
(দ্বিতীয় পর্ব)
আমাদের বাংলায় পাশ্চাত্য নাট্যচর্চা থেকে নাটক কীভাবে এল? বাংলা নাটকের ইতিহাসে দুটি স্রোত মিলেছে। একটি এই ভূখণ্ডের নিজস্ব ধারা: সংস্কৃত নাট্যশাস্ত্রের ঐতিহ্য, আর লোকজীবনের যাত্রা, পালাগান, গম্ভীরা, আলকাপ ও কবিগান। এসব পরিবেশনায় খোলা আসরে গান, সংলাপ ও অভিনয় একাকার হয়ে যায়। দর্শক চারপাশে ঘিরে বসেন। অভিনেতা ও দর্শকের দূরত্ব প্রায় নেই বললেই চলে। অন্য স্রোতটি পাশ্চাত্যের। ইংরেজ শাসনের সূত্রে কলকাতায় ইংরেজি শিক্ষা, শেক্সপিয়রের চর্চা ও প্রসেনিয়াম মঞ্চ এল। ১৭৯৫ সালে গেরাসিম লেবেদেফ কলকাতায় বাংলা ভাষায় নাটক মঞ্চস্থ করলেন; উনিশ শতকে হিন্দু থিয়েটার (১৮৩১) ও বেলগাছিয়া নাট্যশালা (১৮৫৮) গড়ে উঠল। অসংখ্য ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে বাংলায় প্রতিষ্ঠিত হলো ন্যাশনাল, গ্রেট ন্যাশনাল, স্টার থিয়েটার, এমারেল্ড থিয়েটার, মিনার্ভা থিয়েটার, বীণা ও অরোরাসহ বহু নাট্যমঞ্চ।
মধুসূদন দত্ত পাশ্চাত্য নাট্যরীতিতে লিখলেন শর্মিষ্ঠা (১৮৫৯), আর দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ (১৮৬০) দেখাল নাটক অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও হতে পারে। ১৮৭২ সালে ন্যাশনাল থিয়েটারে টিকিট কেটে নাটক দেখার যুগ শুরু হলো। সামাজিক বাধা ঠেলে মঞ্চে এলেন নারীরা। মিসেস বিস্ট্রোর প্রাইভেট থিয়েটার (এমা র্যাংহাম) থেকে স্টার, মিনার্ভা ও এমারেল্ডে এলেন বিনোদিনী দাসী, কুসুমকুমারী, সুকুমারী ও তারাসুন্দরীর মতো নারী অভিনেত্রীরা। তৎকালীন সমাজে তাঁদের অনেককে বারাঙ্গনা পরিচয়ের কারণে অবজ্ঞা সহ্য করতে হয়েছিল। তবু তাঁদের অভিনয় বাংলা মঞ্চের ইতিহাসে স্থায়ী জায়গা করে নেয়।
ব্রিটিশ সরকার নাটকের প্রতিবাদী শক্তি টের পেয়েই ১৮৭৬ সালে নাট্যাভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন করল। বিশ শতকে গণনাট্য সংঘ নাটককে করল সংগ্রামের হাতিয়ার; মুনীর চৌধুরীর কবর (১৯৫৩) ভাষা আন্দোলনের চেতনার প্রতীক হলো। স্বাধীনতার পর ঢাকা থিয়েটার ও আরণ্যকের মতো দল গ্রুপ থিয়েটারের আন্দোলন গড়ে তুলল। সেলিম আল দীন যাত্রা-পালার দেশজ আঙ্গিকে খুঁজে পেলেন নিজস্ব কণ্ঠ, সামরিক শাসনের অন্ধকারে পথনাটক হলো প্রতিবাদের ভাষা। পাশ্চাত্যের কাঠামো আমরা নিয়েছি, কিন্তু তাতে ঢেলেছি নিজেদের সমাজের প্রশ্ন, ভাষা আর গানের সুর। দেশজ আঙ্গিকের এই সন্ধান আসলে আত্মপরিচয়ের সন্ধান।
সমাজ শিল্প ও নাটককে সবসময় এক চোখে দেখেনি। কেউ ভেবেছে সময়ক্ষেপণ, কেউ বিলাস। রক্ষণশীল মহলের একাংশ নাট্যচর্চাকে সন্দেহের চোখে দেখেছে। আবার শিক্ষিত সমাজের একটি অংশ নাটককে দেখেছে সংস্কার ও জাতীয় চেতনার বাহন হিসেবে। শাসকেরা কখনো শিল্পীকে মাথায় তুলেছেন, কখনো কণ্ঠরোধ করতে চেয়েছেন। এই দ্বিমুখিতাই প্রমাণ করে, শিল্পের শক্তিকে কেউ পুরোপুরি অস্বীকার করতে পারেনি। শিল্প সমাজের আয়না, সমাজই শিল্পের মাটি।
