পাহাড়ের নীরবতায় শীলবুনিয়া ঝরনার সৌন্দর্য


Momtaj Uddin Ahamad প্রকাশের সময় : অক্টোবর ১৪, ২০২৬, ৫:২২ পূর্বাহ্ন / ০
পাহাড়ের নীরবতায় শীলবুনিয়া ঝরনার সৌন্দর্য

মারাইংতংয়ের পাদদেশে পাথুরে ঝিরিপথ, স্বচ্ছ জলের কলতান আর নির্জন অরণ্যের নিবিড় আহ্বান


।। মমতাজ উদ্দিন আহমদ ।।


পাহাড়েরও নিজস্ব ভাষা আছে। সে ভাষা কখনো মেঘের ভেলায় ভেসে আসে, কখনো অরণ্যের পাতায় পাতায় বেজে ওঠে। আবার কখনো পাথরের বুক ছুঁয়ে বয়ে চলা জলধারায় মিশে যায়। বান্দরবানের আলীকদমে গেলে প্রকৃতির সেই নীরব ভাষা শোনা যায়। সবুজ পাহাড়, আঁকাবাঁকা পথ আর দূরের মেঘমালার আড়ালে এখানে ছড়িয়ে আছে বহু অনাবিষ্কৃত সৌন্দর্য। তারই একটি শীলবুনিয়া ঝরনা।

আলীকদম উপজেলা সদরের কাছাকাছি শীলবুনিয়া মার্মা পাড়ার পাশে ঝরনাটির অবস্থান। পাড়ার নাম থেকেই এর পরিচিতি। বিখ্যাত মারাইংতং পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই জলধারা আকারে খুব বড় নয়। কিন্তু তার সৌন্দর্য মাপার জন্য উচ্চতা কিংবা জলের প্রবাহের হিসাব যথেষ্ট নয়। এখানে প্রকৃতির আকর্ষণ অন্য রকম। নির্জনতা, পাথুরে পথ আর পাহাড়ি ঝিরির অবিরাম কলতান মিলে তৈরি করেছে এক শান্ত, স্নিগ্ধ পরিবেশ।

পাথরের বুক বেয়ে জলের গান

শীলবুনিয়া ঝরনার পথে যাত্রা শুরু হলে প্রথমেই চোখে পড়ে পাহাড়ি প্রকৃতির সহজ, অনাড়ম্বর রূপ। পথের অনেকটা জুড়ে ছোট-বড় নুড়িপাথর। কোথাও পাথরের ফাঁক দিয়ে সরু জলধারা বয়ে চলে। কোথাও ঝিরির পানি পায়ের কাছে এসে ছুঁয়ে যায়। হাঁটতে হাঁটতে কানে আসে জলের একটানা শব্দ। শহরের কোলাহল থেকে দূরে এই শব্দ যেন প্রকৃতির নিজস্ব সংগীত।

ঝরনার কাছাকাছি রয়েছে প্রায় আট ফুট উঁচু একটি প্রাকৃতিক পাথুরে দেয়াল। তার গা ঘেঁষে নেমে আসে জলধারা। চারপাশের পাহাড়ি ঢাল, সবুজ অরণ্য আর পাথরের গাঢ় রঙের সঙ্গে স্বচ্ছ পানির মিতালি দৃশ্যটিকে করে তোলে আরও আকর্ষণীয়। ঝরনার জল ছুঁয়ে দেখা কিংবা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ বসে থাকা দুই অভিজ্ঞতাই ভ্রমণকারীর মনে আলাদা অনুভূতি জাগাতে পারে।

বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে ঝরনায় পানির প্রবাহ বাড়ে। তখন পাহাড়ি ঝিরিও হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। বৃষ্টিস্নাত পাথর, পাতার ওপর জমে থাকা জল আর অরণ্যের ঘন সবুজে চারপাশ যেন নতুন করে সেজে ওঠে। তবে এই সৌন্দর্যের সঙ্গে থাকে সাবধানতার প্রয়োজনও। বৃষ্টির দিনে পাথর পিচ্ছিল হয়ে যায়। ঝিরির পানিও কখনো দ্রুত বেড়ে উঠতে পারে।

মারাইংতংয়ের ছায়ায়

আলীকদমের পর্যটন মানচিত্রে দেশব্যাপী মারাইংতং পাহাড়ের পরিচিতি রয়েছে। পাহাড়টির টানেই অনেক ভ্রমণকারী এই অঞ্চলে আসেন। তাঁদের কারও কারও ভ্রমণতালিকায় যুক্ত হয় শীলবুনিয়া ঝরনাও। ফলে পাহাড় দেখা ও ঝরনার নির্জনতা অনুভব একই ভ্রমণে দুটি ভিন্ন অভিজ্ঞতার সুযোগ তৈরি হয়।

তবে শীলবুনিয়ার আকর্ষণ তার অবস্থানেই সীমাবদ্ধ নয়। এখানে পৌঁছানোর পথটিও ভ্রমণের অংশ। পাথুরে ঝিরি ধরে হাঁটা, চারপাশের সবুজ দেখা আর পাহাড়ি পরিবেশের শব্দ শোনা সব মিলিয়ে পথ চলার মধ্যেই তৈরি হয় আলাদা আনন্দ। যারা প্রকৃতিকে একটু ধীরে, মন দিয়ে দেখতে চান, তাঁদের জন্য এমন পথ বিশেষ আবেদন তৈরি করতে পারে।

