
নিজের উঠোনে যে-টুকু রোদ এসে পড়ে, তার উষ্ণতা অনুভব করার আগেই অনেকে পাশের বাড়ির ছাদে আরও উজ্জ্বল আলো খুঁজতে যান। নিজের হাতে থাকা ফুলের গন্ধ নেবার বদলে অন্যের বাগানে কত রঙ ফুটেছে, সেই হিসাব কষতে কষতে একসময় নিজের বসন্তটাকেই অচেনা মনে হয়।
কারও বাড়ি বড়, কারও গাড়ি নতুন, কারও ব্যাংক-হিসাব পূর্ণ, কেউ দ্রুত সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছে এই পৃথিবীতে তুলনার উপকরণের অভাব নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই তুলনাকে আরও সহজ করে দিয়েছে। সেখানে মানুষ সাধারণত তার জীবনের উজ্জ্বল জানালাটুকুই খুলে রাখে। অন্ধকার ঘর, ব্যর্থতার রাত, একাকিত্বের দীর্ঘশ্বাস কিংবা অনিশ্চয়তার ভাঙা চেয়ারটি দেখায় না।
আমরা অন্যের সাজানো মুহূর্তের সঙ্গে নিজের সম্পূর্ণ জীবনকে তুলনা করি। ফলে অন্যের হাসি হয়ে ওঠে নিজের দুঃখের প্রমাণ, অন্যের সাফল্য হয়ে ওঠে নিজের ব্যর্থতার রায়।
কিন্তু জীবন কোনো একরৈখিক দৌড় নয়। এখানে সবাই একই পথে হাঁটে না, একই সময়ে পৌঁছায় না, একই গন্তব্যও চায় না। কেউ পাহাড়ে ওঠে, কেউ নদীর ধারে বসে থাকে, কেউ শহরের আলোয় নিজের স্বপ্ন গড়ে, কেউ নিভৃত গ্রামে সন্তানদের মুখে ভবিষ্যৎ দেখে। বাহ্যিক মাপকাঠিতে যে জীবন ছোট, অন্তরের মাপে সেটিই হয়তো পূর্ণ। আবার যে জীবন দূর থেকে বিজয়ের পতাকা বলে মনে হয়, তার ভেতরেও থাকতে পারে নিঃসঙ্গতার দীর্ঘ করিডর।
তুলনা মানুষের আত্মপরিচয়কে ধীরে ধীরে অন্যের হাতে তুলে দেয়। তখন নিজের ভালো লাগা, নিজের প্রয়োজন, নিজের স্বপ্ন সবকিছু অন্যের সাফল্যের মাপে মাপা শুরু হয়। কেউ নতুন বাড়ি করলে মনে হয়, আমার ঘর ছোট। কেউ বিদেশে গেলে মনে হয়, আমার পৃথিবী সংকীর্ণ। কেউ প্রতিষ্ঠিত হলে মনে হয়, আমার এত বছরের চেষ্টা ব্যর্থ। অথচ আমরা জানি না, তার পথের মূল্য কত, তার নিঃসঙ্গতা কত গভীর, তার সাফল্যের পেছনে কী হারানো আছে।
অন্যের জীবনের দৃশ্যমান অংশের সঙ্গে নিজের অদৃশ্য সংগ্রামের তুলনা করা তাই ন্যায্য নয়। যে মানুষটিকে তুমি অতি সুখী ভাবছ, সে হয়তো নিজের ঘরে ফিরে দীর্ঘক্ষণ নীরব বসে থাকে। যে মানুষটিকে তুমি ভাগ্যবান ভাবছ, সে হয়তো এমন কোনো শূন্যতা বহন করছে যার কথা কাউকে বলতে পারে না। মানুষের জীবন বাইরে থেকে যত সরল দেখায়, ভেতরে তত স্তর, তত গোপন ক্ষত, তত নীরব যুদ্ধ।
সুখ হলো নিজের জীবনের সঙ্গে এক ধরনের মীমাংসা। নিজের প্রাপ্তি, অপ্রাপ্তি, সীমা ও সম্ভাবনাকে স্বীকার করে তার ভেতর দিয়ে অর্থ খুঁজে নেওয়া। সুখের সঙ্গে সম্পদের সম্পর্ক আছে। কিন্তু সুখ সম্পদের সমার্থক নয়। স্বাস্থ্য, সম্পর্ক, আত্মসম্মান, নিরাপত্তা, অর্থপূর্ণ কাজ, সৃষ্টিশীলতা এবং অন্তরের প্রশান্তি এসবও মানুষের জীবনের সম্পদ।
জীবনে বেশি সম্পদ থাকা হয়তো সুবিধা দিতে পারে। নিরাপত্তা ও কিংবাসুযোগ বাড়াতে পারে। কিন্তু তা সুখের নিশ্চয়তা নয়। অর্থের প্রয়োজন অস্বীকার করা বাস্তবতা-বিরোধী। অর্থকে জীবনের একমাত্র মানদণ্ড বানানোও আত্মবিনাশী। বড় বাড়িতে বাস করেও মানুষ ছোট হয়ে যেতে পারে, আর ছোট ঘরে থেকেও কেউ বিশাল এক আকাশের নিচে শান্তিতে ঘুমাতে পারে।
অনেক সময় আমরা যে জিনিসটিকে ‘সাফল্য’ বলি, তা অর্জন করতে গিয়ে এই অদৃশ্য সম্পদগুলো হারিয়ে ফেলি। পরে বুঝতে পারি, আমরা যে জীবন চেয়েছিলাম তা পাইনি। বরং অন্যেরা যে জীবনকে সফল বলে মনে করে, সেই জীবনের অভিনয় করেছি।
