৃত্যু এই পরিবর্তনের শেষ সীমা, কিন্তু পরিবর্তনের বোধ শুরু হয় মৃত্যুর আগেই।

‘কাজলা দিদি’ কবিতায় একই পল্লিদৃশ্য বারবার ফিরে আসে। চাঁদ আছে, জোনাকি আছে, ফুল আছে; কিন্তু কাজলা দিদি নেই। প্রকৃতি যেন একই আছে, অথচ মানুষের অভিজ্ঞতা বদলে গেছে। এটাই হেরাক্লিটীয় সত্য। নদী একই বলে মনে হলেও পানি বদলে গেছে। বাড়ি একই থাকলেও সম্পর্কের বিন্যাস বদলে গেছে। সন্ধ্যা একই হলেও একজন মানুষ আর সেখানে নেই।                

মহাবিশ্বের গ্যালাক্সিগুলো যেমন পরস্পর থেকে দূরে সরে যায়, মানুষের জীবনও সময়ের স্রোতে শৈশব, পরিচিত মানুষ ও পুরোনো ঘর থেকে দূরে সরে যায়। কিন্তু এই রূপককে বিজ্ঞানের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। মহাজাগতিক প্রসারণের বিশাল সময়মাত্রা আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের ক্ষুদ্রতা ও মূল্য দুটিই একসঙ্গে অনুভব করায়। একজন মানুষ মহাবিশ্বের তুলনায় অতিশয় ক্ষুদ্র। কিন্তু তাঁর ভালোবাসা, স্মৃতি ও শোক তাঁর নিকটজনের জগতে বিশাল। তাই ক্ষুদ্র হওয়া অর্থহীন হওয়া নয়। একটি জোনাকির আলো মহাকাশ আলোকিত করে না; কিন্তু অন্ধকার উঠোনে অপেক্ষমাণ শিশুর চোখে তার মূল্য অপরিসীম।

মৃত্যু জীবনের অর্থ নিয়ে আমাদের প্রশ্নকে তীব্র করে। যদি জীবন অনন্ত হতো, তবে সময়ের সীমাবদ্ধতা, সিদ্ধান্তের গুরুত্ব এবং সম্পর্কের মূল্য অন্যরকম হতে পারত। মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সুযোগ সীমিত। সময় পুনরুদ্ধারযোগ্য নয় এবং সম্পর্ককে অনির্দিষ্ট ভবিষ্যতের ওপর ফেলে রাখা বিপজ্জনক। মৃত্যুর চেতনা মানুষকে জীবনের প্রতি গভীর মনোযোগ সৃষ্টি করতে পারে। মৃত্যু জীবনের সীমারেখা। চিত্রশিল্পী যেমন ফ্রেমের ভেতরে ছবির অর্থকে স্পষ্ট করেন, তেমনি মৃত্যুর সীমা জীবনের মূল্যকে দৃশ্যমান করে।

মৃত্যু এমন এক সত্য, যার সামনে মানুষের জ্ঞান, সম্পদ ও অহংকার ক্ষুদ্র হয়ে যায়। তবু মানুষ মৃত্যুর কাছে কেবল পরাজিত প্রাণী নয়। সে কবিতা লেখে, স্মৃতি সংরক্ষণ করে, মৃতের নামে বৃক্ষ রোপণ করে, সন্তানের মধ্যে প্রিয়জনের হাসি খুঁজে পায়, এবং একদিন নিজের শোককে অন্যের সান্ত্বনায় রূপান্তরিত করে।

‘কাজলা দিদি’র শিশুটি জানে না মৃত্যু কী। তাই সে বারবার জিজ্ঞেস করে দিদি কোথায়? মা জানেন, তাই তাঁর মুখে কোনো উত্তর আসে না। এই প্রশ্ন ও নীরবতার মাঝখানেই মানুষের মৃত্যুবোধ জন্ম নেয়। আমরা জেনে যাই, মানুষটি আর ফিরবে না; তবু তাকে ডাকা বন্ধ করতে পারি না। কারণ ভালোবাসা উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে শুরু হলেও স্মৃতির মধ্যে নতুন জীবন পায়।

মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে, নদীর জল বদলে যাচ্ছে, মানুষ বয়সের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, প্রিয়জনেরা একে একে দূরে সরে যাচ্ছে। এই পরিবর্তন থামানো যাবে না। কিন্তু এর মধ্যেই আমরা একটি নৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি: যতদিন আছি, ততদিন জীবিত মানুষের প্রতি যত্নশীল হব; শোকাহত মানুষের পাশে দাঁড়াব; মৃত্যুকে কুসংস্কার, নীরবতা ও একাকিত্বের বিষয় না বানিয়ে মানবিক আলোচনার অংশ করব।

মৃত্যু জীবনের শেষ অধ্যায় হলেও জীবিতদের জন্য এটি কখনও কখনও নতুন দায়িত্বের শুরু। কেউ চলে গেলে তাঁর জায়গা পূরণ হয় না। বরং তাঁর স্মৃতিকে সম্মান করে আমাদের বেঁচে থাকার ধরন বদলে যায়। সেই পরিবর্তিত বেঁচে থাকাই হয়তো মৃত্যুর বিরুদ্ধে মানুষের সবচেয়ে গভীর উত্তর।


লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।

মোবাইল: 01556-560126 / 01645-950296

তারিখ: ২২/০৯/202৬ খিষ্টাব্দ।