পর্যটকের ভিড় তুলনামূলক কম থাকলে ঝরনার আশপাশে নীরবতা অনুভব করা যায়। সেই নীরবতা নিস্তব্ধ নয়; বরং তার ভেতরে আছে পাখির ডাক, পাতার মর্মর আর জলের অবিরাম চলাচল। প্রকৃতির সঙ্গে একান্তে কিছুটা সময় কাটাতে চাইলে এই পরিবেশ মনকে প্রশান্ত করতে পারে।

কখন যাবেন

শীলবুনিয়া ঝরনা দেখার জন্য বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময় আকর্ষণীয়। জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বৃষ্টির কারণে পানির প্রবাহ বাড়তে পারে। অক্টোবর ও নভেম্বরেও ঝরনায় পানি থাকার সম্ভাবনা থাকে; এ সময় বৃষ্টির তীব্রতা কমলে পথ চলা তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক হতে পারে।

তবে পাহাড়ি অঞ্চলের আবহাওয়া দ্রুত বদলে যায়। কোনো নির্দিষ্ট মাসেই পথ নিরাপদ থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। প্রবল বৃষ্টি হলে ঝিরিপথ বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। শীত ও গ্রীষ্মে পানির প্রবাহ কমে যেতে পারে। তাই যাত্রার আগে স্থানীয়ভাবে আবহাওয়া, ঝরনার বর্তমান অবস্থা ও যাতায়াতের পথ সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া ভালো।

যেভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে সড়কপথে আলীকদমগামী বাসে উপজেলা সদরে পৌঁছানো যায়। আলীকদম বাজার বা বাস টার্মিনাল থেকে অটোরিকশা কিংবা ইজিবাইকে শীলবুনিয়া পাড়ার দিকে যাওয়া যায়। আবাসিক এলাকার কাছাকাছি নির্ধারিত স্থানে নেমে স্থানীয়দের সহায়তায় ঝিরিপথ ধরে এগোতে হয়। হাঁটার সময় ও দূরত্ব পথের শুরুর স্থান এবং বর্তমান অবস্থার ওপর নির্ভর করতে পারে।

অচেনা পাহাড়ি পথে স্থানীয় অভিজ্ঞ গাইড সঙ্গে নেওয়া নিরাপদ। পথের অবস্থা, ঝরনায় প্রবেশের অনুমতি কিংবা স্থানীয় কোনো বিধিনিষেধ আছে কি না, তা আগেই জেনে নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে বর্ষায় শুধু ঝরনার সৌন্দর্যের কথা ভেবে যাত্রা শুরু করা ঠিক নয়; আবহাওয়া ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

প্রকৃতির কাছে যাওয়ার দায়

পাহাড়ে ভ্রমণ মানে শুধু সৌন্দর্য দেখা নয়; সেই সৌন্দর্য অক্ষুণ্ণ রাখার দায়িত্বও নেওয়া। শীলবুনিয়া ঝরনার পাথর, জলধারা ও অরণ্য স্থানীয় মানুষের জীবনযাপনের পরিবেশের অংশ। তাই সেখানে গিয়ে প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের প্যাকেট কিংবা অন্য কোনো বর্জ্য ফেলে আসা উচিত নয়। পাথুরে ঢালে ওঠানামার সময় সতর্ক থাকতে হবে। ঝরনার পানির গভীরতা না জেনে নামা কিংবা পিচ্ছিল পাথরে ঝুঁকি নিয়ে ছবি তোলাও বিপজ্জনক হতে পারে।

সঙ্গে পর্যাপ্ত পানীয় জল, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও প্রাথমিক চিকিৎসার উপকরণ রাখা ভালো। দিনের আলো থাকতে ঝরনা দেখা শেষ করে ফেরার পরিকল্পনা করতে হবে। পাহাড়ি এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক সব জায়গায় পাওয়া নাও যেতে পারে। তাই যাত্রার পরিকল্পনা পরিবারের কাউকে জানিয়ে রাখা এবং স্থানীয় গাইডের পরামর্শ মেনে চলা জরুরি।

আলীকদমের সৌন্দর্য তার পাহাড়ের উচ্চতায়, ঝরনার জলে কিংবা অরণ্যের ঘনত্বে এককভাবে ধরা পড়ে না। প্রকৃতির নানা উপাদান এখানে একে অন্যের সঙ্গে মিশে তৈরি করেছে নিজস্ব এক ভূদৃশ্য। শীলবুনিয়া ঝরনা সেই ভূদৃশ্যের ছোট্ট অথচ মায়াময় অংশ। তার কাছে গেলে হয়তো বিশাল কোনো জলপ্রপাতের গর্জন শোনা যাবে না; বরং পাওয়া যাবে পাথরের ফাঁক দিয়ে বয়ে চলা জলের সুর, সবুজের গভীরতা আর কিছুক্ষণ থেমে থাকার অবকাশ।

কখনো কখনো ভ্রমণের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কোনো দর্শনীয় স্থানের ছবি নয়। বরং পথের শব্দ, বাতাসের স্পর্শ আর ফিরে আসার পরও মনে থেকে যাওয়া এক টুকরো নীরবতা। শীলবুনিয়া ঝরনা সেই নীরবতারই এক পাহাড়ি ঠিকানা।


লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।