একটি নতুন গাড়ি, একটি বড় বাড়ি পথকে আরামদায়ক হতে পারে। কিন্তু তা জীবনকে নিশ্চিত করতে পারে না। ব্যাংক-হিসাব ভবিষ্যতের ভয় কমাতে পারে, কিন্তু অতীতের অনুতাপ মুছে দিতে পারে না। তাই প্রাপ্তিকে উপভোগ করতে হলে প্রাপ্তির সঙ্গে বুঝা দরকার কেন চাই, কতটুকু চাই।
সমাজ আমাদের শিখিয়েছে, যে আগে পৌঁছায় সে সফল, যে বেশি আয় করে সে শ্রেষ্ঠ, যে দৃশ্যমানভাবে প্রতিষ্ঠিত সে-ই বিজয়ী। এই ধারণা মানুষের জীবনের স্বাভাবিক বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করে। কেউ বিশ বছর বয়সে নিজের পেশা খুঁজে পায়, কেউ চল্লিশে; কেউ দ্রুত উঠে যায়, কেউ ধীরে ধীরে নিজের ভিত তৈরি করে। দেরিতে ফুটে ওঠা ফুলকে অসম্পূর্ণ বলা যায় না।
শিমুল আর শিউলি একই ঋতুতে ফোটে না। নদী আর পাহাড় একই গতিতে এগোয় না। তবু তাদের সৌন্দর্য কমে না। মানুষের জীবনও তেমন। কারও যাত্রা দ্রুত, কারও গভীর। কারও পথ মসৃণ, কারও পথ কাঁটায় ভরা। যে মানুষটি আজ পিছিয়ে আছে, সে হয়তো এমন এক ভিত্তি নির্মাণ করছে যার ওপর আগামী দিনের স্থায়ী জীবন দাঁড়াবে।
কম পাওয়া কখনো কখনো মানুষকে গভীর করে। অভাব তাকে অপেক্ষা শেখায়। ব্যর্থতা তাকে ধৈর্য শেখায়। দেরি তাকে প্রস্তুত হতে শেখায়। অনেক সময় পথ দীর্ঘ হয়, কারণ মানুষকে গন্তব্যের জন্য ভেতর থেকে প্রস্তুত হতে হয়।
যে মানুষ কৃতজ্ঞ, সে অন্ধ নয়। সে বাস্তবতাকে অন্যভাবে দেখে। সে জানে তার কিছু অভাব আছে, কিন্তু সে এটাও জানে তার জীবনে কিছু আশীর্বাদও আছে। একটি সুস্থ সকাল, মায়ের কণ্ঠ, সন্তানের হাসি, বন্ধুর ফোন, কাজ করার সামর্থ্য, নিজের ভুল থেকে শেখার সুযোগ, বৃষ্টির শব্দ, এক কাপ চা, নির্ভয়ে ঘুমানোর একটি রাত এসবই জীবনের নীরব সম্পদ। আমরা এগুলোকে এত স্বাভাবিক ধরে নিই যে হারানোর আগে এদের মূল্য বুঝি না।
অন্যের জীবনের হিসাব করতে করতে মানুষ নিজের জীবনের খাতা বন্ধ করে দেয়। কে কত পেল, কে কতদূর গেল, কার কত অনুসারী, কার সন্তান কোথায় পড়ছে এসব প্রশ্নের শেষ নেই। কিন্তু কিছু প্রশ্ন থেকে যায় অজিজ্ঞাসিত: আমি কি গত বছরের চেয়ে একটু ভালো মানুষ হয়েছি? আমি কি নিজের ভয়কে কিছুটা জয় করেছি? আমি কি কাউকে সাহায্য করেছি? আমি কি আমার প্রিয় মানুষদের যথেষ্ট সময় দিয়েছি? আমি কি নিজের শরীর, মন ও বিবেকের যত্ন নিয়েছি?
এ বিশ্বচরাচরে প্রত্যেকের জীবন সমান গুরুত্বপূর্ণ। নিজের জীবনকে অন্যের মাপজোখে ছোট করলে আত্মবিনাশ হয়। নিজের পথের ধুলো, অপেক্ষা, ব্যর্থতা, ছোট ছোট জয় সব মিলেই নিজস্ব কাহিনিভান্ডার তৈরী করতে হয় নিজেকেই। এই কাহিনি হয়তো অন্যের মতো জাঁকজমকপূর্ণ নয়, কিন্তু তাতে শ্বাসের উষ্ণতা আছে, চোখের জল আছে, প্রিয়জনের স্মৃতি আছে, অদৃশ্য সাহস আছে।
সর্বাবস্থায় আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। মনে রাখা উচিত আমি সব পাইনি, কিন্তু যা পেয়েছি তা-ও অমূল্য। আমি সবার মতো নই, তাই আমার জীবন অসম্পূর্ণ নয়। আমার পথ আলাদা, তাই আমার যাত্রা ব্যর্থ নয়।
জীবনের শান্তি শুরু হয় সেই মুহূর্তে, যখন অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবন মেলানো বন্ধ করে নিজের হৃদয়ের কাছে ফিরে আসা হয়। তখন হয়তো পৃথিবীর সবকিছু নেই কিন্তু নিজের হাতে যে জীবনটি আছে, সেটি ভালোবাসা, যত্ন ও কৃতজ্ঞতায় পূর্ণ করাই যথেষ্ট।
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
মোবাইল: 01556-560126 / 01645-950296
তারিখ: ১৬/১০/202৬ খিষ্টাব্দ।
আপনার মতামত লিখুন :