পার্বত্য জনপদে জনমিতি পরিবর্তনের নেপথ্যে: সেবার আড়ালে ধর্মান্তরের নীল নকশা?


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : মে ৬, ২০২৬, ৬:০৭ অপরাহ্ন /
পার্বত্য জনপদে জনমিতি পরিবর্তনের নেপথ্যে: সেবার আড়ালে ধর্মান্তরের নীল নকশা?

এপিসি ডেস্ক:

সম্প্রতি ‘নেত্র নিউজ’-এ আলীকদমের ম্রো শিশুদের নিয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের প্রতিবাদ জানিয়েছে ম্রো জনগোষ্ঠীসহ স্থানীয় সচেতন মহল। প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনটিকে একপাক্ষিক ও বিভ্রান্তিকর দাবি করে এর প্রকৃত সত্য উন্মোচনের দাবি উঠেছে।

গত সোমবার (৪ মে) আলীকদম প্রেসক্লাবের সামনে এবং লামা উপজেলা পরিষদের সামনে পৃথকভাবে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে ম্রো অধিবাসীর সচেতন লোকজন এ দাবী করেন। প্রকাশিত একপেশে প্রতিবেদন ও মানববন্ধনে বক্তাদের দাবীকে ঘিরে গত কয়েক দশকের সরকারি পরিসংখ্যান এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে পার্বত্য চট্টগ্রামে জনমিতি পরিবর্তনের এক ভিন্ন চিত্র ফুটে ওঠে।

লামা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. কামরুজ্জামান বলেন,যেকোনো প্রতিবেদনের সত্যতা বুঝতে এর প্রকাশকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ও অর্থায়ন জানা জরুরি। নেত্র নিউজ মূলত একটি প্রবাসভিত্তিক নিউজ পোর্টাল, যা বিতর্কিত উৎস থেকে অর্থায়নের মাধ্যমে পরিচালিত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনেকের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে এবং আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে নির্দিষ্ট কোনো মহলের মদদে তারা এমন স্পর্শকাতর তথ্য প্রচার করে থাকে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) ১৯৯১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত আদমশুমারি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রচারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। ১৯৯১ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট জনসংখ্যার ৪৪.১২% ছিল মুসলিম, যা ২০১১ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৪২.৬০ শতাংশে। অর্থাৎ গত ৩০ বছরে এই অঞ্চলে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ২% কমেছে।

বিপরীতে, সরকারি তথ্যানুযায়ী ১৯৯১ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে খ্রিস্টান জনসংখ্যা ছিল মাত্র ২২,২০৬ জন (২.২৮%)। কিন্তু ২০১১ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৫২,০৬৬ জনে (৩.২৬%)। অর্থাৎ গত ৩০ বছরে এই জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বিস্ময়করভাবে ১৩৪.৪৭ শতাংশ। পরিসংখ্যান ও নানান প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২০ বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় ১২ হাজার ২০০ উপজাতি পরিবার খ্রিস্টান হয়েছে।

এদিকে একপরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৭ সালের আগস্টে যেখানে গির্জার সংখ্যা ছিল ৩৬৫টি, ২০২০ সালের মধ্যে তা ৪৪০টিতে উন্নীত হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙামাটির বর্তমানে ১৯৪টি গির্জা উপজাতিদের ধর্মান্তরিত করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে।

এসব গির্জাকে কেন্দ্র করে সিএফডিবি, সিসিডিবি, গ্রাউস, কারিতাস ও ব্যাপ্টিস্ট চার্চসহ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি এনজিও সামাজিক ও আর্থিক দুরাবস্থার সুযোগ নিয়ে ধর্মান্তরের কাজ চালাচ্ছে বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বান্দরবানের ম্রো জনগোষ্ঠীর ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শুরুতে তারা প্রকৃতিপূজারী ছিল এবং পরবর্তীতে ‘ক্রামা’ ধর্ম গ্রহণ করে। কিন্তু বর্তমানে ম্রো জনগোষ্ঠীর প্রায় ৯০ শতাংশই খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত হয়ে গেছে।

মিশনারিরা কৌশলে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি (যেমন- গো-হত্যা উৎসব) পালন করতে বাধা দেয় না, এমনকি নামও পরিবর্তন করতে বাধ্য করে না, যাতে ধর্মান্তরের প্রক্রিয়াটি সামাজিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ না হয়।

লামা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী রুহুল আমিন বলেন, ইতোপূর্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে যে, স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে এই এনজিওগুলোর কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে তদারকি করা প্রয়োজন। সেবার আড়ালে মানুষের দারিদ্র্যকে পুঁজি করে যারা পাহাড়িদের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক ও ধর্মীয় রীতি ধ্বংস করছে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।