আজকের বাস্তবতাতেও সেই দ্বিধা কাটেনি। অনেক পরিবারে গান, নাটক ও ছবি আঁকা এখনও শখ বলে বিবেচিত হয়। সমাজের কিছু অংশে শিল্পচর্চা নিয়ে আপত্তি ও বিধিনিষেধ রয়েছে। পড়াশোনা মানে যেন শুধু চাকরির প্রস্তুতি, মানুষ হয়ে ওঠার প্রস্তুতি নয়। ঢাকার বাইরে থিয়েটারের প্রেক্ষাগৃহ নেই বললেই চলে। নাট্যদলগুলো চলে সামান্য টিকিটের আয় আর কর্মীদের নিজের সঞ্চয়ে; নাট্যকর্মীর জীবিকার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ইউটিউব ও ওটিটির যুগে মানুষের অবসর কাটে হাতের মুঠোর পর্দায় এবং রিলসে। দুই ঘণ্টা মঞ্চের সামনে বসে নাটক দেখার অভ্যাস ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্ন, অস্বস্তিকর শিল্পকর্ম থামিয়ে দেওয়ার প্রবণতা এবং নারী শিল্পীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশের অভাব।
সবচেয়ে জরুরি পরিবর্তন মানসিকতার। শিল্পকে বিনোদনের বাড়তি মশলা না ভেবে শিক্ষা ও মানবিকতার অংশ ভাবতে শিখলেই বাকি পরিবর্তন সহজ হবে। যে শিশু অন্যের চরিত্রে নিজেকে বসিয়ে দেখতে শেখে সে সহমর্মিতাও শেখে। মঞ্চে একটি চরিত্রের দুঃখ, অপমান কিংবা সংগ্রাম দেখতে দেখতে দর্শক অন্য মানুষের জীবন বুঝতে শেখেন। এই অনুভবের সামাজিক মূল্য আছে। সাহিত্য, সংগীত, চিত্রকলা ও নাট্যচর্চা মানুষের কল্পনাশক্তি বাড়ায়। প্রশ্ন করতে শেখায়। ভিন্ন অভিজ্ঞতার প্রতি সংবেদনশীল করে তোলে।
প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা এমন হওয়া দরকার যা শিল্পীর কণ্ঠ কিনে নেয় না, বরং নির্ভয়ে সৃষ্টির সুযোগ দেয়। নাট্যকর্মীর শ্রমের ন্যায্য মর্যাদা, নারী শিল্পীর নিরাপত্তা, সমালোচনা এবং গবেষণার চর্চাও বাড়াতে হবে। ঢাকার বাইরের শহর ও জনপদে নিয়মিত নাট্যপ্রদর্শনীর ব্যবস্থা, উপযুক্ত মঞ্চ, প্রশিক্ষণ এবং স্থানীয় নাট্যদলকে সহায়তা দেওয়া জরুরি। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নাট্যচর্চায় যুক্ত করা গেলে নতুন দর্শক ও শিল্পী দুই-ই তৈরি হবে। দর্শক বাড়ানোর জন্য নাট্যদলগুলোকেও সময়ের সঙ্গে যোগাযোগের নতুন পথ খুঁজতে হবে।
প্রযুক্তিকে শত্রু না ভেবে বন্ধু করা দরকার। নাটকের রেকর্ডিং ও অনলাইন প্রচার নতুন দর্শকের কাছে পৌঁছানোর পথ খুলে দিতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাটকের আলোচনা, মহড়ার অভিজ্ঞতা কিংবা নাট্যকার-অভিনেতার কথোপকথনও দর্শকের আগ্রহ বাড়াতে পারে। তবে প্রযুক্তি যেন সরাসরি মঞ্চের বিকল্প বলে বিবেচিত না হয়। মঞ্চে অভিনেতার জীবন্ত উপস্থিতি, দর্শকের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া এবং একই সময়ে একই স্থানে শিল্পী-দর্শকের সম্মিলিত অভিজ্ঞতা নাটককে স্বতন্ত্র করে। পর্দায় তার রেকর্ড দেখা যায়, কিন্তু মঞ্চের সেই জীবন্ত উত্তাপ পুরোপুরি ধারণ করা যায় না।
আমার কাছে শিল্প তাই সুন্দর ছবি বা মঞ্চের অভিনয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; শিল্প দেখার এক নতুন চোখ। একটি ভালো নাটক দেখে অন্যের কষ্টে যখন বুক ভারী হয়, তখন আমাদের মানবিকতার পরিধি একটু বাড়ে। গ্রিক বেদীর ধোঁয়া থেকে বাংলার পথনাটকের আওয়াজ পর্যন্ত নাটকের এই দীর্ঘ যাত্রা একটি কথাই বলে- যেখানে মানুষ আছে, সেখানে গল্প আছে; যেখানে গল্প আছে, সেখানে মঞ্চ জন্ম নেবে। শিল্প ও নাট্যকলা তাই বিলাস নয়, নিজেকে চেনার সবচেয়ে প্রাচীন আর সবচেয়ে সুন্দর উপায়।
তথ্যসূত্র: ১. জিয়া হায়দার, থিয়েটারের কথা। ২. দর্শন চৌধুরী, বাংলা থিয়েটারের ইতিহাস। ৩. গীতা সেনগুপ্ত, বিশ্বরঙ্গালয় ও নাটক।
লেখক: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, নাটক্যকলা বিভাগ, ২য় বর্ষ।
তারিখ: ১৬/১০/202৬ খিষ্টাব্দ।
আপনার মতামত লিখুন :