
মানুষ যখন মানুষকে শত্রু বলে চিহ্নিত করতে শেখে, তখন সমাজের সবচেয়ে বড় ক্ষতটি তৈরি হয় বিশ্বাসে। আলীকদম প্রেসক্লাবের সাম্প্রতিক সংকট সেই বিশ্বাসভঙ্গেরই এক করুণ দলিল। তবু এই সংকট কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের নয়—এটি মানুষের প্রতি আস্থার, ন্যায়বোধের এবং মফস্বল সাংবাদিকতার অস্তিত্বগত লড়াই।
যাঁরা আজ আলীকদম প্রেসক্লাবকে ঘিরে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, তাঁরা হয়তো জানেন না—এই প্রতিষ্ঠানটি কোনো দিন ক্ষমতার ছায়ায় বড় হয়নি। এটি গড়ে উঠেছে বঞ্চনা, নির্ভীকতা আর কলমের সততার ওপর দাঁড়িয়ে। দীর্ঘ আটাশ বছরের পথচলায় এই প্রেসক্লাব কখনো নামসর্বস্ব সংগঠন ছিল না; বরং ছিল এই জনপদের বিবেক, প্রতিবাদের কণ্ঠ, এবং নীরব মানুষের মুখপাত্র।
আজ সেই প্রতিষ্ঠানকে অপমান, অবরোধ ও প্রশাসনিক রুদ্ররোষের মুখে দাঁড় করানো হয়েছে। যাঁরা সারাজীবন সত্য বলার অপরাধে মামলা-হামলা সহ্য করেছেন, যাঁরা পাঠাগার গড়েছেন, স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠায় অগ্রভাগে ছিলেন, যাঁরা মফস্বলের সাংবাদিকতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছেন—তাঁদেরই বিরুদ্ধে আজ ‘অপরাধী’ হওয়ার অপবাদ জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। এটি নিছক প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়; এটি একটি আদর্শকে ভাঙার প্রচেষ্টা।
এই বেদনা গভীর, কারণ আঘাত এসেছে নৈকট্য থেকেই। দূরের শত্রু যতটা ক্ষতি করে, কাছের মুখোশধারীরা তার চেয়েও ভয়ংকর। তবু এই লেখার মানুষটি মানুষকে ঘৃণা করতে শেখেননি। তিনি জানেন—মানুষের মুখ উল্টালে ভূত হয় না, হৃদয় উল্টালেই ভয়ংকর হয়ে ওঠে। তবু তিনি বিশ্বাস করেন, এই ধূলিমাখা মানুষই একদিন ধুলোর নিচে স্বর্গ টেনে আনবে।
আলীকদম প্রেসক্লাব সংকট তাই কেবল তালা-মারা একখানা ঘরের গল্প নয়। এটি সেই প্রশ্ন—এই জনপদে কি সত্য বলা যাবে? অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কি অপরাধ? সাংবাদিকতা কি ক্ষমতার তোষামোদে পরিণত হবে, নাকি মানুষের পক্ষে দাঁড়াবে?
সমাজকে হাত বুলিয়ে সারানো যায় না—এই সত্য অনেকের কাছে অপ্রিয়। পচা ঘা যখন পেকে ওঠে, তখন অস্ত্রোপচার ছাড়া উপায় থাকে না। আজ আলীকদম প্রেসক্লাব সেই অস্ত্রোপচারের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। সমাজ গালি দেবে, পাথর ছুঁড়বে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ইতিহাস বলে, যে সমাজ অস্ত্রচিকিৎসককে গালি দেয়, একদিন সেই সমাজই তার বন্দনা করে।
এই সংকটে সবচেয়ে বড় আশার জায়গা তরুণেরা। যশের কাঙাল নয়, মানের ভিখারি নয়—যাঁদের দারিদ্র্য সইবার পেট আছে, মার সইবার পিঠ আছে—তাঁরাই নতুন দিনের বাহক। আজ আলীকদমের তরুণেরা যদি বুঝে নেয় যে এই লড়াই একটি প্রেসক্লাবের নয়, এটি তাদের ভবিষ্যৎ কণ্ঠের লড়াই—তবে কোনো তালা, কোনো দমনই এই পথ রুদ্ধ করতে পারবে না।
আজ হয়তো সূর্য আড়াল হয়েছে। কিন্তু সূর্য অস্ত যায় না—শুধু চোখের আড়ালে থাকে। আলীকদম প্রেসক্লাবের পথচলা এখানেই শেষ নয়। রাজপথ বন্ধ হলে কাঁটার পথেই চলবে এই কলম-সৈনিকেরা। কারণ ২৮ বছর আগের অজপাড়াগাঁয়ের আলীকদমে যে সাংবাদিকতার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিয়েছে তার অবমাননা করার অধিকার তাদের নেই।
এই জনপদের ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে—
যাঁরা সত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, তারা ক্ষমতার ছায়ায় হারিয়ে গেছে।
আর যাঁরা সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়ে আঘাত সহ্য করেছিল, তারাই একদিন আলোর দিশারি হয়েছে।
আলীকদম প্রেসক্লাব আজ বেদনাহত, কিন্তু পরাজিত নয়।
কারণ যে বিশ্বাস মানুষের ওপর দাঁড়িয়ে আছে,
সে বিশ্বাস ভাঙে না—
সে শুধু আরও শক্ত হয়।
আপনার মতামত লিখুন :